ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্ট জাগাচ্ছে আশা: বাঁচতে পারে লাখো মানুষের প্রাণ
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৩:০০
দেশে দ্বিতীয়বারের মত ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্টের মাধ্যমে ‘ব্রেইন ডেড’ মানুষের কিডনি প্রতিস্থাপন করা রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। চিকিৎসা ক্ষেত্রে এটা বড় সাফল্য। আশিকুর রহমান’র প্রতিবেদন
একজনের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বাঁচাতে পারে ৮ প্রাণ: ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে ২০ বছর বয়সী তরুণী সারাহ ইসলাম দেশে যে বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন তার সুফল যেন বইতে শুরু করেছে। বাংলাদেশে দ্বিতীয়বারের মত ‘ব্রেইন ডেড’ মানুষের কিডনি শরীরে স্থাপন করে সুস্থ হয়েছেন তাহমিনা ইয়াসমিন পপি নামের এক রোগী। মঙ্গলবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) থেকে তাকে বাড়ি যাওয়ার ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। দেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে এটা বড় অর্জন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
মূলত ‘ব্রেইন ডেড’ মানুষের থেকে অঙ্গ প্রতিস্থাপন করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্ট। ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্টটি অন্যান্য ট্রান্সপ্লান্ট থেকে সহজ। একজন ব্রেইন ডেথ রোগীর ২টি কিডনি ২ জনকে, ১টি লিভার ১ জনকে, ২টি ফুসফুস ২ জনকে, হৃদযন্ত্র ১ জনকে, অন্ত্র ১ জনকে, অগ্ন্যাশয় ১ জনকে দান করে মোট আটজনের জীবন বাঁচাতে পারেন। মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন: কিডনি, হৃৎপিন্ড, ফুসফুস, অন্ত্র, যকৃৎ, অগ্নাশয়, অস্থি, অস্থিমজ্জা, চক্ষু, চর্ম, টিস্যুসহ চিকিৎসার প্রয়োজনে রোগীর দেহের সংযোজনের জন্য ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়ে থাকে। কিডনির মতো লিভার, হার্টসহ অন্যান্য অঙ্গ প্রতিস্থাপন নিয়েও প্রতিষ্ঠানটির কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। অঙ্গ দান নিয়ে যে ভ্রান্ত ও নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, সেখান থেকে মানুষকে বের করে আনতে গণসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

এক্ষেত্রে ভাঙতে হবে সামাজিক ট্যাবু বলে মনে করেন তারা। স্ট্রোক, মস্তিষ্কে আঘাত, মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার বা অন্য কোনো কারণে যদি মানুষের ব্রেন স্টেমের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, তখন তাকে বলা হবে ব্রেন ডেথ। ব্রেন স্টেম হলো মস্তিষ্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য। মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর (হৃদযন্ত্র, ফুসফুসসহ অন্যান্য) নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হলো ব্রেন স্টেম। ব্রেন স্টেম অকার্যকর হয়ে গেলেও হৃদযন্ত্রের মাংসপেশির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে লাইফ সাপোর্ট যন্ত্রের সাহায্যে আরও কিছুদিন সেই মানুষটিকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। যদিও তার বাকি অঙ্গগুলো অকার্যকর হয়ে যায় অল্প সময়ের মধ্যেই। একমাত্র নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) বিশেষ মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর (লাইফ সাপোর্ট) যন্ত্রের মাধ্যমে রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস পরিচালনা করা হয় এবং অন্য অঙ্গগুলো সচল রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু যত চেষ্টাই করা হোক না কেন, ব্রেন ডেথ নিশ্চিত হয়ে গেলে সেই মানুষটি আর ফিরে আসবে না। ক্যাডাভেরিক হলো যাদের আইসিইউ’তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মস্তিষ্ক অচল হয়ে যায় এবং যাদের বাঁচার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। চিকিৎসা শাস্ত্রের ভাষায় তাদেরকে ক্যাডাভেরিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যদি তারা ক্যান্সার হেপাটাইটিস, এইচআইভিসহ অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত না হয় তারা ক্যাডাভেরিক হিসেবে অঙ্গদান করতে পারে।
সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন পপি: বাংলাদেশে দ্বিতীয়বারের মত ‘ব্রেইন ডেড’ মানুষের কিডনি অন্য যে দুজনের শরীরে স্থাপন করা হয়েছিল, তাদের একজন ভালো হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তার নাম তাহমিনা ইয়াসমিন পপি। তিনি সুস্থ হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন। এখানে মৃত মানুষের (ব্রেনডেড) ক্যাডাভেরিক কিডনি তার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্টের সময় তাহমিনা ইয়াসমিনের সিরাম ক্রিটিনিন ছিল ৯। এখন ০.৯ নেমে এসেছে। তার মানে তিনি পুরোপুরি সুস্থ। মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও জাতীয় ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্ট সেলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদের হাত থেকে ছাড়পত্র নিয়ে তিনি নিজ বাসায় ফিরেন।
এর আগে গত ২৫ জানুয়ারি বিএসএমএমইউর আইসিইউতে ঢাকার কামরাঙ্গীচরের বাসিন্দা ৩৮ বছর বয়সী মো. মাসুম আলমের ‘ব্রেইন ডেড’ হয়। অভিভাবকরা তার অঙ্গদানের সম্মতি দেন। ওদিন মো. মাসুমের একটি কিডনি গ্রহণ করেন ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ৪৯ বছর বয়সী মোসাম্মৎ তাহমিনা ইয়াসীন। আরেকটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় ৪৪ বছর বয়সী জাকির হোসেন নামের আরেকজনের শরীরে। এ কার্যক্রমের প্রধান সার্জন ছিলেন অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুর রহমান দুলালের নেতৃত্বে এ ট্রান্সপ্লান্ট সম্পন্ন করা হয়। অন্যদিকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজিতে (এনআইকেডিউ) জাকির হোসেনের শরীরে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। পপির মা খুরশিদা পারভীন গণমাধ্যমকে বলেন, ২০২০ সালে তার মেয়ের কিডনিতে সমস্যা ধরা পড়ে। তাকে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে হচ্ছিল। সাত-আট মাস আগে অবস্থা আরো খারাপ হলে চিকিৎসকরা কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন। কিন্তু পরিবারের সবাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ায় নিজেদের কেউ কিডনি দান করতে পারছিলেন না। পপির চিকিৎসা চলছিল বিএসএমএমইউতে। গত মাসে হঠাৎ করেই চিকিৎসকরা জানান, একজনের মরণোত্তর কিডনি দানের কথা আলোচনা হচ্ছে। সেজন্য হাসপাতালে যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। পপির পরিবার তখন নাম লিখিয়ে রাখেন।
২৫ জানুয়ারি সকালে বিএসএমএমইউ থেকে কল আসে। যে পরিবার আমার মেয়েকে কিডনি দিয়েছে, তাদের কাছে লাখো লাখো শুকরিয়া, আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। আল্লাহ যেন তাকে বেহেশতের সর্বোচ্চ স্থানে রাখেন। আমাদের দেশে এই পদ্ধতিটা এখনও চালু হয় নাই; কিন্তু হওয়া দরকার। একজন মানুষ তো চলেই গেল, তার দেওয়া প্রত্যঙ্গ দিয়ে আরেকজন বাঁচে সেটা অনেক বড় বিষয়। কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় ৪৪ বছর বয়সী এক পুরুষের দেহে। তিনি গত ৭ বছর ধরে কিডনি রোগে ভুগছিলেন। কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালেই নিয়মিত ডায়ালাইসিস করা হচ্ছিল তার। ২৫ জানুয়ারি রাতে কিডনি প্রতিস্থাপনের পর ৪ ফেব্রæয়ারি মারা যান কিডনিগ্রহীতা ওই ব্যক্তি। কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আর রশিদ বলেন, কিডনি প্রতিস্থাপন করার জন্য পাঁচজন রোগীকে বাছাই করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ওই রোগীকেই সবচেয়ে বেশি সবল মনে হয়েছিল। কিডনি প্রতিস্থাপন হওয়ার পর রোগী কিছুটা সুস্থও হয়েছিল। কিন্তু পরে অবস্থার অবনতি হয়। তার অ্যাজমার ইতিহাস ছিল; যা তার পরিবার আমাদের কাছে গোপন করেছিল। অস্ত্রোপচারের পর তিনি সুস্থ হয়েছিলেন কিছুটা। কিন্তু এরপর অবস্থা খারাপ হয়। হঠাৎ করে বøাড প্রেশার কমে গিয়েছিল, সেটা আর তোলা যায়নি। যখন শ্বাসকষ্ট কমল না, তখন আমরা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে দেখিয়েছি, মেডিকেল বোর্ডও গঠন করেছিলাম। কিন্তু তাকে বাঁচানো যায়নি।

ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ
সামাজিক আন্দোলন হওয়া উচিত: বিএসএমএমইউ’র উপাচার্য ও জাতীয় ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্ট সেলের চেয়ারম্যান ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশে ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্টের একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া উচিত। এটি করা গেলে অনেক মৃত্যু পথযাত্রী মানুষকে সহজেই বাঁচানো যাবে। ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্টের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় দুটি সফলতা দেখিয়েছি। এজন্য আমি ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্টের সদস্যদের ধন্যবাদ জানাই। তিনি বলেন, আমি কৃতজ্ঞতা জানাই যে মহৎ মানুষ প্রয়াত কামরাঙ্গীচরের বাসিন্দা মো. মাসুম আলম ও তার স্ত্রী তানিয়া আক্তার এবং তার পরিবারের প্রতি প্রতি। যাদের ত্যাগের ফলে আজ এই তাহমিনা ইয়াসমিন পপি নতুন করে জীবন পেলেন। তিনি এর আগে বলেছেন, ক্যাডাভেরিক একটি মহৎ কার্যক্রম। এ কার্যক্রমকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। এ কার্যক্রম সফল করতে রোগীর পরিবারের সদস্যদের যেমন সহায়তা প্রয়োজন, তেমনি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানের উৎসাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, বিশেষ করে গণমাধ্যমের ভ‚মিকা এখানে অনেক বেশি। গণমাধ্যম যদি ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্টের গুরুত্ব প্রচার করে তাহলে আমাদের কাজ সহজ হবে। জনগণও এতে উপকৃত হবে। আমরা গণমাধ্যমের কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই।
তিনি আরো বলেন, ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্ট আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে আইনের কোনো জটিলতা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইনের যেটুকু সীমাবদ্ধতা ছিল তা ২০১৮ সালে সংশোধন করা হয়েছে। এখন আইনের কোনো জটিলতা নেই। তবে এটির উপকারিতা সম্পর্কে সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। বিশেষ করে ধর্মীয় নেতারা যদি মসজিদ-মন্দিরে বা বিভিন্ন ধর্মীয় সভায় এই বিষয়ে আলোচনা করেন এবং একজন মানুষের শরীরের অঙ্গ দিয়ে আটজন মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার উপকারিতা বোঝাতে সক্ষম হন তাহলে এই কার্যক্রম আরও ত্বরান্বিত হবে বলে আমরা আশা করছি। চিকিৎসকরা বলছেন, দেশে ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্টের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। সারা ইসলাম আমাদের গেট ওপেন করে দিয়েছে। একটা ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্ট করার মধ্যে দিয়ে শেষ হয়ে গেলে হবে না, এখন আমাদেরকে কর্মযজ্ঞ আরও বেশি দেখাতে হবে। এটা একটা সামাজিক আন্দোলন, এই আন্দোলনে সব পর্যায়ের মানুষকে শামিল করতে হবে। আমরা আশা করি, এটাকে সফল করতে পারবো। এ কাজে প্রতিবন্ধকতাও আছে অনেক। আমাদের দেশে ধর্মীয় ও সামাজিক দিক থেকে অনেক ট্যাবু আছে। ধর্মীয়ভাবে অনেকে এটাকে ভুল ব্যাখ্যা করেন। আমাদের যেহেতু ইসলাম প্রধান দেশ, অনেকের মধ্যে একটা ভুল বোঝাবুঝি আছে। সৌদি আরব, ইরানসহ অন্যান্য দেশে সফলভাবে ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে। ওইসব দেশে ধর্মীয়ভাবে একটা ডিবেট হয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসছে যে, অঙ্গদান করা যাবে।
মরণোত্তর অঙ্গদান আর ক্যাডাভেরিক এক নয়: মরণোত্তর অঙ্গদান আর ক্যাডাভেরিক অঙ্গদান এক বিষয় নয়। মানুষ মারা যাওয়ার পর শুধুমাত্র তার কর্নিয়া (যা ৬ ঘণ্টার মধ্যে সংগ্রহ করে) প্রতিস্থাপন করার মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আইসিইউ’তে ব্রেন ডেথ রোগীর হার্টসহ অন্যান্য অঙ্গ সচল থাকে। ব্রেন ডেথ রোগীর ব্রেন ছাড়া সব সচল থাকে। এমন রোগী থেকে আটটি অঙ্গ নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অন্য মানুষের দেহে প্রতিস্থাপন করা যায়। আর ব্রেন ডেথ রোগী শুধু আইসিইউতেই পাওয়া যায়। কোনো ব্যক্তি ‘ব্রেন ডেড’ ঘোষিত হওয়ার পর কিডনি, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, যকৃৎ বা লিভার, অগ্ন্যাশয় (প্যানক্রিয়াস) ও খাদ্যনালির মতো অঙ্গগুলো দান করলে অন্য ব্যক্তির দেহে প্রতিস্থাপন করা যায়। তবে হৃৎপিণ্ড থেমে গেলেও কর্নিয়া, অস্থি, অস্থিমজ্জা ও চর্ম প্রতিস্থাপন করা যায়। এগুলোকে ক্যাডাভেরিক প্রতিস্থাপন বলা হয়। একজন ব্রেন ডেড মানুষের দেওয়া অঙ্গগুলোর মাধ্যমে মোট আটজন মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব। দু’টি কিডনি, দু’টি ফুসফুস, একটি হৃদ্যন্ত্র, একটি অগ্ন্যাশয়, পূর্ণাঙ্গ অন্ত্রনালি এবং যকৃৎ। উন্নত দেশগুলোয় অনেক আগে থেকে ব্রেন ডেড রোগীর শরীর থেকে অঙ্গগুলো সংগ্রহ করে অন্যের জীবন রক্ষা করার কাজ প্রচলিত আছে।
মৃত্যু এক অবধারিত সত্য। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এই মৃত্যুর ধরনে রয়েছে নানা মত। ঐতিহাসিকভাবে একজন মানুষকে তখনই শুধু মৃত বলা হতো, যখন তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া সম্পূূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। তবে ৫০-৬০ বছর ধরে মৃত্যুর আরেকটি রূপ চিকিৎসা বিজ্ঞানে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সেটি হলো- ব্রেন ডেথ বা ব্রেন স্টেম ডেথ। এ ধারণাটি ব্যবহৃত হয় ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে। আবার যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের মৃত্যুকে বলা হয় হোল ব্রেন ডেথ সংযোজন করা হয়েছে বিগত কয়েক দশকে। ১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আইনের মাধ্যমে দুই ধরনের মৃত্যুকে সংজ্ঞায়িত করা হয়। একটি হলো সারকুলেটরি ডেথ (হৃদযন্ত্রের ক্রিয়াবন্ধজনিত মৃত্যু)। অন্যটি হলো ব্রেন ডেথ (মস্তিষ্কের পুরো কর্মকাÐ বন্ধ কিন্তু হৃদ্যন্ত্র সচল থাকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত)। সারকুলেটরি ডেথ ইংল্যান্ডেও প্রচলিত। তবে হোল ব্রেন ডেথ ইংল্যান্ডে ব্রেন ডেথ বা ব্রেন স্টেম ডেথ নামে সংজ্ঞায়িত। আমাদের দেশের আইসিইউতেও অনেক সময় ব্রেন ডেথ রোগী ভর্তি হয়ে থাকেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তাদের সময়মতো ব্রেন ডেথ ঘোষণা করা যায় না। একটি কারণ হলো এ ধরনের মৃত্যুর ব্যাপারে মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব। তারা এই রোগীকে মৃত বলে মেনে নিতে চান না। কারণ, তখনো রোগীর হৃদযন্ত্র সচল থাকে। আবার কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরাও অনাহূত বিপদের আশঙ্কায় ব্রেন ডেথ ঘোষণা এড়িয়ে যেতে চান। অনেক হাসপাতালে হয়তো ব্রেন ডেথ ঘোষণাদানকারী কমিটি থাকে না।

সারাহ ইসলাম
পথ দেখানো একজন সারাহ ইসলাম: দেশে প্রথমবারের মতো অঙ্গদান করেন সারাহ ইসলাম নামে ২০ বছরের এক তরুণী। তাকে গত বছরের দিবাগত রাতে ১৮ জানুয়ারি ‘ব্রেইন ডেথ’ ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। সারাহর শরীর থেকে কিডনি নিয়ে তা দুজনের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। সারাহর চোখের কর্নিয়াও দেওয়া হয় অপর দুজনকে। তারাও ভাল আছেন। একজন সারাহ ইসলামের মাধ্যমে আলোকিত হয়ে উঠেছে ব্রেন ডেথের ধারণা। তার মা শবনম সুলতানা একজন শিক্ষক। জন্মের মাত্র ১০ মাস পরেই ধরা পড়ে যে সারাহ ইসলাম টিউবেরাস স্ক্লেরোসিস রোগে আক্রান্ত। মৃত্যুর আশঙ্কা অনেক বেশি, বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় নেই। তখন থেকে সারাহ ও তার পরিবারের যুদ্ধ শুরু হয় এই রোগটির বিরুদ্ধে। দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর সারাহ এই রোগটির সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। সারাহ ইসলাম মেধাবী একজন ছাত্রী ছিলেন। জটিল এই রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করেও তিনি সাফল্যের সঙ্গে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে চারুকলায় স্নাতকে ভর্তি হয়েছিলেন। তিনি সুদক্ষ চিত্রশল্পী ছিলেন। মানবতাবাদী ছিলেন। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন। তাই তার মা শবনম সুলতানা তাঁর ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে এই অঙ্গদানে সম্মতি দিয়েছেন। সম্মতি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু করা হয় সঠিক অঙ্গগ্রহীতার খোঁজ। প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধরে ছয়জন সম্ভাব্য রোগীকে পরীক্ষা করে সেখান থেকে দু’জনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়। গত ১৮ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১০টা থেকে জটিল এই অস্ত্রোপচার শুরু হয় এবং শেষ হয় পরদিন ভোর প্রায় পাঁচটার দিকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সারাহ ইসলামই প্রথম ব্যক্তি, যিনি ব্রেন ডেথ থেকে মৃত্যুর আগে নিজের অঙ্গ দান করে চারজন মানুষের জীবনে আশা জাগিয়ে গেলেন। সারাহ ইসলামের দিয়ে যাওয়া উপহার সবচেয়ে দামি উপহার। জীবনদায়ী উপহার।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
সামাজিক ট্যাবু ভাঙতে হবে: বাংলাদেশে কিছুটা সামাজিক ট্যাবু এবং কিছুটা আইনের জটিলতার কারণে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের বিষয়টা এতটা প্রচলিত হতে পারেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিডনি প্রতিস্থাপন জনপ্রিয় হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বল্প পরিসরে শুরু হয়েছিল লিভার প্রতিস্থাপনও। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক ট্যাবু ভাঙতে পারলে সহজেই এই প্রক্রিয়া জনসাধারণের মাঝে পৌঁছাবে এবং মানুষের আগ্রহও বাড়বে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১০ হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন। কিন্তু প্রতি বছর মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ জন বিকল কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। প্রতি বছর প্রায় এক হাজার ৫০০ বিকল কিডনি রোগী ইন্ডিয়া ও শ্রীলঙ্কায় গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করাচ্ছেন, এতে প্রতি রোগীর ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়। বিত্তশালীরা সিঙ্গাপুর ও আমেরিকায় গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করান। সেখানে ব্যয় হয় এক থেকে তিন কোটি টাকা। অর্থাৎ বাংলাদেশী রোগীরা কেবল কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য আনুমানিক ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় করেন। ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্ট চালু হলে যা অনেক কমে আসবে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্ট খুব সহজেই জনপ্রিয়তা লাভ করার সুযোগ কম বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, কয়েক যুগ ধরে পুরো পৃথিবীতেই অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বেড়ে চলেছে। অসংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম কিডনি বিকল হওয়া, লিভার সিরোসিস, হার্ট ফেইলিওর অন্যতম। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৪০-৪৫ হাজার নতুন রোগী বিকল কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু আমরা যেহেতু এখনো মরণোত্তর দেহ দান বা ব্রেইন ডেথ রোগীর স্বজনদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে সক্ষমতা তৈরি করতে পারিনি সেহেতু এই কার্যক্রম এতটা সহজ হবে না বলে আমার মনে হয়। তবে যদি এটি চালু করা যায় বা কোনোভাবে কার্যক্রমটিকে জনপ্রিয় করা যায় তাহলে যে মানুষটি বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ক্লিনিক্যালি ডেথ ডিক্লেয়ার হয়েই থাকে তার শরীর থেকে বিভিন্ন অর্গান অন্য আরেকজন রোগীকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিতে পারবে।
ইউডি/এজেএস

