গাজায় শিল্পীদের মিউজিক থেরাপি: বাঁশির সুরে ভুলছেন বুলেট বোমার আতঙ্ক
উত্তরদক্ষিণ। শনিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৫, আপডেট ০৯:৩০
গাজা বিশ্ব মানবতার চরম ব্যর্থতার এক নাম! শির উঁচু করে শান্তি-সৌহার্দ আর গণতন্ত্রের গলাবাজি করা বিশ্বের তাবড় সব হোমড়া-চোমড়া নেতাদের মনভোলানো প্রতিশ্রুতির ধ্বংসাবশেষ; একবিংশ পৃথিবীর সর্বাধুনিক সভ্যতার গা শিউরানো সুরতহাল! মধ্যপ্রাচ্যের এই ছোট্ট ভ‚খণ্ডটিকে এখনও দু-বছর আগের সেই গাজা নাম ধরে ডাকলে শুধু ভৌগলিক কঙ্কালটুকুই সাড়া দেয়। বুলেট-বোমায় বিধ্বস্ত বিস্তীর্ণ এই ধ্বংসস্ত‚পের এখন একটাই পরিচয়- মৃত্যুদ্বীপ। পৌরাণিক চোখে দেখলে- মৃত্যুপুরী।
আমেরিকার আশীর্বাদপুষ্ট বর্বর ইসরাইলের আগ্রাসী শেকেলে বাঁধা এক অবরুদ্ধ জনপদ। যেখানে বাসিন্দাদের ঘুম ভাঙে ইসরাইলি নৃশংস যুদ্ধাস্ত্রের শব্দে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে এ যেন গাজাবাসীর নিত্যদিনের রুটিন। তবে এতসব বিকট যুদ্ধাস্ত্রের মাঝেই আশা জাগাচ্ছে শিল্পীদের সুমধুর গান। থেরাপির মতো কাজ করছে সংগীতের পরিবেশনা। বাঁশির সুরে ক্ষণিকের জন্য হলেও বাসিন্দারা ভুলছেন বুলেট-বোমার আতঙ্ক। রয়টার্স।
ইসরাইলের গাজা হামলার আগে অবরুদ্ধ অঞ্চলটিতে ছিল সংগীত শেখার স্কুল। শিশু থেকে তরুণ-তরুনীরা সেখানে অনুশীলন করত। কিন্তু ইসরাইলের হামলার জেরে বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেসব স্কুল। এখন নতুন করে সেই উদ্যোগ নিয়েছে এডওয়ার্ড সাইদ ন্যাশনাল কনজারভেটরি অব মিউজিক। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকদের নেতৃত্বে তরুণ শিক্ষার্থীরা সংগীত পরিচালনা করছে। বাস্তুচ্যুত শিবিরের তাঁবুতেই তারা তাদের অনুশীলন অব্যাহত রেখেছে। ১৫ বছর বয়সি রিফান আল-কাসাস বলেন, ‘যখন আমি যন্ত্রগুলো বাজাই, তখন আমার মনে হয় যেন আমি উড়ে যাচ্ছি। সংগীত আমাকে আশা দেয় এবং আমার ভয় কমায়।’
এই প্রতিষ্ঠানটি পশ্চিম তীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর প্রায় ১৩ বছর পর গাজায় তারা এ শাখা খোলে। সেখানে গাজার জনপ্রিয় ধারার পাশাপাশি ধ্রুপদী সংগীতও শেখানো হয়। বোমা হামলার আগে ইসরাইল কখনো কখনো সেরা শিক্ষার্থীদের গাজার বাইরে ভ্রমণের জন্য অনুমতি দিত। ২২ মাস ধরে বোমা হামলার পর কিছু ছাত্র এখন মারা গেছে। জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক ভিডিও অনুসারে, স্কুলের পুরনো বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পড়ে আছে। দেওয়াল ভেঙে পড়েছিল, ঘরগুলো ধ্বংসস্তূপে ভরা ছিল এবং একটি গ্র্যান্ড পিয়ানো ধ্বংস গিয়েছিল। সংরক্ষণাগারের জন্য কাজ করা এক সমন্বয়কারী ফুয়াদ খাদের বলেন, যুদ্ধে খুব কম বাদ্যযন্ত্রই অক্ষত আছে। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য অন্যান্য বাস্তুচ্যুতদের কাছ থেকে কিছু বাদ্যযন্ত্র কিনেছেন। কিন্তু বোমাবর্ষণের সময় কিছু ভেঙে গেছে।
এখন শিক্ষকরা খালি ক্যান এবং পাত্র থেকে তাদের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে সংগীত পরিচালনা করছেন। এমনকি অনেক শিক্ষকই জীবনের পরোয়া না করে আবার নিজেদের আগের জায়গা ফিরে এসেছেন- যেন তারা শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারেন। এমনই একজন ৪৩ বছর বয়সি আবু আমশা। উত্তরে গাজা সিটিতে তিনি ফিরে আসেন। গত ছয় মাস ধরে তরুণ-তরুণীদের গিটার, হ্যান্ড ড্রাম এবং নে, একটি রিড বাঁশি শেখাচ্ছেন। পাশপাশি ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে সেশনের জন্য কিন্ডারগার্টেনগুলোতেও যান।
দক্ষিণ ও মধ্য গাজায় শিক্ষকরাও সংগীতের পাঠদান করছে। জুন মাসে ১২ জন সংগীতশিল্পী এবং তিনজন গানের শিক্ষক প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থীকে সংগীত শিক্ষা দিচ্ছেন। আমশা আরও বলেন, ৮ আগস্ট ইসরাইলি মন্ত্রিসভার গাজা শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর শিক্ষক এবং অভিভাবকরা আবারও উচ্ছেদ হওয়ার বিষয়ে ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’। ইসরাইল কখন এটি চালু করবে তা জানায়নি।
ইউডি/কেএস

