নারী নির্যাতন: বেড়েই চলেছে
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ০৬ জুলাই, ২০২৪, আপডেট ১৫:০০
ধর্ষণ, হত্যা কমছে না জনমনে উদ্বেগ : গত ১০ বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিস্ময়কর সাফল্যের পেছনে নারীদের অগ্রগতি গোটা বিশ্বে বেশ প্রশংসা কুড়াচ্ছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট কতটা পরিবর্তন হয়েছে। দেখা যায় ঘরে-বাইরে নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশের ৬৫ শতাংশ বিবাহিত নারী স্বামীর মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতন ভোগ করেছেন, ৩৫ শতাংশ অন্য কারও দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশের একটি বেসরকারি সংস্থার পরিচালিত গবেষণায় বলা হয়েছে, গত তিন বছরে ১৫ বছরের কম বয়সি কিশোরীরা বেশি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ সময়ে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ৪৩ শতাংশের ওপর ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে এবং ২৭ শতাংশ নারী স্বামী, শ্বশুরবাড়ির লোকদের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন। নারী নির্যাতনের স্বীকার হয় কিন্তু বিচার হয় না। বিচারহীন সংস্কৃতির কারণে দেশে নারী নির্যাতন বাড়ছে। চলতি বছরের জুন মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৯ কন্যাসহ ৬৭ জন। তাদের মধ্যে ১১ জন কন্যাসহ ১৯ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার। ৪ জন কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়াও ৯ জন কন্যাশিশুসহ ১৭ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। এর বাইরেও অসংখ্য ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে হরহামেশাই। দেশের আনাচে কানাচে ঘটা এসব ধর্ষণকাø লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যাওয়ার কারণে তার কোন পরিসংখ্যান হয়না। এছাড়া, অনেক ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে যায়। আবার কোনটা লোকলজ্জার ভয়ে জনসম্মুখে আসেনা। যে কয়টা সামনে আসে, তারই পরিসংখ্যান তৈরি করে সরকারসহ নানা সংস্থা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা যে হারে বেড়েছে, তার চিত্র জনমনে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইন আছে; প্রয়োগ নেই। বন্ধ হচ্ছে না নারী নির্যাতন, ব্যভিচার, হত্যাকাø, ধর্ষণ। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশে এজাতীয় নারী নির্যাতন এবং যৌন হয়রানির ঘটনা মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে গেছে। নিত্যই ব্যভিচার ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। রোধ হচ্ছে না। নির্যাতিত হচ্ছে স্কুলছাত্রী, রোগী, শিশু, যুবতী, আয়া, বুয়া, গৃহবধূ। নিজ গৃহে, হাসপাতালে, রাস্তা-ঘাটে, চলন্ত বাসে, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে, গৃহে ঘটছে এই নির্যাতনের পৈচাশিক ঘটনা। একের পর এক সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় নারীর নিরাপত্তা নিয়ে আবার উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নারী এখন ঘরে বা বাইরে কোথাও যেন নিরাপদ নয়। পথে ঘাটে প্রান্তরে এমনকি বেড়াতে গিয়েও নারীর নিস্তার মিলছেনা। পাবলিক পরিবহনেও পাশবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বিভিন্ন বয়সী নারী। প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ৬ মাসে ৬৯টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা দেশে ঘটেছে। সে হিসেবে প্রতি মাসে গড়ে ১১ দশমিক ৫০টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। মামলা হয়েছে অর্ধশতাধিক। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত পাঁচ মাসে মোট ৫০টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
৬ মাসের পরিসংখ্যানে ভয়াবহ চিত্র: গত ছয় মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন মোট ২৫০ নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জন নারীকে। ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন তিন জন নারী। এছাড়া ৫৮ জন নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংখ্যাগত প্রতিবেদন (জানুয়ারি-জুন) ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ পায়। এ সময় নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন হয়রানি ও সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যা, পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, গৃহকর্মী নির্যাতনসহ নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গত ছয় মাসে যৌন হয়রানিকেন্দ্রিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন ১৪৬ জন নারী-পুরুষ। যাদের মধ্যে হামলার শিকার হয়েছেন ১১৩ জন নারী ও ৩৩ জন পুরুষ। এর মধ্যে বখাটেদের কর্তৃক লাঞ্ছিত হয়েছেন ১০১ জন নারী, বখাটেদের উৎপাতকে কেন্দ্র করে সংঘাতে আহত হয়েছেন ৩৬ জন নারী। যৌন হয়রানির কারণে এক জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। অন্যদিকে, যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে বখাটে কর্তৃক চার জন পুরুষ হত্যাকাøের শিকার হয়েছেন। পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ২৬৯ জন নারী। এর মধ্যে ৮৪ জন নারী স্বামী কর্তৃক হত্যার শিকার হয়েছেন।

এদিকে, জাতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) করা প্রতিবেদন বলছে, গত জুন মাসে ২৯৬ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। তাছাড়া গত মাসে শুধু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৪১টি। সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ১১টি এবং ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনা ঘটে তিনটি। এর মধ্যে ছয় জন প্রতিবন্ধী শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। অন্যদিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে পাঁচ জন কিশোরী ও ছয় জন নারী এবং ধর্ষণ ও হত্যার শিকার দুই জন শিশু ও এক জন প্রতিবন্ধী নারী। এ সময় ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় ২৭টি, যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে ২৬টি। এ সময় শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে ৪১টি। এ সময় এক জন শিশু, ১৯ জন কিশোরী ও ৪১ জন নারীসহ মোট ৬১ জন আত্মহত্যা করেছে। গণমাধ্যম সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিশোধ, পারিবারিক বিরোধ, যৌতুক, প্রেমঘটিত, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া ও অভিমান ইত্যাদি কারণে এগুলো সংঘটিত হয়েছে। এ মাসে তিন জন মৃত ও এক জন জীবিত মোট চার জন নবজাতক শিশুকে বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে, যা অমানবিক ও নিন্দনীয়। এই শিশুদেরকে কী কারণে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা নিরূপণের চেষ্টা করছে না। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের জুন মাসের জরিপ বলছে, আলোচ্য মাসে ১৪৮ কন্যাশিশু এবং ১৪৯ জন নারীসহ মোট ২৯৭ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুন মাসে মোট ২৯৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৯ কন্যাসহ ৬৭ জন। তাদের মধ্যে ১১ জন কন্যাসহ ১৯ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ৪ জন কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়াও ৯ জন কন্যাশিশুসহ ১৭ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সরকার তৎপর: নারী নির্যাতনের ঘটনায় বিচার কতটা হয়, তা জানা যায় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রাম (৪র্থ পর্যায়)’ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত ১৪টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) থেকে। ওসিসির তথ্য বলছে, গত ২৩ বছরে সেখান থেকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন এবং দগ্ধ হওয়ার ঘটনায় ৬২ হাজারের বেশি নারী ও শিশু সহায়তা পেয়েছে। মামলা হয়েছে মাত্র ১৯ হাজার ৪৪১টি। এর মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে রায় হয়েছে এবং সাজা কার্যকর হয়েছে ১ শতাংশের কম। মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সিমিন হোসেন রিমি বলেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও যৌতুক নিরসনে সরকার তৎপর। সেজন্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ১৪টি ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ও ৬৭টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল স্থাপন করেছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার জাতীয় পর্যায়ে একটি ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাব, বিভাগীয় পর্যায়ে ৮টি ডিএনএ স্ক্রিনিং ল্যাব, টোল ফ্রি ১০৯ হেল্পলাইন, ন্যাশনাল ও রিজনাল ট্রমা কাউন্সিলিং সেন্টার, ৬টি সেল্টার হোম স্থাপন করেছে। এ ছাড়া জয় মোবাইল অ্যাপস তৈরি করেছে। তিনি বলেন, নারী ও শিশুর প্রতি সহায়তা প্রতিরোধের জাতীয় পরিকল্পনায় মোট ৪০৩টি কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী নারী ও শিশু প্রতিরোধে ৩৫টি মন্ত্রণালয়/বিভাগে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে তাঁর মন্ত্রণালয় সচেতনতা সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন ও আইনি সহায়তা দেওয়ার কাজ করছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট নয়, সেটা ঠিক। আইন মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’র মাধ্যমে দরিদ্র নারী-পুরুষ, শ্রমিক ও কারাবন্দীদের আইনি সহায়তা দেয়। সংস্থার ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রতিবেদন অনুসারে, ওই বছর সারা দেশে ৩২ হাজারের বেশি মামলায় সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে সেখানে নারীর জন্য কতটা সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তা আলাদা করা নেই।

প্রসঙ্গত, নারী ও শিশু নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় তা দমনে ১৯৮৩ সালে আমাদের দেশে বিশেষ আইন প্রণয়ন করা হয়। পরে ১৯৯৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন পাস করা হয়। তবে আইনটি বাতিল করে ২০০০ সালে নতুন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন প্রণয়ন হয়। আইনটি আরও শক্তিশালী করতে ২০০৩ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন প্রণয়ন করা হয়। এ ছাড়া নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আরও কিছু আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭, বাল্যবিবাহ নিরোধ বিধিমালা ২০১৮, ডিএনএ আইন ২০১৪, ডিএনএ বিধিমালা ২০১৮, যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮।
সাম্প্রতিক সময়ে যত আলোচিত ঘটনা : গত ২৫ জুন রাতে সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনে এক তরুণী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম জিআরপি থানায় মামলা হওয়ার পর চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন ওই ট্রেনে খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এস এ করপোরেশনের কর্মী। বাকীজন রেলের নিরাপত্তাকর্মী। তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় পুলিশ চারজনকে আদালতে পাঠায়। আদালত ১ জুলাই সোমবার আসামীদের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।
এর আগে, চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে কেরানীগঞ্জে ঘুরতে যাওয়া এক চাকুরিজীবী তরুণী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত পাঁচ আসামীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। ভুক্তভোগী ঘটনার দিন তার দুই সহকর্মীর সঙ্গে কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর এলাকায় মধুসিটি হাউজিংয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন। হাউজিংয়ের ভিতর ছবি তোলার সময় পাঁচ থেকে সাতজন তাদের বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকে। এক পর্যায়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে তারা ওই তরুণী ও তার বন্ধুদের কাছে থাকা নগদ টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। এরপর তাদের টানাহেঁচড়া করে হাউজিংয়ের আরও ভিতরে ফাঁকা জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে তরুণীর দুই সহকর্মীকে মারধর করে আটকে রাখা হয় এবং তরুণীর ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। এর আগে মোহাম্মদপুর থানার নবীনগর হাউজিং এলাকায় প্রেমের ফাঁদ ফেলে এক তরুণীকে শিকলে বেঁধে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। ২৫ দিন একটি ফ্ল্যাটে ওই তরুণীকে বেঁধে রেখে তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায় সেই তরুণীর কথিত প্রেমিক ও তার দুই বন্ধু। সহায়তা করে অপর এক নারী। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ২৩ বছর বয়সী তরুণী গত ৩১ মার্চ বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় তার প্রেমিকসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। চলতি বছরের মার্চ মাসের ৫ তারিখ থেকে সেই ফ্ল্যাটে তাকে আটকে রাখা হয়েছিল।
এদিকে, রাজধানীর খিলক্ষেতের নিকটবর্তী বনরূপা এলাকায় গত ২৮ জুন মধ্যরাতে এক নববধূ সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। সেদিন রাতে ওই নববধূকে নিয়ে তার স্বামী খিলক্ষেতের এক আত্মীয়ের বাসা থেকে ফিরছিলেন। এ সময় সাত যুবক তাদের পথরোধ করে বনরূপা এলাকায় নিয়ে যায়। রাতের অন্ধকারে ওই এলাকার ঝোপের মধ্যে নিয়ে সেই নারীর স্বামীকে মারধরের পর মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করতে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর সেই নববধূর ওপর পাশবিকতা চালায় সাত দুর্বৃত্ত। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার সেই নারী গত ১৮ জুন বিয়ে করেন। এরই মধ্যে সেই সাত যুবককে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
এছাড়াও গত ১৫ মে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরী নিজ বাড়িতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়। ঘটনার দিন গভীর রাতে আড়াইহাজার পৌরসভার চামুরকান্দি এলাকায় ৫-৬ যুবক ঘরের দরজা ভেঙে ঢুকে দেশীয় অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীর হাত-পা বেঁধে পাশবিক নির্যাতন চালায়।
২০১৮-২০২৩: বছরে গড়ে ২০ হাজার মামলা : পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৬ থেকে সাড়ে ২২ হাজার মামলা হয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, মামলার সংখ্যা বছরে গড়ে ২০ হাজার। নির্যাতনের ঘটনাগুলো গুরুতর হলে তা গণমাধ্যমে আসে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ গত বছর পত্রিকায় প্রকাশিত খবর ঘেঁটে ৩৫ ধরনের নারী নির্যাতনের তথ্য সংকলিত করেছে। ভুক্তভোগী নারী ও শিশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসের প্রতিটিতে এ সংখ্যা ছিল ২০০ জনের বেশি। নারী নির্যাতনের কথা জানিয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯- গত বছর তাৎক্ষণিক অভিযোগ এসেছে ২৬ হাজার ৭৯৭টি। অনলাইনেও হয়রানি ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নারীরা। পুলিশ সাইবার সাপোর্ট সেন্টার ফর উইমেনের (পিসিএসডব্লিউ) তথ্য অনুসারে, গত ১৫ মাসে অনলাইনে ভুয়া আইডি (পরিচয়) খোলা, আইডি হ্যাক, প্রতারণা, মুঠোফোনে হয়রানি ও আপত্তিকর আধেয় বা কনটেন্ট ছড়ানোর সাড়ে ১২ হাজারের বেশি অভিযোগ এসেছে। উচ্চ আদালত সূত্রে পাওয়া গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্য অনুসারে, সারা দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪৩৮টি মামলা বিচারাধীন।
পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩৪ হাজারের বেশি। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক গণমাধ্যমকে বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে মামলার জট কমাতে বিচারপ্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনা দরকার। পাবলিক প্রসিকিউটর রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ না দিয়ে ক্যাডার সার্ভিস থেকে ধাপে ধাপে নিয়োগ দিতে হবে। তিনি বলেন, কঠোর সাজার ভয়ে লোকে অপরাধ করবে না, এই ভাবনা থেকে কোনো কোনো অপরাধের শাস্তি বাড়ানো হয়। এর ফলে বিচারকের আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করার হার কমে। কারণ, বিচারক মনে সামান্য সন্দেহ রেখেও বড় সাজা দিতে চান না। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা দরকার।
শিকড় উপড়ে ফেলতে জোর আহ্বান : বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, নারী নির্যাতনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতে ঘটতেই আজকে ডালপালা বিস্তার করে আগ্রাসী ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে নারীদের উপর কী প্রভাপ পড়ছে, সেটা আপনাদের মনে করার জন্য অনুরোধ করছি। নারীর মর্যাদা ক্ষুন্ন হচ্ছে এটা বললেই শুধু হবে না, নারী লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। নারী নির্যাতনের এই ধারার শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে।
নারী নির্যাতনের প্রতিকার পাওয়া আগের মতো কঠিনই আছে। কারণ, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদøের বিধান রেখে নারী নির্যাতন আইন সংশোধন করা হলেও, সেখানে অনেক ফাঁকফোকর ও বৈষম্যমূলক ধারা রয়েছে বলে মনে করছেন নারী নেত্রীরা। তারা বলছেন, সিডও কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বৈবাহিক ধর্ষণের সংজ্ঞা এখনও আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, ন্যাশনাল হেল্পলাইন সেন্টার, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। প্রতিবন্ধী নারী ও কন্যাশিশুরা ধর্ষণ এবং নির্যাতনের শিকার হলেও আইন অনুযায়ী বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নির্দেশনা নেই। এদিকে, বেশ কয়েকটি খসড়া প্রণয়নের পরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রসহ সর্বস্তরে যৌন হয়রানি রোধে কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়নি। ২০০৯ সালে উচ্চ আদালত এ বিষয়ে নির্দেশনা দিলেও সেটি যথেষ্ট নয়। এ জন্য সর্বাত্মক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক আইন প্রণয়নের দাবি ‘আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট’ এর প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হকের।

আওয়ামী লীগ নেতা বাবুল হত্যা অভিযুক্ত পৌর মেয়র আক্কাছ গ্রেপ্তার : রাজশাহীর বাঘা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম বাবুল হত্যা মামলার প্রধান আসামি বাঘা পৌরসভার মেয়র আক্কাছ আলীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। শুক্রবার (৫ জুলাই) তাকে ঢাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি মতিঝিল বিভাগ। বিষয়টি নিশ্চিত করে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, রাজশাহী জেলার বাঘা উপজেলার আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি মো. আশরাফুল ইসলাম বাবুল হত্যার ঘটনায় বাঘা থানায় হওয়া মামলার ১নং আসামি বাঘা পৌর মেয়র মো. আক্কাস আলীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি মতিঝিল বিভাগ। অন্য গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা হলেন– মজনু, টুটুল, আব্দুর রহমান ও স্বপন। তাদের রাজশাহী জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
( প্রতিবেদন টি লিখেছেন আসাদ এফ রাহমান, মোঃ শহিদ রানা , আরেফিন বাঁধন, আশিকুর রাহমান ,পারভেজ আহমেদ )
ইউডি/এআর

