নিরাপদ প্রত্যাবাসন চান রোহিঙ্গারা
উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৫, আপডেট ০৯:০০
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও প্রত্যাবাসনের টেকসই সমাধান খুঁজতে কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হয়েছে। গতকাল রোববার বিকেলে উখিয়ার ইনানীতে হোটেল বে-ওয়াচ মিলনায়তনে তিন দিনের এ সম্মেলন শুরু হয়। প্রথম দিন ক্যাম্প থেকে ১০০ রোহিঙ্গা প্রতিনিধিকে সম্মেলনে আনা হয়। অতিথিরা তাদের মতামত শুনেছেন। তারা নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
মূলত স্বদেশ ফেরার ‘রোহিঙ্গা ভাবনা’ নিয়ে রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিশেষ সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই সেশনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আস্থা গড়ে তোলার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।
রোহিঙ্গাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এ সেশনে অংশ নেন। সেশনটি পরিচালনা করেন রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নেতা লাকি করিম, মোহাম্মদ রফিক ও ওমর সালমা। এতে বক্তব্য দেন– সয়েদুল্লাহ, ফুরকান মির্জা, আবদুল্লাহ, হুজ্জাউত উল্লাহ, সহাত জিয়া হিরো, আবদুল আমিন, জাইতুন নারা, জিহিন নূর, আবদুল্লাহ ও মুজিফ খান।
সম্মেলনে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত বিশেষ দূত থমাস এইচ অ্যান্ড্রুজ ছাড়াও ঢাকায় অবস্থানরত বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক সংগঠন, বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনের মূল অধিবেশন আজ সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের ফাঁকে উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন হবে। তার আগে এ সম্মেলনকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে।
সম্মেলনের এক ফাঁকে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম সাংবাদিকদের বলেন, ‘সহায়তা না পেলে যে মানবিক দুর্যোগ সৃষ্টি হবে, তা আমরা এই সংলাপে জোরালোভাবে তুলে ধরছি। বর্তমানে যারা সহায়তা করছেন, তাদের পাশাপাশি নতুন উৎস থেকেও আর্থিক সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা চলছে।’
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সিয়াম বলেন, ‘বাংলাদেশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। তবে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুধু বাংলাদেশের প্রচেষ্টার ওপর নির্ভরশীল নয়, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও আস্থার ওপরও তা নির্ভর করে। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান এখন শুধু একটি আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।’
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, এদিন রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে শোনা হয়েছে তারা আসলে কী চায়, তারা কীভাবে নিজ দেশে ফেরত যাবে। এ আলোচনাটি মূলত তাদের মনোবল বৃদ্ধি করা ও প্রত্যাবাসনে তাদের ভাবনা শোনার জন্য। সেখানে অংশীজনরা কীভাবে রোহিঙ্গাদের সহযোগিতা করতে পারেন, এটি ছিল প্রথম দিনের আলোচনার বিষয়।
সন্ধ্যায় বিদেশি অতিথিদের জন্য পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সৌজন্যে রোহিঙ্গাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। যেখানে তাদের ঐতিহ্যগত সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা তুলে ধরা হয়।
মিজানুর রহমান বলেন, আগামীকাল মঙ্গলবার অতিথিদের ক্যাম্প পরিদর্শনে নিয়ে যাওয়া হবে। রোহিঙ্গাদের কীভাবে রাখা হয়েছে, তারা তা দেখবেন। রোহিঙ্গাদের জন্য যেসব সেবা চালু রাখা হয়েছে, সেগুলোর পর্যবেক্ষণ করবেন তারা। রোহিঙ্গাদের সঙ্গেও আলোচনা করবেন। আমাদের মূল উদ্দেশ্য এবং রোহিঙ্গাদের চাওয়া– তাদের নিজ দেশে নিরাপদে ফেরত যাওয়া, যাতে কোনো হানাহানি বা বিপত্তির কারণ না হয়।
রোহিঙ্গা শিশুদের ‘ঝরে পড়ার’ তথ্য দিল ইউনিসেফ
রোহিঙ্গাদের দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি ফেরাতে কক্সবাজারে যখন শুরু হয়েছে তিন দিনের সম্মেলন, ঠিক সেই মুহূর্তে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক তহবিল ইউনিসেফ জানাল রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষাজীবন থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা।
নিদারুণ অর্থ সংকট মেটানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে ভারাক্রান্ত মনে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, প্রায় দেড় লাখ শিশুর লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন তারা। এসব শিশু কেজি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পড়ুয়া। অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়েই তারা আর স্কুলে যেতে পারছে না।
প্রাথমিক পর্যায়ে না পড়ে কোন প্রক্রিয়ায় ওপরের ক্লাসগুলোতে শিশুরা পড়বে– এমন প্রশ্নের জবাবে ফ্লাওয়ার্স বলেন, ক্যাম্পে আরও কিছু সংস্থা কাজ করছে, আমরা আশা করছি, তারা অর্থ সহায়তা পেলে এসব শিশুকে পড়ানোর ব্যবস্থা করবেন। সেখান থেকে ইউনিসেফের খোলা থাকা ওপরের ক্লাসগুলোতে তারা ভর্তি হবে।
ইউডি/কেএস

