অ্যান্টার্কটিকার বরফের গভীরে মিলল হারিয়ে যাওয়া এক ‘পৃথিবী’
উত্তরদক্ষিণ। শনিবার, ০৩ জানুয়ারি , ২০২৬, আপডেট ১৭:৩০
পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা স্থায়ী মানব বসতির জন্য অনুপযুক্ত। বিস্তীর্ণ এই সাদা মহাদেশের বহু অংশে এখনও মানুষের পা পড়েনি। দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের কাছে অ্যান্টার্কটিকা ছিল এক রহস্যের নাম। তবে গবেষকরা বলছেন, শুরু থেকেই এমন বরফে ঢাকা ছিল না এই মহাদেশ।
কোটি কোটি বছর আগে অ্যান্টার্কটিকা ছিল গভীর জঙ্গল ও সবুজ বনভূমিতে পরিপূর্ণ। বর্তমানে যেখানে পেঙ্গুইনের বিচরণ, সেই অঞ্চল এক সময় ছিল ঘন অরণ্যে আচ্ছাদিত। আজও অ্যান্টার্কটিকায় কিছু গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ দেখা যায়। তবে গবেষকদের দাবি, এক কালে সেখানে গুল্ম নয়, বরং বড় বড় গাছও জন্মাত।
অ্যান্টার্কটিকায় কখনোই স্থায়ী মানব বসতি গড়ে ওঠেনি। শুধুমাত্র গবেষণার প্রয়োজনে সাময়িকভাবে বিজ্ঞানীরা সেখানে অবস্থান করেন। কয়েক বছর আগে ব্রিটেনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টুয়ার্ট জেমিসনের নেতৃত্বে একদল গবেষক অ্যান্টার্কটিকার বরফের স্তরে ক্ষুদ্র পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।
গবেষণার অংশ হিসেবে তারা ড্রিল মেশিন ব্যবহার করে বরফের আস্তরণে গর্ত করতে থাকেন। প্রায় দুই কিলোমিটার গভীরে পৌঁছানোর পর তারা এমন কিছু নমুনা পান, যা অ্যান্টার্কটিকা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। বরফের নিচে চাপা পড়ে থাকা পলির নমুনায় পাওয়া যায় উদ্ভিদের জীবাশ্ম ও পরাগরেণু, গাছের পাতার ভগ্নাংশ এবং মৃত অণুজীবের চিহ্ন। পরীক্ষায় জানা যায়, এসব নমুনা প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ বছরের পুরনো।
পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার উইলকিস ল্যান্ড এলাকায় এই গবেষণা চালানো হয়। জেমিসন ও তাঁর সহকর্মীদের মতে, পাওয়া উদ্ভিদজ জীবাশ্ম ইঙ্গিত দেয় যে পুরো এলাকাটি এক সময় গভীর অরণ্যে ঢাকা ছিল। অধ্যাপক জেমিসনের ভাষায়, এটি এক ধরনের টাইম ক্যাপসুল, যা আমাদের এমন এক সময়ের কথা বলে। যখন অ্যান্টার্কটিকা আজকের মতো বরফে মোড়া ছিল না।
বরফের নিচে হারিয়ে যাওয়া এই বনভূমির সন্ধান পাওয়ার পর গবেষণা আরও বিস্তৃত করা হয়। এ কাজে কানাডার কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবস্থা ‘র্যাডারস্যাট’-এর সহায়তা নেন গবেষকেরা। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে বরফের স্তরের সূক্ষ্ম পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে তারা ভূপৃষ্ঠে নদী-উপত্যকার মতো গঠন শনাক্ত করেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, কোটি কোটি বছর আগে অ্যান্টার্কটিকায় নদীর প্রবাহও ছিল।
গবেষকদের মতে, যে সময়ে এই বনভূমির অস্তিত্ব ছিল, তখন অ্যান্টার্কটিকা আলাদা কোনো মহাদেশ ছিল না। এটি ছিল সুপার কন্টিনেন্ট ‘গন্ডোয়ানা’র অংশ। আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল এই ভূখণ্ড। প্রায় ১৮ কোটি বছর আগে জুরাসিক যুগে গন্ডোয়ানা ভাঙতে শুরু করলে ধীরে ধীরে বর্তমান মহাদেশগুলোর জন্ম হয়। সেই ভাঙনের পরও অ্যান্টার্কটিকায় নদী ও বনভূমির অস্তিত্ব ছিল, যা পরবর্তীতে বরফের চাদরের নিচে চাপা পড়ে যায়।
বিজ্ঞানীদের মতে, অ্যান্টার্কটিকার এই হারিয়ে যাওয়া অরণ্যের সন্ধান ভবিষ্যৎ পরিবেশ ও জলবায়ু গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কোটি কোটি বছর ধরে বরফের স্তর কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই গবেষণা নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণেও অ্যান্টার্কটিকার বরফস্তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
ইউডি/এআর

