কিশোর গ্যাং ‘কালচার’ থামছে না: মদদদাতাদের রুখবে কে?
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ০৭ মার্চ, ২০২৪, আপডেট ১৩:৫০
গত কয়েক বছর ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোররা সংগঠিত হয়ে নানারকম অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে যা অন্যতম একটি সমস্যায় রূপ নিয়েছে। এ নিয়ে সিরাজুল ইসলাম’র প্রতিবেদন
অপরাধসমূহের রূপ বদলাচ্ছে: সারাদেশে কিশোর গ্যাং কালচার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দেশজুড়ে ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, জমিদখল, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, ধর্ষণ এবং খুনসহ নানা অপরাধের ঘটনা অহরহ ঘটছে। উঠতি বয়সের স্কুল-কলেজগামী কিশোরদের একটি অংশ লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির প্রসারে সহজেই তাদের মনোজগতে সন্ত্রাসবাদীরা হানা দিচ্ছে। আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র- জুনিয়র দ্বন্দ্ব, প্রেমের বিরোধ, মাদকসহ নানা অপরাধে কিশোররা খুনাখুনিতে জড়িয়ে পড়ছে। এলাকার কথিত বড় ভাইদের মদদে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের অপরাধসমূহের রূপ বদলাচ্ছে, হিংস্র হচ্ছে, নৃশংস হয়ে দেখা দিচ্ছে। প্রকাশ্য দিবালোকে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এদের মধ্যে ছিন্নমূল পরিবারের বিপথগামী সন্তান থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীও রয়েছে। বিভিন্ন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার প্রয়োজনে কিশোর বন্ধুরা মিলে প্রথমে একটি গ্রুপ তৈরি করে। পরে একসাথে শক্তিমত্তা প্রদর্শনের প্রয়োজনে অস্ত্র বহন ও ফাঁকা ফায়ারিং করে এবং গ্রুপ করে মোটরসাইকেল নিয়ে দেয়া হয় মহড়া। এভাবে নানা অপরাধে জড়িয়ে কিশোররা ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে।
রাজধানীর তেজগাঁও, গুলশান, উত্তরা ও মতিঝিল এলাকায় যৌথ অভিযান চালিয়ে গত দুই দিনে ৭৫ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবি বলছে, কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে বর্তমানে বড়লোকের সন্তানরাও জড়িয়ে যাচ্ছে। তারা মাদক, চাঁদাবাজিসহ হত্যার মতো অপরাধে জড়াচ্ছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও মহানগর গোয়েন্দাপ্রধান মোহাম্মদ হারুন রশীদ বলেন, গত মঙ্গল ও বুধবার মোট ৭৫ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের দৌড়াত্বের কারণে সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। কিশোর গ্যাং সদস্যরা ছিনতাই, ইভটিজিং, হুমকি দেওয়া, স্কুল-কলেজ ছাত্রীদের ভয় দেখানো এবং বিভিন্ন সময় উত্তেজনাকর পরিস্থিত সৃষ্টি করে। এই কাজগুলো তারা করছে দলবদ্ধ হয়ে।
তিনি বলেন, চক্রগুলো রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নানা নামে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। উত্তরায় প্রভাব বিস্তার করেছে ইয়োং স্টার, বিগবস, ডিস্কো বয়েজ, বন্ধু মহল, শীল বিষু গ্যাং, পারভেজ গ্রুপ, রুস্তম গ্রুপ, ইয়োং স্টার গ্রুপ, নাইনএমএম গ্রুপ, নাইন স্টার গ্রুপ; রামপুরায় উজ্জল গ্রুপ। কিশোর গ্যাং গ্রুপগুলো মাদক, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ করে আসছে। কিছু বড় ভাইয়ের ছত্রছায়ায় তারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। এ সব কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় গত দুই বছরে ৩৪ জন কিশোর নিহত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সমাজে নানা অসঙ্গতি রয়েছে। নিজেদের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কিশোররা। তাদের আচরণে পরিবর্তন হচ্ছে। কিশোর বয়সে হিরোইজম ভাব থাকে। এই হিরোইজমকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে হবে। আবার কিশোরদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার কারণে তাদের মধ্যে এক ধরনের গ্যাং কালচার গড়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে ভিনদেশি সংস্কৃতি ইচ্ছামতো তাদের আয়ত্বে চলে যাওয়ায় তাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ধনীদের সন্তানরাও চক্রে জড়াচ্ছে: ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও মহানগর গোয়েন্দাপ্রধান মোহাম্মদ হারুন রশীদ বলেন, আমরা এক সময় মনে করতাম, ভাসমান ও নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানরা কিশোর গ্যাং চক্রে জড়িত হচ্ছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, উচ্চ মাধ্যবিত্ত, ধনীদের সন্তানরাও কিশোর গ্যাং চক্রে জড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের পোশাক, চুলে কাটিং চলাফেরা সবই ভীতিকর। এই সব ধনীর সন্তানরা প্রথমে মাদক সেবন, পরে মাদক বিক্রিতেও জড়িয়ে যাচ্ছে। এছাড়া তারা এলাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক বড় ভাই আবার কখনও কাউন্সিলরদের নিয়ন্ত্রণে থেকে হত্যার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। বর্তমান ও সাবেক কাউন্সিলরদের ছত্রছায়ার অভিযোগ রয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে দুই দিন ৭৫ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। গ্রেফতার সবাই কিশোর গ্যাং চক্রে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। কিশোর গ্যাং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ উল্লেখ করে ডিবি প্রধান বলেন, অভিভাকদের উচিত, তার সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে সেই খোঁজ রাখা। গ্রেফতার করে কিশোর গ্যাং দমন করা যাবে না। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, সন্তানদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। কিশোর গ্যাংয়ের আশ্রয় দেওয়া বড় ভাইদের পরিচয় প্রকাশ করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা বর্তমানে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেফতার করেছি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে আমরা অনেকের নাম পেয়েছি। এ সব নাম তদন্ত করে আমরা দেখবো, কারা কারা কিশোর গ্যাং সদস্যদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়।
হারুন বলেন, মাহফিল ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে এক হচ্ছে কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্যা। নানা গ্রুপের সদস্যরা রাজনৈতিক নেতাদের পরিচয় দিয়ে এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধ করে। কিশোর গ্যাংয়ের এমন দৌড়াত্বের কারণে কেউ প্রতিবাদের সাহস পায় না। কিশোর গ্যাংবিরোধী ধারাবাহিক অভিযান চলবে। এ বিষয়ে কেউ সুপারিশ নিয়ে এলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিশোর গ্যাং দমনে এগিয়ে আসতে হবে। স্থানীয় রাজনৈতি নেতা ও পরিবারের সদস্যদেরও।
কাউন্সিলররা জড়িত থাকলে ব্যবস্থা: পুলিশের একটি প্রতিবেদনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অন্তত ২১ জন কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাংকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ এসেছে। এ বিষয়ে হারুন অর রশীদ বলেছেন, কিশোর গ্যাং সদস্যদের প্রশ্রয়দাতা হিসেবে যদি কাউন্সিলরদের নাম পাওয়া যায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ঢাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত কিছু কাউন্সিলরদের নাম এসেছে। ডিবি তাদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না-জানতে চাইলে ডিবিপ্রধান বলেন, গ্রেপ্তাররা সাবেক ও বর্তমান কিছু কাউন্সিলরদের নাম জানিয়েছে। এটি তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে যদি কোনো কাউন্সিলরদের নাম পাওয়া যায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গোড়া থেকে সমস্যা সমাধানের নির্দেশ: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এখন সবচেয়ে বড় কিছু সমস্যা আছে। এর মধ্যে একটি কিশোর গ্যাং। প্রায়ই এদের উৎপাত দেখা যায়। পড়ালেখা করা ছেলে-মেয়েরা কেন এসবে জড়াবে? এটা সবার দেখতে হবে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকসহ সবাইকে নজরদারি বাড়াতে হবে। ছেলে-মেয়েরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যায় কি না, সেটা নিশ্চিত করতে নজরদারি বাড়াতে হবে। কিশোর গ্যাং বন্ধে জেলা প্রশাসক ও কমিশনারদের কাজ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত সমাধানে কিশোরদের গ্রেফতার করে লাভ নেই, গোড়া থেকে সমস্যা সমাধান করতে হবে।
সম্প্রতি জেলা প্রশাসক সম্মেলনে তিনি এ নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, যখন ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যাবে, পড়াশোনা করবে, সেই সময় কিশোর গ্যাং; বিশেষ করে কোভিড অতিমারির সময় কিন্তু এই জিনিসটা সব থেকে বেশি সামনে এসেছে। আমার মনে হয়, প্রত্যেকটা এলাকাভিত্তিক ছেলে-মেয়ে যারা শিক্ষাগ্রহণ করবে, তারা কেন এ ধরনের গ্যাং হবে এবং অসামাজিক কাজে বা ছিনতাই, খুন, ডাকাতি, এসবে লিপ্ত হবে। সে বিষয়টা নজরদারি করা একান্তভাবে জরুরি। তিনি বলেন, আমার মনে হয়, শুধু গ্রেফতার করে, ধরে লাভ নেই। কারণ গ্রেফতার করে জেলে পাঠালে আবার এর থেকে আরও বেশি; যেগুলো গ্যাং থাকে বা যারা বেশি আইন-শৃঙ্খলার ভঙ্গ করল অথবা খুন করে বা কোনো অপরাধ করে অপরাধী, তাদের সঙ্গে মিশে এরা আরও বেশি খারাপ হয়ে যাবে। শেখ হাসিনা বলেন, সেই কারণে গোড়া থেকে আমাদের ধরতে হবে। পরিবার থেকে শুরু করতে হবে বা স্কুল-কলেজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই শুরু করতে হবে। ছেলে-মেয়েরা যেন এই ধরনের পথে কখনো না যেতে পারে।
অনলাইনের উত্থান বাড়ছে অপরাধ: অ্যাপভিত্তিক ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের যোগাযোগ বাড়ায় অপরাধ বেড়েছে। কিশোররা বিভিন্ন লাইক-কমেন্ট করে প্রথমে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে কিশোরীদের সঙ্গে। পর্যায়ক্রমে এই সম্পর্ক ভিডিওর মাধ্যমে অশ্লীলতায় পৌঁছে যায়। যার কারণে সম্প্রতি ব্ল্যাকমেইল করে কিশোরীদের ধর্ষণ ও হত্যার মতো কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে টিকটকের ‘কিশোর গ্যাং’গুলো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এছাড়াও বিভিন্ন পার্ক, খোলা জায়গায়, ফুটপাতে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে একত্রিত হয়ে ভিডিও কন্টেন্ট তৈরির নামে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, ইভটিজিং, পথচারীদের গতিরোধ, বাইক মহড়াসহ বিভিন্ন অসৌজন্যমূলক আচরণ করে থাকে।
গ্রুপগুলো একে অপরের ভিডিও কন্টেন্টে ‘লাইক’ ও ‘কমেন্ট’ করার আহ্বান জানায়। এক গ্রুপ লাইক বা কমেন্ট করার পর অপর গ্রুপটি যদি না করে এ নিয়েও গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। যা হাতাহাতি, মারামারি ও খুনোখুনিতে গড়ায়। দেশে কিশোর অপরাধ আগেও ছিল। তবে বর্তমানের মতো এমন হিংস্রতা আগে খুব একটা দেখা যায়নি। গত অর্ধ যুগ ধরে কিশোর অপরাধ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এর ধরন পালটে গেছে। তাদের অপরাধগুলো ক্রমেই হিংস্র নৃশংস বিভীষিকাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। খুন, ধর্ষণ ও ধর্ষণ করার পর হত্যা করার মতো হিংস্র ধরনের অপরাধ করার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে এবং বেড়েই চলছে। সংঘবদ্ধভাবে প্রকাশ্য দিনের আলোয় নৃশংসভাবে খুন করা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার লক্ষ্যে এখনই এর লাগাম টেনে ধরা দরকার।
২০২৭-২০২৩ চালচিত্র: ২০১৭ সালে উত্তরায় স্কুল ছাত্র আদনান হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি আলোচনায় আসে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের মূলহোতাসহ বেশ কয়েকজন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেফতার করে র্যাব। পরবর্তী সময়ে উত্তরা, গাজীপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় স্কুলছাত্র শুভসহ আরও কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। কিশোর গ্যাং নামক অপসংস্কৃতি রোধকল্পে র্যাব এসব হত্যাকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসামিকে গ্রেফতার করে। এ প্রসঙ্গে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ২০১৭ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত ১ হাজার ১২৬ জন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে গ্রেফতার করে র্যাব। এদের মধ্যে মাত্র ৪০ জনকে; যার ৩০ জনকে অর্থদণ্ড ও ১০ জনকে মুচলেকা দিয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে র্যাবের অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের বিভিন্ন গ্রুপের ৩৪৯ জন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিশোর গ্যাং অপরাধীদের বিরুদ্ধে র্যাব ফোর্সেসের গোয়েন্দা নজরদারি ও জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ডিএমপি সূত্র বলছে, ২০২৩ সালে রাজধানীতে যত খুন হয়েছে তার ২৫টির সঙ্গে কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট। বাহিনীগুলো একদিনে গড়ে ওঠেনি। রাজনীতিবিদদের প্রশ্রয় ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় এসব বাহিনী এখন ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। রাজধানীতে, বড় শহরে মানুষের নিরাপদ বসবাসের ক্ষেত্রে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে এসব বাহিনী। ঢাকায় ২১ জন কাউন্সিলরের নাম এসেছে যাদের আশ্রয়ে কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে। সারা দেশের ‘কিশোর গ্যাং’ নিয়ে পুলিশ প্রতিবেদন তৈরি করেছিল ২০২২ সালের শেষ দিকে। এতে বলা হয়েছে, সারা দেশে অন্তত ১৭৩টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। বিভিন্ন অপরাধে এদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ৭৮০টি। এসব মামলায় আসামি প্রায় ৯০০ জন। রাজধানীতে কিশোর গ্যাং রয়েছে ৬৬টি। চট্টগ্রাম শহরে আছে ৫৭টি। মহানগরের বাইরে ঢাকা বিভাগে রয়েছে ২৪টি গ্যাং। বেশির ভাগ বাহিনীর সদস্য ১০ থেকে ৫০ জন। পুলিশের প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছিল, তার চেয়ে এখন পরিস্থিতি খারাপ। যেমন পুলিশের তালিকার বাইরে ঢাকায় আরও অন্তত ১৪টি কিশোর গ্যাংয়ের খোঁজ পাওয়া গেছে।

যে দাবি জানালেন মুজিবুল হক চুন্নু: কিশোর গ্যাংয়ের আশ্রয়-প্রশ্রয় দানকারী সরকারি দলের হোক বা পুলিশের হোক, তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে অনির্ধারিত আলোচনায় তিনি এ দাবি জানান। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে এখন সাধারণ মানুষের বসবাস করা কঠিন। এসব বাহিনী যারা চাঁদাবাজি ও লুটপাট করছে, যারা মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে তারা পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে। নতুনভাবে সরকার গঠন করা হয়েছে, যারা এসব কাজে জড়িত সেটা সরকারি দলের হোক বা পুলিশের হোক- এগুলো নিয়ন্ত্রণ করে ঢাকা শহরের মানুষকে শান্তিতে বসবাসের সুযোগ দিতে হবে। এদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। একটা পরিকল্পনা করে এদের ধরপাকড় করে আইনের আশ্রয়ে আনতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন চুন্নু।
কিশোর গ্যাং নিয়ে একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন তুলে ধরে চুন্নু বলেন, ২০২৩ সালে ২৫টি খুনের সঙ্গে কিশোর গ্যাং জড়িত। বাহিনী বেশি মিরপুর, ডেমরা ও সূত্রাপুরে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমি দখলে ভাড়া খাটা, উত্যক্ত করা, খুনে সস্পৃক্ত হচ্ছে এসব গ্যাং। পুলিশের নিজস্ব প্রতিবেদন সূত্রে ঢাকায় গাংচিল বাহিনীর মতো অন্তত ৮০টি বাহিনীর খোঁজ পাওয়া গেছে, যেগুলোর বেশির ভাগ ‘কিশোর গ্যাং’ নামে পরিচিত। নামে কিশোর গ্যাং হলেও এসব বাহিনীর বেশির ভাগ সদস্যের বয়স ১৮ বছরের বেশি। তারা ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমি দখলে সহায়তা, ইন্টারনেট সংযোগ, কেবল টিভি (ডিশ) ব্যবসা ও ময়লা–বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, উত্ত্যক্ত করা, যৌন হয়রানি, হামলা, মারধরসহ নানান অপরাধে জড়িত। চুন্নু আরও বলেন, বাহিনীগুলো শুধু অপরাধই করে না, আধিপত্য বজায় রাখতে পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়ায়।
দ্রুত বেড়ে যাওয়ার নেপথ্যে কারন: দেশে বিরজমান কিশোর গ্রুপ কিশোর গ্যাং ও দ্রুত বেড়ে যাওয়া কিশোর অপরাধ সম্পর্কে বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, এতে ইন্টারনেট প্রযুক্তির প্রসারের প্রভাব রয়েছে। কেউ বলছেন, পারিবারিক বন্ধন শিথিল, মা-বাবার সঙ্গে কিশোর সন্তানদের দূরত্ব তৈরি এবং খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণে শিশুদের মধ্যে নেতিবাচক প্রবণতা বাড়ছে, যা কিশোরদের ভ্রান্তপথে যাওয়ার একটি কারণ। অনেকের মতে, সমাজে সন্ত্রাস ও খুন হরহামেশায় হচ্ছে এবং অর্থের বলে ও ক্ষমতার দাপটে সন্ত্রাসী ও খুনিরা বিচার ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সমাজে বহাল তবিয়তে অবস্থান করছে। তাদের সামাজিক মর্যাদা আরও বাড়ছে। কিশোররা এসব দেখে ধরে নিচ্ছে সন্ত্রাস করে পার পেয়ে যাওয়া তাদের পক্ষেও সম্ভব। তারা হয়ে উঠছে বেপরোয়া।
অপরাধ বিশ্লেষক ড. জিয়া বলেছেন, কিশোর বয়সী ছেলেমেয়েরা প্রভাবিত হয় সহজে। তাদের নতুন করে সবকিছু বুঝতে শেখার এই সময়টাতেই যদি ‘ক্ষমতা’ বিষয়টি তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তবে তারা সহিংসতাকেই হাতিয়ার মনে করে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ের কিশোররা উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে পশ্চিমা সংস্কৃতিতে আকৃষ্ট হচ্ছে এবং সেই সংস্কৃতি নিজেদের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই জায়গায় তারা ব্যর্থ হচ্ছে। যে সংস্কৃতি তারা গ্রহণ করতে চাচ্ছে সেটা পুরোপুরি নিতে পারছে না।
অন্যদিকে যারা নিচ্ছে তারাও এটার সদ্ব্যবহার করতে পারছে না। যার ফলে সমাজে এর কু প্রভাব পড়ছে এবং কিশোর অপরাধ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক মা-বাবা আছেন, তারা তাদের সন্তান কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে, ইন্টারনেটে কী দেখছে, সে সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন না। মনে করেন টাকা দিলেই সব শেষ। তাদের সন্তানদেরই অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিবাবকদের নিয়ন্ত্রণহীনতা, অর্থের সহজলভ্যতা, ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের অবাধ সুবিধা ইত্যাদি কিশোর অপরাধ বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
মানবাধিকার বিভিন্ন সংগঠনের মতে, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে। সমাজের প্রতিটা স্তরে নীতি নৈতিকতার অবক্ষয় হচ্ছে। ফলে সমাজ থেকে শিশুরা যা দেখছে তাই শিখছে। সমাজে সর্বস্তরে অপরাধ বাড়ছে তাই কিশোর অপরাধও বাড়ছে। কিশোর গ্যাং কিশোর গ্রুপ সর্বোপরি কিশোর অপরাধ সম্পর্কে গুণীজনরা যা বললেন তার সারাংশ হলো, পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতা, পারিবারিক অনুশাসনহীনতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অংশগ্রহণহীনতা, ইন্টারনেটের অপব্যবহার, বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্টতা ও তা অনুকরণ এবং অপব্যবহার, সর্বোপরি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, এর হাত থেকে বাঁচার উপায় কী? বাংলাদেশে দু’টি কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র আছে। একটি গাজিপুরের টঙ্গিতে অন্যটি যশোরে। ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী ৯ থেকে অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের কোন শিশু অপরাধে জড়ালে তাদের সাধারণ কারাগারে না পাঠিয়ে বড়দের মতো শাস্তি না দিয়ে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয় এবং তাদের মানসিকভাবে শোধন করার ব্যবস্থা করা হয়। এই শোধন প্রক্রিয়াই কি দেশের কিশোর গ্যাং অপরাধ নিধন করতে পারবে? সম্ভবনা খুবই ক্ষীণ। তবে কি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এভাবেই ধ্বংস হয়ে যাবে? না, এর লাগাম টেনে ধরার জন্যে যা যা প্রয়োজন এখনই তাই তাই করতে হবে।

