ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে

ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে

মো. তাওহীদুর রহমান। রবিবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৬:৩০

দেশে মরণব্যাধি ক্যান্সারের বিস্তার ঘটছে আশঙ্কাজনক মাত্রায়। বিশেষত গ্রামীণ ও নগর দরিদ্রদের মধ্যে রোগটির প্রকোপ বাড়ছে দ্রæতগতিতে। তথ্য বলছে, মোট ক্যান্সার আক্রান্তের প্রায় ৮৪ শতাংশই দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যাদের বেশির ভাগই স্বাক্ষরজ্ঞানহীন ও স্বল্পশিক্ষিত। জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমানে এটা একটা বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামনের দিনে নানা কারণে এর ব্যাপকতা আরো বাড়বে। কাজেই ক্যান্সারের বিস্তার রোধে প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক উভয় ধরনের ব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি দেয়া জরুরি। এজন্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনাচার বদলে যেমন সচেতনতা বাড়াতে হবে, তেমনি সুলভে চিকিৎসা সুবিধাও আরো বাড়াতে হবে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচেষ্টতা কাম্য।

বিশ্বব্যাপী ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে সাড়ে ৩ কোটিতে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ১৮৫টি দেশের ৩৬ রকমের রোগ বিশ্লেষণ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার এই পূর্বাভাস দিয়েছে। সিএনএন জানিয়েছে, ২০২২ সালে বিশ্বে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ কোটি; সেই হিসাবে পরবর্তী ২৮ বছরে এই সংখ্যা ৭৭ শতাংশ বেড়ে যাবে।

গবেষকরা তাদের বিশ্লেষণে দেখেছেন, ২০২২ সালে বিশ্বে ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রভাব ছিল বেশি। ওই বছর ২৫ লাখ ফুসফুসের ক্যান্সার শনাক্তের হিসাব পাওয়া যায়, যা মোট শনাক্তের ১২ দশকি ৪ শতাংশ। এরপরই রয়েছে নারীদের স্তন ক্যান্সার, কোলোরেক্টাল, প্রোস্টেট ও পাকস্থলীর ক্যান্সার। বিশ্বে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্তদেরই মৃত্যুর হার বেশি। ২০২২ সালে ক্যান্সারে মারা যাওয়াদের ১ দশমিক ৮ শতাংশের মৃত্যু হয় এই ক্যান্সারে, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ১৯ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যান্সার গবেষণা এজেন্সি বলছে, উন্নত দেশগুলোতে আক্রান্তদের সংখ্যা দেখা যায় বেশি। যেমন- মানব উন্নয়ন সূচকে (এইচডিআই) এগিয়ে থাকা দেশগুলোতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত। আগামীতে সেখানে ১২ নারীর মধ্যে ক্যান্সার শনাক্ত হবে একজনের। আর মারা যাবেন ৭১ জনের মধ্যে একজন।
অপরদিকে মানব উন্নয়ন সূচকে পিছিয়ে দেশগুলোতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মান তেমন উন্নত নয়। সেখানে ২৭ জনে একজন নারী স্তন ক্যান্সার ধরা পড়বে এবং প্রতি ৪৮ জনে একজনের মৃত্যুর হবে।

মূলত দেরিতে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার সুযোগের অভাবে এসব দেশে শনাক্তের হার কম, কিন্তু মৃত্যুর হার বেশি। ক্যান্সারে আক্রান্তদের চিকিৎসায় রেডিয়েশন বা রেডিও থেরাপি ও স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টের মত সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্য রয়েছে। সামনের বছরগুলোতে ক্যান্সার বাড়ার পেছনে কিছু কারণের কথা বলছেন গবেষকরা। নতুন সমীক্ষায় তারা দেখিয়েছেন, স্থূলতা, তামাক ও অ্যালকোহল ব্যবহার এবং বায়ু দূষণের মত পরিবেশগত কারণসহ বিভিন্ন কারণে ক্যান্সার আক্রান্ত বাড়বে। আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি গত জানুয়ারিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে ক্যান্সারে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। কিন্তু ক্যান্সারের নির্দিষ্ট ধরনগুলোতে আক্রান্ত বাড়ছে। ১৯৯১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশটিতে ক্যান্সারে মৃত্যু কমেছে ৩৩ শতাংশ। তামাকের কম ব্যবহার, শুরুতেই শনাক্ত হওয়া এবং চিকিৎসায় দ্রুত উন্নতির ফলে মৃত্যু হ্রাস পেয়েছে। যদিও এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবৈষম্য রযেছে। ফলে যারা বর্ণবৈষম্যের শিকার, তাদের ঝুঁকিও বেশি। আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি জানিয়েছে, কমবয়সীরা এখন বেশি ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। ৫৫ বছরের কম বয়সী প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্যান্সার আক্রান্তের হার ১৯৯৫ সালে ছিল ১১ শতাংশ। কিন্তু ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২০ শতাংশ।

জাতিসংঘ ঘোষিত ও সরকার স্বীকৃত সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল নির্যাস হলো, আর্থিক সক্ষমতা নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের রোগ থেকে সুরক্ষা ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষেরও আছে সুস্থ হওয়ার অধিকার। এটা তার মৌলিক অধিকার। সুতরাং সবার জন্য সুলভে ক্যান্সারের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে রোগী যে হারে বাড়ছে তার তুলনায় চিকিৎসা সুবিধা অপ্রতুল। তাই এটা আরো বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সচেতনতা বাড়াতেও জোর দিতে হবে অত্যধিক। এক্ষেত্রে মূল ভ‚মিকা পালন করতে হবে স্বাস্থ্য বিভাগকে। প্রতিরোধমূলক ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থায় জোরালো পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশে ক্যান্সারের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে প্রত্যাশা।

লেখক: শিক্ষার্থী

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading