ড. বেনজীর কি দেশের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ?
শফিকুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন, ২০২৪, আপডেট ১৯:৩০
দুর্নীতি শব্দটির সঙ্গে আমরা এখন অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। কেউ আর দুর্নীতিবাজদের দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেন না; বরং তাকে একনজর দেখার চেষ্টাই করেন।
কারণ তিনি অত্যন্ত চৌকস, মেধাবী আর ম্যানেজেবল পাওয়ার’র অধিকারী। এই সব গুণ না থাকলে তিনি অপকর্ম করেন কীভাবে? এতো গুণ থাকলে একজন মানুষকে একনজর দেখাই স্বাভাবিক।
এই ধরুন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) ড. বেনজীর আহমেদের কথা। প্রথমেই বলি তার দক্ষতার কথা। তিনি র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) ছিলেন।
সন্ত্রাস-জঙ্গি দমনে তার নেতৃত্ব প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার ছিলেন।
দায়িত্ব পালনে বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন তিনি। আইজি হিসেবেও তাকে সফল না বলার কোনো কারণ নেই। সহকর্মী ও সাংবাদিকদের কাছে তিনি সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
সৎ কর্মকর্তা হিসেবে তাকে শুদ্ধাচার পুরস্কার দেওয়া হয়। এবার আসি তার শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে।
তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়েছেন। ২০১৯ সালে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি নেন ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডক্টর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিবিএ) প্রোগ্রাম থেকে। কিন্তু ওই প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়ার তার যোগ্যতা ছিল না। শর্ত শিথিল করে তাকে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
সেখানে ভর্তির জন্য স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হয়। শিক্ষাজীবনের সব পাবলিক পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর পেতে হয়। কিন্তু তা বেনজীরের ছিল না।
বেনজীরের ভর্তির ক্ষেত্রে মৌলিক শর্তগুলো শিথিল করা হয়েছিল ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের তৎকালীন ডিন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের সুপারিশে। তিনি ছিলেন বেনজীরের ‘ডক্টরেট’ প্রোগ্রামের তত্ত্বাবধায়ক।
আর ভর্তি ও ডিগ্রি পাওয়ার সময় বেনজীর ছিলেন র্যাবের মহাপরিচালক। ভর্তির শর্ত শিথিলের ক্ষেত্রে বেনজীরের পদ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।
সততার মুখোশ পড়ে দুর্নীতির রামরাজত্ব কায়েম করেছিলেন বেনজীর। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে তিনি অন্তত তিন হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। অথচ তার সারাজীবনের চাকরির বেতন দুই কোটি টাকার মতো।
সারা দেশেই তার ভূসম্পত্তি রয়েছে। অজগরের মতো খেতে খেতে তার পেট এতো মোটা হয়ে গেছে যে সপরিবারে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।
তিনি যে দেশে থাকতে পারবেন না; তা বোধ করি তিনি আগেই জেনে গিয়েছিলেন। এ কারণে অ্যাকাউন্ট খালি করে টাকা সরিয়ে ফেলেছেন।
এসব টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে কি না; তা তদন্তের দাবি রাখে। তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবেন- এই প্রমাণ মেলে তার পাসপোর্ট দুর্নীতিতে। তিনি নিজের নাম-পরিচয় পরিবর্তন করে ৭টি পাসপোর্ট বানিয়েছেন।
তার ৭টি পাসপোর্টের মধ্যে ৫টির নম্বর হলো- ই ০০১৭৬১৬, এএ ১০৭৩২৫২, বিসি ০১১১০৭০, বিএম ০৮২৮১৪১ ও ৮০০০০২০৯৫। এছাড়া আরও দুইটি পাসপোর্ট রয়েছে। তিনি বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে পাসপোর্টগুলো তৈরি করেন।
তার নজিরবিহীন জালিয়াতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের চারজন পরিচালক, একজন উপপরিচালক ও দুজন উপসহকারী পরিচালককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
নবায়নের সময় ধরা পড়লে বেনজীরের সেই পাসপোর্ট আটকে দেয় পাসপোর্ট অধিদপ্তর। চিঠি পাঠানো হয় র্যাব সদর দপ্তরে। কিন্তু অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে সব ব্যবস্থা করে ফেলেন সাবেক আইজিপি। পাসপোর্ট অফিসে না গিয়ে নেন বিশেষ সুবিধাও।
চাকরিজীবনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তিনি সরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে নীল রঙের অফিসিয়াল পাসপোর্ট করেননি।
সুযোগ থাকার পরও নেননি লাল পাসপোর্ট। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, কতটা মেধাবী, চৌকস আর ম্যানেজেবল পাওয়ার’র অধিকারী বেনজীর।
তিনি যে শুদ্ধাচার পুরস্কার পেয়েছিলেন, সেটাও কি ম্যানেজ করে- এই প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। সব চেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো- তার শুদ্ধাচার পুরস্কার বাতিল হবে কি না; সেই ঘোষণা এখনো আসেনি।
‘গুরুতর’ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাব ও এর সাবেক-বর্তমান ৭ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তর। তালিকায় র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক হিসেবে বেনজীর আহমেদের নাম রয়েছে।
২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৫৯ বছর পূর্ণ হওয়ায় সরকারি চাকরির আইন অনুযায়ী অবসরে যান তিনি। বেনজীরের বিশাল বিত্তবৈভব নিয়ে গত ৩১ মার্চ ও ৩ এপ্রিল প্রতিবেদন প্রকাশ হয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
এতে সাবেক এই আইজিপি ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠে আসে। আপাতত দৃষ্টিতে তাকে দেশের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ বলা যেতেই পারে।
লেখক: শিক্ষক ও সাংবাদিক। ইউডি/এআর

