বেনজীরের সম্পত্তির ভবিষ্যৎ কী?
আব্দুর রহিম । মঙ্গলবার, ১১ জুন, ২০২৪, আপডেট ২০:২৫
বর্তমান সময়ের ধনকুবের বেনজীর আহমেদ। পুলিশের সাবেক এই মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সারা দেশে দুই হাজার বিঘার বেশি জমির সন্ধান পাওয়া গেছে। এই সম্পত্তির মালিক তার স্ত্রী জিসান মির্জা এবং দুই মেয়ে। আরও বেশ কিছু কোম্পানি ও শেয়ারের মালিক তারা। এরই মধ্যে তিনি সপরিবারে সিঙ্গাপুরে পালিয়ে গেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে বেনজীর আহমেদের মালিকানাধীন সাভানা রিসোর্ট ও ন্যাচারাল পার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসন। এখন থেকে এই সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রশাসনই পালন করবে। আদালত ক্রোকাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক কাজী মাহবুবুল আলম এই তথ্য জানিয়েছেন।
২৩ মে দুর্নীতি দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বেনজীর আহমেদের সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দেন ঢাকার একটি আদালত। ৮৩টি দলিলের প্রোপার্টি, বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং কক্সবাজারের একটি প্রোপার্টি রয়েছে এই তালিকায়। অনুসন্ধান শেষ হলে তার মোট সম্পদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাবে। ওই অনুসন্ধান রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই দুদক মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে।
দুদক তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছিল। কিন্তু তিনি সময় চেয়ে আবেদন করেছেন। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আইজিপির পদ থেকে অবসরে গেছেন তিনি। সম্প্রতি একটি জাতীয় পত্রিকায় তার বিরুদ্ধে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এরপর সারাদেশে তোলপাড় শুরু হয়। যদিও বেনজীর আহমেদ ফেসবুক লাইভে এসে প্রকাশিত সব সংবাদকে অসত্য দাবি করেন।
কর্মজীবনে পাঁচবার পুলিশের সর্বোচ্চ পদক ছাড়াও নীতি নৈতিকতার জন্য শুদ্ধাচার পুরস্কারেও তাকে ভূষিত করেছিল সরকার। দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেছেন, আদালত জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছে, সে কারণে পরবর্তী অন্য কোন নির্দেশ না আসা পর্যন্ত এই সম্পদ জব্দ অবস্থাতেই থাকবে। জব্দ সম্পত্তিতে কিছু করতে হলে আদালতের অনুমতির দরকার হয়।
আইনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এখনও পর্যন্ত আদালত বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের যে সব সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করার নির্দেশ দিয়েছেন তার মধ্যে আছে ঢাকার গুলশানে চারটি ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসেব, তিনটি শেয়ার ব্যবসার বিও অ্যাকাউন্ট, প্রায় ৬২১ বিঘা জমি, উনিশটি কোম্পানির শেয়ার এবং ত্রিশ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। এছাড়া তদন্তকারীরা ঢাকা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও কক্সবাজারে বেনজীর আহমেদ এবং তার স্ত্রী ও তিন মেয়ের মালিকানাধীন জমির সন্ধান পেয়েছেন।
এর মধ্যে প্রায় ১১২ একর জমি তার নিজ জেলা গোপালগঞ্জে। বেনজীর আহমেদ বা তার পরিবারের সদস্যদের বিদেশে সম্পদ আছে কি না, তা জানতে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) চিঠি দিয়েছে দুদক।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার; র্যাবের মহাপরিচালক ও আইজিপি থাকা অবস্থায় অত্যন্ত ক্লিন ইমেজধারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন বেনজীর। তাকে শুদ্ধাচার পুরস্কারও দেওয়া হয়। তবে পুলিশের শীর্ষ পদে থাকা অবস্থায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন তিনি।
যদিও তিনি নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিলেন র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক হিসেবে ‘বিচার বহির্ভূত হত্যার’ মত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সম্পৃক্ততা’র জন্য। সাভানা রিসোর্ট ও পার্কের জন্য জোর করে জমি নেয়া হয়েছে বলে স্থানীয়রা অনেকে সংবাদ মাধ্যমের কাছে অভিযোগ করেছেন। তাদের এক দল ওই পার্কের সামনে বিক্ষোভও করেছে।
দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীরের মতে, কেউ যদি কারও জমি জোর করে দখল রাখে তাহলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি থানায় গিয়ে ফৌজদারি অভিযোগ করতে পারেন এবং প্রয়োজনে সিভিল কোর্টে গিয়েও বলতে পারেন যে তার জমি জোর করে দখল করে রাখা হয়েছে।
কিন্তু কেউ যদি দলিল করে দিয়ে থাকেন তাহলে তিনি যে চাপের মুখে বাধ্য হয়েছেন বা তাকে দলিল দিতে যে বাধ্য করা হয়েছে সেটি প্রমাণ করতে হবে আদালতে। সংক্ষুব্ধদের অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করা সময় সাপেক্ষ এবং দীর্ঘ আইনী লড়াই পাড়ি দিতে হবে। সেটা নয়, বাদ-ই দিলাম।
তারা সম্পদ ফেরত পাবেন কি না; তা দেখার অপেক্ষায় থাকলাম আমরা। যুক্তির খাতিরে ধরেই নিলাম জব্দ করা সম্পত্তি ফেরত পাবেন বেনজীর ও তার পরিবার।
কিন্তু তার নামে যে দুর্নীতির একটা দাগ লেগে গেল; সেটা কি উঠবে? একজন মানুষের তিন বা চার প্রজন্মের জীবনযাপনের জন্য কত সম্পত্তি প্রয়োজন? কত টাকা দরকার? সেই হিসাব আমাদের আছে? নাই। হিসাব থাকলে এত সম্পত্তির পেছনে কেউ ছুটতো? না।
আসলে সম্পত্তি অর্জন একটা নেশা। হেরোইন সেবনের মতো নেশা। কেউ এই নেশায় ডুবলে আর সহজে বের হতে পারে না। বেনজীরের ক্ষেত্রে কি এমনটাই হয়েছে?
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক/ ইউডি/এআর

