দেশের জনসংখ্যার ১১ ভাগই দূষণের ঝুঁকিতে: আবারও উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে আর্সেনিকজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১২ জুন, ২০২৪, আপডেট ১৬:৩০
‘নীরব ঘাতক’ আর্সেনিক দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছেন দেশের ১১ ভাগ মানুষ। যা বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এক উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন গবেষণা বলছে ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরও বাড়তে যাচ্ছে। মো. আশিকুর রহমান’র প্রতিবেদন
১৯৭০ থেকে ২০২৪; প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ: দেশের ১১ ভাগ মানুষ আর্সেনিক দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপ প্রতিবেদন ‘মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে, ২০১৯’ অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যার ১১ ভাগ আর্সেনিক দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে। মঙ্গলবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরে নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য মোরশেদ আলমের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা জানান স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়। নতুন গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে, আর্সেনিকের সমস্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে যাচ্ছে। জলবায়ু বিপর্যয়ের বিভিন্ন প্রভাব, যেমন বন্যা, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এসব কারণে ভ‚গর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে পানিতে আর্সেনিক দূষণের সূত্রপাত হয় ১৯৭০-এর দশকে। ওই সময় নদী-খাল, পুকুরের অর্থাৎ ভ‚-উপরস্থ দূষিত পানির জন্য শিশুমৃত্যুর হারে শীর্ষ সারির দেশ ছিল বাংলাদেশ। এরপর গৃহস্থালি ব্যবহারে, ফসলের খেতে সেচ দিতে এবং মাছ চাষের জন্য গভীর নলক‚পের পরিষ্কার পানি সরবরাহ করতে জাতিসংঘের সহায়তা সংস্থা এবং এনজিওগুলোর অর্থায়নে ব্যাপক কর্মসূচি চালানো হয়। নতুন নলক‚পগুলোর সুবাদে পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হয়। এর ফলে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার অনেক কমে আসে। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে জানা যায়, দেশের পাললিক শিলার স্তর থেকে তোলা পরিষ্কার পানিতে উচ্চমাত্রায় প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট আর্সেনিক থাকে। বাংলাদেশে নলক‚পের পানিতে দীর্ঘস্থায়ী আর্সেনিক বিষক্রিয়ার প্রথম ঘটনার সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৯৩ সালে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এঁকে ‘একটি জনপদের ইতিহাসে বৃহত্তম গণ বিষক্রিয়ার’ ঘটনা বলে উল্লেখ করে। আর্সেনিকের সমস্যাটি সমাধানে যদিও সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাগুলো এগিয়ে এসেছে, এরপরেও লাখ লাখ মানুষ আর্সেনিকের ঝুঁকি থেকে মুক্ত নন। বাংলাদেশে প্রতি বছর আর্সেনিকের বিষক্রিয়া থেকে সৃষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যায় মারা যান অন্তত ৪৩ হাজার মানুষ।
দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা সুপেয় পানি প্রাপ্যতার বিবেচনায় ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে চর এলাকা, বন্যাপ্রবণ এলাকা, উপক‚লীয় এলাকা, হাওর এলাকা, বরেন্দ্র অঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকা। দেশের এই ছয় শ্রেণির এলাকা বিস্তৃত রয়েছে ১০০টি উপজেলায়। দেশের ১৫৯ সিটি ও পৌরসভায় সরবরাহ করা পানির মানও একই। ওইসব এলাকায় ১৬৮টি পানি শোধনাগার, ১ হাজার ৫০০টি গভীর নলক‚পে ১৫ হাজার কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা সরকার চালু রেখেছে। গ্রাম পর্যায়ের ২০ লাখ টিউবওয়েলের পানি নিরাপদ হওয়ার কথা ছিল। তবে আর্সেনিক ও মাত্রাতিরিক্ত আয়রন সে পানিও জনজীবনকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। আর্সেনিক পরিস্থিতি, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এবং তাদের চিকিৎসার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ডিপিএইচইর কার্যক্রমে বড় ঘাটতি রয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিদগণ বলছেন, সরকার বিশেষ নজর না দিলে দেশে আর্সেনিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। তাই দেশে যেসব অঞ্চলের মানুষ আর্সেনিকের ঝুঁকিতে আছেন সেসব অঞ্চল অতি দ্রুত চিহ্নিত করতে হবে।

নেপথ্যের বড় কারণ জলবায়ু পরিবর্তন: জলবায়ু পরির্তনের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদী ভাঙনের মতো দুর্যোগের কথা সবারই জানা। কিন্তু জলবায়ু সংকটের কারণে বাংলাদেশের আরেকটি ভয়ঙ্কর পরিণতির দিক উঠে এসেছে সা¤প্রতিক এক গবেষণায়, এই গবেষণায় প্রাপ্ত আতঙ্ক জাগানো তথ্যাবলী তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান। এতে বলা হয়েছে, জলবায়ু সংকটের ফলে নলক‚পের পানি দূষিত হয়ে পড়ায় ক্যানসারের ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশের কয়েক কোটি মানুষ। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বিজ্ঞান জার্নাল পিএলওএস-ওয়ান এ প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, তাপমাত্রা বাড়ার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অপ্রত্যাশিত বন্যা ও তীব্র বৈরী আবহাওয়া দেখা দেওয়ায় দেশের সুপেয় পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। গবেষণাটির মুখ্য গবেষক, নরউইচ ইউনিভার্সিটির ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. সেথ ফ্রিসবি স¤প্রতি গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যের ওপর আয়োজিত প্রেজেন্টেশনে বলেন, সুপেয় পানিতে আর্সেনিক বিষের মাত্রা বাড়া গুরুতর সমস্যা। তিনি বলেন, একবার আমি একটা গ্রামে গিয়েছিলাম; ওই গ্রামে ৩০ বছরের বেশি বয়সের কোনো মানুষ নেই। এই গবেষণার ফলাফলে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য সংকটের তীব্রতা উঠে এসেছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। আর্সেনিক বিষের কারণে ইতিমধ্যে এদেশে লাখ লাখ মানুষ ত্বক, মূত্রাশয় ও ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগছে। ফ্রিসবি বলেন, আর্সেনিক প্রাকৃতিকভাবেই উৎপন্ন হয়। …গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, ইরাবতী ও মেকং নদীর অববাহিকায় প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন আর্সেনিক রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, মানুষ ভ‚মির ওপরের স্তরের (নদী-খাল, পুকুর) পানি পান করার সময় কোনো সমস্যা হতো না, কারণ ভ‚-উপরস্থ পানি বায়ুমÐলে থাকা অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসে। এর ফলে আর্সেনিক অদ্রবণীয় হয়ে পড়ে এবং পানি থেকে এটি সরে যায়। সে কারণেই হুট করে মানুষ এসব গভীর নলক‚পের পানি ব্যবহার করতে শুরু করায় গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটের উদ্ভব হয়েছে।
জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে জলবায়ু সংকটের কারণে বাংলাদেশে এ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা গড়ে প্রায় দেড় ফুট বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৫ ফুটেরও কম। প্রতিবছর বন্যা নি¤œাঞ্চলে বসবাসকারী সাড়ে ১৬ কোটি বাংলাদেশির জন্য নিরাপদ পানীয় জলকে দুর্লভ করে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গবেষকরা ভ‚গর্ভস্থ পানির দূষণ রোধে পরিশোধন প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোসহ সম্ভাব্য সমাধানগুলো দ্রুত উন্নয়নের আহ্বান জানিয়েছেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অনাকাঙ্ক্ষিত বন্যা এবং জলবায়ু উত্তপ্ত হওয়ার কারণে সৃষ্ট চরম আবহাওয়া দেশের পানীয় জলে আর্সেনিকের বিপজ্জনক মাত্রার নির্গমনকে ত্বরান্বিত করবে। গবেষকরা বলছেন, এতে জনস্বাস্থ্য সংকট তীব্র হবে। ইতোমধ্যে আর্সেনিকের বিষক্রিয়ার ফলে লাখ লাখ মানুষের ত্বক, মূত্রাশয় এবং ফুসফুসের ক্যান্সার হয়েছে।

তাজুল ইসলাম
সুরক্ষায় সরকারের যত পদক্ষেপ: আর্সেনিকের কবল থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের কথা তুলে ধরে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম জানান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় ২০২৫ সালের মধ্যে ১০ লাখ ৬৫ হাজার আর্সেনিকমুক্ত পানির উৎস স্থাপন করা হবে। এক্ষেত্রে গভীর নলক‚প ছাড়াও পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং পুকুর খনন ও পুনঃখননসহ সৌরচালিত পন্ড স্যান্ড ফিল্টার স্থাপন করা হবে। এতে ২০২৫ সালের মধ্যে আর্সেনিক দূষণ ঝুঁকি ৫-৬ ভাগে নেমে আসবে। তিনি জানান, সাধারণ জনগণকে আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহের জন্য দেশব্যাপী তিনটি উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো- পানি সরবরাহে আর্সেনিক ঝুঁকি কমাতে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৭২ হাজার ৭১৬টি পানির উৎস স্থাপন করা হয়েছে। সমগ্র দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত ৪৪ লাখ ৮ হাজার ৩০টি পানির উৎস স্থাপন করা হয়েছে, উপক‚লীয় জেলাসমূহে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত ৩২ হাজার ৮৭৪টি পানির উৎস স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া পল্লি অঞ্চলে পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত ৮৮ হাজার ২৩৫টি পানির উৎস স্থাপন, এবং অগ্রাধিকারমূলক গ্রামীণ পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৫টি পানির উৎস স্থাপন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) সা¤প্রতিক সময়ের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে দেশে আর্সেনিকযুক্ত নলক‚পের সংখ্যা অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে। ডিপিএইচই ২০২২ সাল পর্যন্ত ৫৪ জেলার মোট ৭২ লাখ নলক‚পে আর্সেনিক পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ১৩.৯১ শতাংশ নলক‚পে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে আর্সেনিক পাওয়া গেছে। এর একটি বড় কারণ আর্সেনিক সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বেড়েছে এবং গভীর নলক‚প বসানোর হার অনেক বেড়েছে। সাধারণত অগভীর নলক‚পে আর্সেনিক দূষণ অনেক বেশি হয়। তবে দেশের কিছু এলাকায় এই হার মারাত্মকভাবে বেশি রকমের। যেমন- গোপালগঞ্জ জেলায় এ হার ৫২.৫৭ শতাংশ, চাঁদপুর জেলায় ৫২.৩৫ শতাংশ. কুমিল্লায় ৪৪.৯১ শতাংশ, সাতক্ষীরায় ৪০.৮৫ শতাংশ। মো. তাজুল ইসলাম বলেন, রাজধানী ঢাকা শহরবাসীকে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে ঢাকা ওয়াসা ২০১৪ সালে ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করেছে। মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী ইতোমধ্যে ৫টি পানি শোধনাগার হতে নগরীতে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে, যা বর্তমান চাহিদার ৩৪ শতাংশ। অবশিষ্ট চাহিদার ৬৬ শতাংশ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে গভীর নলক‚পের মাধ্যমে। মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী আরো দুইটি পানি শোধনাগার নির্মাণের কাজ দ্রæত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এই দুটি প্ল্যান্ট চালু করা হলে ৬৭ শতাংশ পানি ভ‚-উপরস্থ উৎস হতে সরবরাহ করা হবে। ফলে ভ‚-গর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। বর্তমানে শতভাগ নগরবাসী সাতদিন ২৪ ঘণ্টা ঢাকা ওয়াসার নিরাপদ পানি পাচ্ছে।
‘বিপজ্জনক’ পানি খাচ্ছে দেশের কত মানুষ: আর্সেনিক একটি নীরব ঘাতক, তবে এটি কোনো ছোঁয়াচে বা বংশগত রোগ নয়। পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেশি থাকলে পানকারীর শরীরের নানা রকম রোগের উপসর্গ তৈরি করে। এটি দেশের বেশ পুরোনো একটি সমস্যা এবং এখনও অনেক অঞ্চলের ভ‚গর্ভস্থ পানিতেই আর্সেনিকের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। দুঃখজনক হলো, বিষয়টি নিয়ে আগের মতো আলোচনা নেই। আর্সেনিক পরিস্থিতি, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এবং তাদের চিকিৎসার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ডিপিএইচই-এর কার্যক্রমে বড় ঘাটতি রয়েছে। সরকার বিশেষ নজর না দিলে দেশে আর্সেনিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। বাংলাদেশিদের প্রায় অর্ধেক সংখ্যকের পানীয় জলেই বিপজ্জনক মাত্রার আর্সেনিক রয়েছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। বিজ্ঞানীদের একটি দল বলছে, প্রায় ৮ কোটি বাংলাদেশি বা জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ক্ষতিকর মাত্রার আর্সেনিকযুক্ত পানি খাচ্ছে। এটি দেশের জনস্বাস্থ্য সংকটকে প্রকট করে তুলেছে। সম্প্রতি পিএলওএস ওয়ান জার্নালে প্রকাশিত সমীক্ষাই এই তথ্য উঠে আসে।
গবেষকরা আর্সেনিক নিঃসরণের পেছনের গতিশীলতা বোঝার জন্য অক্সিজেনের ঘনত্ব, পিএইচ এবং তাপমাত্রা পরীক্ষা করার জন্য সমগ্র বাংলাদেশের ক‚প থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করেছেন। তারা দেখেছেন, বাংলাদেশের ভ‚গর্ভস্থ পানির প্রায় ৪৯ শতাংশে আর্সেনিকের ঘনত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত নিরাপদ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। নিরাপদ মান ধরা হয় প্রতি লিটার পানীয় জলের জন্য ১০ মাইক্রোগ্রাম। কিছু নমুনায় আর্সেনিকের ঘনত্ব পাওয়া গেছে ৪৫০ মাইক্রোগ্রাম, যা ডবিøউএইচওর নির্দেশিকার ৪৫ গুণ। গবেষক অধ্যাপক সেথ ফ্রিসবি বলেন, পানীয় জল থেকে দীর্ঘস্থায়ী আর্সেনিক বিষক্রিয়া একটি বাস্তব সমস্যা, তাত্তি¡ক বিষয় নয়। আমার অনুমান প্রায় ৭.৮ কোটি বাংলাদেশি এ ঝুঁকিতে রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, একটি রক্ষণশীল অনুমান হলো প্রায় ৯ লাখ বাংলাদেশি ফুসফুস এবং মূত্রাশয় ক্যান্সারে মারা যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই সমস্যা আরও প্রকট আকার নিচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে বন্যার হার ব্যাপক বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা আরও বেড়ে যাবে।
দেশে দেশে দুশ্চিন্তা : আর্সেনিক সমস্যা যে শুধু বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে তা নয়, বরং আমেরিকাসহ অন্যান্য দেশের গবেষকরা বলছেন সারা বিশ্বেই আর্সেনিক সমস্যা বাড়তে যাচ্ছে। বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, চীন, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, আর্জেন্টিনা, চিলি, মেক্সিকো, এছাড়া ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশে ভ‚গর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক রয়েছে উচ্চ মাত্রায়। রঙহীন, গন্ধহীন, স্বাদহীন এই নীরব বিষ ধীরে ধীরে শরীরে জমা হয় ও ক্ষতি করতে থাকে। হাতেপায়ে কেরাটোসিস অর্থাৎ শক্ত ফুসকুড়ি, ছোপ ছোপ দাগ, এমনকি ‘বø্যাকফুট ডিজিজ’ যা থেকে দেহে পচনও ধরতে পারে- এসব লক্ষণ দেখা যায় আর্সেনিক বিষক্রিয়ায়। ত্বক পার হয়ে শরীরের ভেতরে নজর দিলে দেখা যায় আরও ভয়াবহ চিত্র। যকৃৎ, ফুসফুস, মূত্রথলির ক্যান্সার হতে পারে আর্সেনিক থেকে, অন্যদিকে হতে পারে হৃদ্রোগ এবং ডায়াবেটিস। গর্ভপাত, শিশুর বেড়ে ওঠায় সমস্যা, এবং ফুসফুসের সমস্যার পেছনেও থাকতে পারে আর্সেনিক।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১২ জুন ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
গবেষণা ও মনিটরিং এখন সময়ের দাবি: আর্সেনিক দীর্ঘদিন ধরে শরীরে প্রবেশ করতে থাকলে নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তার মধ্যে রয়েছে বমি, পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া ইত্যাদি। ক্রমে তা নানা ধরনের রোগের প্রকাশ ঘটাতে থাকে। চর্মরোগ, হাত-পা কিংবা শরীরের অন্যান্য স্থানের ত্বকে ঘায়ের সৃষ্টি হয়। অত্যধিক মাত্রায় আর্সেনিক গ্রহণের কারণে এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, মেটাবোলিক সিনড্রোম, বুদ্ধিবৈকল্য, অ্যাজমা, এমনকি ক্যান্সারের মতো রোগও দেখা দিতে পারে। তাই আর্সেনিকোসিস এবং পরবর্তী সময়ে জটিলতায় মৃত্যুর সংখ্যাও অনেক বেশি হয়।
ওয়াটার এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান গণমাধ্যমকে বলেন, আর্সেনিকের ভয়াবহতার কথা আমরা ভুলতে বসেছি। ২০১৮ সালের পর থেকে আর্সেনিক রোগী শনাক্ত করা ও বিনামূল্যে সেবা দেওয়ার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। নতুন করে এখন আর আর্সেনিক রোগী শনাক্ত করা হয় না। নলক‚পগুলো পরীক্ষার কাজ বিনামূল্যে করার ব্যবস্থা ছিল, এখন তাও বন্ধ। নতুন করে আর্সেনিক পরীক্ষা করা উচিত। তিনি বলেন, ২০১৫ সাল পর্যন্ত আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় আক্রান্তদের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ভিটামিন ডি কমপ্লেক্স ও আয়রন ট্যাবলেট দেওয়া হতো। এখন তাও পান না রোগীরা। আর্সেনিক নিয়ে বড় গবেষণা দরকার। তিনি জানান, দেশে ভ‚গর্ভস্থ পানির গুণগত মান ও পরিমাণ নিয়ে কোনো গবেষণা নেই। এটা নিয়ে কোনো মনিটরিং নেই। ভ‚গর্ভস্থ পানি নিয়ে তথ্যভান্ডার থাকা উচিত, যে তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, আর্সেনিক বিষক্রিয়া বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি অন্যতম প্রধান হুমকি। আর্সেনিক একেবারে উধাও হয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই নিয়মিত আর্সেনিক পরীক্ষা করা দরকার। আর্সেনিকের ব্যাপকতা পানিতে কী রকম আছে তা জানা দরকার। সে অনুযায়ী জরুরিভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। সরকার এখন ভ‚গর্ভস্থ পানির বিকল্প হিসেবে সারফেস ওয়াটারের বা ভ‚উপরিস্থ পানির দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলেও কোথায় কোথায় আর্সেনিকের পরিমাণ বেশি, তা পরীক্ষা করে জানা জরুরি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে নলক‚পের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ‘বাংলাদেশ আর্সেনিক মিটিগেশন ওয়াটার সাপ্লাই প্রজেক্টের (বিএএমডবিøউএসপি)’ আওতায় ২৭১ উপজেলার ৫৭ হাজার ৪৮২টি গ্রামে আর্সেনিক পরীক্ষা করে। ৪৯ লাখ ৫০ হাজার নলক‚পের পানি পরীক্ষা করে এর মধ্যে ২৯ শতাংশে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। আর্সেনিকের এত বেশি উপস্থিতি পাওয়ার পরও আর কখনও বড় পরিসরে পরীক্ষা করা হয়নি। মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ খাবার পানি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তবে শুধু পানির জোগান নিশ্চিত করলেই চলে না, পানিকে অবশ্যই নিরাপদ হতে হবে। কেননা, খাবার পানি যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে মানুষের সামগ্রিক জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আর্সেনিকমুক্ত নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার আরও জোরদার প্রচেষ্টা চালানো উচিৎ বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদগণ।
ইউডি/এজেএস

