গ্রীষ্মকালের দৈর্ঘ্য বেড়েছে, অতিবৃষ্টির সম্ভাবনা: দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাপপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে

গ্রীষ্মকালের দৈর্ঘ্য বেড়েছে, অতিবৃষ্টির সম্ভাবনা: দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাপপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১২:৩৫

দেশে গ্রীষ্মকালের দৈর্ঘ্য বেড়েছে, বর্ষা আসার সময় পাল্টে যাচ্ছে, শীতেও বেড়ে যাচ্ছে তাপমাত্রা। আবহাওয়ার এমন পরিবর্তন প্রভাব ফেলছে জনজীবন ও কৃষিতে। এ নিয়ে সাদিত কবির’র প্রতিবেদন

১৯৮০ থেকে ২০২৩-আবহাওয়ার ভিন্নতা: দেশে গরমের সময়, অর্থাৎ গ্রীষ্মকালের দৈর্ঘ্য বেড়েছে। একই সঙ্গে আগের তুলনায় শীতের দিনে তাপমাত্রা কমছে এবং বদলে যাচ্ছে বর্ষা মৌসুমের সময়ও। এতে দেশের কৃষিতে পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। শীতের সময় দিনের তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় ধানের ফলনেও প্রভাব পড়ছে। আর বর্ষার সময় পরিবর্তন হওয়ায় সামগ্রিক কৃষি খাতেই প্রভাব পড়ছে, ডেঙ্গুর মতো বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়ছে। ‘বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল জলবায়ু: আবহাওয়ার পর্যবেক্ষণে ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের প্রবণতা এবং পরিবর্তন’ শীর্ষক গবেষণায় দেশের জলবায়ু পরিবর্তনের এই চিত্র উঠে এসেছে। মঙ্গলবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর বিজয় সরণির বঙ্গবন্ধু মিলিটারি জাদুঘরে মাল্টিপারপাস মিলনায়তনে আবহাওয়া অধিদপ্তরের উদ্যোগে এই গবেষণার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।

ঢাকার তাপমাত্রার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ৪০ বছরে দেখা গেছে প্রাক্-বর্ষা, বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী তিন সময়েই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৯, শূন্য দশমিক ৩৩ এবং শূন্য দশমিক ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। শুধু শীতকালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কমে গেছে শূন্য দশমিক ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে চারটি কালেই সর্বনি¤œ তাপমাত্রা বেড়েছে। দেখা গেছে ঢাকাসহ আট বিভাগেই বর্ষাকালে সর্বোচ্চ ও সর্বনি¤œ তাপমাত্রা বেড়েছে। এর মধ্যে খরাপ্রবণ রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে, শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৃষ্টিবহুল সিলেটেও এ সময় তাপমাত্রা বেড়েছে একই রকম মাত্রায়। ঢাকা, রংপুর ও চট্টগ্রামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির এ হার ছিল শূন্য দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যের আলোর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি কমেছে শীতকালে। এর মধ্যে গত ৪০ বছরে রংপুর বিভাগে সূর্যালোক সবচেয়ে বেশি কমেছে। এরপর সূর্যালোক কমেছে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে। অন্যদিকে মেঘের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত বেশি হারে বেড়েছে রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগে। গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বজলুর রশীদ জানান, ঢাকার তাপমাত্রা গত ৪০ বছর ধরেই বাড়ছে। আবার ঢাকাসহ দেশের আট বিভাগেই বর্ষা মৌসুমে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার সীমা বেড়ে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে রাজশাহীতে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত এসপেন রিকটার-ভেন্ডসেন, নরওয়ের আবহাওয়া ইনস্টিটিউটের প্রধান হান্স ওলাভ হাইজিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিভাগের প্রধান ড. ফাতিমা আখতারসহ অনেকে। এতে সভাপতিত্ব করেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক আজিজুর রহমান। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাকে সহযোগিতা করেছেন আফরোজা সুলতানা ও এস এম কামরুল হাসান। অন্যদিকে নরওয়ের গবেষক এলিয়া কুয়া, কাজসা পারডিং ও হান্স ওলাভও এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিন বছর এই গবেষণা হয়েছে। সারা দেশের আবহাওয়ার ৩৫টি স্টেশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই গবেষণা করা হয়েছে।

তাপমাত্রার পরির্তন-বড় কারণ দূষণ: দেশের জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি উল্লেখ করে আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, গরমে দেশের তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। গরমের সময় বাড়ছে। অন্যদিকে শীতের সময় কমেছে। শীতে দিনের তাপমাত্রা কমে যাচ্ছে। এতে করে মেঘ ও কুয়াশার পরিমাণও বাড়ছে। তিনি বলেন, ২০১০ সালের পর ঢাকা বিভাগে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। এর একটা বড় কারণ দূষণ। ভবিষ্যতে এই তাপমাত্রা বাড়বে বলেও আশঙ্কা ব্যক্ত করেন তিনি।

বজলুর রশীদ বলেন, বর্ষার সময় তাপমাত্রা বাড়ছে সারা দেশে। এখন অক্টোবর ও নভেম্বর মাসেও ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। অর্থাৎ, বর্ষার সময় পরিবর্তন হয়েছে, বৃষ্টি দেরি করে আসছে এবং দেরি করে যাচ্ছে। প্রি মনসুন, মনসুন ও পোস্ট মনসুনের যে বিষয়—সেখানে দেখা যাচ্ছে পোস্ট মনসুনে (অর্থাৎ, বাংলাদেশে পরিচিত বর্ষাকালের বদলে বর্ষ মৌসুম-পরবর্তী সময়ে) বৃষ্টির পরিমাণ বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, রংপুর, খুলনাসহ প্রায় সব বিভাগেই বর্ষা মৌসুমে তাপপ্রবাহ বেড়েছে। তবে চট্টগ্রামে তাপপ্রবাহের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম। আবার জুন, জুলাই মাসেও তাপপ্রবাহ বেড়েছে, যে কারণে বর্ষা আসছে দেরিতে। বজলুর রশীদ বলেন, বায়ুদূষণের কারণে দেশের তাপমাত্রায় বড় প্রভাব পড়ছে। আর এ ক্ষেত্রে ট্রান্সবাউন্ডারি বায়ুদূষণের প্রভাব রয়েছে। শীতের সময় গড় তাপমাত্রা বাড়লেও দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য অনেকটাই কমে গেছে। এর কারণ বায়ুদূষণ।

বর্ষা মৌসুমের গতি পাল্টেছে: সাধারণত মে মাসের শেষের দিক থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই কক্সবাজার উপক‚লীয় এলাকা দিয়ে বাংলাদেশের মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করে। আর তা চলে যেতে থাকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। গবেষণার তথ্য বলছে, ২০০০ সালের পর থেকে কখনো কখনো বর্ষা আসতে জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ হয়ে যাচ্ছে। গত বছর বর্ষা এসেছে ৮ জুন। একইভাবে বর্ষা যাচ্ছেও দেরি করে। গত ১০ বছরে কখনো কখনো ২৩ অক্টোবর পর্যন্তও মৌসুমি বায়ুর প্রভাব ছিল। অর্থাৎ তখনো বৃষ্টি হতো।

বাংলাদেশের কৃষি মূলত ধানভিত্তিক। আর স্বভাবতই এর সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্ক নিবিড়। তবে বর্ষার আসা-যাওয়ার হেরফেরে কৃষির ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে বলে জানান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণা তত্ত¡াবধায়ক অধ্যাপক এ বি এম আরিফ হাসান খান। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, বর্ষা দেরিতে আসায় এবং মেঘাচ্ছন্ন দিন বেশি হওয়ায় সালোক সংশ্লেষণ কম হয়। এতে আউশ ধানের উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তাপপ্রবাহ বেশি থাকায় বোরো ধান পুষ্ট হওয়ার আগেই নষ্ট হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দেয়।

নেতিবাচক প্রভাব কৃষির ওপর: আশংকা করা হয় যে, বাংলাদেশে ২০৩০ সাল নাগাদ গড় তাপমাত্রা ১.০ ডিগ্রি, ২০৫০ সালে ১.৪ ডিগ্রি এবং ২১০০ সালে ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে। সম্প্রতি দেশে তাপমাত্রা ও শৈত্যপ্রবাহের মাত্রা বেড়েছে। বাংলাদেশে ক্রমান্বয়ে শীতকালের ব্যাপ্তি ও শীতের তীব্রতা দুই-ই কমে আসছে। বেশির ভাগ রবি ফসলেরই স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে ফলনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এ ছাড়া শীত মৌসুমে উষ্ণ প্রবাহ দেখা দিলে বেশি সংবেদনশীল ফসল যেমন গমের ফলন খুব কমে যায় এবং উৎপাদন অলাভজনক হয়। ধানের ক্ষেত্রে ফুল ফোটা বা পরাগায়নের সময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে গেলে চিটার সংখ্যা বেড়ে গিয়ে শিষে ধানের সংখ্যা কমে যেতে পারে, যা ধানের ফলনকে কমিয়ে দেবে। ধানের কাইচ থোড় আসার পরপরই রাতের তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং দিনের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে এবং এ অবস্থা ৪/৫ দিন অব্যাহত থাকলে ধান আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে চিটা হওয়ার আশংকা থাকে। ধানের প্রজনন পর্যায়ে বাতাসের গড় তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে ধানগাছের জন্য খুবই অসহনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং ধানে অতিরিক্ত চিটা হয়।

শৈত্যপ্রবাহের সাথে দীর্ঘ সময় কুয়াশাচ্ছন্ন থাকলে অনেক ফসল বিশেষ করে গমের পরাগায়ন (পলিনেশন) ও গর্ভধারণ (ফার্টিলাইজেশন) না হওয়ায় আংশিক বা সম্পূর্ণ ফসল চিটা হয়ে যায় এবং পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যায়, প্রজাতি বৈচিত্র্য কমতে পারে এবং প্রজননে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। উষ্ণতা বাড়ার ফলে গাছের প্রস্বেদনের হার বেড়ে যায় এবং অতিরিক্ত সেচ প্রদানের ফলে সেচের পানির অভাব হয়। শৈত্যপ্রবাহের ফলে আমের মুকুল নষ্ট হয় ও নারিকেলের ফলধারণ ব্যাহত হয়।

জমির উর্বরতা হ্রাস জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষিক্ষেত্রে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতাসহ কৃষি পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে জমির উর্বরতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে ফসলের উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে। যদিও পলির পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে কোথাও কোথাও ভ‚মির ব্যবহার উপযোগিতা বৃদ্ধি পায় কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় এ লাভ অপ্রতুল। সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছ¡াসের প্রভাবে মুহূর্তের মধ্যেই আক্রান্ত এলাকার ফসল, বৃক্ষরাজি, পশুপাখি, জীবজন্তু, ঘরবাড়ি ও মানুষসহ সবই ধ্বংস হয়ে যায়। প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোন ‘সিডর’ এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। নদীভাঙনের ফলে প্রচুর উৎপাদনশীল জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়। প্রতি বছরই নদীর ক‚ল ভেঙে অনেক কৃষি জমি, বসতি স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। কৃষি জমি কমে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং নদীর দুই-ক‚লবর্তী অসংখ্য মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব ভাসমান মানুষে পরিণত হচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় অতিবর্ষণের সময় উঁচু এলাকার উপরিভাগের উর্বর মাটি ধুয়ে ক্ষয়ে যায়, কখনও কখনও ভ‚মি ধস হয়। ফলে এসব এলাকার মাটি ক্রমান্বয়ে উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ধীরে ধীরে ফসল উৎপাদনের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

ঝুঁকি মোকাবিলায় নীতি ও পরিকল্পনা: কৃষিবিদ মো. হামিদুর রহমানের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একটি সমন্বিত উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা, সুশীল সমাজ ও ব্যবসায় খাতের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রভাব এবং সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্যের মধ্যেকার সম্পর্ক অনুধাবনের জন্য একটি নীতি গবেষণা ও বিশ্লেষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ সমীক্ষার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা দিতে পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়নে জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুগুলোকে সম্পৃক্ত করা। বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে ‘জলবায়ু পরিবর্তন সেল’ গঠন করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন সেলের কাছে বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনে অভিযোজনের লক্ষ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুগুলোকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রমাণিত ভালো অভিযোজন কলাকৌশলসমূহ মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করে জনগণের জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন ও টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। কিছু ভালো প্রমাণিত অভিযোজন কৌশল উল্লেখ করা হলো-খরা এলাকায় সম্পূরক সেচের জন্য মিনিপুকুর ও পাতকুয়া (ডাগ ওয়েল) খনন করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ; বোরো ধানে শুকনা বীজতলা তৈরির মাধ্যমে সুস্থ ও কোল্ড ইনজুরিমুক্ত চারা তৈরি; বন্যা, আকস্মিক বন্যা, খরা ও লবণাক্ততা থেকে রক্ষা পেতে স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন ধান/ফসলের চাষ; খরা এলাকায় স্বল্প পানির চাহিদা সম্পন্ন ফসলের (গম, মুগ, মাসকলাই, ছোলা, মসুর ইত্যাদি) চাষ; মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় কম্পোস্ট, খামারজাত সার, ভার্মিকম্পোস্ট ইত্যাদির ব্যবহার; ফেরোমেন ট্রাপের মাধ্যমে শাকসবজির চাষ; পানি সাশ্রয়ের জন্য এডব্লিউডি পদ্ধতিতে ধানক্ষেতে সেচ প্রদান; কৃষি সম্প্রপ্রসারণ অধিদপ্তরে ‘জলবায়ু পরিবর্তন সেল/দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সেল’ গঠন করার জন্য সরকারের নীতি ও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা যাতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি হ্রাসে সব স্তরের সংশ্লিষ্টদের (কৃষক, অফিসিয়াল, নীতিনির্ধারক প্রভৃতি) এ বিষয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা; কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে আপদকালীন ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তহবিল/দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা তহবিল’ গঠন করার জন্য সরকারের নীতি ও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা;এলাকাভিত্তিক উচ্চমূল্য ফসলেরআবাদ সম্প্রসারণ ও উপযোগী শস্যবিন্যাস অনুসরণ করা;জোয়ার-ভাটা এলাকায় বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সর্জান ও ভাসমান পদ্ধতিতে পদ্ধতিতে সবজি ও ফল চাষ, ঘেরের পাড়ে সবজি চাষ করা; চরাঞ্চলে, উপক‚লীয় এলাকায় তরমুজ, বাঙ্গি, খিরা, বাদাম, ফেলন, সূর্যমুখী, ভুট্টা ইত্যাদি চাষ; মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় ভার্মিকম্পোস্ট, কম্পোস্ট, জৈবসার, সবুজ সারের উৎপাদন ও ব্যবহার; ভ‚-উপরিস্থ পানির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা;জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে দেশব্যাপী স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা/প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন;দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে এলাকা উপযোগী কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষকের মাঝে ভর্তুকির মাধ্যমে বিতরণ করা;কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে একটি সেন্ট্রাল নলেজ হাব তৈরি করা যেখানে অ্যাডাবটেশন ও মিটিগেশনের কৌশলসমূহ এবং আবহাওয়া ও জলবায়ু সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষিত থাকবে।

এখনই নিতে হবে যথাযথ ব্যবস্থা, বলছেন গবেষকরা: জলবায়ু পরিবর্তন যে ভয়ানক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা থেকে রক্ষা পেতে ভবিষ্যতের জন্য কোনো কিছু ফেলে রাখার কোনো অবকাশ নেই বলে মনে করেন নরওয়ের আবহাওয়া দপ্তরের জলবায়ু বিভাগের প্রধান হ্যান্স অলিভ হাইজেন। ব্যবস্থা এখনই নিতে হবে বলে জানান তিনি। গবেষণায় পাওয়া তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে হ্যান্স অলিভ হাইজেন বলেন, রাজশাহীসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাপপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ভবিষ্যতে বৃষ্টির সময়ও কমে আসতে পারে। হঠাৎ অস্বাভাবিক বৃষ্টি হতে পারে। এমন বৈরী পরিস্থিতি কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য শঙ্কার বিষয়।

গবেষক হান্স ওলাভ বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য আঞ্চলিক ও স্থানীয় দূষণ দায়ী।’ ওলাভ তাঁর উপস্থাপনায় বলেন, ‘বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমের সময় আরও কমে আসবে। গরমের সময় বাড়বে। আবার দেখা যাবে, অনেক গরমের পর অল্প সময় অতিবৃষ্টি হবে। শুধু গবেষণার পরিসংখ্যান নয়, চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রভাব প্রতিনিয়ত টের পাচ্ছেন বলে জানান অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন ফাতিমা আকতার। তিনি বলেন, ‘এর প্রভাব আমাদের কৃষি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর পড়ছে। আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা, অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে ভবিষ্যতে।’ এসব মোকাবিলায় কর্মপন্থা নির্ধারণে আবহাওয়া অধিদপ্তরের এই গবেষণা তাৎপর্যপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে বলে মনে করেন তিনি।

নরওয়ের রাষ্ট্রদূত এসপেন রিকটার-ভেন্ডসেন বলেন, বিশ্ব একটাই, আর তাই আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রভাব সবার ওপর পড়বেই। ভবিষ্যতে জলবায়ুর আরও পরিবর্তন হবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যে আছে। এ জন্য সঠিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ দরকার। নরওয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে থাকবে এসব কাজে। আজিজুর রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। তারা মূলত কয়েকটি বিষয়কে মাথায় রেখে গবেষণা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে বর্ষা মৌসুম, তাপপ্রবাহ, শীতের ধরন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

১১ জেলার মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে এল নতুন প্রকল্প: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আধুনিক দাসত্বের অবসান ঘটাতে উইনরক ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ প্রোগ্রাম উদ্বোধন করেছে ‘অগ্রযাত্রা’ প্রকল্প। মঙ্গলবার ঢাকায় এ প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আমেরিকান দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হেলেন লাফাভ এবং বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মানবপাচার ও জলবায়ু পরিবর্তন উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতিকে তুলে ধরেন। জলবায়ু অভিযোজন, সহনশীলতা এবং প্রশমন ব্যবস্থার বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সম্পদ সংগ্রহে সহায়তা করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করবে আমেরিকা। আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের সহায়তায় অগ্রযাত্রা প্রকল্পটি জলবায়ু পরিবর্তন, মানবপাচার এবং আধুনিক দাসত্বের মধ্যে যোগসূত্র নিয়ে জ্ঞানের পরিধি বাড়াবে। প্রকল্পটি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি ও মৎস্যজীবী পরিবারগুলোতে হওয়া সম্পত্তি ও জীবিকার ক্ষতির কারণে তৈরি হওয়া শোষণ ও মানবপাচারের ঝুঁকি হ্রাস করবে। প্রকল্পের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য জলবায়ু-সহনশীল জীবিকার ব্যবস্থা করা হবে। যা এই জনগোষ্ঠীর সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও পাচারের চ্যালেঞ্জকে স্থানীয় নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার রোডম্যাপ সরবরাহ করবে।

রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরিশাল ও পটুয়াখালীসহ বাংলাদেশের ১১টি জেলায় এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। আমেরিকান দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হেলেন লাফাভ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে মৎস্যজীবী-কৃষকদের উপর প্রভাব ফেলছে তা আরও ভালোভাবে বুঝতে বাংলাদেশ সরকারকে সাহায্য করবে অগ্রযাত্রা প্রকল্পটি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের দুর্বল জনগোষ্ঠীর মধ্যে মানবপাচারের ঝুঁকি কমাতে সঠিক প্রমাণ সরবরাহ করবে।

ইউডি/এজেএস

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading