তাবলীগ জামাতের দুই গ্রুপের বিরোধের নেপথ্যে কী?
আরাফাত রহমান । বুধবার, ০৬ নভেম্বর , ২০২৪, আপডেট ১৫:৪৮
তাবলীগ জামাতের ভেতরে দু’টি গ্রুপের বিরোধ চলছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। যা ২০১৮ সালে সহিংস রূপও নেয়। এই বিরোধের কেন্দ্রে আছেন তাবলীগ জামাতের কেন্দ্রীয় নেতা ইন্ডিয়ার মোহাম্মদ সাদ কান্দালভি। ভারতীয় উপমহাদেশে সুন্নি মুসলমানদের বৃহত্তম সংগঠন এই তাবলীগ জামাতের মধ্যে এই দ্ব›দ্ব প্রথম প্রকাশ্য রূপ পায় ২০১৭ সালের নভেম্বরে – যখন তাদের মূল কেন্দ্র কাকরাইলে দুই দল কর্মীর মধ্যে হাতাহাতি হয়।
এর পর ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের আমীর শাহ আহমদ শফী’র উপস্থিতিতে তাবলীগ জামাতের একাংশের এক সম্মেলন হয়। এতে সাদ কান্দালভিকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করাসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ঢাকার মোহাম্মদপুরে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়- দিল্লিতে তাবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা সাদ কান্দালভির বক্তব্য ও মতবাদকে অনুসরণ করা হবে না এবং তাকে বাংলাদেশে আসতেও দেয়া হবে না। তাবলীগ জামাতের কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ সাদ কান্দালভির এসব চিন্তাভাবনা নিয়ে তাবলীগ জামাতের দুই গোষ্ঠীর দ্ব›েদ্বর প্রভাব গত ইজতেমাতেও পড়েছিল। কান্দালভির সমর্থক গোষ্ঠীর একজনের মতে, তাবলীগ জামাতের ৯০ শতাংশই ‘নিজামুদ্দিন মারকাজ’ বা সা’দ কান্দালভি-র অনুসারী হিসেবেই আছেন। কিন্তু তার কিছু কথাকে একটি গোষ্ঠী সহজভাবে নিতে পারছেন না। তার বিরোধীদের পেছনে কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের লোকেরা সক্রিয় বলে বলা হলেও – হেফাজতের নেতারা এ অভিযোগ সরাসরি স্বীকার করেন না। হেফাজতে ইসলামের নেতারা বলছেন, এখানে হেফাজত বা অন্য কোন রাজনৈতিক দলের কোন সম্পৃক্ততা নেই। প্রসঙ্গত,ইন্ডিয়ার মাওলানা ইলিয়াসের হাত ধরে তাবলিগ জামাতের প্রচার ও প্রসার শুরু হয়। তাবলিগের শুরু থেকে মাওলানা ইলিয়াসের উত্তরসূরিরাই এ দাওয়াতি কাজের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় টঙ্গীর তুরাগ তীরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব-ইজতেমায় বরাবরই মাওলানা ইউসুফ, মাওলানা এনামুল হাসান, মাওলানা জুবায়েরুল হাসান ও মাওলানা সাদ কান্ধলভী অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯৯৫ সালে মাওলানা এনামুল হাসান মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি তাবলিগের ১০ সদস্যকে নিয়ে শূরা ব্যবস্থা প্রণয়ন করেন। যেন তার অনুপস্থিতিতে শূরা সদস্যরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এটি ২০১৫ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল। ২০১৫ সালে তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইলিয়াসের প্রপৌত্র মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে তাবলিগ জামাতের বিশ্ব আমির করা হয়। ২০১৭ সালে মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বেশ কিছু বক্তব্য ও বিবৃতি ইসলামের মূল আকিদা ও বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে ইন্ডিয়ার দেওবন্দ মাদ্রাসাসহ বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও অফ্রিকার শীর্ষ কওমি মাদরাসাগুলো থেকে ফতোয়ার মাধ্যমে অভিযোগ করা হয়।
ইন্ডিয়ার সাইয়্যিদ আরশাদ মাদানি, বাংলাদেশের আল্লামা আহমদ শফি ও দক্ষিণ আফ্রিকার মুফতি ইব্রাহিম দেসাইসহ বিশ্ববরেণ্য বহু আলেম-মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে তার বক্তব্য প্রত্যাহারের আবেদন জানান। মাওলানা সাদ ও তার অনুসারীরা বিষয়টি বরাবরই কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও কওমি মাদ্রাসার আলেম-ওলামারা তাদের দাবি থেকে এতটুকুও সরতে রাজি হননি। তারা মাওলনার মতামতকে ভ্রান্ত প্রমাণের জন্য কুরআন-হাদিসের আলোকে সভা-সেমিনারের আয়োজন, বই-পুস্তক প্রণয়ন, লিফলেট ও প্রচারপত্র বিতরণ এমনকি প্রতিবাদে সভা-সমাবেশেরও আয়োজন করতে থাকেন। একসময় মাওলানা সাদের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আলেমরা। চরম দ্ব›দ্ব শুরু হয় তাবলিগের বিশ্ব মারকাজ দিল্লির নিজামুদ্দিনেও। ২০১৮ সালে এই দ্ব›েদ্ব পৃথক হয়ে পড়েন তাবলিগের অনুসারীরা। তাবলিগ জামাতের মধ্যে সৃষ্টি হয় দুই পক্ষের।
মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে পৃথক ফতোয়া দিয়ে বৈশ্বিকভাবে দারুল উলুম দেওবন্দের নীতি অনুসরণ করা হয় কওমি ও দেওবন্দিধারার মাদ্রাসাগুলোয়। এই দ্ব›েদ্বর রেশ এসে পড়ে বাংলাদেশেও। দেওবন্দ মাদ্রাসার অনুসরণে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার অনুসারীরাও মাওলানা সাদের বিপক্ষে অবস্থান নেন। তারা মাওলানা সাদকে বাংলাদেশে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। ২০১৮ সালের পর থেকে কওমি মাদ্রাসার আলেমদের বাধার মুখে মাওলানা সাদ আর বাংলাদেশের কোনো ইজতেমায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি।
ইউডি/এজেএস

