দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের হামলা অব্যাহত, নিহত আরও ১১

দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের হামলা অব্যাহত, নিহত আরও ১১

উত্তরদক্ষিণ। বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, আপডেট ১৩:৫৫

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে লেবাননে বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। গত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) থেকে আজ বুধবার ভোর পর্যন্ত তারা কয়েক ডজন বিমান হামলা চালিয়েছে, যার কিছু হামলা তাদের কথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর অনেক উত্তরে হয়েছে। এই লাইনটি দক্ষিণ লেবাননের সেই অংশ, যেটা তারা দখলে রেখেছে বা আকাশপথ থেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, এসব হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে একটি ছিল ‘ডাবল ট্যাপ’ হামলা যাতে অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন ছিলেন সিভিল ডিফেন্স কর্মী, যারা আগের একটি হামলার পর বেঁচে থাকা লোকজনকে উদ্ধার করার চেষ্টা করছিলেন। এই হামলায় লেবাননের সেনাবাহিনীর দুই সদস্যও আহত হয়েছেন।

ডাবল-ট্যাপ হামলা হলো একটি আক্রমণের (যেমন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, বিমান হামলা, আর্টিলারি শেলিং বা বিস্ফোরক অস্ত্র বা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসের বিস্ফোরণ) কয়েক মিনিট পরে একই স্থানে ইচ্ছাকৃতভাবে দ্বিতীয় আঘাত হানার কৌশল, যা সাধারণত হতাহতের সংখ্যা সর্বাধিক করার জন্য করা হয়।

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম এবং প্রেসিডেন্ট যোসেফ আউন এই হামলার নিন্দা জানিয়ে এটাকে নতুন একটি ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তারা বলেছেন, যুদ্ধবিরতি মানতে ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে বাধ্য করতে তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

এদিকে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী মঙ্গলবার দক্ষিণ লেবাননে চালানো তাদের হামলার সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রকাশ করেছে। তারা জানিয়েছে, তাদের বাহিনী তিনজন হিজবুল্লাহ যোদ্ধাকে হত্যা করেছে এবং অঞ্চলজুড়ে গোষ্ঠীটির অবকাঠামোতে বোমা হামলা চালিয়েছে।

তারা নিশ্চিত করেছে যে, দক্ষিণ লেবাননে ‘ইয়েলো লাইন’-এর উত্তরে, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার বাইরেও বেশ কয়েকটি জায়গায় হামলা চালানো হয়েছে। তারা জানিয়েছে, একটি ঘটনায় একজন ইসরাইলি সেনা ‘সামান্য আহত হন এবং তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়’।

বিমান হামলার সঙ্গে সঙ্গে ইসরাইলি সেনাবাহিনী আর্টিলারি হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞও চালিয়ে যাচ্ছে। তারা জানিয়েছে, আল-কানতারা শহরে বড় বড় বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছে, যেখানে হিজবুল্লাহর একটি সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা হয়েছে।

তারা ঘরবাড়ি ভাঙাও চালিয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে বিনত জবেইল শহরে, যেখানে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো হিজবুল্লাহ দাবি করেছে যে তারা একটি ইসরাইলি বুলডোজারকে বিস্ফোরক ড্রোন দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, প্রায় এক দশক ধরে নির্মিত বিশাল হিজবুল্লাহ টানেল নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা হয়েছে। প্রায় ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেল ব্যবস্থায় ছিল আবাসন, রান্নাঘর ও অপারেশন কক্ষ। ইসরাইল বলছে, এটি ইরানের সহায়তায় তৈরি ‘বৃহৎ সামরিক স্থাপনা’, যা ধ্বংসের মাধ্যমে তারা হিজবুল্লাহর সক্ষমতায় বড় আঘাত হেনেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও আমেরিকা ইরানে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে। এতে ওইদিন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হন। ইরানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ২ মার্চ ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে হিজবুল্লাহ। অন্যদিকে বিমান হামলার পাশাপাশি লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করে ইসরাইল।

লেবাননের কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ২৯০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৭৭ জন শিশু এবং ১০০ জন স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। এছাড়া ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরাইলের তথ্যমতে, একই সময়ে হিজবুল্লাহর হামলায় ১৩ জন ইসরাইলি সেনা এবং দুজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

ইরানের চাপে এবং আমেরিকার মধ্যস্থতায় সম্প্রতি ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এর মধ্যদিয়ে ছয় সপ্তাহের তীব্র সংঘর্ষ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়। তার আগে দক্ষিণ লেবাননের বেশ কিছু এলাকা দখলে নেয় ইসরাইলি বাহিনী।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের কয়েক ডজন গ্রাম দখল করে রেখেছে এবং সীমান্ত বরাবর লেবাননের ভূখণ্ডের গভীরে ৬০০ বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকা জুড়ে একটি ‘বাফার জোন’ বা সুরক্ষিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

সেই লক্ষ্যে বর্তমানে যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও তারা বিস্ফোরক ও বুলডোজার দিয়ে অসংখ্য বাড়িঘর, পাড়া এবং এলাকা ধ্বংস করছে। তারা এই অঞ্চলের ভেতরে ও বাইরেও তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহও দক্ষিণে ইসরাইলি সেনাদের দখলে থাকা অবস্থানগুলোতে প্রতিদিন হামলা চালানোর দায় স্বীকার করছে, যার ফলে বেশ কয়েকজন ইসরাইলি সেনা হতাহত হয়েছে।

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading