ত্রিশ হাজার দুর্গম চরবাসীর দুর্ভোগ ১ কিলোমিটার
উত্তরদক্ষিণ। বুধবার, ০৫ মার্চ, ২০২৫, আপডেট ১৪:৩০
গ্রীষ্মে সূর্যের প্রখরতা, শুকনো মৌসুমে বালুময় পথ, বর্ষায় নৌকায় খেয়া পারাপার আর শীতে ঘন কুয়াশা ভেদ করে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার মাহমুদনগর ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চলে ধলেশ্বরী নদীর পথ পেরিয়ে নিদারুণ কষ্টে যাতায়াত করছেন ৩০ হাজার মানুষ। ফলে একটি সেতু অভাবে বছরের পর বছরে যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এই চরবাসীর মানুষ।
সরেজমিনে জানা যায়, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাতুলী ইউনিয়ন সংলগ্ন গোলচত্বর থেকে ধলেশ্বরী নদী পাড়ী দিয়ে মাহমুদনগরের মাকোরকোল গ্রামে যেতে হয়। গোলচত্বর ও মাকোরকোলের মাঝখান দিয়ে প্রায় ১ কিলোমিটার প্রশস্ত ধলেশ্বরী নদী। এর পাশে জেলার নাগরপুর উপজেলা ও সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলা থেকে মাহমুদনগরের মাকোরকোলে নদী তীরে এসে ওই এলাকার মূল পাকা সড়ক পৌঁছেছে।
মাহমুদনগর ইউনিয়নের ছাত্র-ছাত্রী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ সিরাজগঞ্জের চৌহালী, নাগরপুরের ভাড়রা ইউনিয়নের পশ্চিম অংশের হাজারও মানুষের চলাচলের এটিই একমাত্র রাস্তা। এরপাশে গোলচত্বর পর্যন্ত পাকা সড়ক রয়েছে। মাঝখানে প্রায় এক কিলোমিটার প্রস্থের ধলেশ্বরী নদী। ওই এক কিলোমিটারে গ্রীষ্মকালে ধূ ধূ বালুচর, বর্ষায় শুধু পানি আর পানি এবং শীতকালে ঘন কুয়াশার রাজত্ব থাকে। ওই ১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে চরম ভোগান্তির শিকার হয়।
এই ইউনিয়নে মেজর মাহমুদুল হাসান উচ্চ বিদ্যালয় ও বালিয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় নামে দু’টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি পূর্ণাঙ্গ স্বতন্ত্র কারিগরি স্কুল, ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি ফাজিল ও একাধিক হাফিজিয়া মাদরাসা রয়েছে। ৩০ হাজার মানুষের স্বাস্থ্য সেবার জন্য ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রই একমাত্র ভরসা।
ওই এলাকার ভোগান্তির অপর নাম নৌকায় নদী পারাপার হওয়ার যন্ত্রণা। অসুস্থ রোগীকে জরুরি প্রয়োজনে জেলা সদরে নিতে না পেরে অনেকে জীবনও হারিয়েছে। মাহমুদনগর ইউনিয়ন হওয়ার আগে থেকে স্থানীয়রা গোলচত্বর থেকে মাকোরকোলে ধলেশ্বরী নদীতে একটি সেতুর দাবি করছেন। কিন্তু বার বার জনপ্রতিনিধিদের কাছে ওই দাবি পূরণ হয়নি।
স্থানীয় কৃষক মুন্নাফ আলী, আব্দুল জব্বার, আরফান আলীসহ অনেকেই জানান, ধলেশ্বরী নদীতে সেতু না থাকায় তারা কৃষিপণ্য চাষ করেও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। সেতুর অভাবে উৎপাদিত ফসল বিক্রির জন্য সময়মতো বাজারে নিয়ে যেতে পারেন না। এছাড়া খেয়া পাড়ি দিয়ে বা নদীর তপ্তবালু পেড়িয়ে হাট-বাজারে যেতে সময় বেশি লাগার সঙ্গে খরচও অনেক বেশি হয়। শহরে পণ্য বিক্রি করে এজন্য তাদের পোষায় না। গ্রামেও বিক্রি করলে দাম অনেক কম হয়।
মাহমুদনগর ইউপি চেয়ারম্যান আসলাম শিকদার জানান, তার ইউনিয়নের অভিভাবক সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসান বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে সেতু নির্মাণে উদ্যোগ নিয়ে টেন্ডার করিয়ে ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেটা বন্ধ হয়ে যায়। মাহমুদনগর ইউনিয়নের উন্নয়নের স্বার্থে এলাকার মানুষের কষ্ট লাঘবে সেতুটি নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
টাঙ্গাইল এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামরুজ্জামান জানান, গোলচত্বরের ওখানে ধলেশ্বরী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা ও প্রাথমিক পরিমাপ করা হয়েছে। প্রায় ১ কিলোমিটার প্রস্থের ধলেশ্বরী নদীতে সেতু নির্মাণে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। অচিরেই প্রাথমিক প্রাক্কলন তৈরি করে অনুমোদনের জন্য এলজিইডি ভবনে প্রস্তাব পাঠানো পর অনুমোদন ও অর্থপ্রাপ্তি সাপেক্ষে সেতু নির্মাণে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, টাঙ্গাইল শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার পশ্চিমে প্রায় ২৪টি গ্রাম নিয়ে ৩০ হাজার জনসাধারণের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ইউনিয়ন মাহমুদনগর। ২০০৪ সাল পর্যন্ত সদর উপজেলার কাতুলী ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) মাহমুদুল হাসানের জন্মস্থান এ ইউনিয়নের মাকোরকোল গ্রামে হওয়ায় তার প্রচেষ্টায় ২০০৪ সালে ‘মাহমুদনগর’ স্বতন্ত্র ইউনিয়ন হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে।
ইউডি/আরকে

