বিশ্ব ইজতেমা ঘিরে দুই পক্ষের ‘পাল্টাপাল্টি’ : তাবলীগ জামাতে ‘অন্তর্কোন্দল’

বিশ্ব ইজতেমা ঘিরে দুই পক্ষের ‘পাল্টাপাল্টি’ : তাবলীগ জামাতে ‘অন্তর্কোন্দল’

উত্তরদক্ষিণ। বুধবার, ০৬ নভেম্বর , ২০২৪, আপডেট ১৫:৪০

সাদপন্থিদের নিষিদ্ধ করাসহ ৯ দাবি জুবায়েরপন্থিদের

আরিফ হোসেন : ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশ থেকে তাবলীগ জামাতের একাংশের তরফে সাদপন্থিদের নিষিদ্ধ করাসহ ৯ দফা দাবি জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার (০৫ নভেম্বর) ‘ওলামা-মাশায়েখদের ইসলামি মহাসম্মেলন’ থেকে এসব দাবি তুলে ধরেছেন শায়খুল হাদিস পরিষদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও বেফাক মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক। এই সম্মেলনে জমায়েত হন তাবলীগের অপর পক্ষ জুবায়েরপন্থিরা, যারা নিজেদের ‘শুরায়ে নিজাম’ পরিচয় দিয়ে থাকেন।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাবলিগ জামায়াতের দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি সমাবেশের ঘোষণায় উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরে সরকারের ‘মধ্যস্থতায়’ সাদপন্থিরা তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন।

গত সোমবার দুই পক্ষকে নিয়েই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সভার উদ্যোগ নেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। সেখানে সাদপন্থিরা এলেও অন্যরা আসেননি। ওই বৈঠকে এবারও দুই পর্বে বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। আগে এক মঞ্চ থেকে একবারই বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন হত। কিন্তু দিল্লির মাওলানা সাদ কান্ধলভি এবং বাংলাদেশের কাকরাইল মারকাজের মাওলানা জুবায়ের আহমদের অনুসারীরা নিজেদের মধ্যে বিভেদে জড়িয়ে পড়েন ২০১৯ সালে। এক পর্যায়ে দুই পক্ষ বিশ্ব ইজতেমা দুইবারে করার সিদ্ধান্ত নেন। মাঝে কোভিড মহামারীর কারণে ইজতেমা দুই বছর বন্ধও রাখা হয়। পরে ২০২২ সাল থেকে ফের ইজতেমা হচ্ছে দুই পর্বের আয়োজনে। এর মধ্যেই মঙ্গলবারের সমাবেশ থেকে এক পক্ষকে নিষেধাজ্ঞার দাবি জানাল অপর পক্ষ।

সোহরাওয়ার্দীর সমাবেশের শেষভাগে শায়খুল হাদিস পরিষদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও বেফাক মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক ৯ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো-কওমি শিক্ষাকে দারুল উলুম দেওবন্দের আওতায় পরিচালনা করতে হবে এবং তাবলিগ নিয়ে বিচ্ছিন্ন মহলের সব ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে হবে। সাধারণ শিক্ষা সিলেবাসে ধর্মশিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। আলেমদের বিরুদ্ধে বিগত সরকারের যাবতীয় মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। শাপলা চত্বরের গণহত্যায় জড়িত আসামিদের দেশে এনে শাস্তি নিশ্চিত এবং সারাদেশে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। ২০১৮ সালে টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থিদের নৃশংস আক্রমণের বিচার করতে হবে।

সাদপন্থিরা নবী করিম (স.)-সহ সাহাবীদের সমালোচনা করে আসছে। সাদ তাবলিগের নীতিমালা উপেক্ষা করে আসছে। সেই কারণেই মাওলানা সাদকে দেশে আসতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। কোনো অবস্থাতেই তাকে আসতে দেওয়া হবে না। ‘আলেমপন্থিদেরই’ সরকার ঘোষিত দুই পর্বে বিশ্ব ইজতেমা করতে দিতে হবে। কাকরাইল মসজিদ সাদপন্থিদের কোনো কার্যক্রম চালাতে দেওয়া হবে না। কাকরাইল থেকে কেবল ‘শুরায়ে নিজাম’ পরিচালিত হবে। ‘অভিশপ্ত’ কাদিয়ানিদের অবিলম্বে অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে। মঙ্গলবার বেলা দেড়টার দিকে মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই মহাসম্মেলন। মোনাজাত পরিচালনা করেন শাহ মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী। এদিন সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে বাস ও ট্রাকে ভরে মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকসহ লোকজন সম্মেলনস্থলের দিকে যেতে শুরু করে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘিরে লাখো মানুষের জমায়েতের চাপ পড়ে বাইরের সড়কগুলোতেও। প্রেস ক্লাব, মৎস্যভবন থেকে শাহবাগ হয়ে সায়েন্সল্যাব এবং শাহবাগ থেকে বাংলামোটর দিকের সড়কের পেরিয়ে এই বাড়তি জটলার প্রভাব পড়ে সারা ঢাকাজুড়ে।

দাবি না মানলে সরকার পতনের হুঁশিয়ারি

সাদিত কবির : তাবলিগ জামাতের দিল্লির মাওলানা সাদ ও তার অনুসারীদের বাংলাদেশে আসার অনুমতি দেওয়া হলে অন্তর্বর্তী সরকার পতনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাবলীগ জামাতের একপক্ষের নেতারা। মঙ্গলবার ইসলামি মহাসম্মেলন থেকে তারা এ হুঁশিয়ারি দেন। বাংলাদেশ নেজামে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক বলেন, আসন্ন বিশ্ব ইজতেমা ঘিরেও সাদপন্থিদের ‘ষড়যন্ত্র’ চলছে। বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে স্বঘোষিত আমির সাদ ও তার অনুসারীরা বিশৃঙ্খলা করার পরিকল্পনা নিয়েছে। আমরা কোনোভাবেই সেটি হতে দেব না। তাদের সমস্ত ষড়যন্ত্র যেকোনো মূল্যে আমরা ব্যর্থ করে দেব। বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে আজকের সম্মেলন থেকে ওলামায় কেরামের পক্ষ থেকে যে ঘোষণা দেওয়া হবে, সরকারকে সেই নির্দেশনা মানতে হবে। এর বাইরে কারও সিদ্ধান্ত তৌহিদী জনতা মানবে না। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে বলবো, আপনারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। আমরা আপনাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবো। আপনাদের মনে রাখতে হবে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অনেক ওলামায়ে কেরাম শাহাদাতবরণ করেছেন। আমরা শাপলা চত্বরে জীবন দিয়েছি। আওয়ামী জালিম সরকারের অনেক অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছি।

সম্মেলনে মাওলানা আব্দুল হামিদ (পীর মধুপুর) বলেন, বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে সরকার দুই পক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে। আমি বলবো কীসের পরামর্শ, এই সম্মেলন থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সরকারকে এটাই বাস্তবায়ন করতে হবে। ভিন্ন কোনো চিন্তা করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। তিনি বলেন, আমরা সরকারকে সহযোগিতা করবো। সরকারকেও আলেমদের সহযোগিতা করতে হবে। নয়তো পূর্ববর্তী সরকারের মতোই তাদের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হবে। হেফাজতে ইসলামী বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবিব বলেন, আমরা ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এ সরকারকে বসিয়েছি। কেউ যদি রক্ত চক্ষু দেখায়, তবে আমরা তাদের চক্ষু উপড়ে ফেলব। জাতির পথপ্রদর্শক হবে আলেমরা। তাবলিগের রাহবারও আলেমদের থেকেই হবে, অন্য কেউ নয়।

সমাবেশে মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী বলেন, সাদ স্বঘোষিত তাবলিগের আমির বলে ঘোষণা দিয়েছে। কোরআন হাদিস, আলেম-ওলামা, আল্লাহর অলি, নবী ও স্বয়ং আল্লাহর বিরুদ্ধে কুফরি বক্তব্য দিয়েছে৷ তাই সারা বিশ্বে তাবলিগের মূলধারা তাকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে। সাদের অনুসারীরা হচ্ছে কাদিয়ানী গ্রুপ। তারা ইসলামের মূলধারায় বিভক্তি সৃষ্টি করছে। তাবলীগের নামে কাদিয়ানীদের সব কর্মকাø নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। কাদিয়ানিরা বাংলাদেশে অবাঞ্চিত। নরসিংদীর জামিয়া কোরআনিয়া বৌয়াকুর মাদ্রাসার মোহতামিম মাওলানা ইসমাইল নুরপুরী বলেন, আজকের এই সমাবেশ প্রমাণ করলো- সাদ অনুসারীরা বাতিল, গোমরাহ। আমরা চাই, তিনি যেন বাংলার জমিনে পা রাখতে না পারে। তারা যেখানেই যায় সেখানেই রক্ত ক্ষয় হয়।

আল্লামা শাহ্ মহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্যে দেন হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক আল্লামা মুফতি খলিল আহমদ কাসেমী, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর আল্লামা শাহ্ মহিবুল্লাহ বাবুনগরীর লিখিত বক্তব্য পাঠ করে মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। এছাড়া মাওলানা আবদুল হামিদ, মাওলানা সালাহউদ্দীন নানুপুরী, মাওলানা সাজেদুর রহমান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

সাদপন্থিদের সংবাদ সম্মেলন আজ

আশিকুর রহমান: তাবলিগ, কওমি মাদ্রাসা ও দ্বীন রক্ষার্থে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত দেশের শীর্ষ আলেম-ওলামার মহাসম্মেলনকে ‘রাজনৈতিক শোডাউন’ বলে মনে করেন তাবলিগের সাদপন্থি অনুসারীরা। এই সমাবেশ নিয়ে আজ বুধবার (০৬ নভেম্বর) সংবাদ সম্মেলন করবেন তারা। এদিন সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠেয় সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন সাদপন্থি আলেমরা। হক্কানী উলামা মাশায়েখ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুফতি শফিউল্লাহ শাফী মাক্কী ও সাধারণ সাথীদের পক্ষে তৌহিদুল হক সোহেল স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।

এদিকে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত সমাবেশ নিয়ে বাংলাদেশে মাওলানা সাদের অনুসারীদের মিডিয়া সমন্বয়ক মুহাম্মাদ আবু সায়েম বলেন, আমরা মূল ধারার মেহনত করি। আমরা কাউকে হুমকি দিতে চাই না।

মোহাম্মদ সাদ কান্দালভি

গণমাধ্যমে আবু সায়েম দাবি করেন, এটা নিছক একটি রাজনৈতিক শো-ডাউন। সামনের নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে এবং মাদ্রাসার ছাত্রদের জড়ো করে তারা সরকারকে চাপে ফেলতে চাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চাচ্ছে। তাবলিগের এই মোবারক মেহনতের সঙ্গে এই ছাত্ররা এখনও সম্পৃক্ত নয়। এই রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও নয়। যারা তাবলিগে সময় লাগান, চিল্লা দেন তাদের উপস্থিতি নেই। অথচ মাদ্রাসাগুলো থেকে ছোট ছোট শিশু ছাত্রদেরও নিয়ে আসা হয়েছে। গত সোমবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার দফতরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শেষে তাবলিগের মাওলানা সাদ কান্ধলভির অনুসারী মাওলানা মুয়াজ বিন নূর বলেন, আমরা টানা সাত বছর তাবলিগের মাঠসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বঞ্চিত হচ্ছি। যারা আমাদের এতদিন বাধা দিয়ে আসছেন তাদের (মাওলানা মোহাম্মদ যোবায়ের অনুসারী দল) মন্ত্রণালয় থেকে দাওয়াত দেওয়া হলেও তারা আসেনি। তারা বাংলাদেশে এই বৈষম্য সৃষ্টি করে রেখেছে। এই না আসার মধ্যে দিয়ে তারা সরকারকে অবজ্ঞা করেছে। তারা বুঝাতে চেয়েছে তারা যা ইচ্ছা তাই করবে।

কাকরাইল মারকাজের ইমাম সাদপন্থি মুহাম্মাদ আযীমুদ্দীন গণমাধ্যমকে বলেন, সম্মানিত উলামায়ে কেরামের কোনো বক্তব্যে আমরা সামান্যতমও বিচলিত নই। তারা এর আগেও এমন বক্তব্য দিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ আপন মেহেরবাণীতে হকের উপর থাকার কারণে বাংলাদেশে আমাদেরকে টিকিয়ে রেখেছেন। সাদপন্থি এই মুফতি বলেন, আগামীতেও আল্লাহ আমাদেরকে টিকিয়ে রাখবেন- এই বিশ্বাস নিয়ে আমরা আমাদের দাওয়াতের ময়দানে অবিচল থাকব। কারো কোন বক্তব্যের আমরা পরোয়া করি না, প্রতিবাদও করব না।

তাবলীগ জামাতের দুই গ্রুপের বিরোধের নেপথ্যে কী?

আরাফাত রহমান: তাবলীগ জামাতের ভেতরে দু’টি গ্রুপের বিরোধ চলছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। যা ২০১৮ সালে সহিংস রূপও নেয়। এই বিরোধের কেন্দ্রে আছেন তাবলীগ জামাতের কেন্দ্রীয় নেতা ইন্ডিয়ার মোহাম্মদ সাদ কান্দালভি। ভারতীয় উপমহাদেশে সুন্নি মুসলমানদের বৃহত্তম সংগঠন এই তাবলীগ জামাতের মধ্যে এই দ্ব›দ্ব প্রথম প্রকাশ্য রূপ পায় ২০১৭ সালের নভেম্বরে – যখন তাদের মূল কেন্দ্র কাকরাইলে দুই দল কর্মীর মধ্যে হাতাহাতি হয়।

এর পর ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের আমীর শাহ আহমদ শফী’র উপস্থিতিতে তাবলীগ জামাতের একাংশের এক সম্মেলন হয়। এতে সাদ কান্দালভিকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করাসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ঢাকার মোহাম্মদপুরে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়- দিল্লিতে তাবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা সাদ কান্দালভির বক্তব্য ও মতবাদকে অনুসরণ করা হবে না এবং তাকে বাংলাদেশে আসতেও দেয়া হবে না। তাবলীগ জামাতের কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ সাদ কান্দালভির এসব চিন্তাভাবনা নিয়ে তাবলীগ জামাতের দুই গোষ্ঠীর দ্ব›েদ্বর প্রভাব গত ইজতেমাতেও পড়েছিল। কান্দালভির সমর্থক গোষ্ঠীর একজনের মতে, তাবলীগ জামাতের ৯০ শতাংশই ‘নিজামুদ্দিন মারকাজ’ বা সা’দ কান্দালভি-র অনুসারী হিসেবেই আছেন। কিন্তু তার কিছু কথাকে একটি গোষ্ঠী সহজভাবে নিতে পারছেন না। তার বিরোধীদের পেছনে কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের লোকেরা সক্রিয় বলে বলা হলেও – হেফাজতের নেতারা এ অভিযোগ সরাসরি স্বীকার করেন না। হেফাজতে ইসলামের নেতারা বলছেন, এখানে হেফাজত বা অন্য কোন রাজনৈতিক দলের কোন সম্পৃক্ততা নেই। প্রসঙ্গত,ইন্ডিয়ার মাওলানা ইলিয়াসের হাত ধরে তাবলিগ জামাতের প্রচার ও প্রসার শুরু হয়। তাবলিগের শুরু থেকে মাওলানা ইলিয়াসের উত্তরসূরিরাই এ দাওয়াতি কাজের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

এরই ধারাবাহিকতায় টঙ্গীর তুরাগ তীরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব-ইজতেমায় বরাবরই মাওলানা ইউসুফ, মাওলানা এনামুল হাসান, মাওলানা জুবায়েরুল হাসান ও মাওলানা সাদ কান্ধলভী অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯৯৫ সালে মাওলানা এনামুল হাসান মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি তাবলিগের ১০ সদস্যকে নিয়ে শূরা ব্যবস্থা প্রণয়ন করেন। যেন তার অনুপস্থিতিতে শূরা সদস্যরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এটি ২০১৫ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল। ২০১৫ সালে তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইলিয়াসের প্রপৌত্র মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে তাবলিগ জামাতের বিশ্ব আমির করা হয়। ২০১৭ সালে মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বেশ কিছু বক্তব্য ও বিবৃতি ইসলামের মূল আকিদা ও বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে ইন্ডিয়ার দেওবন্দ মাদ্রাসাসহ বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও অফ্রিকার শীর্ষ কওমি মাদরাসাগুলো থেকে ফতোয়ার মাধ্যমে অভিযোগ করা হয়।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৬ নভেম্বর ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

ইন্ডিয়ার সাইয়্যিদ আরশাদ মাদানি, বাংলাদেশের আল্লামা আহমদ শফি ও দক্ষিণ আফ্রিকার মুফতি ইব্রাহিম দেসাইসহ বিশ্ববরেণ্য বহু আলেম-মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে তার বক্তব্য প্রত্যাহারের আবেদন জানান। মাওলানা সাদ ও তার অনুসারীরা বিষয়টি বরাবরই কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও কওমি মাদ্রাসার আলেম-ওলামারা তাদের দাবি থেকে এতটুকুও সরতে রাজি হননি। তারা মাওলনার মতামতকে ভ্রান্ত প্রমাণের জন্য কুরআন-হাদিসের আলোকে সভা-সেমিনারের আয়োজন, বই-পুস্তক প্রণয়ন, লিফলেট ও প্রচারপত্র বিতরণ এমনকি প্রতিবাদে সভা-সমাবেশেরও আয়োজন করতে থাকেন। একসময় মাওলানা সাদের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আলেমরা। চরম দ্ব›দ্ব শুরু হয় তাবলিগের বিশ্ব মারকাজ দিল্লির নিজামুদ্দিনেও। ২০১৮ সালে এই দ্ব›েদ্ব পৃথক হয়ে পড়েন তাবলিগের অনুসারীরা। তাবলিগ জামাতের মধ্যে সৃষ্টি হয় দুই পক্ষের।

মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে পৃথক ফতোয়া দিয়ে বৈশ্বিকভাবে দারুল উলুম দেওবন্দের নীতি অনুসরণ করা হয় কওমি ও দেওবন্দিধারার মাদ্রাসাগুলোয়। এই দ্ব›েদ্বর রেশ এসে পড়ে বাংলাদেশেও। দেওবন্দ মাদ্রাসার অনুসরণে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার অনুসারীরাও মাওলানা সাদের বিপক্ষে অবস্থান নেন। তারা মাওলানা সাদকে বাংলাদেশে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। ২০১৮ সালের পর থেকে কওমি মাদ্রাসার আলেমদের বাধার মুখে মাওলানা সাদ আর বাংলাদেশের কোনো ইজতেমায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading