অধিকারবোধের নিরাপদ দুর্গ হবে বিচার বিভাগ: প্রধান বিচারপতি

অধিকারবোধের নিরাপদ দুর্গ হবে বিচার বিভাগ: প্রধান বিচারপতি

উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৪, আপডেট ১৫:৫৫

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেছেন, একটি ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থার কাজ হলো নিরপেক্ষভাবে স্বল্প সময় ও খরচে বিরোধের মীমাংসা নিশ্চিত করে জনগণ, সমাজ, রাষ্ট্রকে সুরক্ষা দেওয়া। এ জন্য বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভা থেকে পৃথক ও স্বাধীন করা সবচেয়ে জরুরি। কেননা শাসকের আইন নয়, বরং আইনের শাসন করাই বিচার বিভাগের মূল দায়িত্ব। সারা দেশের অধস্তন আদালতের বিচারকদের উদ্দেশে শনিবার (২১ সেপ্টেম্বর) অভিভাষণে এ কথা বলেন প্রধান বিচারপতি। সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবনের ইনার গার্ডেনে এই অভিভাষণের আয়োজন করা হয়। বক্তব্যের শুরুতে প্রধান বিচারপতি বলেন, বিগত বছরগুলোতে বিচার বিভাগের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। ন্যায়বিচারের মূল্যবোধকে বিনষ্ট ও বিকৃত করা হয়েছে। শঠতা, বঞ্চনা, নিপীড়ন ও নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে বিচার বিভাগের ওপর মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। অথচ বিচার বিভাগের সবচেয়ে শক্তির জায়গা হচ্ছে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস। তাই নতুন এই বাংলাদেশে আমরা একটা বিচার বিভাগ গড়তে চাই যেটি, সততা ও অধিকারবোধের নিশ্চয়তার একটি নিরাপদ দুর্গে পরিণত হবে।

বিচারকদের পদায়ন-পদোন্নতি-শিগগির নীতিমালা প্রণয়ন হবে: অভিভাষণে প্রধান বিচারপতি বলেন, বর্তমানে বিচারকদের পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো ঘোষিত নীতিমালা নেই। ফলে পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনেক সময়ই বিচারকেরা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। এ বিষয়ে যথোপযুক্ত নীতিমালা দ্রæত প্রণয়ন করব। শুধু বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা হিসেবে সংবিধানের ৯৫(২) অনুচ্ছেদে যে বিধান রয়েছে কেবল সেটুকু নিশ্চিত করে বিচারক নিয়োগের ফলে সুপ্রিম কোর্টে এক অভ‚তপূর্ব অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনেক ক্ষেত্রেই রাজনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা হিসেবে পালন করেছে। এটি ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। তাই উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে অন্যান্য দেশে অনুসৃত আধুনিক পদ্ধতিগুলো বিবেচনায় নিয়ে দেশে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে একটি কলোজিয়াম ব্যবস্থা চালু করতে সচেষ্ট হওয়ার কথাও জানান প্রধান বিচারপতি।

বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় জরুরি : প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার স্বার্থে মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখন আবশ্যক। দেশের সংবিধানের ১১৬ ক অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতের বিচারকেরা বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন বলে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বিচারকদের প্রকৃত স্বাধীনতা তত দিন পর্যন্ত নিশ্চিত হবে না, যত দিন না বিচার বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান দ্বৈত শাসনব্যবস্থা অর্থাৎ, সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের যৌথ এখতিয়ার সম্পূর্ণরূপে বিলোপ করে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। এটিই হবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকল্পে প্রয়োজনীয় সংস্কারের প্রথম ধাপ।

সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের মতো বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য পরিপূর্ণ প্রস্তাব প্রস্তুতক্রমে আমরা শিগগিরই আইন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করব। এই প্রস্তাব দ্রæত বাস্তবায়নের জন্য আমি প্রধান উপদেষ্টা ও মঞ্চে উপবিষ্ট আইন উপদেষ্টার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, কোনো সন্দেহ নেই যে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর মধ্যে প্রধান সমস্যা হচ্ছে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ কার্যকররূপে পৃথক না হওয়া। এর কুফল আমরা সবাই ভোগ করেছিলাম দেড় দশক ধরে। এ ছাড়া আছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব। মামলা অনুপাতে বিচারকের নিদারুণ স্বল্পতা, বার ও বেঞ্চের মধ্যে…মনোভাবের ঘাটতি, আদালতগুলোর অবকাঠামোগত সংকট, অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য নীতিমালা না থাকা, উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগ ও স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে কোনো আইন না থাকা এবং প্রথাগত জ্যেষ্ঠতার নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন ইত্যাদি বিষয়গুলো, যা আমাদের বারবার পিছিয়ে দিয়েছে। বিচার বিভাগ যেন স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে সে জন্য জরুরি ভিত্তিতে বিচার বিভাগের কিছু সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সহযোগিতা কামনা করেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, এই সংস্কারের উদ্দেশ্য হবে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের যে আস্থার সংকট হয়েছে, তা দ্রুত দূর করে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী, আধুনিক, দক্ষ ও প্রগতিশীল বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading