ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার: নির্বাচনোত্তর পুঁজিবাজারে ধস-ব্যাপক দরপতন, ফোর্সড সেলের আতঙ্কে বিনিয়োগকারীরা দিশেহারা

ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার: নির্বাচনোত্তর পুঁজিবাজারে ধস-ব্যাপক দরপতন, ফোর্সড সেলের আতঙ্কে বিনিয়োগকারীরা দিশেহারা

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১১:০০

পুঁজিবাজারে ‘ফ্লোর প্রাইস’ তুলে নেওয়ার পর প্রথম কার্যদিবসে ব্যাপক দরপতন ঘটে, ফোর্সড সেল নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে বিনিয়োগকারীদের মাঝে। এ নিয়ে আরাফাত রহমানআসাদুজ্জামান’র প্রতিবেদন

‘ফ্লোর প্রাইস’ ওঠার পর বড় দরপতন: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনোত্তর পুঁজিবাজারে শেয়ারের বেঁধে দেওয়া সর্বনিম্ন দর বা ‘ফ্লোর প্রাইস’ তুলে নেওয়ার পর প্রথম কার্যদিবসে ব্যাপক দরপতন ঘটে। ৩৫টি কোম্পানির বাদ দিয়ে বাকি কোম্পানির শেয়ারের সর্বনিম্ন দর বা ‘ফ্লোর প্রাইস’ তুলে দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় অন্তত ১১৬টি কোম্পানির শেয়ারদর পতনের সর্বোচ্চ সীমায় গিয়ে লেনদেন শেষ করে। গত বৃহস্পতিবার পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরপরই বিনিয়োগকারীরা বড় দরপতনের ভয়ে ছিল। রবিবার লেনদেনের শুরুতেই সেই আশঙ্কা সত্য প্রমাণ হয়। প্রথম ৬ মিনিটে সূচক পড়ে যায় ২১৬ পয়েন্ট। এ সময় ফ্লোর তুলে দেওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে অল্প কিছু বাদে প্রায় সবগুলোই দরপতনের সর্বোচ্চ সীমায় লেনদেন হচ্ছিল। কেবল দুটি কোম্পানি দর বেড়ে হাতবদল হচ্ছিল। ফ্লোর প্রাইসের বেশি দর থাকা কোম্পানিগুলোও এ সময় দর হারিয়ে লেনদেন হতে থাকে। তবে সময় যত গড়াতে থাকে, পতনের গতি কমতে থাকে। লেনদেনের শেষ সোয়া এক ঘণ্টায় হারিয়ে ফেলা সূচকের অনেকটাই পুনরুদ্ধার হয়। সকালের এই পতনের কারণেই দিন শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সূচকের ৯৬ পয়েন্ট উধাও হয়ে যাওয়া কিছুটা হলেও স্বস্তি আনে। ভোট শেষ হওয়ার দুই সপ্তাহের মাথায় ৩৫টি কোম্পানি হাতে রেখে বাকিগুলোর ফ্লোর তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে। প্রথম দিন শেয়ারের ক্রয়চাপের চেয়ে বিক্রয়চাপ বেশি থাকার পর লেনদেনও কমেছে ৫০ কোটি টাকার মতো। ডিএসইতে ৫৮৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়। বৃহস্পতিবার লেনদেন ছিল ৬৩৭ কোটি টাকার বেশি। লেনদেনে আসা ৩৮৬টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর পতন হয় ২৯৬টির, দর বেড়ে লেনদেন শেষ করেছে ৫৪টির। ৩৬টির দর ছিল অপরিবর্তিত। সর্বোচ্চ সীমা ১০ শতাংশ দর হারিয়েছে আটটি কোম্পানি। তবে লেনদেন হয়নি বললেই চলে। ১০৮টি কোম্পানির দর কমেছে ৯ শতাংশ থেকে ৯.৯৯ শতাংশ পর্যন্ত। আরো ২২টি কোম্পানির দর কমেছে ৮ থেকে ৮.৯৯ শতাংশ। ৬টি কোম্পানির দর ৬ শতাংশের বেশি, ৮টির দর কমেছে ৭ শতাংশের বেশি। পুঁজিবাজারে এখন তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের সংখ্যা ৩৯২টি। এর মধ্যে ৩৫৭টির শেয়ারদরের সর্বনি¤œ সীমা তুলে নিয়েছে । তবে তিন বিবেচনায় ৩৫ কোম্পানিতে ফ্লোর বহাল রাখা হয়েছে। সর্বনি¤œ দর বেঁধে রাখায় অনেকে এতদিন শেয়ার বিক্রি করতে পারেননি। ফলে ফ্লোর প্রাইস ওঠার সুযোগে অনেকেই শেয়ার ছেড়ে দিয়েছেন। সে কারণে ফ্লোর প্রাইস ওঠার প্রথম দিন যে দরপতন হবে, তা অনেকটা অনুমিতই ছিল। এসব কোম্পানির শেয়ারদর ওঠানামার সার্কিট ব্রেকার আগের মতই ১০ শতাংশই থাকছে। অর্থাৎ, কোনো শেয়ারের দাম ১০ শতাংশের বেশি কমতে পারবে না।

মার্জিন লোন নেয়া বিনিয়োগকারীরা মহা আতঙ্কে : ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার হওয়ার ফলে যে সকল বিনিয়োগকারী মার্জিন লোন নিয়েছেন তারা মহা আতঙ্কে রয়েছেন। নতুন এই সিদ্ধান্তে তাদের ইকুইটি কমে যাচ্ছে, লোন রেশিও বাড়ছে। এক সময় মূলধন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসবে। মূলধন হারিয়ে সর্বশান্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন মার্জিন লোনধারী বিনিয়োগকারীগণ। ট্রিগার সেল আতঙ্কে ভুগছেন তারা। বিএসইসি এখনও এই বিষয়ে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ না করায় তাদের শঙ্কা আরও বাড়ছে। করোনাভাইরাস মহামারীর সময় শেয়ারদর ক্রমশ কমতে থাকায় ২০২০ সালের ১৯ মার্চ বাংলাদেশে পুঁজিবাজারে প্রথমবারের মত ফ্লোরপ্রাইস বেঁধে দেওয়া হয়। ওই বছরের জুন থেকে প্রথমে বীমা খাত ও পরে আরো কিছু খাতের শেয়ারদর বাড়তে থাকলে ধাপে ধাপে ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে ফ্লোর প্রাইস তুলে নিয়েছিল কমিশন। ২০২২ সালের ফেব্রæয়ারির শেষে ইউক্রেইনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর আতঙ্কে আবার পুঁজিবাজারে দরপতন শুরু হলে দ্বিতীয়বারের মত ফ্লোর প্রাইস দেওয়া হয় ২৮ জুলাই। বিনিয়োগকারীদের একাংশের দাবির মুখে একই বছরের ডিসেম্বরে ১৬৯ কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস তুলে শেয়ারের দরপতনের সর্বোচ্চ সীমা ১ শতাংশ বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর এমন কোম্পানিও দেখা যায়, তার দর টানা ৪০ কর্মদিবস এক শতাংশের কাছাকাছি কমেছে। পরে ২০২৩ সালের মার্চে আবার এসব কোম্পানিতে সর্বনি¤œ দর বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর থেকে সূচক মোটামুটি একটি বৃত্তে ঘুরপাক খেলেও শেয়ারের লেনদেন একেবারেই কমে আসে। প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি শ্রেণির বিনিয়োগকারীরা অর্ডার বসিয়ে শেয়ার বিক্রি করতে পারছিলেন না। লেনদেনও কমে আসে অনেকটাই। ওই অবস্থায় ফ্লোর তুলে স্টক ব্রোকার অ্যাসোসিয়েশনসহ বড় বিনিয়োগকারীরা ফ্লোর তুলে দেওয়ার অনুরোধ জানায় বিএসইসিকে। তবে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত কোনো ‘ঝুঁকি’ নিতে চায়নি বিএসইসি।পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, যাদের মার্জিন ঋণ নেওয়া আছে তাদেও চিন্তা বাড়ছে। তাদেরকে অল্টারনেটিভ ফাইন্যান্সের ব্যাপারে তৎপর হতে হবে। যদি কোনো কারণে শেয়ার ট্রিগার সেলের আওতায় চলে আসে, তার ব্যাকআপ প্ল্যান রাখতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, যাদের মার্জিন ঋণ আছে তারা তাদেও বাড়তি সতর্কতা হিসেবে কিছু ফান্ড অ্যারেঞ্জমেন্টের ব্যবস্থা রাখতে হবে। কেননাদেড় বছর ফ্লোর প্রাইসের আওতায় পড়ে থাকা যেসব কোম্পানির শেয়ারে ক্রেতা আসেনি বা ১০ শতাংশ ডাউন সার্কিটে উল্লেখযোগ্য শেয়ার লেনদেন হয়নি, তাহলে হঠাৎ করেই ওই কোম্পানির শেয়ারে ক্রেতা চলে আসবে বিষয়টা কিন্তু সেরকম নয়। তো আপনাকে আগে একটু সময় দিতে হবে। কোন লেভেলে ক্রেতা আসে, আসার পর কেমন ভলিউম হয়, এতে বাজার কোন দিকে টার্ন করে-এমন অনেকগুলো বিষয়কে বিবেচনা রেখেই কিন্তু বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

মোহাম্মদ রেজাউল করিম

বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কমিশন সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করবে: ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার কারণে বাজারে যাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সে জন্য তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিএসইসি’র নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম দৈনিক উত্তরদক্ষিণের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল অবস্থায় চলে আসায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মাঝে এখন আর আস্থা-অনাস্থার কোনো ইস্যু নেই। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কমিশন সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করবে। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সাময়িক সময়ের জন্য ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হয়েছিল। এরপর নানা কারণে ফ্লোর প্রাইসের সময় দীর্ঘায়িত হয়। এখন বাজারসংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বার্থে তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তা আবার প্রত্যাহার করা হয়েছে। আর এর মাধ্যমে আমরা আশা করছি, বাজারে সব শ্রেণির বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়বে। বাজার নিজস্ব গতি ফিরে পাবে। এভাবে আমরা একটা গতিশীল বাজার দেখতে পাব।

আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই: ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর বাজারে এর প্রভাব পড়া শুরু করেছে, এর উত্তরে তিনি জানান, যতটা চাপের শঙ্কা করা হয়েছিলো তা প্রথম দিন তেমনভাবে পড়েনি। সুতরাং এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তিনি বলেন, বিএসইসি ফোর্সড সেল ও প্যানিক সেল ইস্যুতে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যেসব কোম্পানির লেনদেনযোগ্য তথা ফ্রি ফ্লোট শেয়ার এবং বাজার মূলধন বেশি, সেগুলোর ওপরই মূলত ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখা হয়েছে। ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ায় বাজারে সূচকের যাতে বড় ধরনের পতন না হয়, সে জন্য এ কৌশল নেওয়া হয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে জোর: ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার পর বাজারে যাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সে জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলমান রয়েছে বলেও জানান রেজাউল করিম। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে সেল প্রেসার যেন না দেওয়া হয় তা নিয়েও আশ^স্ত করা হয়েছে বিএসইসিকে বলে জানান তিনি। পুঁজিবাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিল থেকে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানকে বাজারে বিনিয়োগের জন্য কম সুদে ১০০ কোটি টাকার তহবিল সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তীতে এটা আরও বাড়বে বলে জানান মুখপাত্র। রেজাউল করিম বলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বে পুঁজিবাজারের গতিশীলতা বৃদ্ধি ও তারল্য বাড়াতে নানা উদ্যোগ তারা গ্রহণ করেছেন। ইতোমধ্যে ব্যাংক খাত থেকে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য এ খাতের সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করেছে বিএসইসি, সেখানে সক্ষমতা অনুযায়ী প্রত্যেকে বিনিয়োগ বাড়াবে বলেও আশ^স্ত করা হয়েছে বলে জানান নির্বাহী পরিচালক। এছাড়াও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) সহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী বিনিযোগ বাড়াবে বলে বিএসইসি’র সঙ্গে সম্মতি প্রদান করেছে বলেও জানান তিনি। বিএসইসির আদেশে বলা হয়েছে, বেশিরভাগ শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হলেও ৩৫টি কোম্পানির ক্ষেত্রে আগের আদেশ বহাল থাকবে। যে ৩৫ কোম্পানির শেয়ারদরের ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার হলো না, সেগুলো কীসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে-এমন প্রশ্নে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র রেজাউল করিম বলেন, কোম্পানিগুলোর ফ্রি-ফ্লোট শেয়ারের ভিত্তিতে বাজার মূল্যসূচকে অবদান, মার্জিনযোগ্য শেয়ারগুলোর মধ্যে বিক্রির চাপ বেশি, মূল্য-আয় অনুপাত বেশি-এমন বেশ কিছু দিক বিবেচনায় নিয়ে তালিকাটি করা হয়েছে।

এমন সিদ্ধান্ত কতটা চ্যালেঞ্জিং?: বিশ্লেষকদের মতে, ফ্লোর প্রাইস দিয়ে মার্কেট ধরে রাখার বিষয়টি স্থায়ী সমাধান ছিল না। ফ্লোর প্রাইস দেয়া হয়েছিল সঙ্কটপূর্ণ একটি সময় বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে। বিষয়টি তখনকার পরিপ্রেক্ষিতে যৌক্তিক ছিল। তবে বর্তমানে ধাপে ধাপে তুলে নিলে মার্কেটের উপর চাপ কম পড়তো। মার্কেট ধীরে ধীরে সচল হচ্ছে। তারপরও মার্কেটে ডিমান্ড সাইড এখনো দুর্বল; সেদিক থেকে বিবেচনা করলে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করা যেত। ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে নিলে একটি পক্ষের দাবি ছিল মার্কেট স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে। বস্তুত মার্কেট পরিচালিত এবং ব্যালান্স হয় ডিমান্ড আর সাপ্লাই এর উপর নিভর করে। দীর্ঘ সময় ধরে মার্কেটে ডিমান্ড সাইড অনেক দুর্বল। লিকুইডিটি হচ্ছে মার্কেটের ব্লাড। মার্কেট থেকে অনেক বেশি মাত্রায় লিকুইডিটি বের হয়েছিল, যার কারণে ভালো কিংবা দুর্বল নির্বিশেষে সব কোম্পানি ক্রাশ করলো। ফ্লোর উঠিয়ে নিলে এই পক্ষের হয়তো দাবি স্টকগুলো দাম আরো কমলে ডিমান্ড সৃষ্টি হবে, কিন্তু অনেক স্টক ইন্ট্রিন্সিক ভ্যালু থেকে কম মূল্যে থাকা সত্তে¡ও ডিমান্ড সৃষ্টি হয়নি। এখন প্রশ্ন হতে পারে-চলতি সপ্তাহ মার্কেটের জন্য কতটা চেলেঞ্জিং? অনেকেই বলছেন কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। তবে প্যানিক হওয়ার কিছু নেই, মার্কেট নিজ থেকে ব্যালান্স হতে শুরু করবে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২২ জানুয়ারি, ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

বাজার সংশ্লিষ্টদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া: সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বাজারসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কেউ কেউ মনে করছেন, ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ায় শুরুতে কিছু শেয়ারে দরপতন হবে। হয়তো কিছু শেয়ারে ক্রেতাও মিলবে না। আবার কারও কারও ধারণা, যত শঙ্কা করা হচ্ছে, তত খারাপ অবস্থা হবে না। বরং কোনো শেয়ারের দর বেশি কমলে ওই দরই নতুন বিনিয়োগকারী তৈরি করবে। নতুন পরিস্থিতিতে শেয়ারবাজারে তারল্য প্রবাহ বাড়বে। ফলে লেনদেনের পরিমাণ বাড়বে। যদিও মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে নিতে সম্প্রতি সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার যে নীতি বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা করেছে, তার কারণে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে। তারা বলেন, ঋণের সুদের হার বাড়ছে, যা বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ধাপে ধাপে না করে একবারে সিংহভাগ শেয়ারের ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার ‘ভালো সিদ্ধান্ত’ বলে মনে করেন প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, বিএসইসি ভালো সিদ্ধান্তই নিয়েছে। এর থেকেও ভালো সিদ্ধান্ত হলো ‘স্ট্যান্ডার্ড সার্কিট ব্রেকার’ নীতি অনুসরণ করা।
তিনি আরও বলেন, অনেক শেয়ারই ফ্লোর প্রাইসের ওপরে লেনদেন হয়েছে। যেসব শেয়ার ফ্লোর প্রাইসে ছিল, সেগুলোর মধ্যে সাময়িকভাবে সামান্য কিছু শেয়ারের দর কমতে পারে। কারণ সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো নয়। এর মধ্যে অনেক কোম্পানির মুনাফা কমলেও ফ্লোর প্রাইসের কারণে সেগুলোর শেয়ারদর সমন্বয় হয়নি। এখন হয়তো দর সমন্বয় হবে। কোনো শেয়ারের দর অল্প সময়ে বেশি কমলে, সেগুলোর বাজারদরই নতুন চাহিদা তৈরি করবে। এতে অল্প সময়ের মধ্যে বাজার তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে বলে আশা করা যায়।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ফ্লোর প্রাইস আরোপের সিদ্ধান্ত অর্থনীতি ও বাজার ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। অন্তত শেয়ারবাজারে এমন ধারণা প্রতিষ্ঠা করা একেবারেই ঠিক হয়নি। তথাকথিত ফ্লোর প্রাইস কাউকে রক্ষা করবে না, বরং মার্জিন ঋণ নিয়ে যাদের বিনিয়োগ ছিল তাদের অনেককে ফকির বানাবে। আবু আহমেদ বলেন, এখন চাহিদা ও জোগানই শেয়ারের প্রকৃত দর নির্ধারণ করে দেবে। শুরুর কয়েকদিন হয়তো দরপতন হবে। তবে দরপতনেই নতুন চাহিদা তৈরি করবে। ভালো শেয়ারে যাদের বিনিয়োগ রয়েছে, তারা ধৈর্য ধরে থাকলে পুনরায় দর ফিরে পাবেন। তবে যেসব মন্দ শেয়ারের দর অযৌক্তিকভাবে বহুগুণ হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।

সিইও ফোরামের তিন সিদ্ধান্ত: শেয়ারবাজারের ব্রোকারেজ হাউসের কতিপয় নির্বাহীদের সংগঠন সিইও ফোরাম নিজেদের মধ্যে আলোচনায় করেছে। অনলাইনে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি ও ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়। এই পরিস্থিতিতে বাজারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা করার বিষয়ে একমত হন বেশির ভাগ সিইও। বৈঠকে তিনটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রথমত, যেসব শেয়ারের ক্রেতা থাকবে না, সেই সব শেয়ারের বড় বিক্রয় আদেশ দেওয়া হবে না। দ্বিতীয়ত, ব্রোকারেজ হাউসের ডিলার অ্যাকাউন্ট থেকে এক কোটি টাকা বা সাধ্যমতো শেয়ার কেনা হবে। তৃতীয়ত, বিনিয়োগকারীরা যেন আতঙ্কিত হয়ে ‘প্যানিক সেল’ না করেন, সে বিষয়ে তাদের বোঝানো হবে। সিইও ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও ইবিএল সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছায়েদুর রহমান জানান, বাজার নিয়ে উদ্বেগের তেমন কিছু নেই। বাজারে বিক্রির চাপ তৈরি না হয়, সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে।

ইউডি/এজেএস

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading