অস্থির বাজার, নিত্যপণ্যে হাঁসফাঁস ভোক্তার
উত্তরদক্ষিণ। শুক্রবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৫, আপডেট ১১:৩০
সাপ্তাহিক ছুটির দিন সকালে বাজারে এসেই মাথায় হাত বেসরকারি চাকরিজীবী আশরাফুল হোসেনের। কেন না গত সপ্তাহের তুলনায় আরও বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। এতে পকেটে যে টাকা এনেছিলেন তা দিয়ে সম্পূর্ণ বাজার হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয়ে তিনি।
শুক্রবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর নয়াবাজার ও কারওয়ান বাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, সপ্তাহ ব্যবধানে আরও অস্থির হয়ে উঠেছে রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজার। শাক-সবজি, মাছ-মাংস, ডিমসহ বেড়ে গেছে প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম।
সপ্তাহ ব্যবধানে কোনো কোনো সবজি প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে অন্তত ১০-২০ টাকা পর্যন্ত। বাজারে প্রতিকেজি কচুমুখী ৬০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৭০ টাকা, পেঁপে ২০ টাকা, পটোল ৮০ টাকা, গোল বেগুন ১০০ টাকা, লম্বা বেগুন ৮০ টাকা, কাঁকরোল ৬০ টাকা, বরবটি ৮০ টাকা, গাজর ৬০-১০০ টাকা ও কহি ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া করলা ৮০ টাকা, টমেটো ১৫০ টাকা, ঝিঙে ৬০ টাকা, কচুর লতি ৬০-৮০ টাকা ও শসা ৭০-৮০ টাকা কেজি দরে বেচাকেনা হচ্ছে। আর লাউ প্রতি পিস ৬০-৭০ টাকা ও চালকুমড়া প্রতি পিস ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজির পাশাপাশি দাম বেড়েছে সব ধরনের শাকেরও। প্রতি মুঠো লাউ শাক ৪০ থেকে ৫০ টাকা ও পুঁইশাক ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি আটি ডাঁটাশাক ৩০ টাকা, কলমি শাক ১৫ টাকা, লালশাক ২০-৩০ টাকা ও পাটশাক ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৃষ্টির কারণে সরবরাহ কমায় প্রায় সব ধরনের শাক-সবজির দাম বেড়েছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা আনিস বলেন, কোনো কোনো সবজিতে প্রায় ২০ টাকা পর্যন্তও বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে পটোলের দাম। তবে তুলনামূলক কম রয়েছে পেঁপে।
দাম বেড়েছে কাঁচা মরিচ ও ধনেপাতারও। প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ২০০-২৪০ টাকায়। আর প্রতিকেজি ধনেপাতার জন্য গুনতে হচ্ছে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। বিক্রেতারা বলছেন, বৃষ্টির কারণে ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দাম বেড়েছে মরিচ ও ধনেপাতার।
এদিকে বাজারে ইলিশের দাম কিছুটা কমলেও চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে অন্যান্য মাছ। বাজারে ১ কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২২০০ টাকায়। আর ৫০০-৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১৬০০ টাকা, ৭০০-৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১৮০০ টাকা ও দেড় কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৩০০০-৩২০০ টাকায়।
এছাড়া প্রতিকেজি বোয়াল ৭৫০-৯০০ টাকা, কোরাল ৮৫০ টাকা, আইড় ৭০০-৮০০ টাকা, চাষের রুই ৩৮০-৪৫০ টাকায়, কাতল ৪৫০ টাকা, তেলাপিয়া ১৮০-২২০, পাঙাশ ১৮০-২৩০, কৈ ২০০-২২০ এবং পাবদা ও শিং বিক্রি হচ্ছে ৪০০-৫০০ টাকায়।
আর চাষের ট্যাংরা প্রতি কেজি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা, কাঁচকি ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা ও মলা ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দাম বেড়েছে মুরগিরও। কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকায়; আর প্রতিকেজি সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩২০-৩৪০ টাকায়। এছাড়া প্রতিকেজি দেশি মুরগি ৬০০-৭০০ টাকা, সাদা লেয়ার ৩১০ টাকা ও লাল লেয়ার বিক্রি হচ্ছে ৩২০ টাকায়। জাতভেদে প্রতি পিস হাঁস বিক্রি হচ্ছে ৫০০-৬০০ টাকায়।
বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় দাম বাড়ছে। মুরগি বিক্রেতা দিদার বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টির কারণে খামার থেকে পর্যাপ্ত মুরগি আসছে না। তাই সরবরাহ কমে গেছে, আর দাম বেড়ে গেছে।’
বাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ডিমও। বর্তমানে প্রতি ডজন লাল ডিম ১৪৫-১৫০ টাকা ও সাদা ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩৫-১৪০ টাকায়। এছাড়া প্রতি ডজন হাঁসের ডিম বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকায়। বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে হঠাৎ করে বেড়েছে ডিমের চাহিদা। কিন্তু সেই তুলনায় বাড়েনি সরবরাহ; যা বাড়িয়ে দিচ্ছে ডিমের দাম।
তবে গরু ও খাসির মাংসের দামে তেমন পরিবর্তন নেই। প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০-৮০০ টাকায়, খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ছাগলের মাংস ১ হাজার ১০০ টাকায়।
এদিকে, পাইকারিতে দাম কমলেও এর প্রভাব এখনও পড়েনি পেঁয়াজের খুচরা বাজারে। ফলে ভোক্তাদের বাড়তি দামেই কিনতে হচ্ছে পেঁয়াজ। সীমান্ত নামে এক ক্রেতা বলেন, প্রতি কেজি পেঁয়াজ কিনতে হচ্ছে ৮৫-৯০ টাকায়। যা এক ধরনের জুলুম। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আমদানির পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে তদারকি বাড়াতে হবে।
নিত্যপণ্যের এই ঊর্ধ্বমুখী দামে হাঁসফাঁস অবস্থা ভোক্তাদের। তারা বলছেন, বাজার অস্থির করে তুলেছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। কিন্তু নিয়ন্ত্রণে নেই সরকারের কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ। বেসরকারি চাকরিজীবী আশরাফুল হোসেন বলেন, ‘গত সপ্তাহের তুলনায় দাম আরও বেড়ে গেছে। যে টাকা সঙ্গে এনেছিলাম, তাতে সম্পূর্ণ বাজার করতে পারব কিনা সন্দেহ আছে। এভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়লে আমরা সাধারণ মানুষ খাব কি?’
আরেক ক্রেতা নিয়ামুল হক বলেন, ‘বাজারে পণ্যের দাম বাড়লেও, নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। এতে অসাধুরা আরও দাম বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। নিয়মিত বাজার তদারকি করলে, বাজারে স্বস্তি ফেরানো অসম্ভব।’
বাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
সংগঠনটির সিনিয়র সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন জানান, ‘অনেক ব্যবসায়ী অতি মুনাফা করছে এবং হঠাৎ করেই তারা সবাই মিলে সিন্ডিকেটে নামছে। এর ফলে অল্প সময়ে অনেক পণ্যের দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত আমদানি ও মজুত থাকা সত্ত্বেও যারা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। তাই ব্যবসায়ী নামক কিছু মূল্যসন্ত্রাসীরা কিছু দিন পরপর এক-একটি পণ্য নিয়ে এমন ধরনের কারসাজি চালাচ্ছেন।’
বাজারে কেনো মনিটরিং নেই উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলো তৎপর নয়। তারা নানা প্রটোকলে ব্যস্ত থাকার কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। মনিটরিং বলতে শুধু ভোক্তা অধিকারের বাজার তদারকি বোঝানো হয় না; বরং আমদানিকারক, পাইকারি বিক্রেতা ও উৎপাদকরা পণ্যের দাম, শুল্ক, অন্যান্য ট্যাক্স ও খরচ এবং বিক্রির হিসাব কীভাবে করেছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। কিন্তু সরকারের কেউ এগুলো দেখতে চান না। বরং সবাই ব্যস্ত থাকেন কীভাবে ব্যবসায়ীদের সেবা প্রদানের মাধ্যমে বাড়তি পাওনা আদায় করা যায়।’
ইউডি/কেএস

