বিশ্বজুড়ে জলবায়ু বিপর্যয়ের নতুন আশঙ্কা: ধেয়ে আসছে সুপার এল নিনো
উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬, আপডেট ১৬:২০
প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং এল নিনোর নতুন ঢেউ নিয়ে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়াবিদদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ু সংস্থা বলেছে, চলতি বছরের মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যেই এল নিনোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডবিøউএমও) জানিয়েছে, প্রাথমিক লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে এবারের ঘটনাটি বিশেষভাবে শক্তিশালী হতে পারে। এটি শক্তিশালী হয়ে বিরল ‘সুপার এল নিনো’তে রূপ নিতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা, যা গত ১৪০ বছরের সব রেকর্ড চুরমার করে দিতে পারে। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে, দীর্ঘ শুষ্ক সময় বা খরাও দেখা দিতে পারে। এল নিনোর নতুন ঢেউ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন…
প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে দানা বাঁধছে এক ‘দানবীয়’ শক্তি
রিন্টু হাসান : প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জলবায়ু বিপর্যয়ের নতুন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রকৃতি তার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রতিশোধ নিতে চলেছে। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে দানা বাঁধছে এমন এক দানবীয় শক্তি, যা গত ১৪০ বছরের সব রেকর্ড চুরমার করে দিতে পারে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডবিøউএমও) এবং মার্কিন জলবায়ু সংস্থা ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ)-এর চলতি এপ্রিল মাসের সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, পৃথিবী এক প্রলয়ংকরী ‘সুপার এল নিনো’-র মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, ২০২৬ সাল আধুনিক মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড গড়তে পারে। বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরপেক্ষ (নিউট্রাল) অবস্থা বিরাজ করলেও আগামী মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে এল নিনো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৬১ শতাংশ। এটি বছরের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, যা বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রাকে নজিরবিহীন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। আবহাওয়াবিদদের মতে, চলতি বছরের মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যা পরবর্তীতে ভয়ংকর সুপার এল নিনোতে রূপ নিতে পারে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার এক প্রতিবেদনে এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। তথ্যমতে, আগামী জুলাইয়ের মধ্যে এল নিনো তৈরির সম্ভাবনা ৬১ শতাংশ। এই প্রাকৃতিক অবস্থা ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের গড় তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকলে তাকে সুপার এল নিনো বলা হয়।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ২০২৪ সালের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার ১৫ শতাংশ শঙ্কা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, ‘এল নিনো’ এ সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য, সুপেয় পানি এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে। একটানা ৩ বছর ‘লা নিনা’-এর দাপটের পর ‘এল নিনো’র আবির্ভাবের কথা নিশ্চিত করেছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত ‘এল নিনো’র চক্র স্থানীয়ভাবে খরা এবং ক্ষুধার পাশাপাশি প্রাণীবাহিত রোগের সংখ্যাও বৃদ্ধি করে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড সোসাইটি’র বিজ্ঞানী ওয়াল্টার ব্যাথগেন বলেন, ‘এল নিনোর মানে এই নয় যে, বিশ্বব্যাপী এ বছর অন্য বছরের চেয়ে বেশি দুর্যোগ হবে। এটি বিশ্বের বিভিন্ন অংশে গুরুতরভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।’
বিশ্ববাসী কী এবার দেখবে ১৮৭৭ সালের পুনরাবৃত্তি!
বিশ্বজুড়ে ১৮৭৭ সালের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ ২০২৭ সালের মধ্যে একটি শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’ আসতে চলেছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে এই উষ্ণ সামুদ্রিক স্রোত আরও শক্তিশালী হয়ে তাপপ্রবাহ, খরা এবং ফসলহানির কারণ হতে পারে। বিশ্ববাসী ১৮৭৭ সালে এমনই এক দুঃসহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সাক্ষী থেকেছিল। তাপপ্রবাহ চরমে পৌঁছেছিল। এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে চরম তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা, ফসলহানি এবং দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়েছিল। অসহ্য গরম আর ফসলের অভাবে সেই সময় লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়।
সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কায় দিন গুনছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞেরা। তৎকালীন বিশ্বে জনসংখ্যার প্রায় চার শতাংশ মানুষ এই ঘটনায় প্রাণ হারান। সেই সংখ্যাটি কয়েক লক্ষের গÐি ছাড়িয়েছিল। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মাথাব্যথার সবচেয়ে বড় কারণ হল এর ভয়াবহতা। সেই একই শক্তিশালী সুপার এল নিনোর খাঁড়া যদি নেমে আসে, তা হলে আজকের জনসংখ্যার নিরিখে প্রাণবিপর্যয়ের সংখ্যা কয়েক কোটিতে পৌঁছে যেতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। পূর্ব থেকে পশ্চিমে বয়ে চলা স্থায়ী বাতাস ‘বাণিজ্য বায়ু’ অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে, এমনকি উল্টো দিকেও বইতে পারে। এল নিনোর প্রভাব কেবল প্রশান্ত মহাসাগরে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সারা বিশ্বের আবহাওয়াকে ওলটপালট করে দেয়। আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনার কারণে দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে প্রচÐ তাপপ্রবাহ এবং বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত কম (খরা পরিস্থিতি) হয়।

ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ)
অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়া অঞ্চলে ভয়াবহ খরা এবং দাবানলের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। দক্ষিণ আমেরিকার মরুভ‚মি অঞ্চলেও প্রচÐ বৃষ্টিপাত এবং আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটে। উত্তর আমেরিকার দক্ষিণ অংশে মাত্রাধিক বৃষ্টিপাত এবং উত্তরাঞ্চলে থাকে তুলনামূলক উষ্ণ শীতকাল। আবহাওয়াবিদেরা ২০২৭-এর আশঙ্কার কথা শোনালেও চলতি বছরেই তার আঁচ পড়ছে বিশ্বে। আবহাওয়া গবেষকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ভ‚মিকা। এল নিনোর সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যুক্ত হয়ে তাপমাত্রাকে এমন এক স্তরে নিয়ে যাচ্ছে, যা ইতিপূর্বে দেখা যায়নি। ইতিমধ্যেই স্বাভাবিক তাপমাত্রা বেড়ে গিয়েছে। এর অর্থ হল, এল নিনোর ফলে তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হবে। ফলে চরমভাবাপন্ন পরিস্থিতি অতীতের চেয়ে আরও মারাত্মক হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদেরা। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, যা একসময় বিরল বলে মনে করা হত, তা এখন আরও ঘন ঘন ঘটছে এবং আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
উষ্ণায়নের পথে বিশ্ব : ‘এল নিনো’ মূলত কী
আরাফাত রহমান : স্প্যানিশ ভাষায় ‘এল নিনো’র অর্থ হলো ছোট ছেলে এবং ‘লা নিনা’র অর্থ ছোট বালিকা। ‘এল নিনো’ এবং ‘লা নিনা’ হচ্ছে ‘এল নিনো-সাউদার্ন অসকিলেশন’ (ইএনএসও) নামক আবহাওয়ার প্যাটার্নের দুটি অংশ। এটি মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর বাতাসের ধরন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্বারা চিহ্নিত। ‘এল নিনো’ বলতে ইএনএসও-এর উষ্ণায়ন পর্যায়কে এবং ‘লা নিনা’ শীতলকরণ পর্যায়কে বোঝায়। ‘এল নিনো’র বছরগুলোতে তাপমাত্রা প্রায় শূন্য দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়ে থাকে, যা ‘লা নিনা’র সময়ে প্রায় একই পরিমাণে হ্রাস পায়। দুই প্যাটার্নের ওঠা-নামার ঘটনাটি প্রায়ই একটি নিরপেক্ষ পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়। ‘এল নিনো’ সাধারণত প্রতি ৪ থেকে ৭ বছরে একবার দেখা যায়। এর স্থায়িত্ব ১২ থেকে ১৮ মাস।
তবে গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকবার ‘এল নিনো’ দেখা গেছে এবং এটি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ‘লা নিনা’। সা¤প্রতিক বছর এবং মাসগুলোতে পৃথিবী বারবার রেকর্ড তাপমাত্রায় পৌঁছেছে। আবহাওয়া ও পরিবেশ সংক্রান্ত একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে সাধারণ এল নিনোর তুলনায় বহু গুণ শক্তিশালী রূপ প্রত্যক্ষ করবে সারা বিশ্ব। তাতেই চিন্তার ভাঁজ ক্রমশ চওড়া হচ্ছে বিশেষজ্ঞদের। সেই সম্ভাব্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রভাবে নাভিশ্বাস উঠবে মানবজাতির, এমনটাই আশঙ্কা তাদের। উষ্ণায়নের যে পথে বিশ্ব এগোচ্ছে, তাতে অচিরেই তা সুপার এল নিনোয় পরিণত হবে। সুপার এল নিনো হল এল নিনোর একটি চরম বা শক্তিশালী রূপ। এটি একটি উষ্ণ সামুদ্রিক স্রোত, যার প্রভাব পড়ে বিভিন্ন দেশের আবহাওয়ায়। এল নিনোর ঘটনা মূলত ঘটে চিলি, পেরু-সহ দক্ষিণ আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব উপক‚লবর্তী দেশগুলিতে। ডিসেম্বরে নাগাদ এক প্রকার দক্ষিণমুখী উষ্ণ স্রোতের সৃষ্টি হয়, মোটামুটি ভাবে ২ থেকে ৭ বছর অন্তর।

সা¤প্রতিক বছর এবং মাসগুলোতে পৃথিবী বারবার রেকর্ড তাপমাত্রায় পৌঁছেছে
সেই সময় মহাসাগরের জলস্তরের (সি সারফেস) তাপমাত্রা অন্তত ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যায়। ফলে, উপক‚লবর্তী এলাকার বায়ুমÐলও তেতে ওঠে। ওই সময় মহাসাগরের পিঠের জল দ্রæত হারে গরম হয়ে যায়। কারণ, ওই সময় প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্ত থেকে গরম জলের স্রোত ধেয়ে আসে মহাসাগরের পূর্ব দিকে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে, প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্তের জলস্তর অনেকটাই গরম। তুলনায় ঠান্ডা চিলি, পেরু-সহ দক্ষিণ আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব উপক‚লবর্তী জলস্তর। এল নিনোর সময় পূর্ব উপক‚লের সেই গরম জল তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় মহাসাগর সংলগ্ন স্থলভাগের বিভিন্ন দেশের বহু এলাকার। ওই সময় সমুদ্রের তলদেশ থেকে ঠান্ডা জলও উপরে উঠে আসতে পারে না। ফলে, সেখানকার সমুদ্রের পিঠের জলস্তর ঠান্ডা হওয়ার সুযোগই পায় না। প্রশান্ত মহাসাগর নিয়ে গবেষণারত বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, সা¤প্রতিক মডেল বিশ্লেষণ থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রæত বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সেই তথ্য অদূর ভবিষ্যতে এল নিনোর বাড়বাড়ন্তের দিকেই নির্দেশ করছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সেটি মেগা বা সুপার এল নিনোর রূপ নিতে পারে। ফলে বিশ্বব্যাপী আবহাওয়া মারাত্মক ভাবে প্রভাবিত হবে।
বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত কমে দীর্ঘ খরার শঙ্কা
সাদিত কবির : পৃথিবীর বেশির ভাগ অংশের জলবায়ুর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো খরা। মূলত দীর্ঘ সময় ধরে চলা শুষ্ক আবহাওয়া, অপর্যাপ্ত বৃষ্টি, বৃষ্টিপাতের তুলনায় বাষ্পীভবন ও প্রস্বেদনের পরিমাণ বেশি হলে খরার সৃষ্টি হয়। এতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় দেখা দেয় পানির অভাব। কুয়া, খাল, বিলের মতো নিত্যব্যবহার্য পানির আধার শুকিয়ে যায়। গত কয়েক দশকের মধ্যে বাংলাদেশ ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে সবচেয়ে বড় খরা মোকাবেলা করেছে। খরার কারণে সে সময় দেশের প্রায় ৪২ শতাংশ জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর ১৯৯৭ সালে খরার কারণে কৃষিতে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের ক্ষতি মোকাবেলা করতে হয় বাংলাদেশকে। এত বছর পর এসেই প্রাকৃতিক এ দুর্যোগের ঝুঁকি এখনো কমেনি। প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণতার কারণে এ বছর বাংলাদেশে তুলনামূলক শুষ্ক মৌসুমি বৃষ্টি এবং একাধিক তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে-এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশি আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার এই প্রবণতাই এল নিনোর মূল কারণ, যা বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বাংলাদেশ মৌসুমি বৃষ্টির স্বাভাবিক শীতল প্রভাব থেকে বঞ্চিত হতে পারে এবং উচ্চচাপের প্রভাবে সরাসরি সূর্যের তাপ ভ‚মিতে বেশি পড়বে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মারুফুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, এল নিনোর কারণে সমুদ্র থেকে স্বাভাবিক আর্দ্রতার প্রবাহ ব্যাহত হয়। তিনি বলেন, এর ফলে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে, দীর্ঘ শুষ্ক সময় বা খরাও দেখা দিতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. রবিউল আউয়াল গণমাধ্যমকে বলেন, মনসুনের আগে যদি এল নিনো তৈরি হয়, তাহলে এই অঞ্চলের মৌসুমি বৃষ্টি অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্বল মানে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম বৃষ্টি হবে, যার প্রভাব বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়বে। ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর সময় বাংলাদেশ তীব্র তাপপ্রবাহের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সে সময় দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫১টিতে ৪০ থেকে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল।

গবেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও দুর্যোগ ঝুঁকি চিহ্নিত করা এ প্রতিবেদনের মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি অবকাঠামো পরিকল্পনা, নকশা ও কৌশল প্রণয়ন, বিপদ প্রশমনে দ্রæত উদ্যোগ গ্রহণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ মোকাবেলায় একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে এ অ্যাটলাস। এছাড়া কৃষিতে টেকসই জলবায়ু-স্থিতিস্থাপক উন্নয়ন প্রচার করা, স্টেকহোল্ডারদের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের পানি সম্পদ খাত জলবায়ু এবং দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবেলায় তাদের নির্দেশনা দেয়াও হবে এর লক্ষ্য। খরার মূল কারণ দেরিতে বৃষ্টি হওয়া কিংবা মৌসুমি বৃষ্টি দ্রæত শেষ হয়ে যাওয়া। এ ধরনের খরা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে। সে সময় দেশের প্রায় ৪২ শতাংশ আবাদি জমি সরাসরি ক্ষতির শিকার হয়েছিল। বাংলাদেশের একটি বিশাল এলাকাজুড়ে ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা ও মেঘনা নদীর মোহনা। ২০০০-২০১৯ সালের মধ্যে প্রাকৃতিক ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সপ্তম। ফলে দেখা গেছে, দেশের ৬৪ জেলার প্রতিটিই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রভাব পড়বে বাংলাদেশেও, এখন করণীয় কী
আশিকুর রহমান : সম্ভাব্য ‘সুপার এল নিনোর’ প্রভাব পড়বে বাংলাদেশেও। বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন বেশ কিছু পরামর্শ। কৃষি খাতের সুরক্ষা: বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর, তাই খরা ও তীব্র তাপপ্রবাহের প্রভাব সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার ওপর পড়ে। খরা-সহনশীল জাতের চাষ: বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই) উদ্ভাবিত খরা-সহনশীল ধানের জাতগুলো (যেমন: ব্রি ধান-৫৬, ৬৬ বা ৭১) কৃষকদের মধ্যে দ্রæত ছড়িয়ে দিতে হবে। বিকল্প ফসল চাষ: ধান চাষে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। এল নিনোর প্রভাবে পানির সংকট দেখা দিলে গম, ভুট্টা, ডাল বা তৈলবীজের মতো কম পানি সাশ্রয়ী ফসল চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে।
সেচ ব্যবস্থাপনা: বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের (রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং) ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং ভ‚-গর্ভস্থ পানির অপচয় রোধে “ফিতা পাইপ” বা “ড্রিপ ইরিগেশন” পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। ২. পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা: এল নিনোর প্রভাবে নদ-নদী ও ভ‚-গর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যায়। জলাশয় সংস্কার: খাল, বিল এবং পুকুর খনন ও পুনঃখনন করতে হবে যাতে খরার সময় পর্যাপ্ত পানি মজুত থাকে। শিল্প ও গৃহস্থালিতে পানি সাশ্রয়: পানির অপচয় রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং জনগণকে সচেতন করতে হবে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে পানির অপচয় বন্ধে প্রচারণা চালানো জরুরি। ৩. জনস্বাস্থ্য ও হিটওয়েভ ব্যবস্থাপনা: তীব্র গরমে হিটস্ট্রোকসহ নানা পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২৬ এপ্রিল ২০২৬ । প্রথম পৃষ্ঠা
হিট অ্যাকশন প্ল্যান: প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে “কুলিং সেন্টার” বা সাধারণ মানুষের বিশ্রামের জন্য ঠান্ডা জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে। হাসপাতালের প্রস্তুতি: সরকারি হাসপাতালগুলোতে হিটস্ট্রোক ও ডিহাইড্রেশন আক্রান্ত রোগীদের জন্য বিশেষ ইউনিট এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ (যেমন: ওরাল স্যালাইন) মজুত রাখতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধি: ভরদুপুরে রোদে বের না হওয়া, ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরা এবং প্রচুর পানি ও তরল খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। ৪. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা: অতিরিক্ত গরমে বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়, যা গ্রিডের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সুষ্ঠু বিদ্যুৎ বণ্টন: হাসপাতাল ও জরুরি সেবা কেন্দ্রগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিক লোডশেডিং পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। সৌরশক্তির ব্যবহার: এল নিনোর সময় আকাশ পরিষ্কার থাকে এবং কড়া রোদ পড়ে, এই সুযোগে সৌর প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে জাতীয় গ্রিডের চাপ কমানো সম্ভব।
ইউডি/এজেএস

