তনু হত্যার ১০ বছর পরে বিচার প্রক্রিয়ায় নাটকীয় মোড়: বিচারহীনতার পাপ থেকে মুক্তি মিলবে তো!

তনু হত্যার ১০ বছর পরে বিচার প্রক্রিয়ায় নাটকীয় মোড়: বিচারহীনতার পাপ থেকে মুক্তি মিলবে তো!

উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, আপডেট ১৬:৫৫

এক দশকের প্রতীক্ষার পর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় নতুন গতি এলেও এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি। তনুর হত্যার পর দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ন্যায়বিচারের দাবিতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তার বাবা-মা। মেয়ের একমাত্র স্মৃতি হিসেবে তার এখন সম্বল শুধু দেয়ালে ঝোলানো কয়েকটি ছবি। এই স্মৃতি বুকে আঁকড়ে তারা এখনও অপেক্ষায় আছেন, কবে তনুর হত্যাকারীরা তাদের অপরাধের প্রাপ্য সাজা পাবে। মামলার নতুন এই অগ্রগতিতে এখন সবার প্রত্যাশা এবার যেন সত্য উদ্ঘাটিত হয় এবং দোষীরা যেন পায় যথাযথ শাস্তি। এ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন…

দোষীরা যেন পায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি

মো. জাকারিয়া : দীর্ঘ এক দশক পর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় প্রথমবারের মতো সন্দেহভাজন এক আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম হাফিজুর রহমান। তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসের সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার। গ্রেপ্তারের পর তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। গত ২২ এপ্রিল কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মুমিনুল হক এ আদেশ দেন। এদিকে, তিন দিনের রিমান্ড শেষে গত শনিবার দুপুরে তাকে আদালতে তোলা হয়। এ সময় ১৬৪ ধারায় তিনি জবানবন্দি না দেওয়ায় তাকে কারাগারে প্রেরণের আদেশ দেন বিচারক। এর আগে, গত ২১ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। এই মামলার নতুন এই অগ্রগতিতে বিচার প্রক্রিয়ায় নাটকীয় মোড় এলেও বিচারহীনতার পাপ থেকে মুক্তি মিলবে কি? এ প্রশ্ন এখন সচেতন মহলের। সবার প্রত্যাশা এবার যেন সত্য উদ্ঘাটিত হয় এবং দোষীরা যেন পায় যথাযথ শাস্তি।

প্রসঙ্গত, গত ৬ এপ্রিল এই মামলার সপ্তম তদন্ত কর্মকর্তা তিন সন্দেহভাজনের ডিএনএ নমুনা ম্যাচিংয়ের আবেদন করেন। আদালত এতে সম্মতি জানায়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম কুমিল্লার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. মুমিনুল হকের আদালতে হাজির হলে তাকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। ওইদিন তিনি বলেছেন, আগেই তনুর ব্যবহৃত কিছু কাপড় থেকে তিনজন ব্যক্তির ডিএনএ প্রোফাইল করা হয়। এগুলো পরে আর ম্যাচিং করা হয়নি। তাই আদালত বলেছেন, সন্দেহভাজন তিনজনের ডিএনএ পরীক্ষা করতে।

হাফিজুর রহমান

২০১৭ সালে সিআইডি তনুর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিন জন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল। আদালত সূত্র জানায়, বহুল আলোচিত এ মামলায় এখন পর্যন্ত ৮০টি শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। গত এক দশকে চারটি সংস্থার সাত জন কর্মকর্তা মামলার তদন্ত করেছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সন্দেহভাজন তিন আসামি বর্তমানে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে আছেন। তবে তনু হত্যার পর কখন তারা অবসরে গেছেন বা তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে কিনা, সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আদালতের আদেশ পেয়েই তাদের গ্রেপ্তারে অভিযানে নামে পিবিআই। গ্রেপ্তার ওয়ারেন্ট অফিসার (অব.) হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে এই প্রথম সন্দেহভাজন একজনের ডিএনএ ক্রস ম্যাচ (মিলিয়ে দেখা) নমুনা নেওয়া হয়। অপর দুইজনকে গ্রেপ্তারের পর তাদেরও ডিএনএ নমুনা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পিবিআই।

পিবিআই কর্মকর্তা বলেন, সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যাওয়া সন্দেহভাজন আরও দুই সেনা সদস্যকে খোঁজা হচ্ছে। কেউ আটক হলে সময় মতো গণমাধ্যমে সব জানানো হবে। এদিকে ওয়ারেন্ট অফিসার (অব.) হাফিজুর রহমানকে পিবিআই ঢাকার কার্যালয়ে তনু হত্যার বিষয়ে তিন দিনের জিজ্ঞাসাবাদে কোনো তথ্য দিয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন হাফিজুর। আমরা এসব তথ্য যাচাই করবো। তাই, এ নিয়ে এখনই বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করা যাচ্ছে না। উল্লেখ্য, শুরুতে থানা-পুলিশ, জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটি তদন্ত করেও কোনো রহস্য বের করতে পারেনি। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর তনু হত্যা মামলার নথি পিবিআইয়ের ঢাকা সদর দপ্তরে হস্তান্তর করে সিআইডি।

ছিল টক অব দ্য কান্ট্রি : ২০১৬ সালের ২০ মার্চ আসলে কী ঘটেছিল?

মহোসু : ১৯ বছর বয়সী সোহাগী জাহান তনু কুমিল্লা সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। তনুর বাবা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে চাকরিরত ছিলেন। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি তনু। পরে খোঁজাখুঁজি করে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে ঝোপের মধ্যে তনুর লাশ পাওয়া যায়। তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়। পরদিন তনুর বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে একটি মামলা করেন।

২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল ও ১২ জুন দুই দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর কারণ খুঁজে না পাওয়ার তথ্য জানায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ। ‘তনু হত্যাকান্ড’ সমগ্র বাংলাদেশে আলোড়ন তুলে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে প্রচণ্ড আলোচনা হয়। সমগ্র বাংলাদেশে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ক্যাম্পাসে বিচারের দাবিতে আন্দোলন করে এবং ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের একটি দল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ মিছিল করে। এই হত্যাকাÐের শেষ ভরসা ছিল ডিএনএ রিপোর্ট। ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি তনুর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানায়। এ ছাড়া তনুর মায়ের সন্দেহ করা তিনজনকে ২০১৭ সালের ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সিআইডির একটি দল ঢাকা সেনানিবাসে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তবে ওই সময় তাদের নাম গণমাধ্যমকে জানায়নি সিআইডি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনার শুরুতে থানা-পুলিশ, পরে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটি তদন্ত করেও কোনো ক‚লকিনারা করতে পারেনি।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)

পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর তনু হত্যা মামলার নথি পিবিআইকে হস্তান্তর করে সিআইডি। প্রায় চার বছর মামলাটি তদন্ত করেছেন পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান। কিন্তু তিনিও কোনো অগ্রগতি আনতে পারেননি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মামলাটির ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পেয়েছেন পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম। এখন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা ছয়জন তদন্ত কর্মকর্তার মধ্যে পুলিশ পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান ও ২০১৬ সালে সিআইডির কুমিল্লার তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন আহম্মদ সবচেয়ে বেশি সময় মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন। তারা চার বছর করে আট বছর মামলাটির তদন্ত করেছেন।

বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম আদালতে মামলাটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানান। তিনজনের নাম উল্লেখ করে ডিএনএ ম্যাচিংয়ের আবেদন করে আদালতকে তিনি বলেন, ২০১৭ সালের মে মাসে তনুর পোশাকে পাওয়া তিনজন পুরুষের শুক্রাণু থেকে তিনজন ব্যক্তির ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু পরে সন্দেহভাজনদের কাছ থেকে নমুনা নিয়ে ওই তিনজনের ডিএনএ ম্যাচিং করা হয়নি।’ এরপর আদালত ডিএনএ নমুনা ম্যাচিংয়ে সম্মতি জানান। তরিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। আপাতত আমরা এসব নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না। আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। আশা করছি, তদন্তের মাধ্যমে সব বেরিয়ে আসবে।

অন্য দুইজনকে গ্রেপ্তারে জোর তৎপরতা

মামলার অন্য দুই প্রধান সন্দেহভাজন সার্জেন্ট জাহিদ ও সৈনিক শাহীন আলমকে গ্রেপ্তারে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বর্তমানে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। তাদের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। পিবিআই ধারণা করছে, তাদের মধ্যে একজন ইতিমধ্যে দেশের বাইরে চলে গেছেন এবং অন্যজন দেশেই আত্মগোপনে আছেন। দেশে থাকা অভিযুক্তকে দ্রæত আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে বিশেষ দল। এদিকে, মামলার বাদী ও তনুর বাবা ইয়ার হোসেনের দাবি, সৈনিকের নাম শাহীন আলম নয়, জাহিদ হবে। তারা ঘটনার শুরু থেকেই নামগুলোর কথা বলে আসছেন। শাহীন নামে কোনো সৈনিকের কথা তারা তখন জানেননি, সৈনিক জাহিদের নামটি বারবার আলোচনায় এসেছে।তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শাহীন ও জাহিদ দুজন সম্পূর্ণ আলাদা ব্যক্তি এবং তদন্তের মাধ্যমেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

এবার বিচারের আশা দেখছে পরিবার : অদৃশ্য চাপে যেন মামলাটি অন্ধকারে চলে না যায়

আরিফ হোসেন: দীর্ঘ ১০ বছর পর প্রথমবারের মতো সন্দেহভাজন এক আসামিকে গ্রেপ্তারের পর তনুর ভাই আনোয়ার হোসেন রুবেল গণমাধ্যমকে বলেন, মোবাইলে কল দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা আমাদের কুমিল্লা কারাগার গেটে থাকতে বলেন। আমি বাবাকে (মামলার বাদী) গেটে পৌঁছে জানতে পেরেছি আসামিকে (হাফিজুর) কারাগারের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাই, তাকে দেখা হয়নি। তনুর ভাই বলেন, সিআইডি যখন মামলাটির তদন্ত করেছে, তখন সন্দেহভাজন কয়েকজনকে ঢাকায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু কাগজে-কলমে কখনো তাদের নাম প্রকাশ্যে আসেনি। এবারই প্রথম তিনজনের নাম প্রকাশ্যে এল। এ উদ্যোগে কিছুটা আশার আলো দেখছেন উল্লেখ করে আনোয়ার হোসেন বলেন, আমরা অপরাধীদের বিচার চাই, কোনো বাহিনীর না। অদৃশ্য চাপে যেন মামলাটি আবার অন্ধকারে না চলে যায়।

তনুর মা আনোয়ারা বেগম, তনুর বাবা ইয়ার হোসেন

বিচারের আশা দেখছেন তনুর মা আনোয়ারা বেগম। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমি কখনো বিচারের আশা ছাড়ি নাই। আশায় ছিলাম একদিন না একদিন খুনিরার বিচার হইব। যাক অবশেষে একটা খুনি ধরা পড়ল। ১০ বছর পর ধরা পড়লো এক আসামি। তো আশা করছি এবার বিচারটা পামু। তারা আমার মেয়েকে যেমনে হত্যা করেছে, আমিও চাই তেমনি তাদের শাস্তি হোক। ফাঁসি চাই তাদের। দেশবাসীও যাতে কইতে পারে, তনু হত্যায় তাদের ফাঁসি হইছে। আনোয়ারা বেগম বলেন, দীর্ঘ এই সময়ে সাংবাদিকেরা আমরার লগে আছিলো। নাইলে কবেই আমরারে তুলার মতো তুলাধুনা কইরালাইতো। মৃত্যুর আগে আমার একডাই ইচ্ছা, খুনিডির ফাঁসি দেখতাম চাই। বাকি খুনিডির দ্রæত গ্রেপ্তার চাই। তনুর মা বলেন, আমার মাইয়াডার ওপর নির্মম পাশবিক নির্যাতন কইরা খুন করা হয়েছে। আমি কখনো বিচারের আশা ছাড়ছি না। সব সময় আল্লাহর কাছে কইছি, আল্লাহ যেন মৃত্যুর আগে আমারে বিচারডা দেখায়। সার্জেন্ট জাহিদ বড় খুনি। তারে গ্রেপ্তার করনের লাইগ্যা কতবার কইছি; কিন্তু কেউ আমরার কথা শুনছে না। অবশেষে তার নামডা আদালতে গেছে। এহন আমরা বিচার দেখতাম চাই। এই জীবনে আর কিছু চাই না। শুধু মাইয়াডার খুনিডির বিচার দেখতাম চাই। আইন আর বিচার যদি সবার লাইগ্যা সমান হয়, তাইলে আমার তনুর খুনের বিচারও পাইয়াম এই আশায় দিন কাটাইতাছি।

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা খুব খুশি। এক আসামিকে গ্রেফতারের দৃশ্য দেখলাম, কাঠগড়ায় দেখলাম। রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠনো হলো। আমি বিচার চাই, দেশবাসীও বিচার চায়। ইয়ার হোসেন বলেন, আরও দুজন খুনি এখনো ধরা পড়েনি। বিশেষ করে খুনের মূল হোতা সার্জেন্ট জাহিদ এবং সৈনিক জাহিদকে গ্রেপ্তার করা জরুরি। সার্জেন্ট জাহিদ গ্রেপ্তার হলেই সব বেরিয়ে আসবে। তার স্ত্রীও এই খুনে জড়িত। হত্যার সময় তনুর চুল কেটে ফেলা হয়েছিল। ওই নারীই চুল কেটেছে। ঘটনার পর তিনি খুনিদের নাম উল্লেখ করে মামলা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে সময়ে তাকে কারও নাম উল্লেখ করতে দেওয়া হয়নি। তনুর বাবা ইয়ার হোসেন, মা আনোয়ারা বেগম আর ভাই আনোয়ার হোসেন (রুবেল) কে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তাদের চোখেমুখে কিছুটা স্বস্তির ছাপ। গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে তনুর বাবা ‘বিচার চাই বিচার চাই, খুনিদের বিচার চাই’ বলে ¯স্লোগান দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি বলে উঠলেন, ‘তনু খুনের ১০ বছর পার হয়েছে। এই ১০ বছর পর একজন খুনিরে কাঠগড়ায় দেখলাম। আমার চোখে শান্তি লাগছে।’

সচেতন মহলের প্রত্যাশা, তনুর পরিবার ন্যায়বিচার পাবে

আকবর হোসেন: দীর্ঘ সময় পর একজনকে গ্রেপ্তার করায় তনু হত্যার বিচারে নতুন করে প্রত্যাশা জাগায়। তবে এ ধরনের বিলম্ব ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে। একটি সংবেদনশীল হত্যাকান্ডে এত দীর্ঘ সময় ধরে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকা বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ডিএনএ পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকগণ। তদন্তকারী কর্মকর্তা যে তিনজনের ডিএনএ নমুনা মেলানোর আবেদন করেছিলেন, তাদের মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত হাফিজুর রহমান একজন। বাকি দুজনেরও বিষয়েও যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করতে হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তনুর পরিবার দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ন্যায়ের অপেক্ষায় আছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ। ২৭ এপ্রিল ২০২৬ । প্রথম পৃষ্ঠা

এই মামলার সুষ্ঠু সমাধান হলে তারা ন্যায় বিচার পেতে পারেন। পাশাপাশি এটা সামগ্রিকভাবে বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা বাড়াবে। হত্যা মামলায় দীর্ঘসূত্রতা ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা। প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও ন্যায়ের অধিকার রক্ষায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ অপরিহার্য। নারায়ণগঞ্জের তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার মতো দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা অন্যান্য ঘটনারও বিচার হওয়া জরুরি। কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি কাইমুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, এই উদ্যোগ ২০১৭ সালেই নেওয়ার কথা। কিন্তু দেরিতে হলেও জড়িত সন্দেহে তিনজনের নাম সামনে এসেছে। আমি আশাবাদী এই খুনের বিচার নিয়ে। আইন সবার জন্য সমান। তনুর পরিবার যেন ন্যায়বিচার পায়, আমরা তাদের পাশে থাকব। সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় গণমাধ্যমকে বলেন, হত্যাকান্ডের পর থেকেই তনুর পরিবার কিন্তু এই নামগুলো বলেছে। তবে প্রতিবারই অদৃশ্য চাপে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন পরে হলেও তিনজনের নাম সামনে এসেছে এবং তারা তখন সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন-এটি তদন্তের জন্য ভালো একটি বিষয়। আশা করছেন, দ্রæত সময়ের মধ্যে খুনিদের নামগুলো সামনে আসবে।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading