মৌসুমের শুরুতেই চোখ রাঙ্গাচ্ছে ডেঙ্গু

মৌসুমের শুরুতেই চোখ রাঙ্গাচ্ছে ডেঙ্গু

ঢাকায় এডিস মশার সাথে পাল্লা দিয়ে হাসপাতালে বেড়েই চলছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। এ নিয়ে আশিকুর রহমান’র প্রতিবেদন

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ২৯ জুন, ২০২৪, আপডেট ১৫:৪৫

শহরের সঙ্গে বাড়ছে গ্রামেও, উদ্বেগ: বর্ষা শুরুর পর থেকে এ বছর ঢাকায় ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা বেড়েই চলছে। হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। বিগত বছরগুলোতে বিশাল সংখ্যক মানুষ এতে আক্রান্ত এবং মৃত্যুবরণ করে। এ কারণে এটি বেশ আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। পূর্বে এটি বড় শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে এখন গ্রামেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ, যা বেশি উদ্বেগের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বছর ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু সংবাদ পাওয়া গেছে। তাই নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এবারও ডেঙ্গু ভোগাবে মানুষকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, সারাদেশে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৩৪৪২ জন। বছরের প্রথম ছয় মাসে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ১০ বছরের মধ্যে বছরের প্রথম ছয় মাসে এর চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি এবং মৃত্যু হয়েছিল ২০২৩ সালে। সে বছর জুলাই মাস থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকে। তার আগে বছরের এই সময় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এত মানুষের মৃত্যু হয়নি। এ বছর ১ জানুয়ারি থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত সারাদেশে ৩৪৯৬ জন রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এরমধ্যে জুনের প্রথম ২৬ দিনে হাসপাতালে এসেছেন ৬৪৩ জন রোগী। দেখা গেছে, ১ থেকে ৭ জুন পর্যন্ত মাসের প্রথম সপ্তাহে হাসপাতালে এসেছেন ১৬৬ জন, দ্বিতীয় সপ্তাহে ১৭৪ জন, তৃতীয় সপ্তাহে ১২২ জন এবং ২২ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত হাসপাতালে এসেছেন ১৮১ জন রোগী। ১৭ জুন কোরবানির ঈদের আগে-পরে দীর্ঘ ছুটি থাকায় হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছে কম।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে দেখা গেছে, ২০২৩ সাল ছাড়া বাংলাদেশে বছরের প্রথম ছয় মাসে এত রোগী ভর্তি হয়নি। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এত মৃত্যুও ছিল না। চলতি বছর ২৬ জুন পর্যন্ত ৪৩ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৮ জন মারা যায়। ২০২০ সালের পুরো বছরে মৃত্যু হয়েছিল ৭ জনের। ২০২১ সালের জুন মাস পর্যন্ত ১২ জন, ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত ১ জন এবং ২০২৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত ৪৩ জন মারা গিয়েছিল ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন, যাদের মধ্যে মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন; যা এক বছরে ডেঙ্গুতে সর্বাধিক মৃত্যুর রেকর্ড।

পর্যাপ্ত চিকিৎসা আছে, সচেতন হতে হবে : ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসার জন্য দেশের প্রতিটি হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। তবুও ডেঙ্গু যেন কারো না হয়, সেজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। সম্প্রতি রাজধানীর শহীদ শামসুননেছা আরজু মনি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি ১০ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ উপলক্ষে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন এসব কথা বলেন। রাতারাতি না পারলেও স্বাস্থ্যখাতকে আরও উন্নত করার জন্য যা যা করা প্রয়োজন তা করা হবে উল্লেখ করে ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য যথাসম্ভব চেষ্টা করা হবে। দেশের আরবান হাসপাতালগুলোতে যদি ব্লাড প্রেশার ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ব্যবস্থা রাখা যায়, তাহলে বড় বড় রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এছাড়াও স্বাস্থ্যমন্ত্রী পর্যায়ক্রমে দেশের সব হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সের ঘাটতিও কমানোর আশ্বাস দেন।

ডা. সামন্ত লাল সেন

মশাবাহিত এই রোগ নিয়ন্ত্রণে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে,যার মধ্যে রয়েছে সচেতনতা তৈরিতে (অ্যাওয়ারনেস) ক্যাম্পেইন, মশার বংশবিস্তারের স্থান নির্মূল ও লার্ভা নিধন। তাছাড়া বয়স ও এলাকা ভিত্তিতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী এবং এতে মৃত্যুর তথ্য শ্রেণিবিন্যাস করছে সরকার। দেশজুড়ে ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য সব হাসপাতালে আলাদা ইউনিট করা হয়েছে। অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্পেইনের আওতায় সরকারের বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল, ডিজিটাল ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ক্রমাগত ডেঙ্গু পরিস্থিতি সম্পর্কিত তথ্য প্রচার এবং কীভাবে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে সে বিষয়ক প্রচারণা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা প্রাক-বর্ষা, বর্ষাকালীন ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ের জরিপের মতো নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

দরকার সঠিক বিনিয়োগ : দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ ডেঙ্গুর কবলে পড়েছে। এদের মধ্যে বাংলাদেশ ডেঙ্গু সংক্রমণের সংখ্যার দিক থেকে নতুন নতুন রেকর্ড গড়ে চলেছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশকে বিভিন্ন বিদেশি সংস্থা জরুরি সহায়তা সামগ্রী দিচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট, সংশ্লিষ্ট পেশাদারদের প্রশিক্ষণসহ স্বাস্থ্য, এবং পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও হাইজিন খাতগুলোতে অন্যান্য জরুরি সরঞ্জাম ও সেবা প্রদান। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং কিশোর-কিশোরী ও তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের ‍যুক্ত করছে, যারা নিজ নিজ এলাকায় ডেঙ্গু নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে ভ‚মিকা রাখবেন। অংশীজনদের সঙ্গে মিলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে কারিগরি পরামর্শ দেবার মাধ্যমে সহায়তা করছে।

ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি’র এবার প্রস্তুতি কেমন : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এইডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় গত ১৭ এপ্রিল থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকায় মশার ঘনত্ব মাপতে জরিপ চালায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জরিপে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৯৯টি ওয়ার্ডের ৩১৫২টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। মশার ঘনত্ব নির্ণয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগ। এতে ঢাকার উত্তরা, মিরপুর-১, মিরপুর-২, গুলশান ও মোহাম্মদপুর এলাকায় চারটি প্রক্রিয়ায় মশার উপস্থিতি দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে চার ধরনের ফাঁদ পেতে পূর্ণ বয়স্ক, গর্ভবতী মশা ধরার পাশাপাশি বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে মশার লার্ভার উপস্থিতি দেখা হয়।

ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধ ও এডিস মশার প্রজননস্থল নিধনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। অভিযানে বিভিন্ন বাসাবাড়ি, স্থাপনায় এইডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। রবিবার ২০৪টি বাড়ি ও স্থাপনা পরিদর্শন করে ১১টিতে এইডিস মশার লার্ভা পাওয়ার কথা জানিয়েছে ডিএসসিসি। এ সময় ছয়টি বাড়িকে জরিমানা করা হয়, বাকি বাড়ির মালিকদের সতর্ক করে দেওয়া হয়। সোমবার কাঁঠালবাগান, জিগাতলা, দক্ষিণ বনশ্রী, মুরাদপুর, উত্তর মাÐা ও ডেমরার ডগাইরে ২৯৯টি বাসাবাড়ি ও নির্মাণাধীন ভবনে অভিযান চালায় ডিএসসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। এ সময় ১৯টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। এডিস মশার লার্ভা পাওয়ার হার ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এ সময় ১০টি বাড়ির মালিককে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বাকি ৯টি বাড়িতে মশার লার্ভা তুলনামূলক কম থাকায় ওইসব বাড়ির মালিককে মৌখিকভাবে সতর্ক করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। মঙ্গলবারও ৩১১টি বাসাবাড়ি ও স্থাপনা পরিদর্শন করে ১২টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। এদের মধ্যে ৯টি বাড়ির মালিককে জরিমানা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা।

ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে এবার বর্ষা শুরুর আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রচারণা চালানো হচ্ছে, ডিএসসিসির কর্মীরা নিয়মিত ওষুধ দিচ্ছে। আমাদের সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে আমাদের বাসা-বাড়িসহ আঙ্গিনার কোথাও পানি জমে থাকছে কি না। যদি পানি জমে থাকে, পাত্রটি উল্টে দিন। পরিত্যক্ত পাত্র কাজে না লাগলে ধ্বংস করে ফেলুন। কারণ এসব পাত্রেই এইডিস মশা বংশ বিস্তার করে।

ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফজলে শামসুল কবির বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে বছরের প্রথম থেকেই কাজ শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সব হাসপাতাল এবং থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করা হয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য। অভিযানে কিছু কিছু জায়গায় এইডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে, তবে সেটা খুব বেশি নয়। তিনি বলেন, গত বছর জুন পর্যন্ত ১৭১৩ জন রোগী পাওয়া গিয়েছিল দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়, চলতি জুন পর্যন্ত ৬২ জন। আমরা বলব গত বছরের চেয়ে আমরা ভালো অবস্থায় আছি। তারপরও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক আছি।

তাজুল ইসলাম

সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রণের আশা: ডেঙ্গু একটা বড় সমস্যা এবং দেশের সব স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলাম। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সাথে সমন্বয় করে ডেঙ্গু প্রতিরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান। বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের উপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এ সব কথা বলেন। এ সময় ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।তাজুল ইসলাম বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে থাকলেও ২০১৯ সালের পর থেকে ডেঙ্গুর তীব্রতা আমাদের দেশে এসেছে। এ ব্যাপারে আমাদের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবার কারণে নিয়ন্ত্রণে ছিল।

তিনি বলেন, রাজধানীসহ গ্রামাঞ্চলে সাদা পানিতে এডিস মশা জন্মে। আমি স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করছি। এছাড়া মোনাস, মায়ামী, সিঙ্গাপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক্সপার্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। আমাদের বিশেষজ্ঞরা তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে ডেঙ্গু প্রতিরোধের চেষ্টা করছে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের গুলো ভালো কাজ করছে, এখন আর আগের মত পানি জমে না। সব মিলিয়ে ডেঙ্গু মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে থাকবে আশা করছি। বাংলাদেশ যেভাবে কোভিড-১৯ অতিমারি সামাল দিয়েছে, তা যেকোন মহামারি মোকাবিলায় এদেশের সক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ; যা প্রমাণ করে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সময়মত কার্যকরী নির্দেশনা-বার্তা সকলের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এ ধরনের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।

মানুষের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও ডেঙ্গু সংক্রমণের হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সম্মিলিতভাবে ডেঙ্গু বিস্তারের কারণগুলো জানা থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে এখন প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে নিয়ে বিভিন্ন খাতের সমন্বয়ে একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এর মধ্য দিয়ে শুধু উদ্ভাবনী সমাধান আসার পথই খুলবে তা নয়, বরং সকল কমিউনিটি যেন প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেবার মাধ্যমে ডেঙ্গু মোকাবিলা করতে সক্ষম হয় তাও নিশ্চিত করতে হবে। সংকট মোকাবিলায়, সরকারের নিরলস প্রচেষ্টা সাথে সকলের সহায়তা থাকতে হবে।

বিশ্বব্যাপী ৩৯০ মিলিয়ন ডেঙ্গু সংক্রমণ ঝুঁকিতে আছে। সব মিলে এখানে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের অনেক প্রভাব রয়েছে। আফ্রিকা, আমেরিকা, পূর্ব ভ‚মধ্যসাগর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১০০টিরও বেশি দেশে এই রোগটি এখন স্থানীয়। আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলগুলোয় ডেঙ্গুর সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি। পৃথিবীর মোট ডেঙ্গুর ৭০ শতাংশ এশিয়ায়। অপরিকল্পিত নগরায়ন, বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশগত কারণ ডেঙ্গু সংক্রমণের সাথে সংশ্লিষ্ট। জনসংখ্যার ঘনত্ব, মানুষের যাতায়াত, ব্যবহারযোগ্য পানির স্বল্পতা, বিভিন্ন পাত্রে পানি সংরক্ষণ এডিস মশার ঘনত্ব ও ডেঙ্গু বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা : মশার ঘনত্ব নির্ণয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগ। মশা নিয়ে এই সার্ভিলেন্সের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার।
অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু মশা আগের চেয়ে ‘অনেক’ বেড়েছে। কমেছে অন্য মশা। গত সপ্তাহের চেয়ে এই সপ্তাহে কম পেয়েছি। আমরা যে জায়গাগুলোয় কাজ করি, একই জায়গায় সিটি করপোরেশন হয়তো খুব অ্যাকটিভলি কাজ করছে। এ কারণে মশা কমেছে। তবে ডেঙ্গু আগের চেয়ে বেশ বেড়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গ্রীষ্মমন্ডলীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলে ডেঙ্গু ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা পরিবর্তিত পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছে।

ড. কবিরুল বাশার

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, আবহাওয়ার যে পরিস্থিতি তাতে এ বছর মশার উৎপাত গত বছরের চেয়ে বেশি হবে। মশা বাড়লে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়বে। তিনি বলেন, ডেঙ্গুতে ভর্তি রোগীর অনুপাতে মৃত্যু বেশি। মৃত্যু কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। মশা নিয়ন্ত্রণ করতে সময় লাগবে, কিন্তু মৃত্যু কমানোর জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সরকারি রেটে ডেঙ্গু পরীক্ষা সহজ করতে হবে। আক্রান্ত রোগীদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারলে ক্রিটিক্যাল রোগীর সংখ্যা কমে আসবে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২৯ জুন ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এইডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান বলেন, বর্ষা পূর্ববর্তী জরিপে মশার যে উপস্থিতি পাওয়া গেছে, সেটি ছিল উদ্বেগজনক। বর্ষায় বৃষ্টিপাতে মশা আরও বাড়বে। এরইমধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, হচ্ছে। একটা ভারি বৃষ্টি হলেই বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে যাবে, মশার ব্রিডিং সোর্স বেড়ে যাবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জরিপ করে মশক নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোকে একটা ইনডিকেশন দেয় কোন কোন এলাকায় মশার বিস্তার বেশি। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারের ডেঙ্গু কন্ট্রোল ইউনিট, সিটি করপোরেশন- ওইভাবে ভাগ ভাগ করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেয়। কাজেই মশক নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে। বিভিন্ন বাসাবাড়িতে যেন পানি জমতে না পারে, সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। পরিদর্শন করা বাড়ির মধ্যে ৪৬৩টিতে এডিস মশার লার্ভা এবং পিউপা পাওয়া গেছে; যা পরিদর্শন করা মোট বাড়ির ১৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ। লার্ভা পাওয়ার শতকরা হার বা হাউস ইনডেক্স ১০-এর বেশি হলে মশার ঝুঁকিপূর্ণ উপস্থিতি বিবেচনা করা হয়। সেদিন মশার এই উপস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলেছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তারা আশঙ্কা করেছিলেন, বর্ষায় এডিস মশার ঘনত্ব আরও বাড়বে।

ইউডি/এজেএস

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading