সবাই তো ধনী হতে চায়!
আশিকুর রাহমান । শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০২৪, আপডেট ১৭:০০
ধনাঢ্য হতে প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। ধরা পড়লে বা ফেঁসে গেলে কী হবে? বাইরের কোনো দেশে ‘সেকেন্ড হোম’ বানান। বিপদ দেখলে কেটে পড়ুন। আর যদি ধরা পড়েই যান তাহলে তেমন কিছুই হবে না! বড় জোর দু-চার বছরের জেল। যাবজ্জীবন হলেই বা ক্ষতি কী? একদিন তো মরেই যাবেন!
কোটিপতি হবার ইচ্ছে সকল মানুষেরই থাকে। কেউ হতে পারে, কেউ পারে না। সঠিক উপায় জানা না থাকায় অধরাই থেকে যায় সোনার হরিন। ধনী হওয়ার জন্য কায়দা-কানুন জানতে হবে। অবলম্বন করতে হয় কৌশলের। সঠিক পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারলে ধনী হতে পারবেন আপনিও।
আপনার পেশার পাশাপাশি রাজনীতিকে ঢাল বানিয়ে লক্ষে পৌঁছাতে পারবেন। ধান্দা হবে যেকোনো ভাবে মাল কামানো, টাকা বানানো। মনে রাখতে হবে যে, আপনি দলের নন। দল হবে আপনার স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার। লক্ষ্মীপুরের এমপি কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুলের এমপি হওয়ার প্রক্রিয়াকে আপনি উদাহরণ হিসেবে নিতে পারেন। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পরিচালক (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ-২) মোবারক হোসেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কর্মকর্তা মতিউর রহমানের পথও অনুসরণ করতে পারেন।
অথবা পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যানের গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীকেও আইডল হিসেবে নিতে পারেন। আবেদ আলী ড্রাইভিং শিখে পিএসসিতে চাকরি পাওয়ার পরই তার ভাগ্য খুলতে থাকে। বর্তমানে তিনি বিপুল সম্পত্তির মালিক। গ্রামের মানুষ তাকে অনেক পছন্দ করেন। তারা সৈয়দ আবেদ আলীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ মানতে পারছেন না। টাকা পেলে খেটে-খাওয়া আর চেটে-খাওয়া উভয় ধরনের মানুষই আপনার পক্ষে কথা বলবে। এভাবে যদি ঠিকঠাক মতো টাকা ছিটাতে পারেন, তাহলে আপনার বিজয় নিশ্চিত।
আপনাকে মনোনিবেশ করতে হবে টাকা কামানোর খেলায়। মনে রাখবেন, যেকোনো বড় কাজে মাথাওয়ালাদের ফোনের গুরুত্ব অনেক বেশি। আপনি বিশ্বস্ত লোক ঠিক করুন যে আপনার হয়ে নগদ গুনে নেবে। তাকেও নজরদারিতে রাখুন। দুয়েকজন চামচা গোছের ব্যক্তিকে গোয়েন্দা হিসেবে লাগিয়ে রাখুন। তবে তাদের পেমেন্টে নিয়ে কোনো ঝামেলা করবেন না। স্ত্রী-সন্তানকেও জুড়ে নিন সঙ্গে।
উন্নয়নসংক্রান্ত কাজে রয়েছে সীমাহীন টাকা। রাস্তা নির্মাণ, ব্রিজ নির্মাণ, হাসপাতাল নির্মাণ। ঠিকাদাররা আপনার বাসায় আসবেন। এখন ডিজিটাল বাংলাদেশে টাকাই সবচেয়ে বড় উপহার। টেন্ডার নিয়ে আলোচনা হবে, ভাগবাঁটোয়ারা চু’ড়ান্ত হবে। কোনো কোনো ঘাড়ত্যাড়া সরকারি কর্মকর্তা আপনার কথা নাও শুনতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই কিছু মন্ত্রীর সঙ্গে খাতির তৈরি করতে হবে। আমলাদের সামনে সেই মন্ত্রীর সঙ্গে উচ্চস্বরে রসিকতাপূর্ণ আলাপ করে বুঝিয়ে দিতে হবে যে, আপনি তাদের কতোটা আপন। এটা যদি আপনি বোঝাতে পারেন, তাহলে সরকারি কর্মকর্তারা বাপ-বাপ করে আপনার পরামর্শ মেনে নেবে।
নিজে আরও ব্যবসা দাঁড় করান। বানিয়ে ফেলেন রিসোর্টসহ জমি-জমা। মন্ত্রী-এমপিদের ‘বিশ্বস্ত অনুচর’ সেজে কমিশন বা চাঁদাবাজি করেও কোটিপতি হওয়া যায়। এজন্য দরকার হলে মন্ত্রী-এমপির প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রুস্থানীয় কাউকে আপনি বিপদে ফেলে আস্থা অর্জন করতে পারেন। আপনি নিজের একটা ‘সুশীল’ ইমেজ গড়ে তুলেও ফায়দা লুটতে পারেন। বাসায় নিয়মিত ডিজে পার্টি দিন। সেখানে মিডিয়ার হোমড়া-চোমড়াদের ডাকুন। তাদের সঙ্গে সেল্ফি তুলে ফেসবুকে দিন। চাইতো তাদের সন্তানের জন্য একটা দামি উপহার দিন। তাদের বশ করুন, তাহলে তারাই আপনাকে লিফট দেবে। টকশোতে ডাকবে। মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ করিয়ে দেবে। তখন আপনাকে আর ঠেকায় কে?
ততোদিনে আপনার ব্যবসাও ফুলে ফেপে ঢোল হয়ে যাবে। আপনি যদি আমলা হতে পারেন এবং রিজেন্ট, জেকেজির মতো দুই চারটা ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে পারেন, তাহলেই আপনার টেবিলে অটোমেটিক চলে যাবে টাকা। আরও নানান মওকা আপনি পাবেন। সব সময় হাত পেতে নেয়ারও দরকার নেই। এমনিতেই ভাগের অংশ আপনার কাছে পৌঁছে যাবে। আপনি যদি বিচারবিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ হন তবে রায় উল্টাতে টাকার বস্তা আপনার বাসায় পৌঁছে যাবে। আপনি যদি বিদ্যুৎ, গ্যাস, ওয়াসাতে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীও হন, তবে আপনার কোটিপতি হতে বেশি দেরি লাগবে না। অবৈধ সংযোগের বিল আপনার পকেট ভারি করে তুলবে।
রাজস্ব বা কর অফিসে চাকরি করলে দেখেও না দেখার ভান করে কোটিপতি হওয়া যায়। কাস্টমস অথবা বিমানবন্দরে আপনি সুইপার হলেও আপনার কোটিপতি হতে বেশি সময় লাগবে না। পুলিশের বা আনসারের ছোট পোস্টে চাকরি করলেও কোটিপতি হওয়া যায়। এজন্য একটু জায়গা বরাবর পোস্টিং হলেই চলে। অবৈধ মাদক কারবার, মানব পাচার ইত্যাদি করলেও রাতারাতি কোটিপতি হওয়া যাবে।
সরকারি সম্পত্তি অবৈধ দখল করে কোটিপতি হওয়া সহজ। সরকারি ওষুধ রোগীদের না দিয়ে অবৈধভাবে বিক্রি করে কোটিপতি হওয়া যায়। রোগীদের বিভিন্ন টেস্টের কমিশনের টাকা নিয়ে, অথবা টেস্ট না করে ভুয়া রেজাল্ট ধরিয়ে দিয়ে ধনী হওয়া যায়। সাধারণ ভোগ্যপণ্যের সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে সহজে কোটিপতি হওয়া যায়।
বিভিন্ন পদের চাকরির জন্য আলাদা আলাদা রেট ঠিক করুন। চাকরির বাজারে নানা পদের চাকরির সুপারিশ আসবে। পুলিশের কনস্টেবল থেকে বিসিএস অফিসার। কৃষি থেকে সমবায়, প্রাথমিক শিক্ষক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পৌরসভার ঝাড়ুদার থেকে সচিবালয়ের পিয়ন। আপনাকে সব ধরনের চাকরির জন্যই তদবির করতে হবে। চাকরি হওয়া বা না-হওয়া পরের কথা। তবে টেলিফোনে কিছু লোকের সঙ্গে খায়খাতির লাগানোর চেষ্টা করুন। সব সুপারিশই যেন ব্যর্থ না হয়। মানুষ তাহলে অবিশ্বাস করবে।
নিত্যনতুন কুটকৌশল আর নেটওয়ার্ক মেইনটেন করে নিমিষেই শত কোটিপতি হয়ে ওঠার আরেকটি নিশ্চিত পথ হলো ইয়াবা কারবার। প্রধানমন্ত্রীর কঠোর ভূমিকায় মাঝে এ ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়লেও তা বন্ধ হয়নি মোটেও।
তবে কোটিপতি হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে তদবির বাণিজ্য। ধোপদুরস্ত পোশাক পরিচ্ছদ, চলনে বলনে ওভারস্মার্ট- আর সবকিছুর উপরে একটা মুজিবকোর্ট জড়াতে পারলেই সোনায় সোহাগা। পদ-পদবী থাকুক না থাকুক তাতে কোনো সমস্যা নেই। কোনো জনসভা, মিছিলে অংশ নেয়ার কিংবা নেতার সঙ্গে ছবি তোলা থাকলে তো কথাই নেই। বার বার তা মোবাইল স্ক্রীনে প্রদর্শন করেই তদবিরের আসল বাণিজ্যে নেমে পড়েন এসব ধান্ধাবাজ।
বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর কোনো দেশেই কিন্তু কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার মালিক হওয়া সহজ কাজ নয়। অন্য সব দেশে এর জন্য অনেক পরিশ্রম করতে হয়। একটু একটু করে, অনেক সাধ্য-সাধনার পর টাকার মালিক হওয়া যায়। ধনী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায়। পুঁজিবাদী দেশগুলোতেও পুঁজি গড়ে ওঠে ধীরে এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে। আমেরিকার বিল গেটস, ফোর্ড, কার্নেগি, রকফেলার; জার্মানির ক্রুপস, জাপানের মিৎসুবিশি, মিৎসুই থেকে শুরু করে ইন্ডিয়ার টাটা-বিড়লা পর্যন্ত কেউই পারমিটবাজি বা নিছক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দুই-দশ বছরের মধ্যে নিঃসম্বল অবস্থা থেকে কোটিপতিতে পরিণত হননি।
কিন্তু বাংলাদেশে টাকার কুমির হওয়ার জন্য তেমন কোনো সাধনা বা পরিশ্রম করতে হয় না; এখানে ‘অলৌকিক’ উপায়ে রাতারাতি ধনবান হওয়া যায়। পাকিস্তান আমলে মাত্র ২২টি পরিবারের কোটিপতি হিসেবে খ্যাতি ছিল। ঐ ২২ পরিবারের কোটিপতি হওয়ার পেছনেও অবশ্য রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য ও ভোজবাজি কাজ করেছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কোটিপতি হওয়ার এই ধারা আরো অনেক বেশি বিকশিত হয়েছে। এখন আমাদের দেশে কোটিপতির মোট সংখ্যা কেউ জানে না। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এখন কোটিপতির সংখ্যা অন্তত ৫ লাখে পরিণত হয়েছে।
কোটিপতি সৃষ্টির এই যে জাদুকরি ব্যবস্থা, একে কি কোনোভাবে খাটো করে দেখা চলে? ২২ পরিবার থেকে অযুত-নিযুত কোটিপতি পরিবার, এটাই হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের সবচেয়ে বড় সুফল! নব্য কোটিপতিদের ইশারায় দেশ চলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেমন কোটিপতির ছড়াছড়ি, সে সংখ্যার দিক থেকে আমরা সম্ভবত খুব শিগিগর তাদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছে যাব।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশে সাধারণত আইনের আওতার মধ্যে এদিক-সেদিক অনেক ঝকমারি করে বড়লোক বা কোটিপতি হতে হয়। আর এখানে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার নিয়ম। রাতে ফাটা স্যান্ডেল, ছেঁড়া জুতা তো সকালেই নতুন বাড়ি, নতুন গাড়ি। ভাঙা সুটকেসওয়ালাও কোটিপতি বনে যায়। আমাদের দেশের কোটিপতিরা নামকাওয়াস্তে শিল্পকারখানা দেখিয়ে ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত দেন না। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ‘সিক’ দেখিয়ে আরো টাকা নেওয়ার অথবা ঋণ মওকুফের চেষ্টা চালান।
এদেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি বা বেসরকারিকরণের নামে পানির দামে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, এই প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে এখনো অব্যাহত রয়েছে। আর এসব প্রতিষ্ঠান কিনে যেমন, বেচেও তেমনি অনেকেই কোটিপতি বনে গেছেন। পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে কোটিপতি তৈরির পথ সুগম রাখা হয়েছে।
এছাড়া রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য নিয়ে মানব পাচার, মাদক কারবার, অস্ত্র ব্যবসাসহ আরো নানান অবৈধ ব্যবসা করে কোটিপতি তৈরির এক মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছে। সরকারি লাইসেন্স-পারমিটবাজি, কমিশন-সুদ-ঘুষ, চাঁদাবাজি ইত্যাদির মাধ্যমে কোটিপতি সৃষ্টির প্রয়াস তো আছেই। ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এবং তা মেরে দিয়ে কোটিপতি হওয়ার এমন কাহিনি পৃথিবীর অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
এ এক আশ্চর্য নীতির দেশ বটে! এখানে রাজউকের কর্মচারীরাও কোটিপতি। বিমানবন্দর, কাস্টমের ঝাড়ুদারও কোটিপতি। তহসিল অফিসের কেরানি, টেক্সট বুক বোর্ডের পিয়ন, শিক্ষা অধিদপ্তরের দারোয়ান, পুলিশের সেপাই, আদালতের পেশকার প্রমুখ ব্যক্তিও অবৈধ আয়ের জোরে কোটিপতি। আর একবার কোটিপতি হয়ে গেলেই তাদের হাব-ভাব-স্বভাব সবকিছু পাল্টে যায়। তারা তখন দেশ নয়, বিদেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। আরো-আরো অর্থ কামানোর অবারিত পথ খোঁজেন। শুধু টাকাই নয়, তখন একটু ক্ষমতার স্বাদও নিতে চান। ধনী হওয়ার আরও নানান উপায় আছে। এজন্য আপনার অপরিসীম লোভ ও টাকার ক্ষুধা থাকতে হবে। লাজ, লজ্জা, ভয়, বিবেকের দংশন বিসর্জন দিতে হবে। ধনাঢ্য হতে প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। ধরা পড়লে বা ফেঁসে গেলে কী হবে? বাইরের কোনো দেশে ‘সেকেন্ড হোম’ বানান। বিপদ দেখলে কেটে পড়ুন। আর যদি ধরা পড়েই যান তাহলে তেমন কিছুই হবে না! বড় জোর দু-চার বছরের জেল। যাবজ্জীবন হলেই বা ক্ষতি কী? একদিন তো মরেই যাবেন!
ইউডি/এআর

