শিগগিরই বাজারে টিকা ছাড়ছে রাশিয়া: মরণব্যাধি ক্যানসার রোগীদের জন্য হতে পারে আশার আলো
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৩:৩০
শিগগিরই বাজারে ক্যানসারের টিকা ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এতে প্রাণে বাঁচার আশা করছেন রোগীরা। কিফায়েত সুস্মিত’র প্রতিবেদন
ক্যানসার কী, কেন হয়: ক্যানসার হল অনিয়ন্ত্রিত কোষের বৃদ্ধি। এই অনিয়ন্ত্রিত ক্ষতিকারক কোষ শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বিপদের কারণ হতে পারে। যদি সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করা হয়। তবে ক্যানসার মারাত্মক হতে পারে। যদিও এখনও পর্যন্ত ক্যানসারের কোনো নিরাময় নেই। তবে প্রাথমিক সনাক্তকরণ রোগটি পরিচালনা করতে সহায়তা করতে পারে। ক্যানসার সৃষ্টির জন্য আমাদের চারপাশের পরিবেশ বিশেষ করে রাসায়নিক মিশ্রিত পানির ব্যবহার; খাবারে ভেজাল এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও বদ অভ্যাস ক্যানসার সৃষ্টির জন্য দায়ী বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এই অবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী বিশ্ব ক্যানসার দিবস পালন করা হয়। প্রত্যেকেরই ক্যানসার সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন। এই বিশেষ দিনটি ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পালন করা হয়।
এছাড়া ১৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব শিশু ক্যানসার দিবস পালন করা হয়। এর মানে শিশুরাও এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশ্ব ক্যানসার দিবসের প্রস্তাবটি ৪ ফেব্রুয়ারি- ১৯৯৯ সালে প্যারিসে নেওয়া হয়। পরের বছর অর্থাৎ ২০০০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ক্যানসারের বিরুদ্ধে বিশ্ব শীর্ষ সম্মেলনে ফলো-আপ চলাকালীন প্যারিস অ্যাগেনস্ট ক্যানসারের সনদ স্বাক্ষরিত হয়। প্যারিসে নিউ সহস্রাব্দের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব ক্যানসার দিবসের প্রথম উদযাপন করা হয়। সনদের লক্ষ্য ছিল ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিশ্বব্যাপী সহযোগিতার গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া এবং ক্যানসারের যত্ন ও গবেষণা সম্পর্কিত সমস্যাগুলো সমাধান করা। বিশ্ব ক্যানসার দিবসটি মৃত্যুর হার কমানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরণের ক্যানসারের প্রাথমিক সনাক্তকরণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পালিত হয়। ক্যাম্পেইনটি ব্যক্তি, সংস্থা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের রোগীদের এবং তাদের পরিবারের সঠিক যতœ এবং সহায়তার জন্য সচেতনতা জাগায়।
বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ক্যানসার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত বছর ক্যানসার দিবসের অনুষ্ঠানে তখনকার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছিলেন, ক্যানসারে দেশে প্রতিদিন ৩১৯ জন মানুষ মারা যায়। ক্যানসার নিয়ে অনেক দেশ গবেষণা করেছে। কেউ কেউ টিকা আবিষ্কারের দাবিও করেছে। এবার সেই তালিকায় যোগ হলো রাশিয়া। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন বলেছেন, তার দেশ ক্যানসারের টিকা আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে। এটা হলে অনেক মানুষের প্রাণ বাঁচবে। তরুণ প্রজন্ম অনেকটা নিরাপদ হবে। ক্যানসারের টিকা আবিষ্কারের খবর আমাদেরকে আশ^স্ত করে তুলছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ক্যানসারের কারণে ২০২০ সালে প্রায় ১০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়। বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে ক্যানসার। স্তন, ফুসফুস, কোলন, মলদ্বার এবং প্রোস্টেট ক্যানসারের রোগী সব থেকে বেশি। তামাক ব্যবহার, উচ্চ বডি মাস ইনডেক্স, অ্যালকোহল সেবন, কম ফল এবং সবজি গ্রহণ এবং শারীরিক কার্যকলাপের অভাব প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মারাত্মক ক্যানসারের কারণ। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে, হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) এবং হেপাটাইটিসও ক্যানসারের একটি প্রধান কারণ। মোট ক্যানসারের প্রায় ৩০ শতাংশ এই কারণে হয়। প্রাথমিক সনাক্তকরণ এবং কার্যকর চিকিৎসা অনেক ক্যানসার নিরাময় করতে পারে। সব চেয়ে বড় কথা জীবনযাত্রায় নিয়ন্ত্রণ আনা জরুরী। বদ অভ্যাসগুলো বাদ দিলে ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।

অধ্যাপক মোয়াররফ হোসেন
চিকিৎসা অপ্রতুলদরকার সমন্বিত চিকিৎসাকেন্দ্র: ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা বলেন, আদর্শ ক্যানসার চিকিৎসা হয় দলগতভাবে। চিকিৎসকদের এই দলে থাকেন ওষুধ বিশেষজ্ঞ, শল্যবিদ, রেডিও অনকোলজিস্টসহ আরও অনেকে। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মোয়াররফ হোসেন বলেন, ক্যানসারের জন্য দরকার সমন্বিত চিকিৎসাকেন্দ্র। অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে এই কেন্দ্রে থাকবে কেমোথেরাপি, সার্জারি ও রেডিওথেরাপির ব্যবস্থা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য এ রকম একটি করে ক্যানসার সেন্টার থাকা দরকার। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি। মানসম্পন্ন চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশে ১৭০টি ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র থাকা দরকার। কিন্তু আছে মাত্র ২২টি। এর সিংহভাগই রাজধানী ঢাকায়। সারা দেশের দরিদ্র রোগীরা চিকিৎসার জন্য সরকারের জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আসেন। ৫০০ শয্যার এ হাসপাতালে সারা বছর রোগীর ভিড় থাকে। সহজে এ প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা পাওয়া যায় না। অনেক রোগীকে বিশেষ কোনো থেরাপি বা সার্জারির জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়।
কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীর এক নারী স্তন ক্যানসারে ভুগছেন। প্রথমে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার চিকিৎসা হয়। সার্জারি ও কেমোথেরাপি শেষে তার এখন রেডিওথেরাপি প্রয়োজন। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেডিওথেরাপির যন্ত্র নষ্ট। হাসপাতাল থেকে ওই নারীকে রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ওই নারী ঢাকায় এসেছিলেন। ছিলেন আত্মীয়ের বাসায়। অনেক চেষ্টার পর রেডিওথেরাপির একটি তারিখ পেয়েছেন। প্রতিষ্ঠান থেকে তাকে ৬ জুন আসতে বলা হয়েছে। ওই নারী ভ‚রুঙ্গামারীতে চলে গেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, চিকিৎসায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকে চিকিৎসা নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। অনেকে রাজধানীতে থাকার ব্যয় বহন করতে পারেন না। অনেক অর্থ ব্যয় করে ঢাকায় এসেও চিকিৎসা না নিয়ে বাড়ি ফেরত যান। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেশি। তাই অনেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী নন। আবার দেশের চিকিৎসায় আস্থা না থাকায় বিত্তশালীরা বিদেশে চিকিৎসা নেন।
এই আস্থাহীনতার কথা গত সপ্তাহে জনসমক্ষে বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি গত ২৮ জানুয়ারি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, দেশের চিকিৎসার ওপর মানুষের আস্থা নেই। আস্থাহীনতার কারণে মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান। চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতি করে দেশের মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে চান তিনি। ক্যানসার অনেক বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে দৈনিক গড়ে ৪৫৮ জন নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। আর ক্যানসারে দৈনিক গড়ে মারা যাচ্ছে ৩১৯ জন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রোগের প্রকোপের তুলনায় দেশে চিকিৎসাব্যবস্থা অপ্রতুল।

ভ্লাদিমির পুতিন
ক্যানসারের টিকা শিগগিরই আসছে : রাশিয়া ক্যানসারের টিকা তৈরির দ্বারপ্রান্তে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি বুধবার বলেছেন, শিগগিরই রোগীরা এ টিকা পেতে পারেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে পরদিন বৃহস্পতিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) এ তথ্য জানানো হয়েছে। টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে পুতিন বলেন, আমরা নতুন প্রজন্মের ক্যানসারের টিকা ও এর ওষুধ তৈরির খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। আমি আশা করি, শিগগিরই এ টিকা কার্যকরভাবে রোগীদের চিকিৎসাপদ্ধতিতে প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করা হবে। মস্কোর ফিউচার টেকনোলজি ফোরাম আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন পুতিন। অবশ্য যেসব টিকার কথা পুতিন বলেছেন, সেগুলো ঠিক কোন ধরনের ক্যানসারের প্রতিরোধে লাগবে বা কীভাবে সেটি হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলেননি তিনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের অনেক দেশ ও কোম্পানি ক্যানসারের টিকা নিয়ে এখন কাজ করছে। গত বছর যুক্তরাজ্য সরকার ‘ব্যক্তিগত ক্যানসার চিকিৎসা’ দিতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালু করার জন্য জার্মানভিত্তিক বায়োএনটেকের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। দেশটি এ কাজে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার রোগীর কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে।
এ ছাড়া ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি মডার্না ও মার্ক অ্যান্ড কোম্পানিও ক্যানসারের একটি পরীক্ষামূলক টিকা তৈরি করছে। এ টিকার কার্যকারিতা সম্পর্কে মধ্যপর্যায়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জটিল ধরনের মেলানোমায় আক্রান্ত রোগীদের তিন বছরের চিকিৎসার পর আবার এ রোগের পুনরাবৃত্তি বা মৃত্যুর সম্ভাবনা অর্ধেক কমে গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাসের (এইচপিভি) বিরুদ্ধে বর্তমানে ছয়টি নিবন্ধিত টিকা রয়েছে। এইচপিভি জরায়ুমুখের ক্যানসারসহ কয়েক ধরনের ক্যানসার সৃষ্টি করে। এর পাশাপাশি হেপাটাইটিস বি (এইচবিভি)-এর বিরুদ্ধেও টিকা রয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারি চলার সময় রাশিয়া কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে নিজস্ব ‘স্পুটনিক ভি’ টিকা তৈরি করে। আবার বেশ কয়েকটি দেশে সেগুলো বিক্রিও করে। যদিও খোদ রাশিয়াতেই এই টিকা নেওয়ার ব্যাপারে জনসাধারণের অনিচ্ছা ছিল অনেক বেশি।
দেশে ৩২ ধরনের ক্যানসার, দিনে ৩১৯ জনের মৃত্যু: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ৬৭ হাজার ২৫৬ জন ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি। বছরে ক্যানসারে মারা যাচ্ছেন ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৯৮ জন। মৃত্যুও দেখা যায় পুরুষের বেশি। মৃত রোগীদের হিসাব বাদ দিয়ে দেশে এখন ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ৩ লাখ ৪৬ হাজারের কিছু বেশি। খাদ্যনালির (গলবিল থেকে খাদ্যনালি পর্যন্ত) ক্যানসার সবচেয়ে বেশি। দেশে প্রধান পাঁচটি ক্যানসারের মধ্যে আছে- খাদ্যনালি, ঠোঁট ও মুখ, ফুসফুস, স্তন ও জরায়ু ক্যানসার। পুরুষের ক্ষেত্রে খাদ্যনালির ক্যানসার বেশি, আর নারীর ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসার বেশি। তবে মৃত্যু বেশি হচ্ছে খাদ্যনালির ক্যানসারে।
বাংলাদেশে রোগভিত্তিক কোনো জাতীয় জরিপ নেই। ক্যানসারে কত মানুষ আক্রান্ত হন, কত মানুষ মারা যান, কোন ক্যানসারের প্রকোপ বেশি- এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া অনুমিত পরিসংখ্যানই ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকে চিকিৎসা নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। অনেকে রাজধানীতে থাকার ব্যয় বহন করতে পারেন না। অনেক অর্থ ব্যয় করে ঢাকায় এসেও চিকিৎসা না নিয়ে বাড়ি ফেরত যান।
চিকিৎসায় সেরে ওঠে ৩০% শিশু রোগী: প্রতিবছর বিশ্বে অন্তত চার লাখ শিশু ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। উন্নত দেশগুলোতে ক্যান্সার থেকে রোগীর সুস্থ হওয়ার হার প্রায় ৮০ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশে এ হার প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে যথাসময়ে ক্যান্সার শনাক্ত করা গেলে এবং উন্নত চিকিৎসা পেলে ৭০ শতাংশ রোগী ভালো হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতার অভাব, মাত্রাতিরিক্ত চিকিৎসার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগের অভাবসহ নানা কারণে বেশির ভাগ ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু মারা যায়। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে বৃহস্পতিবার পালন করা হয় ‘বিশ্ব শিশু ক্যান্সার দিবস’। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসায় শিশু ক্যান্সার নিরাময় সম্ভব’। দিবসটি উপলক্ষে সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) মিলনায়তনে শিশু হেমাটোলজি বিভাগের উদ্যোগে শোভাযাত্রা ও বৈজ্ঞানিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, শিশুদের ক্যান্সার বা চাইল্ডহুড ক্যান্সার বলতে ১৮ বছরের কম বয়সীদের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়াকে বোঝায়। প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ক্যান্সার কিছুটা ভিন্ন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, শিশুদের মধ্যে সাধারণত লিউকেমিয়া বা রক্তের ক্যান্সার বেশি হয়। ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজির বহির্বিভাগে চার হাজার ৭৮০ ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু চিকিৎসা নিতে আসে। এর মধ্যে এক হাজার শিশুকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। এসব রোগীর ৭৮ শতাংশের রক্তের ক্যান্সার, ৮.৬ শতাংশের বিভিন্ন ধরনের টিউমার, ১৩ শতাংশের রক্তের বিভিন্ন রোগ। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য মতে, রক্তের ক্যান্সারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া।
বিএসএমএমইউয়ের শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ টি এম আতিকুর রহমান বলেন, প্রতিবছর নতুন করে কত শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। তবে এর কোনো পরিসংখ্যান নেই। ধারণা করা হয়, প্রতিবছর নতুন করে আট হাজার শিশু ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। তবে এ সংখ্যা আরো অনেক বেশি। গত এক বছরে বিএসএমইউতে চিকিৎসা নেওয়া ৭০ শতাংশ শিশু এখন ভালো আছে। সমস্যা হলো দেশের চিকিৎসার প্রতি আস্থা না থাকা, সচেতনতার অভাব ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা। তিনি বলেন, দেশে উন্নত ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে বলেই ১০ হাজার ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু পুরোপুরি রোগমুক্ত। তবে অপপ্রচারের কারণে মানুষ বিদেশমুখী হচ্ছে। ক্যান্সারের অনেক ওষুধ সরকার দিচ্ছে, তবে তা অপ্রতুল। অ্যান্টিবায়োটিকসহ আরো কিছু ওষুধ সরকারিভাবে পেলে রোগীর চিকিৎসা খরচ কমে আসবে এবং মানুষ চিকিৎসায় আগ্রহী হবে।শিশুদের ক্যানসার কেন হয়: ডা. এ টি এম আতিকুর রহমান বলেন, ক্যানসারের মূল কারণ অনেক ক্ষেত্রে অজানা। তবে জিনগত কারণে অনেক শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারে। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, শব্দদূষণ, খাদ্যে ভেজাল, অতিরিক্ত ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহার ও ক্ষতিকর রশ্মি বা বিকিরণের সংস্পর্শে আসাটা অন্যতম। এ ছাড়া অধিক মাত্রায় অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও উন্নয়ন শিশুদের শরীরে ক্যানসারের জন্ম দিচ্ছে। তাই সুস্থ ও ক্যানসারমুক্ত প্রজন্ম গড়ার লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব নগরায়ণকে প্রাধান্য দিতে হবে।

অধ্যাপক পারভীন শাহিদা আখতার
ক্যানসার সৃষ্টির জন্য যা দায়ী: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, বেশি বয়স পর্যন্ত বাঁচলে ক্যানসার, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ, হৃদ্রোগ, কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ে। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির সঙ্গে ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক আছে। ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ও মেডিকেল অনকোলজি সোসাইটি ইন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক পারভীন শাহিদা আখতার বলেন, ফাস্ট ফুড, বেশি চিনি বা বেশি লবণযুক্ত খাবার ক্যানসারের কারণ। ধূমপায়ী বা যারা পান-জর্দা খান, তাদের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি। বায়ুদূষণ ক্যানসারের কারণ। ভেজাল খাদ্য মানুষের ক্যানসার বাড়ায়। আমরা এও দেখেছি, অল্প বয়সে বিয়ে করা নারীদের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা আছে।
প্রাথমিক লক্ষণ: শিশুদের ক্যানসার আক্রান্তের প্রাথমিক উপর্সগের মধ্যে রয়েছে ঘন ঘন জ্বর হওয়া, শরীরের কোনো অঙ্গ থেকে রক্তপাত হওয়া; যেমন- দাঁতের গোড়া থেকে রক্ত পড়া, চামড়ার নিচে রক্তপাত, কান দিয়ে রক্ত আসা, চোখের নিচে রক্ত আসা, গায়ে কালো কালো দাগ। এগুলো হলো সাধারণ রক্তের ক্যানসারের উপসর্গ। এ ছাড়া শিশুকে ফ্যাকাসে মনে হলে; যদি কোনো কারণ ছাড়াই বারবার সর্দি-কাশি-জ্বর হয়, শরীরে কোনো অঙ্গ হঠাৎ ফুলে যায়, পেটে চাকা হওয়া বা খিঁচুনি হওয়া বা হাঁটতে না পারা। শিশুদের মধ্যে এসব উপসর্গ থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

দৈনিক উত্তরদিক্ষণ । ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
দেশে আক্রান্ত বেশি পাঁচ ক্যানসারে: কমপক্ষে ৩২ ধরনের ক্যানসারে এ দেশের মানুষ আক্রান্ত হন বলে তথ্য দিচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ক্যানসার দীর্ঘস্থায়ী রোগ। এ রোগের চিকিৎসা চলে দীর্ঘদিন। ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেশি। দরিদ্র মানুষের পক্ষে ক্যানসারের চিকিৎসা শেষ করে আরোগ্য লাভ করা কঠিন। দেশের ধনীদের একটি বড় অংশ ক্যানসার চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। আস্থা রেখে ক্যানসার চিকিৎসা করা যায়, এমন প্রতিষ্ঠান দেশে এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি।
বাংলাদেশে খাদ্যনালির (গলবিল থেকে খাদ্যনালি পর্যন্ত) ক্যানসার সবচেয়ে বেশি। দেশে প্রধান পাঁচটি ক্যানসারের মধ্যে আছে- খাদ্যনালি, ঠোঁট ও মুখ, ফুসফুস, স্তন ও জরায়ু ক্যানসার। পুরুষের ক্ষেত্রে খাদ্যনালির ক্যানসার বেশি, আর নারীর ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসার বেশি। তবে মৃত্যু বেশি হচ্ছে খাদ্যনালির ক্যানসারে। সর্বশেষ ২০২২ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান ছাড়াও প্রতিটি দেশের পৃথক পরিসংখ্যানও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। সংস্থাটি বলছে, বৈশ্বিকভাবে ক্যানসারের বোঝা বড় হচ্ছে। আগের তুলনায় এখন আরো বেশি মানুষ এই রোগে মারা যাচ্ছে। ২০১৮ সালে সারা পৃথিবীতে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ৯৬ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে বছরে এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ মারা যাবে।
ইউডি/সিরাজ/এজেএস

