এক বছরে ৫১৩ জনের আত্মহত্যা: স্কুল কলেজ ভার্সিটি’রশিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহননের প্রবণতা বাড়ছে কেন

এক বছরে ৫১৩ জনের আত্মহত্যা: স্কুল কলেজ ভার্সিটি’রশিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহননের প্রবণতা বাড়ছে কেন

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৪:০০

দেশে তরুণদের আত্মহত্যার প্রবণতা কমছেই না। তবে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই থাকেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু তারা এমন সিদ্ধান্ত কেন নিচ্ছেন এ নিয়ে মো. শহীদ রানার প্রতিবেদন

নারী শিক্ষার্থীদের হার সবচেয়ে বেশি: দেশে তরুণদের আত্মহত্যার প্রবণতা কমছেই না। তবে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই থাকেন শিক্ষার্থীরা। শুধু তাই নয়, দেশে মোট আত্মহননকারীদের মধ্যে এগিয়ে নারী শিক্ষার্থীরা। দুশ্চিন্তা, পারিবারিক চাপ ও কলহ, প্রেমঘটিত কারণ, পড়াশোনোর চাপ, বেকারত্বসহ বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যার পথ বেঁছে নেন অনেকে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সচেতনতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও কার্যত কোনো পরিবর্তন আসেনি। তাই এ সমস্যা নিরসনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের একযোগে কাজ করার পাশাপাশি আত্মহত্যার প্রবণতাকে অপরাধ নয় বরং সমস্যা বলে চিহ্নিত করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
অভিমান, প্রেমঘটিত কারণ, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক দ্ব›দ্ব ও মানসিক সমস্যার কারণে ২০২৩ সালে দেশে ৫১৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে ১৬৫ জনই অভিমান থেকে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে।
সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষায় এ চিত্র উঠে এসেছে। সমীক্ষা বলছে, সবথেকে বেশি আত্মহত্যা করেছে নারী শিক্ষার্থীরা, ৬০ দশমিক ২ শতাংশ। আর শিক্ষার স্তর বিবেচনায় আত্মহত্যা বেশি স্কুলগামীদের, ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ। শনিবার (২৭ জানুয়ারি) ভার্চুয়াল এক সংবাদ সম্মেলনে ২০২৩ সালের আত্মহত্যার এই চিত্র তুলে ধরেন সংগঠনটির রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ইউনিটের টিম লিডার ফারজানা আক্তার লাবনী। তিনি বলেন, গত বছর আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছেলে ২০৪ জন, নারী ৩০৯ জন। ২০২২ সালে আত্মহত্যা করেন ৫৩২ জন। এ বছর কিঞ্চিৎ কমলেও তা আশানুরূপ নয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০২৩ সালে ২২৭ জন স্কুল শিক্ষার্থী (৪৪.২০%) আত্মহত্যা করেন। কলেজ শিক্ষার্থী রয়েছেন ১৪০ জন (২৭.২%), বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ৯৮ জন (১৯.১%) এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ৪৮ জন (৯.৪%)। ঢাকা বিভাগে ১৪৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৮৯ জন, রাজশাহী বিভাগে ৭৭ জন, খুলনা বিভাগে ৬৪ জন, বরিশাল ও রংপুর বিভাগেই ৪৩ জন করে, ময়মনসিংহে ৩৬ জন ও সিলেটে ১২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। ২০২৩ সালজুড়ে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার আগের বছরের কাছাকাছি। ২০২১ সালে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সংখ্যা ছিলো ১০১ জন। ২০২২ সালে দেশে আত্মহত্যাকারী স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল ৫৩২ জন। ২০২৩ সালে দেশের ১০৫টি জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা এবং অনলাইন পোর্টাল থেকে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের গবেষণা ও বিশ্লেষণ বিভাগের টিম লিডার ফারজানা আক্তার।

এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে কী কারণ : ২০২৩ সালে আত্মহনন করা মোট শিক্ষার্থীর ৬০.২% মেয়ে। তাদের আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৮.৮% আত্মহত্যা করেন অভিমানে, ১৬.৫% প্রেমঘটিত কারণে, ৮.৪% মানসিক ভারসাম্যহীনতায়, ৭.১% পারিবারিক কলহে, ৩.৯% যৌন হয়রানি, ৪.২% পড়ালেখার চাপে ও অকৃতকার্য হয়ে, ১.৬% পারিবারিক নির্যাতনে, ০.৬% অপমানে এবং ২.৯% কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে আত্মহত্যা করেন।
আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, ২০২৩ সালে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পেছনে বড় কারণ অভিমান। মোট শিক্ষার্থীর ১৬৫ জন (৩২.২%) অভিমান করে, ১৪.৮% প্রেমঘটিত কারণে, ৯.৯% মানসিক সমস্যাজনিত কারণে, ৬.২% পারিবারিক কলহে, ১.৪% পারিবারিক নির্যাতনে, ৪.৫% পড়ালেখার চাপে, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে ৩.৫%, ১.৮% কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেয়ে, ২.৫% যৌন হয়রানি ও ০.৮% অপমান বোধ করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এছাড়াও পারিবারিক কলহ ৩.১৪ শতাংশ স্কুল এবং কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার জন্যে দায়ী। মোট আত্মহত্যাকারী স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারিবারিক কলহের কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন ২.৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। শুধু কলেজগামী আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই কারণে আত্মহত্যা করেন ৪.৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী।

স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে: মোট শিক্ষার্থীর ৪৪.২% স্কুলগামী গতবছর আত্মহত্যা করেন। কলেজ শিক্ষার্থী রয়েছেন ১৪০ জন (২৭.৩%), বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ১৮ জন (১৯.১%) ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ৪৮ জন (৯.৫%)। আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, বয়ঃসন্ধিকালে নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এ সময়টাতে বেশি রাগ-অভিমানের প্রবণতাও থাকে। গেল বছরের চিত্রে দেখা যায়, ১৩-১৯ বছর বয়সী ৩৪১ শিক্ষার্থী (৬৬.৫%) আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে ২২২ জনই মেয়ে; বিপরীতে ছেলে ১১৯ জন। ২০-২৫ বছর বয়সীদের আত্মহত্যার হার ২৩.৪%, ২৬-৩০ বছর বয়সী ২.৩%, আর এক-দুই বছর বয়সী শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার হার ৭.৮%। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর বয়সে হরমোনজনিত কারণে শিক্ষার্থীরা বেশি আবেগপ্রবণ থাকে। ফলে আত্মহত্যার প্রবণতাও বেশি থাকে। সংগ্রহকৃত তথ্যে উঠে এসেছে, ২০২৩ সালে মোট আত্মহত্যাকারী ৫১৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৯৮ জন, যা মোট সংখ্যার ১৯.১ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৬ জন, সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ জন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ জন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ জন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ জন, মেডিকেল কলেজের ৬ জন, নার্সিং ইনস্টিটিউটের ৫ জন, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ২ জন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ জন, এবং অন্যান্য ১৫ জন শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন।বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জন শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জন শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ জন এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ জন করে শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ব্যাপকহারে আত্মহত্যার পেছনে যে কারণটি দায়ী সেটি হলো প্রেমঘটিত কারণ যা ১৬.৫ শতাংশ, মানসিক সমস্যায় জর্জরিত হয়েও ২২.৭ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। পূর্ববর্তী তথ্যানুসারে ২০২১ সালে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ১০১ জন এবং ২০২২ সালে দেশে আত্মহত্যাকারী স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫৩২ জন।

সরকারি পদক্ষেপ আশা জাগাচ্ছে: ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে আত্মহত্যার হার ২ দশমিক ৪ শতাংশে কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার৷ এ লক্ষ্যে সামাজিকভাবে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)৷ এতে সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দেন বিশেষজ্ঞরা৷ গত চার বছরে আত্মহত্যা ঠেকাতে নানা সময়ে কাজ করতে দেখা গেছে জাতীয় জরুরি সেবা হটলাইন ৯৯৯-এর সদস্যদের৷ বিভিন্ন সময়ে ফোন পেয়ে তারা ছুটে গেছেন ভিকটিম উদ্ধারে৷ সরকারের নেওয়া নানাবিধ পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম একটি পদক্ষেপ হলো মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৮। এছাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য ‘মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক ফার্স্ট এইড (পার্ট-১)’ নামক একটি অনলাইন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। যেখানে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি-২০২২ এর গেজেট প্রকাশ করে সরকার। প্রত্যেক জেলায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য একজন করে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনোবিদ নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনাও প্রক্রিয়াধীন। ২০২৩ সালে ষষ্ঠ এবং সপ্তম শ্রেণির ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা বই’ নামক বইটিতে মনের যতœ নেওয়া বিষয়ক অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে তরুণ প্রজন্মকে মানসিকভাবে তৈরি হতে সহায়তা করতে পারে। আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ বলেন, শিশু কিশোরদের মন সাধারণত ভঙ্গুর প্রকৃতির হয়। এ বয়সে ছোট ছোট বিষয়গুলোও তাদেরকে আন্দোলিত করে। বয়ঃসন্ধিকালে মানসিক বিকাশের সাথে অনেকেই খাপ খাওয়াতে পারে না। ফলে তাদের প্রত্যাশার ক্ষেত্রে ছোটখাটো ঘাটতিও তাদেরকে আত্মহত্যার মতো বড় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ নিয়ে তানসেন জানান, আত্মহত্যা প্রতিরোধে আমাদের শিক্ষক এবং বাবা মায়েদের সবচেয়ে বেশি ভ‚মিকা পালন করতে হবে। শিশুকালে বাচ্চাদের উপর বাবা মায়ের প্রভাব যেমন বেশি থাকে, কৈশোরে সেই দায়িত্ব বর্তায় শিক্ষকদের উপর। তাই শিক্ষার্থীদের মানসিক গঠনে তাঁদের দায়িত্ব এবং কর্তব্যও বেশি। আমাদের দেশে সন্তান লালন পালনের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে শেখার সুযোগ নেই বললেই চলে। আবার সন্তান লালন পালনও যে শিক্ষণীয় একটি বিষয় তাও মানতে নারাজ অনেক বাবা মা-ই। ফলে সন্তানদের মানসিক বিষয়গুলো নিয়ে বাবা মায়েরা অনেক ক্ষেত্রেই থাকেন উদাসীন। তাই সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি তত গুরুত্ব দিতে চান না।
সাইকোলজিস্ট শাহরিনা ফেরদৌস বলেন, ২০২২ সালের এই জরিপে দেখা যাচ্ছে ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহননের প্রবণতা অনেক বেশি। অর্থাৎ তারা যে বয়ঃসন্ধিকালের সময়টি পার করছে এটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং এ সময়ে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের যতœ এবং সচেতনতা তৈরির কোন বিকল্প নেই। কি কারনে তাদের সংখ্যা গত বছর এত বেশি ছিল তার কারণগুলো অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। বিশেষ করে তাদের পারিবারিক বন্ধন, ব্যক্তিগত চাহিদা, সামাজিক অবস্থান এ সকল বিষয় জানার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, রোগী দেখার সময় আমি দেখেছি কোভিডের একটি বড় প্রভাব পড়েছে আমাদের বয়ঃসন্ধিকালীন জনসমষ্টির উপর। যা কাটিয়ে উঠতে এখনো আরো সময়ের প্রয়োজন। সর্বোপরি বয়ঃসন্ধিকালীন মনের যতœ বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। ছেলেমেয়েদের খেলাধুলার সুযোগ ভীষণ প্রয়োজন। স্ক্রিন বা মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারিবারিক বন্ধন, পরিবারের সাথে ভালো সময় কাটানোর চর্চা বাড়াতে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই আত্মবিশ্বাসী এবং সুস্থ মনোন গড়ে তুলতে এই পদক্ষেপগুলো অনস্বীকার্য।
মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে আঁচল ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সামিরা আক্তার সিয়াম বলেন, ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা সর্বাধিক। আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় এটি। ছোটবেলা থেকেই পরিবারিক, সামাজিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় মানসিক স্বাস্থ্য ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের কৌশলগুলো রপ্ত করতে শেখাতে হবে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট, বাংলাদেশের অবস্থান: ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশনের (আইএএসপি) মতে, প্রতি বৎসর বিশ্বব্যাপী ৭ লক্ষ ৩ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে, যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডবিøউএইচও) পরিসংখ্যান অনুযায়ী এর সংখ্যা প্রায় ৮ লক্ষ। ডবিøউএইচও’র মতে, বিশ্বে সার্বিকভাবে মৃত্যুর ১৭তম প্রধান কারণ হলো আত্মহত্যা৷ অবশ্য ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সিদের মৃত্যুর চতুর্থ প্রধান কারণ আত্মহত্যা৷ বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় সাত লাখ তিন হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেন৷ এ হিসেবে, প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেন৷ যদিও দারিদ্র্য সরাসরি আত্মহত্যার সঙ্গে জড়িত নয়, তবে এটি আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ায়৷ ডবিøউএইচও’র এক প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বে প্রতিবছর যত মানুষ আত্মহত্যা করে তার ৭৭ শতাংশই হয়ে থাকে কম আয় ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে৷
আত্মহত্যার এই প্রবণতার দিক হইতে বাংলাদেশ আছে দশম স্থানে। তবে সামগ্রিকভাবে বয়স বিবেচনায় ২১ হইতে ৩০ বৎসর বয়সি নারীদের আত্মহত্যার হার অধিক। আর শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই দিক দিয়া স্কুল-কলেজ পড়ুয়ারা রহিয়াছে শীর্ষ অবস্থানে। বিশ্লেষকগণ বলছেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বয়ঃসন্ধিকালটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় অভিভাবক ও শিক্ষকদের বাড়তি যতœ নেওয়ার কথা থাকলেও তারা অধিক অবহেলা ও অনাদরের শিকার হয়। তাদের চাওয়া-পাওয়াকেও গুরুত্ব দেয়া হয় না। এ সময় তাদের ওপর পড়াশুনার চাপ থাকে অত্যধিক। আবেগ, উদ্বেগ ও প্রেমঘটিত বিষয়াদি যথাযথভাবে সামাল দিতে পারে না। প্যারেন্টিংয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও দক্ষতার অভাব থাকে। এই জন্য শুধু শারীরিক নয়, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারেও অধিক যতœবান ও সচেতন হতে হবে। স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এরূপ প্রবণতা কমাতে হলে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার পাশাপাশি তাহাদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে করিতে হইবে আনন্দময়। ছোটবেলা থেকেই আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।

প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার তাগিদ: স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) মো. সাইদুর রহমান বলেন, এই বয়সে আবেগজনিত সমস্যা, পড়ালেখার চাপ ও পারিবারিক চাপের কারণে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা করতে দেখা যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীদের এই সমস্যাগুলো শনাক্ত করা হয় না। তারা সমস্যার কথা বলার মতো জায়গাও পান না। আত্মহত্যা প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজসেবা অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনায় বসা প্রয়োজন বলে মনে করেন সাইদুর রহমান। যেসব প্রতিষ্ঠান আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করে তাদের সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, অভিমান ও প্রেমের সম্পর্কের মতো আবেগীয় জটিলতা থেকে আত্মহত্যার ঘটনা বেশি ঘটেছে। ফলে শিক্ষার্থীদের আবেগীয় বিষয় নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের মধ্যে এবং পাঠ্যক্রমে কোনো ব্যবস্থা আছে কিনা তা দেখা দরকার। নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। কোনো ধরনের ইমার্জেন্সি টিম গঠন করা যায় কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সম্ভবত ২০২১-২২ সালের দিকে ১ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায় ৯৯৯ এ আত্মহত্যার বিষয়ে কল করা হয়েছে প্রায় ১৫০০। এর মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক কেসে রেসপন্স করা সম্ভব হয়েছে। কারণ যিনি এ পথ বেছে নিচ্ছেন তিনি সার্ভিস নেওয়ার অপেক্ষায় থাকেন না। আবার কল পেয়ে লোকেশন খুঁজে খুব অল্প সময়ের মধ্যে রেসপন্স করাও কঠিন। সেই সঙ্গে সার্ভিস যারা দিচ্ছেন তারা কতটুকু দক্ষ তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাই সবকিছুর জন্য আগে প্রস্তুত হতে হবে।

প্রবণতা কমাতে আঁচল’র প্রস্তাব: আত্মহত্যা কমাতে বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে আঁচল ফাউন্ডেশন। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি মাসে অন্তত একবার মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একজন করে মেন্টর নির্ধারণ এবং উভয়ের মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেন্টাল হেলথ কর্নার চালু করা। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বিষয়াদি অন্তর্ভুক্ত করা। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ট্যাবু ভাঙতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন প্রচার চালু করা। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের কৌশল ও ধৈর্যশীলতা শেখানো। যে কোনো নেতিবাচক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে শিক্ষার্থীদের কৌশল, মানকি চাপ নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে শেখানো। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পরিবারের সদস্যদের আত্মহত্যার আলামত সম্পর্কে ধারণা বিস্তৃত করা। মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা ইন্সুরেন্স বীমার আওতায় আনা, যেন তা সকলের জন্য সাশ্রয়ী হয়। মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দ্রæত ও সহজলভ্য করতে টোল ফ্রি জাতীয় হট লাইন নম্বর চালু করা।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২৮ জানুয়ারি ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

উত্তরণের উপায় নিয়ে যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা: আত্মহত্যার এই সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এ বি এম নাজমুস সাকিব বলেন, এ ক্ষেত্রে গবেষণাগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পাশাপাশি পলিসি মেকিংকে গুরুত্ব দিতে হবে। একটি কারণকে শুধু নয়। মাল্টিপল কারণ খুঁজে বের করে কাজ করতে হবে। শিশু কিশোরদের এটাচমেন্ট শক্তিশালী করতে হবে। তিনি বলেন, কিশোরদের মধ্যে একটা বিষয় কাজ করে যে রিস্ক টেকিং বিহ্যাবিওর। ফলে তারা জীবনকে অনেক কিছুতে জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পরোয়া করে না। এ থেকে বাঁচতে তাদের বোঝাতে হবে যে জীবন একটাই। ব্যক্তি জীবন কোনো ভিডিও গেম না যে একবার চলে গেলে আবার ফিরে পাওয়া যাবে।
এ সমস্যা নিরসনে ধর্মীয় লিডারদের গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাই ধর্মীয় লিডারদের বক্তব্য ও নির্দেশনা যদি পাঠ্যপুস্তকে আসে তাহলে এই সমস্যা নিরসন সহজ হবে বলে পরামর্শ দেন এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে ঢাবির ভ‚মিকার বিষয়ে তিনি বলেন, কোভিডের পর থেকে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষিতে প্রতিটি অনুষদেই এই বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে বেশ কয়েকটি সেশনও করা হয়েছে।

ইউডি/এজেএস

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading