দেশে অতি দরিদ্র মানুষ ৪ কোটি ১৭ লাখ: উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে আয় বৈষম্য
উত্তরদক্ষিণ। শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৪, আপডেট ১৫:৩৫
গুরুতর অবস্থায় দেশের ৬.৫% মানুষ
আশিকুর রহমান : বাংলাদেশে ৪ কোটি ১৭ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে ৬ দশমিক ৫ শতাংশের অবস্থা গুরুতর। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। ‘বৈশ্বিক বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক-২০২৪: সংঘাতের মধ্যে দারিদ্র্য’ শিরোনামের গত বৃহস্পতিবার এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এখানে বহুমাত্রিক দারিদ্র্য পরিস্থিতি বুঝতে বিশ্বের ১১২টি দেশের ৬৩০ কোটি মানুষের ওপর গবেষণা করা হয়েছে। তাতে ২০২২-২৩ বছর পর্যন্ত এক দশকের বেশি সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এখানে মানুষের পর্যাপ্ত আবাসন, পয়োনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ, ভোজ্যতেল ও পুষ্টির মতো অতি প্রয়োজনীয় সেবাসমূহ পাওয়ার ক্ষেত্রে কেমন ঘাটতি রয়েছে, তা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। শিশুরা কী হারে স্কুলে উপস্থিত হচ্ছে, তা-ও এখানে বিবেচনায় এসেছে।
বৈশ্বিক বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক-২০২৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভ‚মিকা রাখছে মানুষের জীবনযাত্রার মান (৪৫ দশমিক ১ শতাংশ)। এরপর রয়েছে শিক্ষা (৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ) ও স্বাস্থ্য (১৭ দশমিক ৩ শতাংশ)। এর আগে, বিশ্বব্যাংকের ম্যাক্রো পোভার্টি আউটলুক ফর বাংলাদেশ অনুসারে, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মাঝে প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। এর ফলে তাদেরকে দৈনিক ২.১৫ ডলারেরও কম অর্থ ব্যয়ে জীবনযাপন করতে হবে। এছাড়া মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়াবে ৯ দশমিক ৬ শতাংশে। এ প্রবণতার কারণ হিসেবে সংস্থাটি ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে নির্দেশ করেছে।
প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছরে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য হার (দৈনিক ২.১৫ ডলার ব্যয়ে জীবনধারণ) ৫ দশমিক ১ শতাংশে উঠবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের আনুমানিক ৪ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেশি। সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট-এর অংশ হিসেবে গত এপ্রিল মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মাঝারি দারিদ্র্যহার (দৈনিক ৩.১৫ ডলারের কম ব্যয়) ২০২২-২৩ অর্থবছরের ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যক্তিগত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্য হ্রাস থমকে গিয়েছে। খাদ্যপণ্যের উচ্চ মূল্য বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর প্রভাব ফেলেছে। এ পরিবারগুলো তাদের আয়ের অর্ধেকেরও বেশি খাবারের পেছনে ব্যয় করে।
তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২-এর প্রতিবেদনে দেশে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে দেখা গেছে। বিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশে চরম দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে ২০১৬ সালের সমীক্ষায় উচ্চ দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৯ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছিল।
বিবিএস’র হিসাব বলছে ভিন্ন কথা
রিন্টু হাসান : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, দেশে অতি দারিদ্র্যের হার কমেছে। ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, দেশে অতি দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১৬ সালে এ হার ছিল ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের সর্বশেষ তথ্যমতে, বাংলাদেশের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে অতি দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন ৫ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। সর্বশেষ জনশুমারি অনুসারে, দেশে বর্তমানে জনসংখ্যা আছে ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার। সে হিসাবে, দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ১৭ লাখ ৫৭ হাজার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এইচআইইএস-২০২২ এর কি ফাইন্ডিংসে দেখা যায়, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে দেশে দারিদ্র্য হ্রাসের এই চিত্র অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ২০৩১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করবে।

দারিদ্র্যের হার বের করা এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। দারিদ্র্য পরিমাপ ও বিশ্লেষণে প্রযুক্তিগত সহায়তাও দিয়েছে সংস্থাটি। সারা দেশের ৭২০টি নমুনা এলাকায় এই জরিপ পরিচালিত হয়। প্রতিটি নমুনা এলাকা থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ২০টি করে মোট ১৪ হাজার ৪০০ খানা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। জরিপের প্রশ্নপত্রে মোট ১০টি সেকশন রয়েছে। এই ১০টি সেকশনের তথ্য সংগ্রহের জন্য একজন তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিটি খানায় ১০ বার ভিজিট করেন। ২০২২ জরিপে ১ জানুয়ারি ২০২২ থেকে শুরু হয়ে ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ সময়ে অর্থাৎ এক বছর ধরে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
বিবিএস জানায়, বাংলাদেশে দারিদ্র্য, আয়-ব্যয়, ভোগ সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রদানের জন্য একটি স্বতন্ত্র জরিপ হলো এইচআইইএস। এটি আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, অভিবাসন এবং রেমিট্যান্স ইত্যাদি বিষয়েও তথ্য সরবরাহ করে। বাংলাদেশে ১৯৭৩-৭৪ সালে হাউজহোল্ট এক্সপেনডিচার সার্ভে নামে এ জরিপটি প্রথম পরিচালনা করা হয়। সর্বশেষ ১৬তম রাউন্ড হিসেবে হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভে নামে ২০১৬-১৭ সালে পরিচালিত হয়। ২০১৬-১৭ সালের পরে দারিদ্র্যের কোনো জরিপভিত্তিক তথ্য না থাকায় ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের সময়ে দারিদ্র্য বৃদ্ধির স্থিতিস্থাপকতার ওপর ভিত্তি করে কিছু দারিদ্র্যের প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ অবস্থায় জরিপের মাধ্যমে হালনাগাদ দারিদ্র্য পরিসংখ্যান প্রস্তুত করা অত্যন্ত জরুরি ছিল।
বিবিএস পরিচালিত হেইজ-২০২২ জরিপে ২০২২ সালে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরব্যাপী সংগৃহীত রিয়েল টাইম ডেটা থেকে জাতীয় এবং বিভাগীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়। এটি ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অধীনে দারিদ্র্য হ্রাসের অগ্রগতি পরিবীক্ষণের পাশাপাশি এসডিজি বাস্তবায়ন অগ্রগতি পরিবীক্ষণে জন্য কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
বিশ্বে চরম দারিদ্র্যে ১১০ কোটি মানুষ
কিফায়েত সুস্মিত : সূচক অনুযায়ী, বিশ্বের ১১০ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছেন। তাদের প্রায় অর্ধেকই সংঘাতকবলিত দেশের বাসিন্দা। চরম দারিদ্র্যে থাকা জনগোষ্ঠীর ৮৩ শতাংশের বেশি বসবাস করেন আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। দক্ষিণ এশিয়ায় ২৭ কোটি ২০ লাখ দরিদ্র মানুষ এমন পরিবারে আছেন, যে পরিবারের অন্তত একজন অপুষ্টিতে ভুগছেন। ইউএনডিপির সূচক অনুযায়ী, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা ৪৫ কোটি ৫০ লাখ মানুষ সংঘাত-সহিংসতার মধ্যে বসবাস করছেন। সংঘাতপূর্ণ দেশগুলোয় শিশুমৃত্যুর হার ৮ শতাংশ। অন্যদিকে শান্তিপূর্ণ দেশগুলোয় এই হার মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ। যুদ্ধ চলা দেশগুলোর মানুষ পুষ্টি, বিদ্যুৎ, পানি ও পয়োনিষ্কাশন সুবিধা থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন। ইউএনডিপি প্রকাশিত সূচকে দেখা গেছে, দারিদ্র্যের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী শিশুরা।

চরম দারিদ্র্যে থাকা মানুষের মধ্যে প্রায় ৫৮ কোটি ৪০ লাখের বয়স ১৮ বছরের কম। এই সংখ্যাটা বিশ্বের মোট শিশুর ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ। এর তুলনায় চরম দারিদ্র্যে রয়েছে বিশ্বের মোট প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ইউএনডিপির আচিম স্টেইন বলেন, সম্প্রতি সংঘাতের পরিধি বেড়েছে। এতে একদিকে যেমন হতাহত বাড়ছে তেমনি রেকর্ড সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে জীবন ও জীবিকায়। প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ১৮ বছরের নিচের প্রায় ৫৮৪ মিলিয়ন মানুষ চরম দারিদ্রতায় ভুগছে। তাছাড়া সংঘাতপূর্ণ দেশগুলোতে শিশু মৃত্যু হার ৮ শতাংশ। স্থিতিশীল দেশুগলোতে এই হার মাত্র এক দশমিক এক শতাংশ।
ইন্ডিয়ায় হার সবচেয়ে বেশি: সূচক অনুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক দরিদ্র মানুষের বসবাস ইন্ডিয়ায়। দেশটির ১৪০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ২৩ কোটি ৪০ লাখই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে আছেন। এরপরই রয়েছে পাকিস্তান (৯ কোটি ৩০ লাখ), ইথিওপিয়া (৮ কোটি ৬০ লাখ), নাইজেরিয়া (৭ কোটি ৪০ লাখ) ও কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (৬ কোটি ৬০ লাখ)। বিশ্বে চরম দারিদ্র্যে থাকা জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকই এই পাঁচ দেশের বাসিন্দা। ইউএনডিপি প্রকাশিত সূচকে দেখা গেছে, দারিদ্র্যের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী শিশুরা। চরম দারিদ্র্যে থাকা মানুষের মধ্যে প্রায় ৫৮ কোটি ৪০ লাখের বয়স ১৮ বছরের কম। এই সংখ্যা বিশ্বের মোট শিশুর ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ। এর তুলনায় চরম দারিদ্র্যে রয়েছে বিশ্বের মোট প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
শহরে দারিদ্র্য বেড়েছে, কমেছে গ্রামে
শহীদ রানা: বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও ব্রিটেনের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট যৌথ এক গবেষণা বলছে, মাসের পর মাস উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে শহরাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। বেড়েছে আয়বৈষম্যও। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অধিকাংশ পরিবার তাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে। অনেক পরিবার খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছে। গ্রামের তুলনায় শহরের দরিদ্র মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বেশি।
‘করোনা মহামারি ও পরবর্তী প্রতিবন্ধকতা কীভাবে বাংলাদেশের দারিদ্র্য, আয়বৈষম্য, শিক্ষা এবং খাদ্য সুরক্ষার ওপর প্রভাব ফেলছে’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, ২০১৮ সালে শহরাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২৩ সালে সেটি বেড়ে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। সানেম-জিইডি ২০১৮ সালে দেশব্যাপী ১০ হাজার ৫০০টি খানায় একটি জরিপ চালায়। এর মধ্যে ৯ হাজার ৬৫টি খানায় গত বছরের অক্টোবর ও নভেম্বরে আবার জরিপ করা হয়। গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে ৭০ শতাংশ খানা বা পরিবার তাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছে। পাশাপাশি ৩৫ শতাংশ পরিবার খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় কাটছাঁট করেছে। ২৮ শতাংশ ঋণ নিয়েছে এবং ১৭ শতাংশ সঞ্চয় কমিয়েছে। পরিবারগুলোর ব্যয় বাড়লেও একটি বড় অংশের আয় বাড়েনি অথবা কমেছে। এর ফলে অতিদরিদ্র খানার (পরিবার) সদস্যদের মাসিক মাথাপিছু ব্যয় ২০১৮ সালের তুলনায় গত বছর ২০ শতাংশ কমেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শহরের দরিদ্ররা গ্রামের তুলনায় বেশি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। গ্রামের ২৯ শতাংশ ও শহরের ৩২ শতাংশ দরিদ্র পরিবার মাঝারিভাবে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, শহরের দরিদ্ররা গ্রামের তুলনায় বেশি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। গ্রামের ২৯ শতাংশ ও শহরের ৩২ শতাংশ দরিদ্র পরিবার মাঝারিভাবে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) নির্দেশিকা অনুযায়ী এ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা পরিমাপ করা হয়েছে। সানেমের রিসার্চ ইকোনমিস্ট মাহতাব উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে শহরাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। দরিদ্র পরিবারগুলো খাদ্যাভ্যাসে কী পরিবর্তন আনছে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, প্রথমেই তারা মাংস, ডিম, ফলমূল ইত্যাদি খাওয়া বাদ দিচ্ছে। এতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা। গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার ছিল ২১ দশমিক ৬ শতাংশ। গত বছর সেটি কমে ২০ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যদিও কয়েকটি বিভাগে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে গত বছর বেশি দারিদ্র্য ছিল রংপুর ও বরিশালে, যথাক্রমে ৪২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সাড়ে ৩২ শতাংশ।
২০১৮ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয় তিন গুণ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধির কারণে স্কুলে না যাওয়া শিশুর সংখ্যাও বাড়ছে, এমনটা উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী ১৫ শতাংশ শিশু স্কুলে যাচ্ছে না, যা ২০১৮ সালে ছিল ১৩ শতাংশ। স্কুলে না যাওয়ার হার দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যে বেশি বেড়েছে। স্কুলে না যাওয়ার কারণের মধ্যে উঠে এসেছে যে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ শিশুর পরিবারের (যারা যায় না তাদের মধ্যে) আর্থিক সামর্থ্য নেই। ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুর পরিবার তাদের অর্থ উপার্জনের জন্য কাজে নিযুক্ত করেছে। ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয় তিন গুণ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে পরিবারের সদস্যদের মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় ছিল ৪৩৫ টাকা। গত বছর সেটি বেড়ে ১ হাজার ৭০৪ টাকা হয়েছে। যদিও এই ব্যয় বৃদ্ধি সব আয়ের মানুষের মধ্যে সমান নয়। দরিদ্রতম ২০ শতাংশ পরিবারের জন্য এই ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ হারে। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের জন্য ব্যয় বেড়েছে ছয় গুণ।
দারিদ্র্য পরিস্থিতি কী অবস্থায় আছে
সাদিত কবির: বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক কে এ এস মুর্শিদ বলেন, ইউএনডিপির এই সমীক্ষায় যেভাবে বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিমাপ করা হয়েছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের বিবিএস বা অন্যান্য সংস্থার সমীক্ষার তুলনা করা ঠিক হবে না। এই সমীক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি বৈশ্বিক তুলনায় কী অবস্থায় আছে, তার একটি চিত্র পাওয়া গেল। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের ডলার-সংকট এবং নানা ধরনের আর্থিক সমস্যার কারণে দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তা নানা সূচকের মাধ্যমে এই সমীক্ষায় বোঝা গেছে। এখান থেকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এই সংঘাত বন্ধ ছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব নয় বলে মনে করেন অক্সফোর্ড পোভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের পরিচালক সাবরিনা আলকায়ার। তিনি বলেন, সংঘাতপূর্ণ দেশগুলোয় দারিদ্র্য বিমোচনের গতি তুলনামূলক কম। তাই বলা যায়, এসব দেশের দরিদ্র মানুষকে দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিনিয়োগ ছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব নয়। গত কয়েক বছরে সংঘাত বেড়ে কয়েক গুণ হয়েছে। এতে প্রাণহানি নতুন করে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংঘাতের জেরে রেকর্ড পরিমাণ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন। এতে বড় পরিসরে মানুষের জীবন ও জীবিকা বাধার মুখে পড়ছে।
ক্রমবধর্মান অর্থনৈতিক বৈষম্য উদ্বেগজনক: ক্রমবধর্মান অর্থনৈতিক বৈষম্য উদ্বেগজনক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে প্রান্তিক গোষ্ঠী সুযোগ এবং সম্পদে অভিগম্যতা পেতে জীবন সংগ্রামে নিয়োজিত। যাদের জীবন ও জীবিকা প্রতিদিন নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, বৈশ্বিক সংঘাত-যুদ্ধ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাসে অর্জিত অগ্রগতি ঝুঁকিতে আছে। যার প্রভাবে গ্রাম থেকে শহরের পড়ছে। দেশে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং শহর এলাকায় ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। যা ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পথে বিরাট বাধা। জীবিকা হারানো, জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ-সংঘাত, নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত হওয়া এবং স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিরাট ব্যবধান বাদ পড়া জনগোষ্ঠীকে আরও প্রান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১৯ অক্টোবর, ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
সম্প্রতি ‘দারিদ্র্য ও অসমতা নিরসন এবং সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা জোরদারকরণ’ শীর্ষক জাতীয় জনসম্মিলনে এ তথ্য জানানো হয়। গ্লোবাল কল টু অ্যাকশন এগেইনস্ট পোভার্টির (জিক্যাপ) সহায়তায় এসডিজি অ্যাকশন এলায়েন্স ও নোয়াখালী রুরাল ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (এনআরডিএস) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এনআরডিএস’র নির্বাহী পরিচালক আবদুল আউয়াল বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নের ধীর গতি আশাহত করছে প্রান্তিক মানুষকে। বিগত বছরগুলোতে করোনা মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা বৈশ্বিক সংকট এসডিজির অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এসডিজি অর্জনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার কঠিন পথযাত্রায় নতুন কৌশল ও সমন্বিত কর্মপ্রচেষ্টা জোরদার করা দরকার। অর্থনৈতিক সংকট ও জলবায়ু সংকটে বাড়ছে বৈষম্য, বাড়ছে দারিদ্র্য, বাড়ছে বাস্তুচ্যুত পরিবেশ শরণার্থীর বিপদাপন্নতা। বিপদাপন্ন মানুষের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না, যদি সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর না হয়।
ইউডি/এজেএস

