ক্ষতিকর গেমস বন্ধ করতে উদ্যোগ নেয়া জরুরি

ক্ষতিকর গেমস বন্ধ করতে উদ্যোগ নেয়া জরুরি

আবু সালেহ মোস্তফা । সোমবার, ০২ জুন, ২০২৫, আপডেট ১৩:৩৫

আপন গতিতে ছুটে চলছে সময়। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলছে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন। আর এই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটছে। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবী আজ বিশ্বগ্রামে পরিণত হয়েছে। আজ এক দেশ থেকে আরেক দেশে মুহূর্তের মধ্যে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র সবাই উপকৃত হয়। আবার এই তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারে ব্যক্তি সমাজ রাষ্ট্র সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মোবাইল গেম প্রযুক্তির অবদান। মোবাইল গেম বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে তরুণরা মোবাইল গেমের প্রতি এতটাই আসক্ত যে, তারা দৈনিক তিন-চার ঘণ্টার বেশি সময় মোবাইল গেমে অপচয় করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৮ সালে মোবাইল গেম আসক্তিকে ‘রোগ’ বলে আখ্যায়িত করেছে।

জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর জীবনের সোনালি সময় হলো তরুণ বয়স। কারণ তরুণ বয়সে মানুষ তার জীবনের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে। শ্রমশক্তিতে এ সময়টা থাকে উদ্দীপ্ত। যে কোনো বাধা পেরিয়ে সমাজ, রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে তারুণ্যের শক্তি। এ জন্যই বলা হয়ে থাকে—তারুণ্যই শক্তি। কিন্তু আজ আমাদের তরুণ সমাজ অনেক সমস্যায় ভুগছে। তার মধ্যে মোবাইল গেম আসক্তি অন্যতম। এর ফলে জীবনের শক্তিদীপ্ত সময়টা অপচয় হয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মোবাইল গেম আসক্তির ফলে দৈনিক তিন-চার ঘণ্টা অপচয় করার কারণে পড়াশোনা ঠিক মতো করতে পারে না। যার ফলে পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করে, হতাশ হয়। অনেকে আবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করে।

অনেকক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করার ফলে শারীরিক নানা সমস্যা দেখা দেয়। এর মধ্যে অন্যতম চোখের সমস্যা। অবস্থা এরকম হয়েছে যে, চোখের ডাক্তারের কাছে গেলেই প্রথমে জানতে চায় বেশিক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করে কি না। গভীর রাত জেগে গেম খেলার ফলে স্বাস্থ্য ঠিক থাকে না। মানসিকভাবেও নানা সমস্যায় ভুগতে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একনাগাড়ে অনেকক্ষণ মোবাইল গেম খেলা এবং একা থাকার কারণে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। সামাজিক জীব হিসেবে আমরা সমাজে একত্রে বসবাস করি। সমাজের অন্য সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে হয় এবং সমাজের কাজে অংশগ্রহণ করতে হয়। কিন্তু মোবাইল গেম আসক্তির ফলে তরুণরা স্বাভাবিক যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে না। ফলে তারা সমাজ থেকে আস্তে আস্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, শক্তিশালী সমাজ কাঠামো গড়ে উঠতে ব্যাঘাত ঘটছে।

অনলাইন গেম এখন অল্প বয়সীদের এতটাই প্রিয়, একবার গেম খেলতে বসলে ডিভাইস ছেড়ে উঠতেই চায় না তারা। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে অনলাইন গেমের আসক্তি ক্রমাগত বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিল ছেড়ে স্মার্টফোনে ফ্রি ফায়ার ও পাবজি গেমের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এতে প্রাথমিক থেকে শুরু করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা আসক্ত হচ্ছেন। অনলাইন গেম তরুণদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হলেও এই জনপ্রিয়তা অভিভাবকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত আসক্ত হয়ে পড়েছে আমাদের আশেপাশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েগুলো। শুধু স্কুল,কলেজ নয় মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীদের ভিতরেও এর প্রভাব পড়েছে। প্রতিনিয়ত এই কিশোর-কিশোরী ছাত্র-ছাত্রীগুলো টাকা দিয়ে এমবি কিনে দিন-রাত পার করছে ঐ গেমস এর পিছনেই।

পিতামাতা টাকা দিতে অস্বীকার করলে অভিমান করে “সুইসাইড”এর পথও বেছে নিচ্ছে কেউ কেউ। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন গেম এমন এক ধরনের কাজ, যার মধ্যে আসক্তির উপাদান খুবই তীব্র। অর্থাৎ একবার কেউ খেলা শুরু করলে সেই গেমের প্রতি আসক্তি বাড়তেই থাকে। অনলাইন গেম কিশোর-কিশোরীদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়, এখানে তারা আনন্দ পাচ্ছে। কিন্তু এটার পেছনে অনেক ক্ষতিকর দিক আছে। মাদকের যেমন আসক্তি, এটারও তেমন আসক্তি। প্রতিরোধের জন্য মনোচিকিৎসক এবং কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে আসক্তদের। এছাড়া পরিবারের দায়িত্বশীল আচরণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধিও সমাধান হতে পারে। অধিকাংশ ভিডিও গেমের কনটেন্টগুলো যুদ্ধ, সংঘাত, রক্তপাত নিয়ে- যা কোমলমতি শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়। শুধু শহরে নয়, ভিডিও গেমসের দিকে ঝুঁকছে গ্রামের শিশু-কিশোরেরাও। মফস্বলের শিশু কিশোররা একত্রে দলবেঁধে ভিডিও গেম খেলছে। খেলার মাঠ থাকা সত্ত্বেও ভিডিও গেমের দিকে ঝুঁকে তারা। একসময় বিকাল হলেই গ্রামের খেলার মাঠগুলো মেতে উঠতো ছোট ছোট অসংখ্য ছেলে মেয়েদের বিভিন্ন ধরনের গ্রামীণ খেলাধুলা আর আনন্দ আড্ডায়। এখন আর সেই পরিবেশ তেমন দেখা যায় না। কারণ, তাদের হাতে এখন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে স্মার্টফোন। তারা খেলাধুলা ছেড়ে ফোনে ব্যস্ত হয়ে থাকে। গ্রামের অসংখ্য ছেলে আছে যাদের খেলাধুলায় বিকাল কাটানোর কথা ছিল কিন্তু তারা এখন ফ্রি ফায়ার, পাবজি নামক ক্ষতিকর গেমগুলো খেলে সময় পার করছে।

মোবাইল গেম খেলার কারণে মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে এর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। অধিক সময় ধরে মোবাইল গেম খেলার কারণে চোখে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন : অকালে চোখের সমস্যায় ভোগা, চোখ দিয়ে পানি পড়া, মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা, চোখ জ্বালা করা, চোখে কম দেখা ইত্যাদি। অধিক সময় পর্যন্ত মোবাইল গেম খেলার কারণে আমাদের মনোযোগ শুধু মোবাইলেই ব্যস্ত থাকে। ফলে হঠাৎ মোবাইল রেখে অন্য দিকে তাকালে প্রচুর মাথাব্যথা শুরু হয়। সাধারণত মোবাইল গেম খেলার সময় আমরা ঝুঁকে থাকি। খুব কম সময়ই আমরা শুয়ে শুয়ে খেলি। ঝুঁকে বসে অধিক সময় মোবাইল গেম খেলার কারণে ঘাড়ব্যথা হয়ে যায়। মোবাইল গেম খেলার সময় আমরা আমাদের সম্পূর্ণ মনোযোগ গেমের দিকেই রাখি। তখন আমাদের কেউ ডাকলে আমরা তার প্রতি বিরক্তবোধ হই।

কখনো কখনো নিজের অজান্তেই খারাপ ব্যবহার করে অন্যকে আঘাত করি। এ ছাড়া অধিক সময় মোবাইল গেম খেলার পর আমরা স্বাভাবিকভাবেই ক্লান্তি বোধ করি। এ সময় আমাদের কোনো কাজের কথা বললে আমরা অনেক বাজেভাবে রেগে যাই এবং নানা উল্টাপাল্টা কথা বলে থাকি। এক্সেজ ইজ ভেরি বেড অর্থাৎ অতিরিক্ত সবকিছুই খারাপ। অতিরিক্ত গেম খেলার প্রভাবে মানুষের চিন্তাশক্তি কমে যায়। সৃজনশীল মেধা হ্রাস পায়। ফলে ব্যক্তির নতুন কিছু সৃষ্টির দক্ষতা কমে যায়। সেই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও কমে যায়। সৃজনশীল মেধা কমে যাওয়ার কারণে দেশও মেধাশূন্য হয়ে যেতে পারে।

বর্তমান যুগে শিশু, কিশোর, যুবক, যুবতী সবাই মোবাইল গেম খেলা নিয়ে এত বেশি আসক্ত যে, তারা পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। পড়ালেখার সময় পড়ালেখা ছেড়ে মোবাইল গেম খেলছে। ফলে অনেকে পড়ালেখা ছেড়ে দিচ্ছে এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। মোবাইল গেমে আসক্ত একজন যুবক সাধারণত বাইরের সবকিছু থেকে নিজেকে আলাদা করে রাখে। মোবাইলের বাইরে সে অন্যকিছু চিন্তাও করতে পারে না। এর ফলে সে তার মা, বাবা, পাড়া-প্রতিবেশী, গুরুজনের দেওয়া শিক্ষা অর্থাৎ বিভিন্ন আদেশ-নিষেধ ভুলে গিয়ে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে পড়ে।

মোবাইল দিয়ে অতিরিক্ত গেম খেলার কারণে মানবিক মূল্যবোধ নষ্ট হয়। যুবকরা হলো ভবিষ্যতের প্রদীপ। কিন্তু বর্তমানে যুবসমাজরা মোবাইল গেমের প্রতি এতটা আসক্ত যে, তারা তাদের দায়িত্ব, কর্তব্য, কাজকর্ম ইত্যাদি বাদ দিয়ে সারা দিন মোবাইলের পেছনে পড়ে থাকে। এর ফলে কাজকর্ম না করায় বেকারত্বের হার বেড়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে দেশের মানুষ ও চরম দরিদ্রতার স্বীকার হচ্ছে। মোবাইল গেমে অধিক সময় ব্যয় করার ফলে এখনকার ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার প্রতি মনোনিবেশ করে না। মা-বাবা, পাড়া-প্রতিবেশী ও গুরুজনদের দেওয়া শিক্ষাও গ্রহণ করে না। কীভাবে মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা ও আচরণ করতে হয় তাও তারা ভুলে যাচ্ছে। এর ফলে অনেক বিষয় নিয়ে তর্ক করে সমাজে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। মোবাইলে অধিক সময় গেম খেললে মোবাইলের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে মোবাইল গরম হয়ে যায়।

মোবাইল আবিষ্কার হয়েছিল মানুষের উপকারের জন্য। কিন্তু কে জানত তা ভয়াবহ ক্ষতি করতে সক্ষম হবে। যে মোবাইল আবিষ্কার হয়েছিল মানুষের উত্তম ব্যবহারের জন্য এখন বেশির ভাগ সময় এর নেগেটিভ ব্যবহার হচ্ছে। আর এই আধুনিক যুগে মানুষের বিনোদনের জন্য বের হয়েছে মোবাইল গেম। আর এই মোবাইল গেমে সবচেয়ে বেশি আকর্ষিত হচ্ছে যুবসমাজ। শুধু যুবকরা নয় ছোট, বড় সবাই এই গেম খেলায় মগ্ন হয়ে পড়েছে। দিনের বেশির ভাগ সময়ই তারা এই মোবাইল গেমের পেছনে ব্যয় করে দিচ্ছে। কিন্তু তারা জানে না এই মোবাইল গেমের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে।

ইন্টারনেট বা গেম আসক্তি কিন্তু মাদকাসক্তির মতোই একটি সমস্যা। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য অভিভাবকদের কঠোর নজরদারির সাথে সাথে তাদের হাতে এই ফোন না দেওয়া এবং দেশের সর্বস্তরের মানুষের এসকল বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিয়ে এই আসক্তি দূর করা চেষ্টা করতে হবে অভিভাবকদের। সেই সাথে এসব গেমকে নিষিদ্ধ করতে উদ্যোগ নিতে হবে। মানসিক অবসাদ দূর করতে বিনোদনের অবশ্যই প্রয়োজন। তাই বলে বিনোদনের নামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করার কোনো অর্থ নেই। তারুণ্যের শক্তি কাজে লাগাতে সময় নষ্ট করা রোধ করতে হবে। আমাদের দেশের দায়িত্বশীল মহল কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে মোবাইল গেমে অযথা সময় নষ্ট রোধ করে তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সুন্দর পৃথিবী গড়তে ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্বাস করি। একই সঙ্গে আমরা সচেতন হয়ে পরিবার, সমাজ ও দেশের সেবা করতে হবে।

যেহেতু এই গেমের মাধ্যমে শিশু, নারী, পুরুষসহ যুবসমাজ ক্ষতিকর প্রভাবের সম্মুখীন, তাই এখনই আমাদের সচেতন হওয়া জরুরি। এজন্য শিক্ষিত সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রত্যেকে যার যার জায়গা থেকে কাজ করতে হবে। মোবাইল গেমের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে পত্রিকায় সচেতন বার্তা লিখতে হবে। তা ছাড়া পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট ইত্যাদির মাধ্যমে সবাইকে সচেতন করে তুলতে হবে। গ্রামগঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় নাটকের মাধ্যমে সবাইকে সতর্ক করতে হবে। মানুষকে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। পত্রিকা এবং বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। এভাবে সচেতন করে তুলতে পারলেই মোবাইল গেম থেকে যুবসমাজসহ সবাইকে বাঁচানো সম্ভব হবে। উন্নত জীবনব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

লেখক : কলামিস্ট।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading