ইরানে ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলা নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা: বিপদে পড়তে পারেন নেতানিয়াহু
উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৪, আপডেট ১৫:৫৫
ইসরায়েলের প্রতিশোধ পরিকল্পনায় ‘উত্তেজনা’
আসাদ এফ রহমান : গত ১ অক্টোবর ইসরায়েলে প্রায় ২০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালায় ইরান। সেই হামলায় ইসরায়েল কোনো ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার না করলেও ইরান দাবি করেছে, তাদের ৯০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্রই ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। তেহরান সে সময় এ-ও দাবি করেছিল যে, গুপ্তহত্যার শিকার হামাসের প্রয়াত প্রধান ইসমাইল হানিয়া, ইসরায়েলি হামলায় নিহত হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহর মৃত্যুর প্রতিশোধ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে। এর পর থেকেই ইরানে পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে ইসরায়েল। ইরানের এই হামলার পর থেকে তেল আবিব কী জবাব দিতে পারে, তা নিয়ে অনেক জল্পনাকল্পনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, ইসরায়েল ইরানের তেল স্থাপনায় আঘাত হানতে পারে; আবার কেউ কেউ বলছেন, তারা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। কিন্তু, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন এই দুটি পরিকল্পনারই বিরোধিতা করছেন বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে। তবে বাইডেন প্রশাসন ইসরায়েলকে একটি টার্মিনাল হাই অলটিচ্যুড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) মিসাইল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দেওয়ার এবং ইসরায়েলে মার্কিন সেনা মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। সম্ভবত ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবিলায় আমেরিকা এসবের অনুমোদন দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
এদিকে বাইডেনের রাজনৈতিক প্রতিদ্ব›দ্বী রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলকে ‘প্রথমেই পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত করতে’ উসকানি দিয়েছেন। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও এই পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু ১৯৮১ সালে ইরাকের একটি পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ইসরায়েলের চালানো আরেকটি হামলার প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষকরা বলেন, তার থেকেও ভয়াবহ হবে যদি ইরানেও একই ভাবে হামলা চালানো হয়। ইসরায়েল ১৯৮১ সালে ফ্রান্স নির্মিত ইরাকি ওসিরাক পারমাণবিক চুল্লিটি ধ্বংস করেছিল। ওই হামলা মূলত গোপনে ইরাককে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি চালানোর বিষয়ে প্রেরণা জুগিয়েছিল এবং ইরাকের তৎকালীন নেতা সাদ্দাম হোসেনকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে উৎসাহিত করেছিল।
এদিকে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে পরিচালিত একটি জরিপ দেখাচ্ছে, ইরানের একটি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির প্রতি জনসমর্থন খুবই বেশি। এর বাইরে এখন জনমনে একটি বৃহত্তর ঐকমত্য রয়েছে যে দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৬৯ শতাংশ বলেছেন, তারা পরমাণু অস্ত্র তৈরির উদ্যোগ সমর্থন করবেন।এটি স্পষ্ট, ইসরায়েলের এখন পর্যন্ত যেসব কাজকারবার করে এসেছে, তা শুধু ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় কোনো ধরনের হামলা হলে তা ইরানের সেই সংকল্পকে আরও দৃঢ় করবে। কিন্তু ইসরালের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা ও লেবাননে যা করছেন এবং ইরানে যা করতে যাচ্ছেন, তা ইসরায়েলকে বিজয় এনে দেবে না। তার কৌশল এই দেশগুলোয় এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করছে। এই ক্ষোভ ইরান ও তার মিত্রদের আরও দ্রæত পুনর্গঠনে সাহায্য করবে। এটি নেতানিয়াহুর জন্য জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।

জো বাইডেন
তেল বা পারমাণবিক স্থাপনা টার্গেটে আমেরিকার বিরোধিতা কেন?
রিন্টু হাসান: সম্প্রতি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরায়েলে ইরানের হামলার জবাবে দেশটির তেল ও পারমাণবিক স্থাপনায় তেল আবিবের সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে খোলাখুলি বিরোধিতা করেন। পরে গত সপ্তাহে এক ফোনালাপে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে ইরানে ইসরায়েলি হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে আলাপ করেন বলে ওই সূত্র জানায়। সূত্র বলেছে, ফোনালাপে নেতানিয়াহু বাইডেনকে ইরানের শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনার কথা জানান। এ বিষয়ে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইরানের তেল ও পারমাণবিক লক্ষ্যবস্তুতে নিজের হামলার পরিকল্পনা না থাকার ব্যাপারে পুনরায় আশ্বস্ত করেছেন। কিন্তু কেন আমেরিকার এই বিরোধীতা তা নিয়ে চলছে আলোচনা। আমেরিকার কর্মকর্তারা বলছেন, সামনেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এ অবস্থায় ইরানের তেল স্থাপনায় হামলা হলে জ্বালানির দাম বেড়ে যেতে পারে। এটি মার্কিন ভোটাররা ভালোভাবে নেবেন না।
আবার, দেশটির পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পুরোদমে যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, ইরানি হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল দেশটিতে পরিমিত জবাব দেবে। তাদের বিশ্বাস, ইরানের সঙ্গে সর্বাত্মক লড়াইয়ে জড়াতে চাইবে না ইসরায়েল। হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের একজন মুখপাত্র বলেন, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষার বিষয়ে আমাদের সমর্থন ইস্পাতকঠিন। ব্যক্তিগত ক‚টনৈতিক আলাপের বিষয়ে আমরা আলোচনা করব না। ইসরায়েলের সম্ভাব্য সামরিক অভিযান নিয়ে জানতে চাইলে আমরা আপনাকে তাদের সঙ্গেই কথা বলতে বলব। ইরানের সা¤প্রতিক ওই হামলায় ইসরায়েলের জবাব দেওয়ার অধিকারের পক্ষে নিজেদের অবস্থান এখনো ব্যক্ত করে চলেছেন বাইডেন ও অন্য শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে নেতানিয়াহুর কার্যালয় বলেছে, তারা আমেরিকার মতামত বিবেচনা করবে। তবে গত ১ অক্টোবর ইরান যে হামলা চালিয়েছে, সেটির জবাব কী হবে, তা নিজ জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই চূড়ান্ত করবে ইসরায়েল। আর কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ইরানের হামলায় ইসরায়েল কী জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, সে বিষয়ে দেশটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন তারা। এর আগে বাইডেন ও নেতানিয়াহুর মধ্যে গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত ওই ফোনালাপকে ‘ফলপ্রসূ’ ও ‘সরাসরি’ বলে বর্ণনা করে হোয়াইট হাউস। প্রায় দুই মাসের মধ্যে এটি ছিল দুই নেতার প্রথম ফোনালাপ। এদিকে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ইসরাইলকে ইরানের তেল স্থাপনাগুলোতে আক্রমণ করা থেকে বিরত রাখতে ওয়াশিংটনের কাছে তদবির করছে। কারণ যদি সংঘর্ষ বাড়তে থাকে তাহলে তাদের নিজেদের তেল স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা তাদের।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
জাতীয় স্বার্থেই নেয়া হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
শহীদ রানা: ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের ব্যাপারে আমেরিকা যদি কোনো অভিমত বা পরামর্শ দেয়, তাহলে তা শুনলেও এ ইস্যুতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ইসরায়েল বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সম্প্রতি এক বিবৃতিতে ইরান ইস্যুতে ইসরায়েলের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তিনি। বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান ইস্যুতে আমরা আমেরিকার মতামত শুনব, তবে এ ব্যাপারে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত আমরাই নেবো এবং সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে ইসরায়েলের জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে। গত ৩ অক্টোবর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান কাতারের রাজধানী দোহায় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেন, ইসরায়েল যদি গাজা এবং লেবাননে অভিযান বন্ধ না করে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে ইসরায়েলে ফের হামলা চালানো হবে।
তার এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল তার নিজের ভৌগলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে শিগগিরই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাব দেবে। নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যের পরই ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ বাধার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন অবশ্য পরোক্ষভাবে ইরানে হামলা না চালানোর জন্য ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন যে ইরানের তেলক্ষেত্রগুলোতে যেন হামলা না চালানো হয়। বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েল যদি ইরানে হামলা চালায়, সেক্ষেত্রে শুধু দেশটির সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
নেতানিয়াহু এখন কী করবেন?
ইসরায়েলের সহযোগীরা দেশটিকে গত সপ্তাহের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রেও ধৈর্য ধারণের আহবান জানিয়েছে। যদিও সব চাপ উপেক্ষা করে ইসরায়েল তার নিজের পথেই চলছে। ইসরায়েলের দীর্ঘসময়ের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২০ বছরের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছেন যে, উপেক্ষা না করলেও, কীভাবে আমেরিকার চাপ সামলানো যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, নেতানিয়াহু জানেন যে আমেরিকা বিশেষ করে তাদের বর্তমান নির্বাচনের বছরে তাকে তার পথ থেকে সরাতে চাপ দিবে না এবং তিনি বিশ্বাস করেন যে তিনি আমেরিকার শত্রæর বিরুদ্ধেও লড়ছেন। এটা মনে করা ঠিক হবে না যে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের রাজনৈতিক মূলধারার বাইরে গিয়ে কাজ করছেন। সেজন্য হিজবুল্লাহর ওপর শক্ত আঘাত হানার চাপ বাড়তে পারে, এমনকি ইরানের বিরুদ্ধেও।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, হিজবুল্লাহ নয় হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ও ড্রোন ছুড়েছে ইসরায়েলের শহরগুলো লক্ষ্য করে। তেল আবিবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইরান সমর্থিত হুতিরাও বড় ধরণের হামলা চালিয়েছে। ইরানও গত ছয় মাসে দুবার হামলা করেছে। এসব হামলায় পাঁচশর বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ইসরায়েল লেবাননে আগ্রাসন চালিয়েছে। এর কোনো একটিই হয়তো ওই অঞ্চলকে যুদ্ধের দিকে নিয়ে গেছে এবং সত্যি হলো ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীও এসব বিষয়ে কোন ঝুঁকি না নিয়েই তার পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন বলে মনে হচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন এবং একটি রাজনৈতিক, সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার বিপর্যয়কর দিন। এ দুটি বিষয়ই ইসরায়েলকে চলমান যুদ্ধে জড়িত হতে সহায়তা করে।
ইসরায়েলে হামাসের হামলার মাত্রা ও ব্যাপকতা ইসরায়েলি সমাজ ও এর নিরাপত্তাবোধের ওপর প্রভাব ফেলেছে, যে কারণে এবারের যুদ্ধ সা¤প্রতিক সব সংঘাতের চেয়ে আলাদা। আমেরিকা প্রশাসন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র দিচ্ছে ইসরায়েলকে। আবার প্যালেস্টাইনি বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু ও গাজার দুর্ভোগ তাদের জন্য অস্বস্তির ও রাজনৈতিকভাবেও ক্ষতিকর। এপ্রিলে ইসরায়েলে ইরানের হামলার ঠেকাতে আমেরিকার বিমানও সক্রিয় ছিল। এটি একটি পরিষ্কার প্রমাণ যে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিষয়ে তার সবচেয়ে বড় সহযোগী কতটা ভ‚মিকা রাখে।

মাসুদ পেজেশকিয়ান
‘এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ইরানের ‘হাতিয়ার’
আশিকুর রহমান : মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বড় ভ‚মিকায় রয়েছে ইরান। দেশটি সাধারণত শক্তি প্রদর্শন করে তাদের সঙ্গে আদর্শগতভাবে মিলে যায় এমন মিত্র ও অরাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। এই নেটওয়ার্কটি ‘এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ নামে পরিচিত। এই নেটওয়ার্কের মধ্যে রয়েছে ইয়েমেনের হুতি, প্যালেস্টাইনের হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহ। এ ছাড়া কাতাইব হিজবুল্লাহ নামে ইরাকের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীটিও ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শুধু ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যার প্রতিশোধই নিতে চান না, এটাও মনে করেন যে পাল্টা জবাব না দিলে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরানের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হতে পারে। প্রতিরোধের অক্ষের সব পক্ষগুলো তেহরানের সমর্থন পেয়ে আসছে।
ইসরায়েল প্রতিশোধ নিলে ইতোমধ্যে পাল্টা আঘাত হানবে বলে সতর্ক করেছে ইরান। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, এটি আমাদের সক্ষমতার একটি আভাস মাত্র। এই বার্তাটিকে আরও শক্তিশালী করতে আইআরজিসি বলেছে-যদি ইহুদিবাদী শাসক ইরানের কার্যক্রমে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তাহলে এটি নিষ্ঠুর আক্রমণের সম্মুখীন হবে। ইরানের হাতে প্রচুর পরিমাণে ব্যালিস্টিক এবং অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি বিস্ফোরক ভর্তি ড্রোন ও মধ্যপ্রাচ্যের চারপাশে বহু মিত্র স্থানীয় মিলিশিয়া রয়েছে। তাদের পরবর্তী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটির পরিবর্তে বেসামরিক এলাকাগুলো লক্ষ্য করতে পারে। ২০১৯ সালে সৌদি আরবের তেল স্থাপনার ওপর সালে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ার হামলা দেখিয়েছিল যে এর প্রতিবেশীরা আক্রমণের কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
পারস্য উপসাগরে ইরানের আইআরজিসি নৌবাহিনীর ছোট এবং দ্রæত ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সক্ষম বড় নৌবহর প্রস্তুত রয়েছে, যা আমেরিকার পঞ্চম নৌবহরের যুদ্ধজাহাজের প্রতিবক্ষা ব্যবস্থাকে সংঘবদ্ধ আক্রমণে ব্যর্থ করতে সক্ষম। নির্দেশ দেওয়া হলে এগুলো হরমুজ প্রণালীতে মাইন স্থাপন করে বিশ্ব তেলের দৈনিক রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ প্রবাহ ব্যাহত করতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে। এর পাশাপাশি, উপসাগরের আরব দিকের কুয়েত থেকে ওমান পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও রয়েছে। জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইএইএ’র মাধ্যমে এটি একটি জানা বিষয় যে, বেসামরিক পারমাণবিক শক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ২০ শতাংশের চেয়েও বেশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে ইরান।

আব্বাস আরাগচি
ভয়াবহ পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত তেহরান
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসকে সতর্ক করেছেন ইরানের শীর্ষ ক‚টনীতিক। এক ফোনালাপে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ইসরায়েলের যেকোনও প্রতিশোধমূলক হামলার জবাবে তেহরান ভয়াবহ পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত রয়েছে। ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে উদ্ধৃত করে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।আরাগচি বলেন, আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় ইরান সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর পাশাপাশি ইসরায়েলের যেকোনও দুঃসাহসী কর্মকাøের জবাবে একটি ভয়াবহ পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১৭ অক্টোবর ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
এ সময় তিনি জাতিসংঘকে আহ্বান জানান, ইসরায়েলের অপরাধ ও আগ্রাসন বন্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং লেবানন ও গাজার জনগণের জন্য মানবিক সহায়তা পাঠাতে। আরাগচি ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল ব্যারোর সঙ্গে ফোনে আলোচনা করেন। এ আলোচনায় তিনি লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন এবং ইসরায়েলের অবাঞ্ছিত কোনও দুঃসাহসী পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে ইসরায়েলি বাধা অপসারণ করা উচিত।
ইউডি/এজেএস

