আমনের ভালো ফলনে বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠছেন কৃষক
উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৪, আপডেট ০৮:৪০
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া গ্রামের কৃষক নবির উদ্দিন বেপারি। নিজের জমির ধান কেটে কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছিলেন বাড়িতে। তাঁর ভাষ্য, চার বিঘা জমিতে এবার আমন ধানের আবাদ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। আগের তুলনায় চাষাবাদের খরচও বেড়েছে। তবে এবার ধানের দাম বেশি। তাই লোকসান হবে না। আর সদর উপজেলার পশ্চিম কোমরনই গ্রামের কৃষক হাফিজার মিয়া বলছিলেন, গত বছরের তুলনায় এবার বিঘাপ্রতি ৩-৪ মণ ধান বেশি হয়েছে। মোটা ধান ১ হাজার ২৫০ এবং চিকন ১ হাজার ৩৪০ টাকায় বিক্রি করেছেন তিনি।
কয়েক দফা বন্যা আর নদীভাঙনে বিপর্যস্ত হয়েছে গাইবান্ধা। কৃষিকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করেন এলাকার বেশির ভাগ মানুষ। ধানের আবাদ করেন অনেকে। বন্যাসহ নানান প্রতিকূলতার পর ধানের আবাদে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর আশা দেখছিলেন তারা। ভালো ফলনও হয়েছে। এতে ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলে আশা তাদের।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, গত বছর জেলায় ১ লাখ ২৯ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছিল। হেক্টরপ্রতি চাল উৎপাদন হয় ৩ দশমিক শূন্য ৯ টন। সে হিসাবে ধান উৎপাদন হয়েছিল ৬ লাখ ৯৯ হাজার ৩৯৮ টন। এবার ১ লাখ ৩৩ হাজার ৪০ হেক্টরে আবাদ হয়েছে। হেক্টরপ্রতি চালের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ২২ টনে। ধানের হিসাবে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪২ হাজার ৫৮৩ টন। গত বছরের তুলনায় ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৪৩ হাজার ১৮৫ টন বেশি হয়েছে। ৩ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে বেশি আবাদ হয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, এখনও মাঠে মাঠে আমন ধান কাটা ও মাড়াই চলছে। এখন সোনালি ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত তারা। কেউ ভ্যানে, আবার কেউ কাঁধে বা মাথায় নিয়ে ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছেন বাড়ি। কেউ কেউ জমিতেই মাড়াইয়ে ব্যস্ত। এবার উৎপাদন বেশি হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে কৃষকের মাঝে।
জেলার বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি মণ মোটা জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। চিকন ধান ১ হাজার ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দাম আরও বাড়বে। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর
ইউনিয়নের ব্যবসায়ী সাদা মিয়া বলেন, মৌসুমের শুরু থেকে মোটা জাতের ধান ১ হাজার ২০০ এবং চিকন জাত ১ হাজার ৩০০ টাকা প্রতি মণ কিনেছেন। এখন মোটা ধান মণপ্রতি ৫০ ও চিকনের দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। সামনে আরও বাড়তে পারে।
এদিকে ধান রোপণ থেকে শুরু করে মাড়াই পর্যন্ত ব্যয় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সদর উপজেলার মালিবাড়ি ইউনিয়নের কৃষক মামুন নিয়া। তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার তেল, সার ও কীটনাশকেরও দাম বেশি ছিল। বিঘাপ্রতি ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তবে ফলনও হয়েছে ভালো। বিঘাপ্রতি ১৪ থেকে ১৬ মণ ধান পাওয়া যাবে।
নদীতে ফসলি জমি হারিয়েছেন সদর উপজেলার কুন্দেরপাড়া চরের কৃষক শহিদুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, এ বছর পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হওয়ায় কীটনাশক কম লেগেছে। প্রয়োজন মতো সার ব্যবহার করেছেন। ফলন ভালো হওয়ায় লাভের মুখ দেখা যাবে।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন বলেন, এ বছর রোগবালাই কম হওয়ায় চাষাবাদে তেমন ক্ষতি হয়নি। ভালো ফলন হওয়ায় সন্তোষ রয়েছে চাষিদের মধ্যে। সব মিলিয়ে এবার ধানের উৎপাদন বেশি হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. খোরশেদ আলম বলেন, চলতি বছর তিন দফা বন্যা আর নদীভাঙনে কিছু জমি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সে সময় শুধু বীজতলা নষ্ট হয়েছে। পরে বিকল্প উপায়ে বীজতলা তৈরিতে সাহায্য করা হয়েছে। জেলায় চর আগে ১৬৫টি থাকলেও পরে বেড়ে ১৮৬টি হয়েছে। ২১টি চর বেড়েছে। এগুলোর অধিকাংশই উর্বর। ফলে সংকট কাটিয়ে ভালো ফলন পেয়েছে। গাইবান্ধার ইতিহাসে এবার সবচেয়ে বেশি আমন ধান উৎপাদন হয়েছে।
ইউডি/কেএস

