আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার নেপথ্যের যত কারণ

আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার নেপথ্যের যত কারণ

শফিকুল ইসলাম। রবিবার, ২৩ জুন, ২০২৪, আপডেট ১৯:৪৫

১৯৪৭ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে ভারতবর্ষ। দেশটি ভেঙে দ্বিজাতি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ইন্ডিয়া হয়। মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠতার কারণে বাংলাদেশকে (তখনকার পূর্ব পাকিস্তান) পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এ দেশের মানুষ সেসময় ভেবেছিলেন তারা স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ পেতে চলেছেন। কিন্তু তাদের সেই আশার গুড়ে বালি পড়তে সময় নেয়নি। নানা অজুহাতে অনেক সিদ্ধান্ত পাকিস্তানিরা এ দেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তখনকার সব চেয়ে বড় রাজনৈতিক দল পাকিস্তান মুসলিম লীগে এই দেশের প্রগতিশীল নেতারা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে নানা ষড়ষন্ত্র চলতে থাকে।

ফলে তারা বুঝতে পারেন তাদের জন্য আলাদা রাজনৈতিক দল প্রয়োজন। এই উপলব্ধি থেকে নতুন দল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর আসাম ও পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগ শাখাকে একীভুত করে পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়। এতে আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ আলী এবং সদস্য দেওয়ান বাসেত ও দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ পূর্ববাংলা মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যভুক্ত হন।

মাওলানা আকরম খাঁ এই কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে নিজেই একটি নতুন কমিটি গঠন করেন। এছাড়াও পাকিস্তানি শাসকদের পূর্ববঙ্গ বিরোধী কার্যকলাপ, ভাষা-সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, পূর্ব বাংলায় দুর্ভিক্ষ, সাধারণ জনজীবনের বিপর্যয় ইত্যাদি ঘটনাবলি মুসলিম লীগের তরুণ অংশকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। দেশ পরিচালনায় মুসলিম লীগের ব্যর্থতা, রাজনৈতিক দমননীতি শিক্ষিত সুধী সমাজকে দারুণভাবে হতাশ করে।

এভাবে পূর্ববাংলার সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ভিত্তিভূমি প্রস্তুত করে দেয়।

১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। এই সম্মেলনে প্রায় তিনশ প্রতিনিধি অংশ নেন।

এতে আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী ভাষণ দেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। এ কে ফজলুল হক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তখন পূর্ব বাংলা সরকারের এডভোকেট জেনারেল (বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল) পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম কমিটির সভাপতি ছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী; সহ-সভাপতি যথাক্রমে আতাউর রহমান খান (অ্যাডভোকেট); সাখাওয়াত হোসেন; আলী আহমদ (এমএলএ); আলী আমজাদ খান (অ্যাডভোকেট); আবদুস সালাম খান (অ্যাডভোকেট); সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক; যুগ্ম সম্পাদক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; সহ-সম্পাদক মোশতাক আহমদ; এ কে এম রফিকুল হোসেন এবং ইয়ার মোহাম্মদ খান কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন। সে সময় বঙ্গবন্ধু কারাগারে ছিলেন। আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পর ঢাকার আরমানিটোলা মাঠে প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগের কাগমারী সম্মেলনের সাথে সাথে অনুষ্ঠিত হয় কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলন। এই সকল সাংস্কৃতিক সম্মেলনে বাংলা ভাষার পক্ষে প্রবল দাবি উচ্চারিত হয়। জাতির সামনে তুলে ধরা হয় বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিবর্তনধারা। এই সম্মেলনগুলোতে অংশ নেন দেশের সকল বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ঐতিহাসিক, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানীরা বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ধারাকে শক্তিশালী করেছেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও বিকাশের ক্ষেত্রে, বাঙালির মুক্তি সংগ্রামকে বেগবান করে তোলার ক্ষেত্রে এই সকল সাংস্কৃতিক সম্মেলনের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

আওয়ামী মুসলিম লীগ নামের কারণে সাম্প্রদায়িক দল মনে করা হতো। মুসলিম ব্যতীত অন্য ধর্মের লোকজন তখন এই দলের রাজনীতি করতেন না। তাদের দলে আনতে সম্মেলনে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। তখন নাম হয় আওয়ামী লীগ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন দল এটি। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে বঙ্গবন্ধু পর্যায়ক্রমে সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা পূর্ববঙ্গের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

কালক্রমে এটি পরিণত হয় বাঙালির মুক্তির সনদে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার বাঙালি রাজনীতিবিদদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকেই ভয় এবং সমীহ করতো। কারণ, পদ সম্পদ কোন কিছু দিয়েই তাকে কেনা সম্ভব হয়নি। রাজনৈতিকভাবে তাকে শেষ করে দেয়ার জন্য ১৯৬৮ সালে তাকে আগরতলা মামলায় জড়ানো হয়। ১৯৬৯ সালে জনগণ তাকে মুক্ত করে এনে ভালবেসে উপাধি দেয় ‘বঙ্গবন্ধু’।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ববাংলার প্রধান রাজনৈতিক দল এবং বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির একক নেতা হয়ে উঠলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল তার নামেই এবং বাঙালি আর কখনও এতো ঐক্যবদ্ধ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি দেশকে পুনর্গঠন এবং মাত্র ৯ মাসের মধ্যে একটি সংবিধান উপহার দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ।

লেখক: শিক্ষক ও সাংবাদিক/ইউডি/এআর

Taanjin

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading