প্রলোভনে না পড়ার আহ্বান জোরালো হচ্ছে: কানাডায় চাকরি পাচ্ছেন না বাংলাদেশিরা, হতাশা বাড়ছে

প্রলোভনে না পড়ার আহ্বান জোরালো হচ্ছে: কানাডায় চাকরি পাচ্ছেন না বাংলাদেশিরা, হতাশা বাড়ছে

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১২:২০

স্বপ্নের দেশ কাডানায় অনেকে পাড়ি জমাচ্ছেন প্রলোভনে পড়ে। আগের মতো চাকরি পাচ্ছেন না বাংলাদেশিরা। তারা চরম কষ্টে দিন পার করছেন। মো. শহীদ রানা’র প্রতিবেদন

সবার সমস্যা প্রায় একই ধরনের: স্বপ্নের দেশ কানাডা। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ এই দেশে স্থায়ী আবাসন গাড়তে উদগ্রীব থাকেন। দেশটি বছরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ অভিবাসী নিয়ে থাকে। এর বাইরে বিপুল সংখ্যক মানুষ রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে থাকে। অনেকে আবার ভিজিট ভিসায় গিয়ে সেখানে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন মানুষকে প্রলোভনে ফেলে। সেখানে ঢোকার পর মোকাবিলা করতে হয় কঠিন পরিস্থিতি। অন্যদের মতো সেখানে বাংলাদেশিরা আগের মতো চাকরি পাচ্ছেন না। জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় তাদের সমস্যায় ফেলছে। ফলে তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। সেখানে না যাওয়ার আহŸান জোরালো হচ্ছে। এরই মধ্যে চাকরি না পেয়ে একজন বাংলাদেশি আত্মহত্যা করেছেন। দেশটিতে বাংলাদেশি অভিবাসী রয়েছেন এক লাখের মতো। তবে অনেকে ভালো আছেন। জব ভিসায় দেশটিতে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

হন্যে হয়ে কাজ খুঁজছেন তারা: সুমিত আহমদ। সিলেট থেকে কানাডার টরন্টোতে এসেছেন পাঁচ মাস হলো। এখনো কোনো কাজ পাননি। প্রতিদিন হন্যে হয়ে কাজ খুঁজছেন। কিন্তু কোথাও তিনি ইতিবাচক কোনো সাড়া পাচ্ছেন না। প্রতিদিন দুবেলা করে বাংলাদেশি এলাকাখ্যাত ড্যানফোর্থে আসেন, যদি কারো মাধ্যমে কোনো কাজের সুযোগ পাওয়া যায়। এ অবস্থায় কিভাবে চলছেন জানতে চাইলে সুমিত আহমেদ বলেন, ‘সরকার যে টাকা (রাজনৈতিক আশ্রয় চাইলে প্রতি ব্যক্তিকে মাসে ৭০০ ডলারের মতো) দেয়, আপতত সেটা দিয়েই চলছি।’ একই অবস্থা এক সময়ের কাতার প্রবাসী হাসমত শিকদারের। তার বাড়ি সিলেটের বিয়ানী বাজারে। উন্নত জীবনের আশায় তিন মাস আগে সুমিত আহমেদের মতো তিনিও টরন্টোতে এসেছেন ভ্রমণ ভিসায়। তবে স্থায়ী হওয়ার জন্য নিজেকে ‘রিফিউজি’ দাবি করেছেন। তবে এখনও ওয়ার্ক পারমিট পাননি। তাই বৈধ কোনো কাজের সন্ধান করতে পারছেন না। ক্যাশে কোথাও কাজ পাওয়া যায় কিনা তাই আপতত খুঁজছেন। কিন্তু সেটাও পাচ্ছেন না৷ একদিকে ধারণার চেয়ে অনেক বেশি বাড়ি ভাড়া আর খাওয়া খরচের চিন্তায় রীতিমতো দিশেহারা তিনি। কারণ, যে টাকা সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তা প্রায় শেষের পথে। সুমিত ও হাসমতের মতো প্রতিদিন অনেক বাংলাদেশির দেখা মেলে টরন্টোর ড্যানফোর্থ এলাকায় গেলে। সকাল থেকে রাত, যখনই যাবেন, কিছু মানুষকে পাওয়া যাবে যাদের আলোচনার মূল বিষয়ই কিভাবে, কোথায় একটা কাজ পাওয়া যাবে। এর মধ্যে আবার বড় একটা অংশ আছেন, যারা ভ্রমণ ভিসায় এসেছেন, কিন্তু স্থায়ীভাবে থেকে যেতে চান। মোট কথা, দেশ ছেড়ে কানাডায় আসা নতুন বাংলাদেশিরা কেমন আছেন, তার খানিকটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়, টরন্টোর ড্যানফোর্থ এলাকায় গেলে। ভিসার ক্যাটাগরির ভিন্নতা থাকলেও সবার সমস্যা এক এবং অভিন্ন -কাজ না পাওয়া। এদিকে চাকরি না থাকা বিভিন্ন দেশের মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছে কানাডার কিছু প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন এলাকায় তারা সপ্তাহে তিন দিন বিনামূল্যে নানারকম খাবার দিয়ে সহযোগিতা করছে। তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান ‘ফিড স্কারবোরো’। মাইনাস ১০-১২ ডিগ্রি ঠান্ডার মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার সংগ্রহ করতে দেখা যায় অনেক বাংলাদেশিকে। এই লাইনে অবশ্য অন্য অনেক দেশের মানুষকেই দেখা যায়।

কমিউনিটির কোনো সহযোগিতা পাননা বাংলাদেশিরা!: কথা হয় অভিবাসী হিসেবে টরন্টোতে আসা বাংলাদেশি তরুণ সুলাইমান সাহিদের সঙ্গে। তিনি এবং তার স্ত্রী দুজনই ঢাকায় বেসরকারি দুটি প্রতিষ্ঠানে মোটামুটি ভালো বেতনে চাকরি করতেন। এক্সপ্রেস এন্ট্রির দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষ করে তারা টরন্টোতে এসেছেন গত বছরের অক্টোবরে। স্ত্রী একটা এনজিওতে চাকরি শুরু করলেও এখনও নিজের পছন্দের কোন কাজ খুঁজে পাননি সুলাইমান। তিনি বলেন, দেশ হিসেবে অভিবাসীদের জন্য কানাডা অবশ্যই ভালো; কিন্তু সবার জন্য নয়। বিশেষ করে, কেউ এসেই চাকরি পেয়ে যাবে- ব্যাপারটা তেমন নয়। ন্যূনতম ছয় মাস থেকে এক বছর অপেক্ষা করতে হবে- একটা মোটামুটি মানের চাকরির জন্য। ফলে, মাঝের সময়টায় টিকে থাকার জন্য হাতে টাকা থাকতে হবে। না থাকলে কঠিন হয়ে যাবে। তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দরখাস্ত করেছি; কিন্তু কোথাও থেকে সেভাবে সাড়া পাচ্ছি না। আমার মতো নতুনদের নিয়ে কানাডিয়ান সরকারের অনেক ভালো ভালো প্রোগ্রাম আছে; কিন্তু সেগুলো সবই অনেক সময়সাপেক্ষ। বাংলাদেশের শক্তিশালী কমিউনিটি না থাকাও নতুন এসে তাড়াতাড়ি চাকরি না পাওয়ার একটা কারণ বলে মনে করেন সুলাইমান। তার মতে, ভারতীয়, কিংবা পাকিস্তানিরা নতুন এসে তাদের কমিউনিটির কাছ থেকে যে ধরনের সহযোগিতা পেয়ে থাকেন, সেটা বাংলাদেশিরা পান না। আবার দক্ষতারও অভাব আছে বলে মনে করেন সুলাইমান। বিশেষ করে, এখানে কাজ করার জন্য ন্যূনতম যে ইংরেজি জানা দরকার, বেশিরভাগেরই সেটা জানা নেই।

ভ্রমণ ভিসায় চাকরি পাওয়া সম্ভব না: বাংলাদেশিদের কাজ না পাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন সাংবাদিক গাজী সালাউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, কানাডার মেইনস্ট্রিম যে জব মার্কেট, সেখানে কিন্তু কোনো ঘাটতি নেই। কারণ, সরকার এটা নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ, এই দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ লোকবল প্রয়োজন, সেই পরিমাণ ইমিগ্র্যান্ট আনে। সালাউদ্দিন মাহমুদের মতে, মেইনস্ট্রিম জব মার্কেটের বাইরে চাকরির সমস্যা আছে। কিন্তু সেটা বুঝতে দুটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। ১. দক্ষতা এবং ২. কানাডায় আসার ভিসার ধরন। তিনি বলেন, গত দুই বছরে অনেক বাংলাদেশি এসেছে ভ্রমণ ভিসা নিয়ে। আর এই ভিসা দিয়ে বৈধভাবে কাজ পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে, ভিন্নভাবে আয়-রোজগারের পথ আছে। সেটা হলো, নগদ পারিশ্রমিকে কাজ করা। আর এই নগদ টাকার কাজগুলো সাধারণত হয় কমিউনিটি-বেজড। অর্থাৎ, একজন বাংলাদেশি আরেকজন বাংলাদেশিকে ক্যাশে কাজ দিয়ে সহযোগিতা করে, বিনিময়ে অবশ্য অনেক সস্তায় শ্রম কেনা হয়। কাজ দিতে পারেন এমন বাংলাদেশির সংখ্যা খুব বেশি না হওয়ায় গত দুই বছরে ভ্রমণ ভিসায় আসা মানুষের সংখ্যা যত বেড়েছে; সে তুলনায় কাজের ক্ষেত্র বাড়েনি। ফলে এই শ্রেণির মানুষ যে কাজের সংকটে ভুগছে, তাতে সন্দেহ নেই। আর যারা স্টুডেন্ট ভিসায় আসছেন, তাদের একটা অংশের দক্ষতার বিরাট অভাব রয়েছে বলে মনে করেন সালাউদ্দিন মাহমুদ। তার মতে, ভারতীয় ছেলে-মেয়েরা যত দ্রæত যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে, বাংলাদেশের ছেলে-মেয়েরা সেটা পারে না। ফলে, যারা চাকরি দিচ্ছে, তারা বেটার পার্সনকে বেছে নিচ্ছে। আর সেখানেই পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশিরা।

রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনার প্রক্রিয়াটা ব্যয়বহুল: গত কয়েক মাসে বাংলাদেশ থেকে যারা ক্যানাডায় এসেছেন, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ ভিসা নিয়ে। এদের একটা অংশ স্থায়ী হতে চান কানাডায়। তাদের এই স্থায়ী হওয়ার প্রক্রিয়াটা মোটেও সহজ না। কারণ, প্রথমত, ভ্রমণ ভিসা নিয়ে বৈধভাবে কোথাও কোন কাজ পাওয়া সম্ভব নয়। কাজ পেতে তাদেরকে জব অফার ম্যানেজ করতে হবে এবং সেটাও হতে হবে কানাডিন সরকারের তালিকাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান। বিশেষ কাজে বিশেষভাবে দক্ষ না হলে, কোনো প্রতিষ্ঠানই সাধারণত ভ্রমণ ভিসায় আসা কাউকে চাকরির জন্য বিবেচনা করে না। ফলে ভিজিটর ভিসায় বাংলাদেশ থেকে আসা বেশিরভাগ মানুষ রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রার্থনা করে। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটাও যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি সময়সাপেক্ষ৷। যেকোনো একজন ভালো মানের আইনজীবীর মাধ্যমে অ্যাসাইলামের আবেদন করলে পারিশ্রমিক হিসেবে তাকে দিতে হয় ১০ থেকে ১২ হাজার কানাডিয়ান ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা)। আর এই রাজনৈতিক আশ্রয়ের পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগ লাগে ন্যূনতম ৫ বছর। তারপরও কানাডায় এসে বাংলাদেশের অনেক মানুষ বেছে নিচ্ছে এই পথ। এমনই দুজনের সঙ্গে কথা হলো টরন্টোর স্কারবরো এলাকায়। এরমধ্যে একজন শাহ ফরহাদ, আরেকজন আবুল আহসান। দুজনই এসেছেন সিলেট থেকে। সেখানে দুজনই ব্যবসা করতেন। এরমধ্যে আইনজীবীর মাধ্যমে আবুল আহসান শরণার্থী হওয়ার আবেদন করলেও আরো কিছুদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে চান শাহ ফরহাদ। তারপর তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন কানাডায় থেকে যাবেন নাকি দেশে ফিরে যাবেন।

তবে অল্প দিনের মধ্যেই তারা বুঝতে পারছেন স্বপ্ন আর বাস্তবতার ফারাক অনেক। একদিকে ওয়ার্ক পারমিট না থাকায় কোথাও কোনো কাজ পাচ্ছেন না, অন্যদিকে প্রতিমাসে গুণতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের বাড়িভাড়া আর খাওয়ার খরচ। সঙ্গে আইনজীবীর খরচ তো আছেই। এমন পরিস্থিতিতে দেশে ফিরে যাবেন কিনা জানতে চাইলে সিলেটের আবুল আহসান বলেন, ফিরে যাওয়ার আর কোন পথ নাই। যেহেতু অনেক টাকা খরচ করে এখানে এসেছি, যত কষ্টই হোক না কেন এখানেই থাকতে হবে। কানাডায় ২০২১ সালের জনশুমারি বলছে, দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশী অভিবাসী রয়েছে ৭০ হাজারের বেশি; যার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি গিয়েছে ২০১১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে। বাংলাদেশের অভিবাসনপ্রত্যাশীদের পছন্দের গন্তব্যের তালিকায় কানাডার অবস্থান এখন শীর্ষে। এর কারণ হিসেবে দেশটির সামাজিক সুরক্ষা ও জীবনযাত্রার মানকেই চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্যমতে, পরিবেশ, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা থেকে শুরু করে সামাজিক নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার মানের দিক থেকে কানাডার শহরগুলো বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে। আবার দেশটিতে আইনের নানা ফাঁকফোকর গলিয়ে অর্থ ও সম্পদ পাচার করে বিনিয়োগকারী কোটায় অভিবাসনের সুযোগও নিয়েছেন অনেকে। এছাড়া কেউ কেউ আইনের নাগাল এড়াতে বা শরণার্থী হিসেবেও যাচ্ছেন।

আশ্রয় পেয়েছেন অনেক লুটেরা: কানাডা সরকার প্রকাশিত ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বাংলাদেশী অভিবাসী রয়েছে ৭০ হাজার ৯০ জন। এর মধ্যে ২০১১ থেকে ২০২১- এক দশকে গেছে ২৫ হাজার ৩৬০ জন। তার মধ্যে ২০১১-১৫ সাল পর্যন্ত গেছে ১২ হাজার ১৮৫ জন। ১৩ হাজার ১৮৫ জন গিয়েছে ২০১৬-২১ সালের মধ্যে। অভিযোগ রয়েছে, কানাডায় বিনিয়োগ কোটায় স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পাওয়াদের একটা অংশ দেশ থেকে দুর্নীতি, ব্যাংকঋণের খেলাপ ও সরকারি সম্পদ আত্মসাতের মাধ্যমে অবৈধভাবে ধনী হয়ে কানাডায় বিলাসী জীবন যাপন করছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ আবার চট্টগ্রামের ঋণখেলাপি ব্যবসায়ী। চট্টগ্রামের বাদশা গ্রæপের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইসা। কয়েকটি ব্যাংকের ৬০০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ পরিশোধ না করে কানাডায় পাড়ি জমিয়েছেন তিনি। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছেন তার ভাই মোহাম্মদ মুসাকেও। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহীম। প্রায় হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি রেখে বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন তার মালিকানাধীন ক্রিস্টাল গ্রæপের তিন কর্ণধার ও পরিবারের সদস্যরা। তিনি নিজেও কানাডা-বাংলাদেশ আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকেন। ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ না করেই কানাডায় স্থায়ী আবাস গড়েছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী দিদারুল আলম। দেশে থাকাকালীন নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ইফফাত ইন্টারন্যাশনালের নামে বিভিন্ন ব্যাংক ও ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেন তিনি। অভিযোগ আছে, টাকার সিংহভাগই তিনি বিদেশে পাচার করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে নিজেও সপরিবারে কানাডায় চলে গিয়েছেন।
২০১০ সালের দিকে ইস্পাত, শিপব্রেকিং ও আবাসন ব্যবসার নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন মিশম্যাক গ্রæপের কর্ণধার তিন ভাই হুমায়ুন কবির, মিজানুর রহমান শাহীন ও মুজিবুর রহমান মিলন। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে তারা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেন। এর মধ্যে মিজানুর রহমান শাহীন ও হুমায়ুন কবির বর্তমানে সপরিবারে কানাডায় অবস্থান করছেন। ১২টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৮০০ কোটি টাকার বেশি পাওনা না দিয়ে বর্তমানে সপরিবারে কানাডায় বসবাস করছেন আরেক ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদিন। তিনি শিপব্রেকিং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ম্যাক ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার।
শুধু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ লুটকারী ব্যবসায়ী নয়, সরকারি অনেক কর্মকর্তাও কানাডায় পাড়ি জমানোদের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। দুর্নীতি ও এর মাধ্যমে উপার্জনকৃত অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও।

বিশেষ করে সা¤প্রতিক বছরগুলোয় যেসব বাংলাদেশী বিনিয়োগকারী কোটায় কানাডায় পিআরের (পারমানেন্ট রেসিডেন্সি বা স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা) সুযোগ পেয়েছেন, তাদের একাংশকে ঘিরেই এখন এসব অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। বলা হয়, দেশ থেকে অবৈধভাবে সরানো টাকায় সেখানে বিলাসী জীবন যাপন করছেন তারা। দেশের রফতানিকারকদের উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার সীমিত অংশ ব্যবসায়িক কাজ পরিচালনার জন্য বৈধভাবে বিদেশে রাখার সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীসহ দেশের বেশকিছু রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা তাদের উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশে না এনে কানাডায় রেখে দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের কেউ কেউ বাংলাদেশে থেকে গেলেও কানাডায় গড়ে তোলা সম্পদের দেখভাল করার জন্য পরিবারকে স্থানান্তর করেছেন সেখানে। বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ পাচারকারীদের নির্মিত বিলাসবহুল বাড়িগুলোর রীতিমতো মহল্লা গড়ে উঠেছে সেখানে, যা মুখে মুখে প্রচার পেয়েছে ‘বেগম পাড়া’ হিসেবে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

কানাডা যাওয়ার আগে ১০ বার ভাবার পরামর্শ: ফেসবুকে কয়েক মাস আগে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এতে রেজাউল করিম খান নামে এক লোককে বলতে শোনা যায়, কানাডা আসার আগে অন্তত ১০ বার ভাবুন। প্রলোভনে পড়ে আসবেন না। উদাহরণ হিসেবে তিনি একটি ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, কানাডা এসে রাসেল নামে এক যুবক আত্মহত্যা করেছেন। তার বাড়ি ফরিদপুরে। রাসেল ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা খরচ করে কানাডায় পাড়ি জমান। সেখানে তিনি জব পাচ্চিলেন না। রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য তিনি আবেদন করার চেষ্টা করছিলেন। এ জন্য দরকার ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা। এই টাকা দিতে তার পরিবার অস্বীকার করেছে। তার পরিবার থেকে বলা হয়েছে, আগে তোমাকে ভিটেবাড়ি বিক্রি করে টাকা দিয়েছি। আর টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। এখন আর আমাদের বিক্রি করার মতো কিছু নেই। তোমাকে টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। টাকা ছাড়া যা পার; তা-ই কর। না হলে দেশে চলে আসো। কিন্তু রাসেল দেশে ফিরতে নারাজ ছিলেন। অবশেষে তিনি আত্মহত্যা করেন। এ কারণে কানাডা আসার আগে ১০ বার ভাবুন। লোভে পড়ে আসবেন না।

জব নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া জটিল নয় : আবেদনকারী এবং তার ডিপেন্ডেড (স্বামী/স্ত্রী, সন্তান)-এর মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট লাগবে। আবেদন প্রক্রিয়া চলার মাঝে মেয়াদ শেষ হওয়ার কমপক্ষে ৬ মাস আগে পাসপোর্ট রিনিউ করে নিতে হবে। আবেদনকারী এবং তার ওপর নির্ভরশীলদের জন্মনিবন্ধন হতে হবে সরকার প্রদত্ত। ১৮ বছরের উপরের সবার ন্যাশনাল আইডি কার্ড থাকতে হবে। বিবাহিতদের জন্য ম্যারেজ সার্টিফিকেট থাকতে হবে। সেটা হতে হবে ইংরেজিতে। শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র এবং মার্কশিট ক্রেডিনশিয়াল করতে হবে। নিয়ম কানাডার ইমিগ্রেশনের সরকারি ওয়েবসাইটে দেয়া আছে। আইইএলটিএস সার্টিফিকেট জমা দিতে হবে। স্টুডেন্ট ভিসায় এলে আইইএলটিএস-এর একাডেমিক পরীক্ষা দিতে হবে আর প্রায় অন্যসব ভিসার জন্য আইইএলটিএস জেনারেল দিতে হবে। ভিসার জন্য আপনাকে সেটেলমেন্ট ফান্ড ব্যাংকে দেখাতে হবে। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে টাকার পরিমাণের ভিন্নতা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ওরা যে টাকার পরিমাণের কথা আপনাকে বলবে সেই সমপরিমাণ টাকা ক্যাশ আকারে ব্যাংকে থাকা ভালো। এ টাকা বিভিন্নভাবে থাকতে পারে যেমন ফিক্স ডিপোজিট, সঞ্চয়পত্র, চলতি হিসাব, প্রভিডেন্ট ফান্ড, শেয়ারবাজার ইত্যাদি। বাড়তি হিসেবে আপনাদের সোনা-গহনা, নিজ নামে বা স্পাউসের নামে সম্পত্তি থাকলে তা দেখাতে পারেন। ওয়ার্ক এক্সপেরিয়েন্স একটি গুরুত্ব পূর্ণ বিষয়। এ ক্ষেত্রে কোনো মিথ্যার আশ্রয় নেবেন না। যেমন আপনার বা আপনার স্পাউসের যদি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ১০ বছর কাজের অভিজ্ঞতা থাকে। তবে প্রতিটির জন্য আলাদা আলাদা অভিজ্ঞতার সনদপত্র জোগাড় করতে হবে। এক একটা সনদপত্র এক পাতার হলে ভালো। প্রত্যেক জায়গায় যিনি আপনাকে এ সনদপত্র প্রদান করবেন তার নাম, পদবি, স্বাক্ষর, ঠিকানা, ফোন নম্বর এবং ই-মেইল এড্রেস থাকতে হবে। কানাডিয়ান ইমিগ্রেশনের সিঙ্গাপুর অফিস থেকে আপনার চাকরির ব্যাপারে অধিকাংশ সময়ই খোঁজ-খবর নেবে। অনেকের ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর থেকে সশরীরে এসে অফিস দেখে যায় এবং আপনার উপস্থিতি তারা কামনা করে। অনেক ক্ষেত্রে আপনি কেন কানাডায় অভিবাসনের ক্ষেত্রে যোগ্য এ ধরনের একটি এক পাতার চিঠি আপনাকে ডকুমেন্ট হিসেবে পাঠাতে হয়।

ইউডি/সিরাজ/এজেএস

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading