ইরানের সঙ্গে কী পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াচ্ছে ইসরায়েল?

ইরানের সঙ্গে কী পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াচ্ছে ইসরায়েল?

উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৪, আপডেট ১৫:৪০

ইরানে পাল্টা হামলা ইস্যুতে সিদ্ধান্তহীনতায় ইসরায়েল

আরাফাত রহমান : ইরানে আক্রমণের ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি ইসরায়েল। গত বৃহস্পতিবার রাতে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা বৈঠকে বসলেও সেখান থেকে বড় কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। ইসরায়েলি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো এ তথ্য জানিয়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তা টাইমস অব ইসরায়েলকে বলেছেন, মন্ত্রীরা কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিক্রিয়া কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে মার্কিনিদের সঙ্গে সমন্বয় করার ইচ্ছা ইসরায়েলের আছে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে কৌশলগত আলোচনা অব্যাহত।

ইসরায়েলি সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল-১২-এর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল মন্ত্রিসভা ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্তকে ইরানের ওপর হামলা চালানোর ব্যাপারে চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়নি। এমনকি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও এককভাবে এই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না বলে জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে। চ‚ড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রীদের অনুমোদন দরকার পড়বে। প্রয়োজন হলে টেলিফোনেও সেই অনুমতি নেওয়া যাবে। এর আগে গত ১ অক্টোবর ইরান ইসরায়েলে প্রায় ২০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। সেই হামলায় ইসরায়েল কোনো ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার না করলেও ইরান দাবি করেছে, তাদের ৯০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্রই ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। তেহরান সে সময় এ-ও দাবি করেছিল যে, গুপ্তহত্যার শিকার হামাসের প্রয়াত প্রধান ইসমাইল হানিয়া, ইসরায়েলি হামলায় নিহত হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহর মৃত্যুর প্রতিশোধ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে।

হোয়াইট হাইসের দিকে সবার নজর: আলোচনা শুরু হয় যে ইসরায়েল হয়তো ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাবে। কিন্তু বিষয়টিতে আমেরিকার সায় নেই। তবে আমেরিকা জানিয়েছে, ইরানকে এই হামলার মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলাকে আমেরিকা সমর্থন করে কি না। জবাবে বাইডেন বলেছিলেন, উত্তর হলো, না।’ পাশাপাশি বাইডেন জানিয়েছেন, ইসরায়েল যদি ইরানের তেল স্থাপনায় হামলা চালাতে চায়, সেটাতেও সায় দেবে না আমেরিকা।

এদিকে, আমেরিকার এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম এক্সিওস জানিয়েছে, ইসরায়েলের মিত্ররা মনে করেন, ইসরায়েল সঠিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এই সংবাদমাধ্যমকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমেরিকা মনে করে ইসরায়েলের পরিকল্পনা এখনো অনেক আগ্রাসী। এদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর আমেরিকা সফরের কথা ছিল। কিন্তু তার সেই সফর এখনো প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পায়নি। মূলত, ইরান আক্রমণের বিষয়টি আলোচনার জন্য আমেরিকা সফরে যাওয়ার কথা ছিল গ্যালান্তের।

গত সপ্তাহেই ইয়োভ গ্যালান্তের আমেরিকা সফর করার কথা ছিল, ইসরায়েলে ইরানি আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়া জানানোর বিষয়ে আলোচনা করার জন্য। কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার সফর আটকে দেন। বলেন, এ বিষয়ে তিনিই আগে আমেরিকার সঙ্গে কথা বলবেন। এরই মধ্যে নেতানিয়াহু আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে আলাপ করেছেন টেলিফোনে। কিন্তু তাদের মধ্যে কী কী আলোচনা হয়েছে তা নিয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেয়নি তেল আবিব বা ওয়াশিংটন।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

নেতানিয়াহু এখন কী করবেন?

শহীদ রানা: ইসরায়েলের সহযোগীরা দেশটিকে গত সপ্তাহের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রেও ধৈর্য ধারণের আহবান জানিয়েছে। যদিও সব চাপ উপেক্ষা করে ইসরায়েল তার নিজের পথেই চলছে। ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ছায়া যুদ্ধে জড়িত ছিল কিন্তু উভয়পক্ষই সতর্ক ছিল যেন তাদের লড়াই একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে। বড় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার উস্কানি হতে পারে-এমন ভয় থেকেই এটা হতো। চলতি গ্রীষ্মে আমেরিকার পূর্ব অনুমোদন ছাড়াই ইসরায়েল হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ইসরায়েলের দীর্ঘসময়ের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২০ বছরের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছেন যে, উপেক্ষা না করলেও, কীভাবে আমেরিকার চাপ সামলানো যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, নেতানিয়াহু জানেন যে আমেরিকা বিশেষ করে তাদের বর্তমান নির্বাচনের বছরে তাকে তার পথ থেকে সরাতে চাপ দিবে না এবং তিনি বিশ্বাস করেন যে তিনি আমেরিকার শত্রুর বিরুদ্ধেও লড়ছেন। এটা মনে করা ঠিক হবে না যে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের রাজনৈতিক মূলধারার বাইরে গিয়ে কাজ করছেন। সেজন্য হিজবুল্লাহর ওপর শক্ত আঘাত হানার চাপ বাড়তে পারে, এমনকি ইরানের বিরুদ্ধেও। ইসরায়েল সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী যে ধারণা তৈরি হচ্ছে তা হলো ‘তুমি একটা দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র, একজন দুর্বৃত্ত খেলোয়াড়’। একই প্রধানমন্ত্রীকে আমেরিকার একজন প্রেসিডেন্ট চিহ্নিত করলেন ‘অত্যন্ত সতর্ক’ হিসেবে আর তার উত্তরসূরি চিহ্নিত করলেন আগ্রাসী হিসেবে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, হিজবুল্লাহ নয় হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ও ড্রোন ছুড়েছে ইসরায়েলের শহরগুলো লক্ষ্য করে। তেল আবিবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইরান সমর্থিত হুতিরাও বড় ধরণের হামলা চালিয়েছে। ইরানও গত ছয় মাসে দুবার হামলা করেছে। এসব হামলায় পাঁচশর বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ইসরায়েল লেবাননে আগ্রাসন চালিয়েছে। এর কোনো একটিই হয়তো ওই অঞ্চলকে যুদ্ধের দিকে নিয়ে গেছে এবং সত্যি হলো ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীও এসব বিষয়ে কোন ঝুঁকি না নিয়েই তার পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন বলে মনে হচ্ছে।২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন এবং একটি রাজনৈতিক, সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার বিপর্যয়কর দিন। এ দুটি বিষয়ই ইসরায়েলকে চলমান যুদ্ধে জড়িত হতে সহায়তা করে।

ইসরায়েলে হামাসের হামলার মাত্রা ও ব্যাপকতা ইসরায়েলি সমাজ ও এর নিরাপত্তাবোধের ওপর প্রভাব ফেলেছে, যে কারণে এবারের যুদ্ধ সা¤প্রতিক সব সংঘাতের চেয়ে আলাদা। আমেরিকা প্রশাসন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র দিচ্ছে ইসরায়েলকে। আবার প্যালেস্টাইনি বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু ও গাজার দুর্ভোগ তাদের জন্য অস্বস্তির ও রাজনৈতিকভাবেও ক্ষতিকর। এপ্রিলে ইসরায়েলে ইরানের হামলার ঠেকাতে আমেরিকার বিমানও সক্রিয় ছিল। এটি একটি পরিষ্কার প্রমাণ যে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিষয়ে তার সবচেয়ে বড় সহযোগী কতটা ভ‚মিকা রাখে।

সম্ভাব্য হামলার শঙ্কায় ইরান কী বিচলিত?

রিন্টু হাসান: ইসরায়েলে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে শক্তির জানান দিলেও চিরবৈরী ইহুদী রাষ্ট্রটির পাল্টা হামলার মাত্রা যাতে কম কিংবা কার্যত ব্যর্থ হয়, সেজন্য মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে ইরান। তবে কি ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার শঙ্কায় ইরান বিচলিত? আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা জানিয়েছে ইরানের বিচলিত হওয়ার কারণও রয়েছে। ইরানের তেল ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা ঠেকাতে ইসরায়েলকে বোঝাতে আমেরিকা সফল হবে কি না, তা নিয়ে দেশটি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া সম্প্রতি ইসরায়েলের ক্রমাগত আক্রমণে এই অঞ্চলে ইরানের সহযোগী হিসেবে পরিচিত সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়াতেও চিন্তায় ইরান। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো হামলার লক্ষ্য হবে না, এমন কোনো নিশ্চিয়তা গত সপ্তাহ পর্যন্ত মেলেনি ইসরায়েলের কাছ থেকে। ইহুদী দেশটি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার পরিকল্পনা কয়েক দশক ধরেই করছিল। দুই বছর আগেও হামলার একটি সামরিক মহড়াও করেছিল দেশটি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীদের হত্যায় ইসরায়েল জড়িত বলে ধারণা করা হয়। তাছাড়া প্রায়ই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যেসব সাইবার হামলা ঘটনা ঘটে, সেসবের পেছনে ইসরায়েলের হাত থাকে বলে ধারণা করা হয়। ইসরায়েলের বিখ্যাত স্টাক্সনেট ভাইরাস তো ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছিল। স¤প্রতি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেছেন, নেতানিয়াহুই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি যুদ্ধ চান এবং ক্ষমতায় থাকার জন্য এ অঞ্চলে আগুন লাগাতে চান। অন্যদিকে সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে প্রতিনিয়িতই ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে কাতার, এবং সেসব তথ্য আমেরিকাকেও জানানো হয়। কিন্তু আমেরিকার একজন কর্মকর্তা বলেছেন, আমরা আসলে জানি না, ইরান কী করবে।
দেশটির আরেকজন কর্মকর্তা বলেছেন, ইসরায়েল যদি হামলা করে, তার জবাব কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ভিন্ন পরিকল্পনা থাকতে পারে। কিন্তু সেটিও নির্ভর করবে ইসরায়েলের হামলা কতটা শক্তিশালী হয় এবং কতটা সুযোগ পাওয়া যাবে, তার ওপর। আরব ক‚টনীতিক বলেছেন, ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে ইরান মূলত সৌদি আরবের সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি সৌদি আরবের ওপর আমেরিকার যে প্রভাব, সেটিকেও কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে সংঙ্কট সমাধানে। দুই দেশের কর্মকর্তারা এক মাসের কম সময়ের মধ্যে অন্তত তিনবার বৈঠক করেছেন। গত বুধবারও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি সৌদি আরব সফর করেছেন ‘আঞ্চলিক উন্নয়ন’ এবং ‘লেবানন ও গাজায় ইহুদী আগ্রাসন বন্ধের’ বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে।

সবমিলিয়ে ইসরায়েল কীভাবে ইরানের হামলার জবাব দেয়, সেদিকেই এখন পুরো বিশ্বের নজর। তবে অন্তত ‘ইয়োম কিপ্পুর’ উদযাপনে শনিবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইহুদী ধর্মে ‘ইয়োম কিপ্পুর’ দিনটি পবিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়, যেদিনে ইহুদী ধর্মের অনুসারীরা তাদের পাপের জন্য ইশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। যদিও ইরানে যেকোনো সময় ইসরায়েলের হামলা অসম্ভব না। আর সেটি হলে এদিন দোকানপাট, রেস্তোরাঁসহ সব ধরনের পরিষেবার পাশাপাশি তেল আবিবের মূল বিমান বন্দর বেন গুরিয়নও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

আব্বাস আরাগচি

যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তেহরান প্রস্তুত

আরেফিন বাঁধন: হিজবুল্লাহ, হামাসসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকে নিয়ে গঠিত জোট ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে যাবে ইরান। এমনটাই জানিয়েছেন ইরানের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেছেন, এই সমর্থন কেবল রাজনৈতিক বা ক‚টনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না, যখন যেখানে প্রয়োজন সমর্থন দেওয়া হবে। কাতার সফরের সময় দেশটির সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আব্বাস আরাগচি এই অবস্থান ব্যক্ত করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি জানান, ইরান নতুন করে যুদ্ধে জড়াতে চায় বা উত্তেজনাও উসকে দিতে চায়; তবে সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তেহরান প্রস্তুত। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইসরায়েল চাইলে আমাদের ধৈর্য এবং সংকল্পকে পরীক্ষা করতে পারে। আমারও দেখব আক্রমণ কেমন হয় এবং তারপর সতর্কভাবে বিবেচনা শেষে আমরা সিদ্ধান্ত নেব কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো যায়। এ সময় তিনি অভিযোগ করে বলেন, ইসরায়েল একটি বড় ধরনে যুদ্ধ শুরুর পাঁয়তারা করছে এবং কিছু দেশকে এই যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে চাইছে। তবে কেবল ইরান নয়, অনেকেই এ ধরনে যুদ্ধ চায় না। কারণ, সবাই জানে এটা কতটা বিপর্যয়কর। আব্বাস আরাগচি জোর দিয়ে বলেন, প্রতিরোধ অক্ষ ইহুদিবাদী ইসরায়েলের শাসকদের প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা যুদ্ধে তার লক্ষ্য-হামাসকে ধ্বংস করাÍঅর্জন করতে পারেননি এবং তিনি লেবাননে একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন। আরাগচি সাক্ষাৎকারে তার সা¤প্রতিক লেবানন সফরের বিষয়টিও তুলে ধরেন।

ইয়ওয়াভ গ্যালান্ট

হামলা হবে শক্তিশালী সুনির্দিষ্ট: গ্যালান্ট

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়ওয়াভ গ্যালান্ট সম্প্রতি এক কঠোর বার্তায় বলেছেন, ইরানে তাদের হামলা হবে শক্তিশালী। তিনি বলেন, আমাদের হামলা হবে শক্তিশালী, সুনির্দিষ্ট এবং সর্বোপরি বিস্ময়কর। তারা (ইরান) বুঝতেই পারবে না, কী হলো, কীভাবে হলো। এমন পরিস্থিতিতে আরব দেশগুলো অবশ্য পাশে থাকার কথা বলেছে বলে জানিয়েছেন একজন ক‚টনীতিক। যদিও ইরান হুমকি দিয়ে রেখেছে, ইসরায়েলকে সহায়তাকারী যেকোনো দেশকে তারা আগ্রাসনকারী হিসেবে ধরে নেবে এবং এমন প্রতিবেশীরা ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আসবে। কিন্তু সৌদি আরব, আরব আমিরাত এবং কাতার এরই মধ্যে আমেরিকা ও ইরানকে জানিয়ে দিয়েছে, হামলা হলে ইসরায়েলকে তারা তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। জর্ডানও তার আকাশসীমায় যে কোনো অন্রপবেশ প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে। আমেরিকা মনে করে না, ইরান ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াবে।

নতুন হাইকমান্ড গঠন, দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে হিজবুল্লাহ

কিফায়েত সুস্মিত: ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র ইসলামি গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। ইতোমধ্যে গোষ্ঠীটি তার শীর্ষ কমান্ড গঠনের কাজও শুরু করেছে। গোষ্ঠীটির দু’টি উচ্চপর্যায়ের সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা। ইরানের প্রত্যক্ষ মদত ও সমর্থনে ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হিজবুল্লাহ তার জন্মলগ্ন থেকেই ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ধ্বংসের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গত দশকগুলোতে ইসরায়েলের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে ছোটো আকারের সংঘাতে জড়ালেও ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ভূখন্ডে গাজা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী হামাসের হামলা ও তার জবাবে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান ইসরায়েল ও হিজুবুল্লাহকে বড় যুদ্ধের মুখোমুখী করে তোলে। ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তের অপর পাশে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল। হিজবুল্লাহর প্রধান কমান্ড কেন্দ্রসহ গোষ্ঠীটির গুরুত্বপূর্ণ সব সামরিক স্থাপনার অবস্থান এ অঞ্চলেই। ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় অভিযান শুরুর পর থেকে হামাসের প্রতি সংহতি জানিয়ে দক্ষিণ লেবানন থেকে উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্য করে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া শুরু করে হিজবুল্লাহ। পাল্টা জবাব দিতে থাকে ইসরায়েলও। উভয়পক্ষের সংঘাতে লেবানন ও ইসরায়েলে গত এক বছরে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।

গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে দক্ষিণ লেবাননে বিমান অভিযান শুরু করে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। এ অভিযানে ইতোমধ্যে নিহত হয়েছেন হিজবুল্লাহর প্রধান নেতা ও সেক্রেটারি জেনারেল হাসান নাসরুল্লাহসহ প্রায় সব শীর্ষ কমান্ডার। এক কথায়, ১০ দিনে হিজবুল্লাহর হাইকমান্ড ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরায়েরের বিমানবাহিনী। ১ অক্টোবর থেকে অভিযানে অংশ নিয়েছে স্থল বাহিনীও। তবে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠছে গোষ্ঠীটি। প্রসঙ্গত, হিজবুল্লাহর অস্ত্র-গোলাবারুদের ভাøার বেশ সমৃদ্ধ। এই গোষ্ঠীটির বেশ কিছু প্রিসিশন ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী। ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর গোলায় গত ২৭ সেপ্টেম্বর হিজবুল্লাহর প্রধান কমান্ড সেন্টার ধ্বংস হয় এবং হাসান নাসরুল্লাহও নিহত হন সেদিনই। কিছুদিন আগে নাসরুল্লাহর সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হাশেম সাফিউদ্দিন নিহত হয়েছেন।
হিজবুল্লাহর এক জ্যেষ্ঠ কমান্ডার জানিয়েছেন, নাসরুল্লাহ নিহত হওয়ার তিন দিনের মধ্যে নতুন একটি কমান্ড সেন্টার স্থাপন করেছে গোষ্ঠীটি। ১ অক্টোবর থেকে সেটি কার্যকরও রয়েছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১৩ অক্টোবর ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

হিজবুল্লাহর একজন মধ্যমসারির ফিল্ড কমান্ডার জানিয়েছেন, আগে গোষ্ঠীটির মধ্যম ও নিম্ন পর্যায়ের যোদ্ধাদের জন্য যেসব কঠোর বিধিনিষেধ ছিল, নাসরুল্লাহ ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কমান্ডার নিহত হওয়ার পর থেকে তা অনেকটাই শিথিল পর্যায়ে রয়েছে। বস্তুত, হিজবুল্লাহর একজন ফিল্ড কমান্ডার আন্তর্জাতিক কোনো সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন, নাসরুল্লাহর সময়ে এটি রীতিমতো অসম্ভব ছিল। এছাড়া বর্তমান কঠিন সময়ে টিকে থাকতে কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে হিজবুল্লাহ, যা আগে কখনও নিতে হয়নি গোষ্ঠীটির। যেমন বর্তমানে কারা আসলে হিজবুল্লাহর সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, তা এমনকি গোষ্ঠীটির মধ্যমপর্যায়ের কমান্ডারদের কেউই জানেন না। তাছাড়া হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন কিংবা ওয়াকিটকি ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। ল্যান্ড ফোনের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছেন তারা। এই ল্যান্ডফোন নেটওয়ার্ক গোষ্ঠীটির নিজেদের তৈরি এবং এটি এখনও ইসরায়েলি হামলা থেকে অক্ষত রয়েছে।

ইসরায়েলের থিংকট্যাঙ্ক সংস্থা আলমার বিশ্লেষক ও কর্মকর্তা আভরাহাম লেভিন রয়টার্সকে বলেন, “আইডিএফের হামলায় শুধু হিজবুল্লাহর হাই কমান্ড তছনছ হয়েছে, গোষ্ঠীটির অস্ত্রভাণ্ডার, যোদ্ধাবাহিনী ও অন্যান্য সক্ষমতায় কিন্তু এ অভিযানের তেমন প্রভাব পড়েনি। হিজবুল্লাহ খুব ভালো করেই জানে যে তাদের যে অস্ত্রভাণ্ডার ও যোদ্ধাবাহিনী রয়েছে, তা দিয়ে অনায়াসে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘ দিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে। তারা এ ও জানে যে ইরান তাদের পাশে রয়েছে। ফলে অস্ত্র-গোলাবারুদের সংকট তাদের আপাতত হবে না। অর্থাৎ, আমি বলতে চাইছি যে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আত্মতৃপ্তিতে ভোগার কোনো সুযোগ নেই। হিজবুল্লাহ এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী একটি সামরিক গোষ্ঠী।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading