দেশ স্বাধীন করতেই জন্ম নিয়েছিল আওয়ামী লীগ
আব্দুর রহিম । রবিবার, ২৩ জুন, ২০২৪, আপডেট ১৯:৩০
পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে জেগে ওঠেছিলেন তরুণ রাজনীতিকরা। মুসলিম লীগে কোণঠাসা হয়ে পড়া নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন, এই দলের নেতৃত্বে মুক্তি সম্ভব নয়।
এ কারণে তারা নতুন দল গঠন করার তাগিদ অনুভব করেছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৪৯ সালের মে মাসে মুসলিম লীগের তরুণ রাজনৈতিক কর্মীরা সম্মেলন আয়োজন করে।
তারা কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ নেতৃত্বের কাছে প্রতিনিধি দল পাঠায়। তারা মুসলিম লীগ সভাপতি চৌধুরী খালেকুজ্জামানের কাছে পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগ নেতৃত্বের ব্যাপারে অভিযোগ দেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সভাপতি পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগের সভাপতি আকরাম খাঁ এবং নাজিমুদ্দিন প্রমুখকে জোরলোভাবে সমর্থন করেন।
এতে পূর্ব বাংলার তরুণ কর্মীরা খুবই ক্ষুব্ধ হন। তাছাড়া সরকার আমলা নির্ভর হয়ে পড়ে। জনগণের সাথে সরকারের দূরত্ব বাড়তে থাকে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ গভর্নর জেনারেল হিসেবে ভারত বা ব্রিটেনের মত নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান না হয়ে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতার মালিক হন। পরবর্তী গর্ভনর লিয়াকত আলী খান একই স্বভাবের ছিলেন।
অন্তর্দলীয় কোন্দল প্রবল আকার ধারণ করে। মুসলিম লীগের কার্যকলাপ, ভাষা-সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, পূর্ববাংলার দুর্ভিক্ষ, সাধারণ জনজীবনে বিপর্যয় ইত্যাদি ঘটনাবলি মুসলিম লীগের তরুণ অংশকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে।
দেশ পরিচালনায় মুসলিম লীগ সরকারের ব্যর্থতা, রাজনৈতিক দমননীতি শিক্ষিত সমাজকে দারুনভাবে হতাশ করে। এরই ফলে ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার কে এম দাস লেনে রোজ গার্ডেন-এ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠিত হয়। দলের সভাপতি হন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। সাধারণ সম্পাদক পদে শামসুল হক; যুগ্ম সম্পাদক পদে শেখ মুজিবুর রহমান আসীন হন।
এ দলের ঘোষণা পত্র এবং গঠনতন্ত্রের ভূমিকায় মুসলিম লীগ সরকারের দেশ পরিচালনায় ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করা হয়।
এ দল পূর্ব বাংলার মানুষের আর্থ-সামাজিক সমস্যা সামনে রেখে কর্মসূচি প্রণয়ন করে। জমিদারি প্রথার বিলোপ, বৃহৎ শিল্পের জাতীয়করণ, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি উচ্ছেদ পাটের ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্প্রসারিত করা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি প্রভৃতি কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল। সরকারী বৈরিতা এবং দমন-পীড়নের কারণে নবগঠিত দলটি পূর্ব বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হিসেবে আর্বিভূত হয়।
প্রতিষ্ঠাকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগে রক্ষণশীল ও প্রগতিশীল- এই দুই ধারার নেতা ছিলেন। রক্ষণশীল অংশ মুসলিম লীগের ন্যায় গতানুগতিক ধারায় রাজনীতি করার পক্ষে এবং প্রগতিশীল অংশ সামন্তবাদ-সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক দল গঠনের পক্ষে ছিলেন।
তাই তারা দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ করার পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু রক্ষণশীল অংশের বিরোধিতার কারণে পার্টির একতা বজায় রাখতে মাওলানা ভাসানী ‘মুসলিম’ শব্দটি রেখেই দলের নামকরণ করেন।
তাছাড়া কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে জনগণকে উদ্ধুদ্ধ করতে, মুসলিম শব্দযুক্ত বিরোধী দলের প্রয়োজন ছিল। পূর্ব বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, শিক্ষিত শ্রেণীর মননলোকের পরিবর্তন ধারা, ভাষাভিত্তিক জাতীয়বাদ প্রভৃতি মৌলিক প্রপঞ্চসমূহকে ধারণ করার মধ্য দিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ একটি অসাম্প্রদায়িক দলে পরিণত হওয়ার অভিপ্রায় পোষণ করে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৫৫ সালের ২১-২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলে সম্মেলনে দলের নাম থেকে মুসলিম বাদ দেওয়া হয়।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালে শরীফ শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন ও ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ও তার দল আওয়ামী লীগ স্বোচ্চার ছিলেন। ১৯৬৫ সালে সংগঠিত পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে ১৯৬৬ সালে ফেব্রুয়ারী মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে ৬দফা কর্মসূচী উত্থান করেন।
১৯৬৬ সালের ৮ মে নারায়ণগঞ্জে কয়েকজন সঙ্গী সহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। এতে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হন। বাঙালির প্রান প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্য তার বিরুদ্ধে আগরতলা মামলা দায়ের করে সরকার। কিন্তু জনগণের চাপের মুখে আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্ধীদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
১৯৭০ সালে ঐতিহাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা দেয়নি শাসকরা। ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জন সমুদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।
১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গণত্যা চালায়। গ্রেফতার হওয়ার ঠিক পূর্বে বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ঘোষণা করেন। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ত্রিশ লাখ শহীদের প্রাণ ও ৩ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির মধ্যদিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ অভ্যুদয় ঘটে।
লেখক:সিনিয়র সাংবাদিক/ইউডি/এআর

