মানুষের মস্তিষ্কে ‘ব্রেন চিপ’ স্থাপন: প্রযুক্তির এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ, সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে শঙ্কাও
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৩:০০
প্রথমবারের মতো মানুষের মস্তিষ্কে ব্রেন চিপ স্থাপন করেছে ইলন মাস্কেও প্রতিষ্ঠান নিউরালিংক। প্রযুক্তির এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ সম্ভাবনার পাশাপাশি শঙ্কাও জাগাচ্ছে। ব্রেন চিপ নিয়ে আশিকুর রহমান’র প্রতিবেদন
মস্তিষ্ক-প্রযুক্তি সমন্বয়-আর্শীবাদ না অভিশাপ: দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে প্রযুক্তির সংযোগ স্থাপনের জন্য ব্রেন কম্পিউটার ইন্টারফেসেস (বিসিআইএস) প্রযুক্তির চিপ তৈরির জন্য কাজ করছে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নিউরালিংক। গত বছরের মে মাসে আমেরিকার খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) নিউরালিংককে প্রথমবারের মতো মানুষের মস্তিষ্কে চিপ যুক্ত করার পরীক্ষা চালানোর অনুমতি দেয়। আর এর পর থেকেই কাজে লেগে পরে মাস্কের কোম্পানি। গত সোমবার সফলতাও পায় প্রতিষ্ঠানটি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-এক্সে ইলন মাস্ক নিজেই সেই খবর জানিয়েছেন। মঙ্গলবার (৩০ জানুয়ারি) তিনি জানান, প্রথমবারের মতো মানুষের মস্তিষ্কে নিজেদের তৈরি ব্রেন চিপ স্থাপন করেছে নিউরালিংক। সোমবার সফলভাবে চিপটি এক ব্যক্তির মস্তিষ্কের সঙ্গে বসানো হয়েছে। একইসঙ্গে তিনি আরও জানান, সেই ব্যক্তি দ্রæত সুস্থ হয়ে উঠছেন। প্রাথমিকভাবে চিপটির মাধ্যমে আশাব্যঞ্জক নিউরো স্পাইকও শনাক্ত করা গেছে। ইলন মাস্ক জানান, বিসিআইএস প্রযুক্তিনির্ভর চিপটির মাধ্যমে মস্তিষ্ক থেকে সংকেত পাঠিয়ে কম্পিউটার, স্মার্টফোনসহ বিভিন্ন যন্ত্র দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। অর্থাৎ মনে মনে ভাবলেই কম্পিউটার বা স্মার্টফোনে বিভিন্ন ধরনের কাজ করার সুযোগ মিলবে। ডিভাইসটি সফলভাবে মানব রোগীর ওপর স্থাপিত হলে তা তার কোম্পানির জন্য বড় এক মাইলফলক হবে। মাস্কের দাবি, একদিন এর মাধ্যমে বিকল্প বাস্তবতা দেখার সুযোগও মিলতে পারে। উল্লেখ্য, নিউরালিংকের আগে আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মস্তিষ্কের তরঙ্গ শনাক্ত করতে সক্ষম যন্ত্র মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে যুক্ত করেছে। নিউরালিংক যদি শতভাগ সফল হয়, তাহলে মানুষ প্রযুক্তির নতুন এক যুগে প্রবেশ করবে। কল্পবিজ্ঞানের বিচিত্র জগৎ ছেড়ে চিন্তার মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ করার ব্যাপারটি হয়ে যাবে নিখাদ বাস্তব। তবে শঙ্কার জায়গা হলো এর প্রভাবে মানুষের মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর তাতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো অলিখিতভাবেই নিয়ন্ত্রণকারী হয়ে উঠবে। মানুষের চিন্তা-ভাবনা, গোপনীয়তা ও নানা তথ্য এক প্রকার অন্যের হাতে চলে যাবে। বিশ্লেষকদের মতে, তাই প্রযুক্তির এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ সম্ভাবনার পাশাপাশি শঙ্কাও জাগাচ্ছে। এদিকে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন- বিসিআই ডিভাইসটি যদি মানুষের ব্যবহারের জন্য নিরাপদ বলে প্রমাণিতও হয়, তবুও বাণিজ্যিকভাবে এটি ব্যবহারের জন্য অনুমোদন পেতে এক দশকেরও বেশি সময় লেগে যাবে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানটির।
আরও গবেষণা করছে যেসব প্রতিষ্ঠান: ইলন মাস্কের নিউরালিংক মনোযোগ আকর্ষণ করলেও, আরও কিছু প্রতিষ্ঠান এ নিয়ে কাজ করে আসছে। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বø্যাকরক নিউরোটেক’ ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস নিয়ে কাজ করছে। এছাড়া, নিউরালিংকের সহ-প্রতিষ্ঠাতার কোম্পানি ‘প্রিসিশন নিউরোসায়েন্স’ পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তা করার জন্য কাজ করছে। তাদের ইমপ্লান্টটি টেপের একটি পাতলা টুকরোর মতো দেখায় এবং ‘ক্রেনিয়াল মাইক্রো-¯িøট’ নামে একটি সহজ পদ্ধতির মাধ্যমে মস্তিষ্কের পৃষ্ঠে স্থাপন করা হয়। সা¤প্রতিক মার্কিন গবেষণায় দেখা গেছে, বিদ্যমান অন্যান্য ডিভাইসগুলোও সফলভাবে মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ পর্যবেক্ষণ করে যখন লোকেরা কথা বলার চেষ্টা করে।
উদ্বেগ বাড়াচ্ছে যে সব বিষয়: মাস্কের বিসিআই স্টার্টাপ নিউরালিংকের লক্ষ্য একসময় মানুষ যদি মাথা দিয়ে চিন্তা করেই তার সামনে টেসলা গাড়ির হাজির করাতে পারবে। অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালকহীন চলাচলে সক্ষম একটি টেসলা গাড়ি তার মালিক শুধু চিন্তা করেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। তবে এমন গবেষণা সফলের ফলে পৃথিবী ‘কৃত্রিম’ এবং ‘প্রাকৃতিক’ এই অংশে ভাগ হয়ে যাবে বলে মনে করেন রবার্টো পোর্টেলিও এর সঙ্গে গবেষণাপত্রে কাজ করা আরেক বিশেষজ্ঞ গবেষক রিলি গ্রিন। ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেস বা বিসিআই গবেষণা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন একদল বিশেষজ্ঞ। তারা বলছেন, মানুষের মস্তিষ্ক যদি কম্পিউটার পড়া শুরু করে তাহলে মানুষের মধ্যে ‘বিøক প্যানারোমা’ তথা বিরক্তিকর মানসিক অবস্থার সৃষ্টি হবে। ফলে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত এমন গবেষণা মানবজাতির জন্য ভয়ংকর রকমের ক্ষতির কারণ হতে পারে।স¤প্রতি এপিল বায়োইঞ্জিনিয়ারিং জার্নাল এ প্রকাশিত একদল বিশেষজ্ঞের গবেষণা পত্রের বরাতে এমনটাই জানায় রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম আরটি। ওই গবেষণার একজন সদস্য এবং গবেষণা পত্রের লেখক রবার্টো পোর্টেলিও বলেন, বিসিআই গবেষণা থেকে বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান মানব মস্তিষ্কের যে তথ্য পাচ্ছেন বিষয়টি নির্দিষ্ট হারে উদ্বেগজনক। এই গবেষণা থেকে মানুষের স্নায়ুবিক তথ্য আহরণ করা হচ্ছে যা মানুষের একান্তই ব্যক্তিগত এবং অন্তরঙ্গ।
প্রসঙ্গত, মানব মস্তিষ্ক থেকে সরাসরি তথ্য আহরণ করার পরিকল্পনা থেকে দীর্ঘদিন আমেরিকায় ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেস নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। খোদ মার্কিন সরকারের অনুমোদনে দেশটির সশস্ত্র বিভাগের পাশাপাশি এই গবেষণায় বিনিয়োগ করছে ফেসবুক, মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তিগত উদ্যোক্তা হিসেবে আছেন এলন মাস্কের মতো প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী। তিনি বলেন, নীতিনির্ধারক এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ‘বিøক প্যানারোমা’ থেকে মানব জাতিকে নিস্তার দিতে হলে বিসিআইয়ের বাণিজ্যিক গবেষণা ও প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে। এ নিয়ে দ্বিধার কোনো সুযোগ নেই। ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোনের মতো গবেষণালব্ধ ফলাফলের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে তাদের শিক্ষা নিতে হবে। এই উদাহরণগুলো দেখিয়েছে যে, বিসিআই গবেষণাকে বৈধ করতে এবং এর বৈধ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হলে কঠোর আইনি কাঠামো দরকার। একইসঙ্গে এমন গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি এবং গবেষণার ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশের দাবিও জানান তারা।
প্রাণী সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ: এদিকে, আমেরিকার প্রাণী সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তদন্তের মুখে পড়েছে নিউরালিংক। রয়টার্সের এক প্রতিবেদন বলছে, নিউরালিংক প্রাণীদের ওপর পরীক্ষা চালানোর ফলে মারা গেছে অনেক নিরীহ প্রাণী। এ নিয়ে এখন রাষ্ট্রীয় তদন্ত চলছে। সে অবস্থাতেই এ অনুমতি দেওয়া হলো। মার্কিন সরকারের একাধিক বিভাগ নিউরালিংকের এসব গবেষণা নিয়ে তদন্ত করছে। এসবের ফলাফল কী হবে, বা ইলন মাস্ক আসলেই এ উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষের কতটা উপকার করতে পারবেন, সে প্রশ্নের জবাব জানে শুধু সময়।
মস্তিষ্কে কীভাবে কাজ করবে ‘টেলিপ্যাথি’: ইলন মাস্কের তথ্যমতে, মানুষের মস্তিষ্ককে কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত করে জটিল স্নায়বিক সমস্যার সমাধান করাই নিউরালিংকের লক্ষ্য। আর তাই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়াতে অক্ষম ব্যক্তিরা শুরুতে চিপটি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। তবে কবে নাগাদ চিপটি বাণিজ্যিকভাবে উন্মুক্ত করা হবে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানাননি ইলন মাস্ক। তারহীন এই চিপের নাম ‘টেলিপ্যাথি’ দেওয়া হতে পারে। নিউরালিংকের চিপগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে এগুলো মস্তিষ্কের সংকেতগুলোকে যথাযথভাবে বুঝে বøæটুথের মাধ্যমে সংযুক্ত ডিভাইসে পাঠাতে পারে। বানরের মস্তিস্কে পরীক্ষা চালানোর সময় এই প্রক্রিয়া সফলভাবে কাজ করেছিল। মস্তিষ্ক কোনো চিন্তা করলে ডিকোডার সেই সিগন্যাল গ্রহণ করে এবং এর ফলে মোটর স্নায়ুটির কীভাবে সাড়া দেওয়া উচিত, তা অনুমান করার চেষ্টা করে। একটু অন্যভাবে বললে, চিন্তা থেকে আসা সিগন্যাল অনুযায়ী বিভিন্ন অঙ্গের কীভাবে সাড়া দেওয়ার কথা, কতটুকু দ্রæত এবং কোন দিকে নড়াচড়া করার কথা সেসব এটি হিসাব কষে বের করে ফেলে। এই হিসাব সে আউটপুট হিসেবে দেয় কম্পিউটারকে। ফলে কম্পিউটার বুঝতে পারে, স্ক্রিনের ওপর মাউসের কার্সরটা কোন দিকে নাড়ানো উচিত। সে অনুযায়ী এটি কার্সরটা নাড়ায়। এভাবেই পেজার শুধু চিন্তা করেই কার্সরটি নাড়াতে পেরেছিল, গেম খেলতে পেরেছিল। সে চিন্তা মাথায় রেখেই ধাপে ধাপে গবেষণা করে মানবদেহের জন্য এই প্রযুক্তিকে উপযোগী করে তোলা হয়। চিন্তার ওপর নির্ভর করে একজন মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ কীভাবে নড়াচড়া করে, তা যদি হিসাব কষে বের করে ফেলা যায়, তাহলে সামনে রাখা বিভিন্ন যন্ত্রকে সেভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া যাবে।
ব্রিটেনের লিডস বেকেট ইউনিভার্সিটির ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সিনিয়র প্রভাষক ডক্টর রজ ওয়াট-মিলিংটন বলেন, আমরা যেসব ডিভাইস ব্যবহার করি, নিউরালিংকের চিপস সেসব ডিভাইসগুলোর সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্ককে যুক্ত করবে। ব্যাপারটা হচ্ছে, এই চিপসগুলো আমাদের মস্তিষ্কের ইলেক্ট্রনিক সংকেতগুলোকে রিয়েল টাইমে সংগ্রহ করবে, সেগুরোকে প্রসেস করবে এবং বøæটুথের মাধ্যমে সংযুক্ত ডিভাইসে প্রেরণ করবে। এর ফলে যার হাত অকেজো, তিনিও তার স্মার্টফোনটি চালাতে পারবেন। ভবিষ্যতে এই চিপের সাহায্যে মাউস বা কী-বোর্ডের কাজও করা যাবে, যাতে হাত নাড়াতে পারেন না, এমন যে কেউ মস্তিষ্কের সংকেত ব্যবহার করে কম্পিউটার ও কী-বোর্ড চালাতে পারেন।
তবে মাস্ক আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি এখানে থামতে রাজি নন। নিউরালিংক ইভেন্টে তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে নিউরালিংক স্মৃতি ‘সেভ’ করে রাখতে পারবে এবং সময়মতো ‘রিপ্লে’ দেখাতে পারবে। তিনি মনে করেন, চাইলে স্মৃতির ‘ব্যাকআপ’ রেখে দেওয়া এবং পরে ‘রিস্টোর’ করে নেওয়া সম্ভব। তার মতে, আপনারা চাইলে এসব স্মৃতি নতুন কোনো দেহে বা কোনো রোবটের ভেতরে ডাউনলোড করে নিতে পারবেন। বড় বিচিত্র এক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি আমরা! মানুষ ইতিমধ্যে ক্রিসপার আবিষ্কার করে জিন সম্পাদনার উপায় বের করে ফেলেছে। ইলন মাস্ক হিউম্যান ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানোর অনুমতি পেয়ে গেছেন। কল্পবিজ্ঞান সত্যি হওয়ার এই যুগে হয়তো সবই সম্ভব!

ইলন মাস্ক
মাস্কের এই চিপ কতটা নিরাপদ?: মস্তিষ্কে এই চিপ স্থাপন করা হলে তা মানুষের শরীর ও জীবনের ওপর কেমন ঝুঁকি তৈরি হয়, তা নিয়ে অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। তবে এফডিএ এখন মানব মস্তিষ্কে এই চিপের পরীক্ষামূলক ব্যবহার অনুমোদন করায় উদ্বেগ কমেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মাস্কের সংস্থা ‘নিউরালিঙ্ক’-কে অনুমোদন দেওয়া নিয়ে যদিও নানা মত রয়েছে। এর আগে, বিভিন্ন মহল থেকেই আপত্তি শোনা গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত ছিল, আগে এ নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা হওয়া দরকার। প্রযুক্তিগত তো বটেই, নীতিগত ভাবেও সমস্ত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে হবে। শুধু তাই নয়, নিউরালিঙ্ক’-এর মালিক মাস্ক বলেই চিন্তাভাবনার প্রয়োজন রয়েছে, এমন মন্তব্যও শোনা যায়। কারণ ট্যুইটারের মালিকানা হোক বা স্পেস এক্স, সা¤প্রতিক কালে বার বার প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে মাস্ককে। মস্তিষ্ক সঞ্চালন যন্ত্র শুধুমত্র কোনও যন্ত্র বা গেজেট নয়, এর সঙ্গে নৈতিক দায়িত্ব এবং দায়বদ্ধতাও জড়িয়ে, তাই অনুমোদন দেওয়ার আগে আরও ভাবনাচিন্তার প্রয়োজন ছিল বলেও মনে করছেন অনেকে। তবে দীর্ঘদিন ধরেই নিউরালিংক এই চিপ নিয়ে নানা রকম যাচাই-বাছাই ও গবেষণা অব্যাহত রেখেছে। মানুষের মস্তিষ্ককে কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়, কিংবা সুপার কম্পিউটারের সমকক্ষ করা যায়, তা নিয়ে অনেক দিন ধরেই গবেষণা চলছে। বিশ্বের একাধিক প্রতিষ্ঠান এ নিয়ে গবেষণা করছে। ইলন মাস্ক দাবি করেছেন, নিউরালিংকের চিপ এই গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। প্রযুক্তি গবেষকরা বলছেন, এই চিপসগুলো জনপরিসরে চালু করার আগে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে, যাতে এগুলোতে কোনো ত্রæটি বা দুর্বলতা না থাকে। মাস্ক এর আগে বলেছিলেন, প্রস্তাবিত প্রযুক্তিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের মাধ্যমে মানুষের উৎখাত হওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
এটা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে অ্যানিম্যাল ট্রায়াল, অর্থাৎ বিভিন্ন প্রাণীর মাথায় চিপ বসিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২১ সালের এপ্রিলে পেজার নামে একটি বানরের মাথায় চিপ বসায় নিউরালিংক। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তিন মিনিটের একটি ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, পেজার নামে একটি বানর শুধু চিন্তা করে করে, কোনো কিছু হাত দিয়ে না ধরেই মাইন্ড পং নামের একটি ভিডিও গেম খেলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোড়ন তোলে এ ভিডিও। গবেষকেরা পেজার নামে এই বানরটির হাত ও বাহুর মোটর করটেক্স স্নায়বিক অঞ্চলে এই ‘লিংক’ বসিয়েছেন। এই অঞ্চল মূলত স্বেচ্ছায় করা নড়াচড়ার পেছনের পরিকল্পনা করে, নড়াচড়া শুরু করে এবং নড়াচড়ার পুরো কাজটা নিয়ন্ত্রণ করে। বসিয়ে দেওয়ার পর লিংক থেকে গবেষকেরা পেজারের সম্পূর্ণ স্নায়বিক কাজকর্মের একটি মানচিত্র পেয়ে গেছেন। তারপর স্নায়বিক বিভিন্ন ধরনের সিগন্যালের জন্য মোটর স্নায়ু কীভাবে সাড়া দেয়, এর ফলে নড়াচড়া কেমন হয়—এসবের একটি মডেল তৈরি করেছেন। এখান থেকে তাঁরা বুঝতে পেরেছেন, কোনো চিন্তা করলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, চিন্তার সঙ্গে প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক কী রকম ইত্যাদি। এর ওপর নির্ভর করে তারা আবার একটি ‘ডিকোডার’ বানিয়েছেন। আসল কাজ করে এই ডিকোডার।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ৩১ জানুয়ারি ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
কী ক্ষমতা চিপের, ঘুচবে কি অন্ধত্ব: ২০১৬ সালে মানুষের মস্তিষ্ক এবং কম্পিউটারের মধ্যে প্রত্যক্ষ সংযোগ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজে নামেন মাস্ক। তিনি জানান, মানুষের কার্যক্ষমতাকে সাধ্যাতীত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াই লক্ষ্য তার। পাশাপাশি, অখঝ বা পারকিনসন্স রোগে যারা আক্রান্ত, তাদের সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন দিতেও এই পরিকল্পনা বলে জানান। মানুষের মস্তিষ্ককে কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত করে দৃষ্টিশক্তি, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধকতা, বিষণœতা, সিজোফ্রেনিয়া, স্থুলতা ও শরীরিক বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে তার এই প্রতিষ্ঠান। সেই সময় মাস্ক জানান, মানুষ এবং যন্ত্রের মধ্যে মিথোজীবী সম্পর্ক গড়ে তোলাই তার উদ্দেশ্য। অর্থাৎ পরস্পরের মধ্যে সাহচর্য গড়ে তোলা। সেই মতো কাজ শুরু করে মাস্কের সংস্থা ঘবঁৎধষরহশ, জানানো হয়, মানুষের মস্তিষ্কে একটি চিপ বসানো হবে। একটির উপর আর একটি, পাঁচটি কয়েন জানালে যে ওজন এবং আকার পাওয়া যায়, সেই আকারের চিপ বসানো হবে মস্তিষ্কে, যা অস্ত্রোপাচারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট জায়গায় বসানো হবে, কোনও তারের দ্বারা যা সংযুক্ত থাকবে না। সেই মতো, গত বছর আমেরিকার নিয়ন্ত্রক সংস্থা পরীক্ষা এগিয়ে নিয়ে যেতে মাস্ককে অনুমোদন দেয়। মানুষের মস্তিষ্কে চিপ বসিয়ে পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া হয় তার সংস্থাকে। গবেষণার কাজে গতি আনতে ঝুহপযৎড়হ-এর সঙ্গেও হাত মেলান মাস্ক। ঝুহপযৎড়হ-ও মস্তিষ্কে চিপ বসানোর কাজে লিপ্ত, তবে মানুষের মাথার খুলি কেটে তাদের তৈরি চিপ বসাতে হয় না। ২০২২ সালের জুলাই মাসে প্রথম বার এক রোগীর মস্তিষ্কে চিপ বসাতে সফল হয় ঝুহপযৎড়হ. সেটি অস্ট্রেলিয়ার সংস্থা। প্রযুক্তি সংস্থাগুলির এই ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা নিয়ে ইতিমধ্যেই আপত্তি উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু ঘবঁৎধষরহশ-এর দাবি, দৃষ্টিশক্তি ফেরানো, মস্তিষ্ক, স্নায়ু এবং পেশির সংযুক্তিকরণ এবং সর্বোপরি কম্পিউটারের সঙ্গে মানুষের মস্তিষ্ককে জুড়ে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে বিজ্ঞানের। সেই কাজকে বাস্তবায়িত করে দেখাতে চায় তারা। এই মস্তিষ্ক সঞ্চালন যন্ত্র আসলে অৎয়াধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি এক ধরনের মাইক্রোচিপ। সেটি ব্যবহার করে পক্ষাঘাত থেকে অন্ধত্ব দূর করা, শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী যারা, কম্পিউটার এবং মোবাইল প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরিয়ে আনাই লক্ষ্য মাস্কের সংস্থার। বাঁদুরের মস্তিষ্কে ইমাইক্রোচিপের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে আগেই। ওই মাইক্রোচিপ এমন ভাবে তৈরি করা হয় যে, মস্তিষ্কে উৎপন্ন সঙ্কেত বøæটুথের মাধ্যমে মাইক্রোচিপে প্রেরিত হবে। পরীক্ষামূলক প্রয়োগে সাফল্য পেয়েছেন সুইৎজারল্যান্ডের গবেষকরাও। নেদারল্যান্ডের এক ব্যক্তি দুর্ঘটনায় হাঁটার শক্তি হারিয়েছিলেন। মেরুদÐ ভেঙে গিয়েছিল তাঁর। কিন্তু বিজ্ঞানীদের তৈরি করা যন্ত্রের সাহায্য ফের উঠে দাঁড়িয়েছেন তিনি, চলাফেরাও করতে পারছেন। জানা যায়, মাস্কের সংস্থা ঘবঁৎধষরহশ আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত। সংস্থার মোট কর্মীর সংখ্যা ৪০০। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৩৬ কোটি ৩০ লক্ষ ডলারের তহবিল গড়ে তুলেছে তারা। যদিও মস্তিষ্কে চিপ বসানোর দৌড়ে একা মাস্কই শামিল নন। অন্য সংস্থাগুলিও পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করেছে। কেউ প্রকল্পের নাম দিয়েছেন ব্রেন-মেশিন, কেউ আবার ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস রিসার্চ।
ইউডি/এজেএস

