জাতীয় কন্যাশিশু দিবস আজ: আগামীর বাংলাদেশ ও কন্যাশিশুদের ভবিষ্যৎ

জাতীয় কন্যাশিশু দিবস আজ: আগামীর বাংলাদেশ ও কন্যাশিশুদের ভবিষ্যৎ

উত্তরদক্ষিণ। সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর), ২০২৪, আপডেট ১৪:৫৫

আসাদ এফ রহমান: আজ সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। প্রতি বছর এই দিনে বাংলাদেশে জাতীয় কন্যা-শিশু দিবস পালিত হয়। নারীরা যেন বৈষম্যের শিকার না হন, সেদিকে লক্ষ্য রেখে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য নিয়ে সরকার ২০০০ সালে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় কন্যা-শিশু দিবস পালনের আদেশ জারি করে। ওই আদেশে বলা হয়, শিশু অধিকার সপ্তাহ (২৯ সেপ্টেম্বর হতে ৫ অক্টোবর) মধ্যে একটি দিন অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বর কন্যা-শিশু দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘কন্যাশিশুর স্বপ্নে গড়ি আগামীর বাংলাদেশ’।

প্রসঙ্গত, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র সমূহে ২০১২ সাল থেকে প্রতিবছরের ১১ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস। সারা বিশ্বেই কোনো না কোনো জায়গায় প্রতি মুহূর্তে অবহেলার শিকার হচ্ছে কন্যা-শিশু। পরিবার ছাড়াও সামাজিকভাবেও তারা হচ্ছে বিভিন্নভাবে নির্যাতিত। সামাজিক, রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্রসহ সমস্ত স্থানে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ দূরীকরণ হলও কন্যা-শিশু দিবস অন্যতম উদ্দেশ্য। গৃহ-পরিবেশে একজন পুত্রসন্তানকে যেভাবে গুরুত্ব সহকারে আদর-যত্নে লালনপালন, শিক্ষার প্রতি যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেভাবেই একজন কন্যা-শিশুর মানসিক নিপীড়নের হাত থেকে মুক্ত করার কথাই উচ্চারিত হয়ে থাকে এ দিবসে।

বিশ্লেষকগণ বলছেন, বিশ্বজুড়ে নারী ও কন্যা-শিশুদের প্রতি সহিংসতা ও নৃশংসতার ঘটনা বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৫ শতাংশ শিশু, যাদের বয়স আঠারো বছরের কম। আর শিশুদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ কন্যা-শিশু যাদের পিছনে রেখে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাইতো কন্যা-শিশুদের জন্য বিনিয়োগ হবে যথার্থ বিনিয়োগ। কারণ আজকের কন্যা-শিশুই আগামী দিনে গড়ে তুলতে পারবে একটি শিক্ষিত পরিবার ও বিশ্ব-সভায় নেতৃত্ব দানে পারদর্শী সুযোগ্য সন্তান। আর সারা বিশ্বেই নানা কারণে কন্যা-শিশুরা বেশ অবহেলিত।

১০ থেকে ১৪ বছর-দরকার বাড়তি দৃষ্টি: দেশের বিভিন্ন জরিপ এবং গবেষণায় ১৫ থেকে ১৮-১৯ বছরের মেয়েরা গুরুত্ব পায়৷ কিন্তু ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সি কন্যা শিশুরা কী অবস্থায় আছে তার চিত্র পরিসংখ্যানে স্পষ্ট নয়৷ জাতিসংঘের শিশু-বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শীর্ষ স্থানীয় দেশগুলোর একটি৷ বাংলাদেশে ১৮ শতাংশ মেয়ের ১৫ বছর বয়সের মধ্যে বিয়ে হয়৷ ১৮ বছর বয়সের মধ্যে ৫২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়৷ সেভ দ্য চিল্ড্রেনের তথ্য অনুসারে, ১০ বছর বয়সি কন্যা শিশুদের অনেক বেশি বয়সি পুরুষদের সঙ্গে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়৷ আসলে শিক্ষা নারীর ক্ষমতায়নের চাবিকাঠি। শিক্ষা কন্যা শিশুর উন্নয়ন, বাল্যবিবাহ রোধ এবং শিশু মৃত্যুর হার কমানোর নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং প্ল্যান বাংলাদেশের এক যৌথ জরিপ মতে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত লেখাপড়া করা ২৬ শতাংশ নারীর বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগে। নিরক্ষর নারীদের বেলায় এই সংখ্যা ৮৬ শতাংশ। সরকার বিগত বছরগুলোতে ছাত্রী ও নারীদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ উৎসাহিত করার জন্য নারীবান্ধব কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। যার ফলে প্রাথমিক, মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলসমূহে ছাত্রী অনুপ্রবেশ এবং লিঙ্গ সমতা নিশ্চিতকরণে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হয়েছে।

এমন একটি দেশ চাই যা হবে শিশু বান্ধব

শহীদ রানা: সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমিন মুরশিদ বলেছেন, আমরা এমন একটি দেশ চাই যে দেশ হবে শিশু বান্ধব। এমন একটি সমাজ চাই যে সমাজ হবে শিশুর মুক্ত চিন্তার উৎকৃষ্টতম স্থান। প্রতিটি পাড়া মহল্লায় শিশুদের জন্য থাকবে খেলাধুলার স্থান, বেড়ে ওঠার নির্মল পরিবেশ। আমরা বিজ্ঞান ভিত্তিক মুক্ত চিন্তার সমাজ চাই। রবিবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে ‘বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহ ২০২৪’ উদযাপনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘কন্যাশিশুর স্বপ্নে গড়ি আগামীর বাংলাদেশ’। শারমিন মুরশিদ বলেন, আমরা চাই প্রতিটি পাড়া মহল্লায় থাকবে শিশুর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ। আমরা বিজ্ঞান ভিত্তিক মুক্ত চিন্তার সমাজ চাই। আমাদের বর্তমান সভ্যতা আসলে বিজ্ঞান ভিত্তিক সভ্যতা। যে সভ্যতায় উদ্ভাবিত সব প্রযুক্তি এই বৈজ্ঞানিক নিয়ম-কানুনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। উপদেষ্টা আরও বলেন, জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে আমাদের সন্তানেরা যখন গুলি খেয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পরলো। তখনই আমাদের আপনাদের বিবেক নাড়া দিয়েছে, আর না এখনই রুখতে হবে। শিশুদের সঙ্গে মা-বাবা শিশুর সুরক্ষায় তার পাশে অধিকার আদায়ে সংগ্রামে রাজপথে নেমে এসেছে। আমরা আর ৫ আগস্টে ফিরে যেতে চাই না।

শারমিন মুরশিদ

নৈতিকতা যদি না থাকে শিশুদের কি শিক্ষা দিবো?: তিনি আরও বলেন, আমরা সত্যকে সত্য বলিনি, অন্যায়কে সহ্য করেছি মুখ বুঝে। আমাদের নীতি নৈতিকতা বধির হয়ে গিয়েছিল। আমাদের নিজেদের মধ্যে নৈতিকতা না থাকলে শিশুদের কি শিক্ষা দিবো? আজকের শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তি এবং জ্ঞানের যায়গায় থেকে অনুপ্রাণিত করতে হবে। আমরা কেনো আমাদের শিশুদের নিরাপত্তা দিতে পারছিনা বলে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের এই শিশুরাই ছিল অগ্রভাগের সৈন্য। এই শিশুরাই এনে দিয়েছে নতুন এক বাংলাদেশ। তাদেকে একটি সুন্দর নিরাপদ বাংলাদেশ উপহার দেয়া আমাদের দায়িত্ব। আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে, মানুষকে সম্মান দিতে হবে।

আজকের শিশু আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, দেশ সংস্কারক ও উদ্যোক্তা উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, শিশুদের আনন্দ দিতে হবে। আনন্দের মধ্য দিয়ে নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ, শিষ্টাচার ও পড়াশোনা শেখাতে হবে। পড়াশোনার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজ শেখাতে হবে। এতে তার চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি পাবে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সেভ দ্যা চিলড্রেন বাংলাদেশের পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন।অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্ত্য রাখেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মহাপরিচালক তানিয়া খান।

গত ৮ মাসে ধর্ষণের শিকার ২২৪ কন্যা শিশু

রিন্টু হাসান : চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২২৪ কন্যা শিশু। একই সময়ের মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ৮১ জন এবং আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে ১৩৩ কন্যা শিশু। জাতীয় কন্যা শিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের আয়োজনে চলতি মাসে ‘কন্যা শিশুর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন উপস্থাপন’ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানা যায়। দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক থেকে সংগৃহীত তথ্যের ওপর তৈরি করা মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় কন্যা শিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর সৈয়দা আহসানা জামান (এ্যানী)।

তিনি বলেন, বর্তমানে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া সত্তে¡ও ধর্ষণ যেন প্রতিযোগিতা করে বেড়েই চলেছে। গত ৮ মাসে মোট ২২৪ কন্যা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া ৩২ কন্যা শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে একক ধর্ষণের শিকার ১৩৪ জন, গণধর্ষণের শিকার হয় ৩৩ কন্যা শিশু, প্রতিবন্ধী কন্যা শিশু রয়েছে ৯ জন। তিনি আরও বলেন, ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী ভেদে কেউ বাদ যায়নি এই জঘন্যতম বর্বর আচরণ থেকে। প্রেমের অভিনয়ের ফাঁদে ফেলে ৩৫ কন্যা শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ধর্ষণ ও গণধর্ষণের মতো জঘন্যতম অপরাধের শিকার হতে হচ্ছে এক বছর বয়সের শিশুদেরও। যারা যৌনতা বোঝা তো দূরের কথা, কথা বলতেও শেখেনি।

অ্যাডভোকেসি ফোরামের প্রত্যাশা ও দাবি: পরিবর্তিত ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ গড়তে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম ১১টি প্রত্যাশা ও দাবি জানিয়েছে। এগুলো হচ্ছে-যৌন হয়রানি, উত্ত্যক্তকরণ ও নিপীড়ন রোধে সর্বস্তরের জন্য ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’ নামে একটি আইন জরুরি ভিত্তিতে প্রণয়ন করা। শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার সব ঘটনাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা। ধর্ষণের ঘটনার অভিযোগ এলে ধর্ষণের শিকার নারী ও কন্যার পরিবর্তে অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই প্রমাণ করতে হবে যে, সে এ ঘটনা ঘটায়নি, এ সম্পর্কিত প্রচলিত আইনের বিধান সংশোধন করা। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী বাধ্যতামূলকভাবে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল গঠনের কঠোর নির্দেশনা মনিটরিংয়ের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা, যেন যৌন নিপীড়নের যেকোনো ঘটনার বিচার করা যায়। এ সংক্রান্ত জোরালো নির্দেশনা প্রতিটি অফিস-আদালতেও প্রণয়ন করা, যাতে একজন নারী বা কন্যাশিশু কোনোভাবেই যেন তার সহকর্মী, শিক্ষক বা বন্ধু কারও দ্বারা নিপীড়নের শিকার না হন। কন্যাশিশু নির্যাতনকারীদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করা। শিশু সুরক্ষায় শিশুদের জন্য একটি পৃথক অধিদপ্তর গঠন করা।

বাল্যবিবাহ বন্ধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা কার্যক্রম বৃদ্ধি করা। বর্তমানে বেশিরভাগ শিশুই স্মার্টফোনের মতো ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে। তাই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির নেতিবাচক দিক থেকে তাদেরকে রক্ষার জন্য উচ্চপর্যায়ের আইসিটি বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় সব ধরনের পর্নোগ্রাফিক সাইট বন্ধ করা। সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ বাস্তবায়ন করা এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। একজন কন্যাশিশুও যেন পর্নোগ্রাফির শিকার না হয় তা নিশ্চিত করা। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাজেট বৃদ্ধি করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কন্যাশিশু ও তাদের অভিভাবকদের এর আওতায় আনা এবং ক্রমবর্ধমান কন্যাশিশু ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নারী-পুরুষ, সরকার, প্রশাসন, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া, পরিবার সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং পাশাপাশি তরুণ ও যুবসমাজকে সচেতনকরণ সাপেক্ষে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাদেরকে যুক্ত করা।

কন্যা শিশু বঞ্চনার শিকার হলে জাতিকে মাশুল দিতে হবে

সাদিত কবির: জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, কন্যা শিশু যদি বঞ্চনার শিকার হয়, তাহলে পুরো জাতিকে এর মাশুল দিতে হবে। আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে ভালো করলেও পুষ্টির ক্ষেত্রে ভালো করতে পারিনি। কারণ মূলত হচ্ছে কন্যা শিশুদের প্রতি অবহেলা ও তাদের প্রতি যথাযথ বিনিয়োগ না করা। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জন্মের পর থেকেই ছেলে শিশুদের তুলনায় কন্যা শিশুদের অপুষ্টির হার সব থেকে বেশি। এমনকি অতীতে কন্যা শিশুরাই স্কুলে যাওয়া থেকে বঞ্চিত হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রে স্কুলে তাদের নাম লেখা থাকে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে তারা স্কুলে যায় না। বিদ্যা অর্জন থেকে তারা বঞ্চিত হয়। পাশাপাশি কন্যা শিশুদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। তাদের যাদের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়, তাদেরও বয়স এই অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাদের তুলনায় অনেক বেশি। এর ফলে তারা অল্প বয়সে গর্ভবতী হয়ে যায়। যে কারণে মা ও শিশু দুজনই অপুষ্টিতে ভোগে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার

সমাজ বিশ্লেষকগণের মতে, আমাদের দেশের কন্যারা বর্তমান সমাজে নিরাপদ নয়। সমাজের বিভিন্ন পদে চলতে গেলে নানা ধরনের বিপদে পড়ে হয় তাদের। এমনকী শিশুকন্যারা এখন নিজের কাছের মানুষদের কাছেও নিরাপদ নয়। তাই পরিবারের অভিভাবকদের উচিৎ শিশুকন্যাদের সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া। আমাদের দেশে ছেলেদের থেকে কন্যাসন্তানরা সব কিছুতে অবহেলিত। কোনো কোনো পরিবারে মানুষ মনে করে ছেলেরা আমাদের দেখবে, মেয়েরা তো আর দেখবেনা। তাকে বিয়ে দিয়ে অন্যের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে তাদের এতো পড়াশোনা করিয়ে কী হবে। আবার বাইরে গিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রেও বাধা দেওয়া হয়। তো সবদিক থেকেই দেখা যায় আমাদের দেশের কন্যা-শিশুরা অবহেলিত ও নির্যাতিত।

আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় ১৩৩ জন: সৈয়দা আহসানা জামান বলেন, গত ৮ মাসে ৮১ কন্যা শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এর অন্যতম কারণ ছিল পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আগে থেকে পারিবারিক শত্রুতার জের, ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন। পাশাপাশি ২০ কন্যা শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু কেন মৃত্যু হয়েছে, এ সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো কারণ বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। আত্মহত্যার তথ্য তুলে ধরে এ্যানী বলেন, কন্যা শিশুরাই শুধু নয়, কোনো একজন শিশু আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে এটি মোটেও কাম্য নয়। এর মাধ্যমে পরিবার, সমাজ এমনকি রাষ্ট্রের ওপরও দায়ভার এসে পড়ে। কিন্তু গত ৮ মাসে ১৩৩ কন্যা শিশু আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। এর পেছনে মূলত যে কারণগুলো কাজ করেছে তা হলো- হতাশা, পারিবারিক মতানৈক্য বা দ্বন্দ্ব, প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হওয়া এবং যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ, যা নির্ভয়ে প্রকাশ করার মতো কোনো আশ্রয়স্থল না থাকা।

সব শিশুর জন্যই চাই সমঅধিকার

মহোসু: বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম গণমাধ্যমকে বলেন, জাতিসংঘের শিশু সনদ আইন আমরা বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছি। সেখানে কন্যাশিশু বা পুত্রশিশুকে আলাদা করে দেখা হয়নি। সব শিশুর জন্যই সমঅধিকারের কথা বলা হয়েছে। সব শিশুই যেন তার অধিকারগুলো পায় তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। তারপরও কন্যাশিশু যে তার সব অধিকার ভোগ করতে পারছে এ কথা বলা যাবে না। শিশুর জেন্ডার শনাক্তকরণের পরবর্তী ধাপে শিশুর প্রতি ব্যবহার পরিবর্তিত হয়ে যায়। যদিও সেটা হওয়ার কথা নয়। সেটা আমাদের চাওয়া নয়।

আমরা চাই, প্রতিটি শিশু সে কন্যাশিশু হোক বা পুত্রশিশু হোক, তার অধিকার সমভাবে নিশ্চিত করতে হবে। সমান ব্যবহার করতে হবে সবার সঙ্গে। কন্যাশিশুর বেলায় আরও তিনটি অধিকারের কথা আমি বলব, যা নিশ্চিত করা খুবই প্রয়োজন। এক. বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করা, দুই. বাল্যবিয়ে রোধ করা, তিন. কন্যাশিশুর ওপর সহিংসতা প্রতিরোধ করা। এগুলো পরিবার থেকে নিশ্চিত করতে হবে। তারপর সমাজ-রাষ্ট্র থেকেও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারেও কন্যাশিশু নিরাপদ নয়, সে বিভিন্ন সহিংসতার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে। বাড়িতে একজন অতিথির আগমনকে আমরা যেভাবে স্বাগত জানাই, পুত্রসন্তান হলে আমরা যেভাবে নতুন শিশুটিকে স্বাগত জানাই, কন্যাশিশুকেও পরিবারের স্বাগত জানাতে হবে। উত্তরাধিকারী হিসাবে তাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। তবেই কন্যাশিশুর জন্য আমরা একটি সুন্দর পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র দিতে পারব।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ৩০ সেপ্টেম্বর। প্রথম পৃষ্ঠা

বিশ্লেষকদের মতে, কন্যা-শিশুর অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করতে হবে পুরুষকে। আমাদের সমাজে এখনও কন্যা সন্তানকে বোঝা মনে করা হয়। আর দেশের শিশুকন্যা সন্তানরা এখনও একেবারেই নিরাপদে নেই। সরকার নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু তারপরেও শিশুকন্যারা নিরাপদে নেই। কেন নেই তার ব্যাখ্যা দিয়ে বিশ্লেষকদের দাবি, সমাজের মানুষরা সচেতন না। বাংলাদেশে কত কন্যা ভ্রæণ হত্যা হচ্ছে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে ২০১৪ সালে আমেরিকাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গুতম্যাকার ইনস্টিটিউটের এক জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১১ লাখ ৯৪ হাজার স্বপ্রণোদিত গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে। নানা কারণে এসব গর্ভপাত ঘটানো হয়। তবে উদ্বেগের চিত্রটি হলো, অনেক দম্পতি ছেলে সন্তানের আশায় থাকে। বাচ্চা পেটে আসলে যখন জানতে পারেন যে, তাদের ছেলে নয় কন্যা সন্তান হবে। তারপর এমআরের মাধ্যমে তাদের কন্যা সন্তানটিকে নষ্ট করে ফেলেন। বিশ্লেষকগণ বলছেন, যেভাবেই ভ্রæণ হত্যা করা হোক না কেন, এটা একটি উদ্বেগজনক বিষয় এবং এটা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading