নারী ও শিশু নির্যাতন: বিচারপ্রাপ্তির চিত্র উদ্বেগজনক
উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, আপডেট ১৬:৩৫
সাজার হার মাত্র ৩%, আসামিরা খালাস পাচ্ছে ৭০% মামলাতেই: গবেষণা
নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। এর বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পাচ্ছেন আসামিরা। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল প্রমাণ, সাক্ষীর অনুপস্থিতি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং উক্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য তুলে ধরা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরা হয়েছে গবেষণার তথ্যে। এসব নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন…
নারীর প্রতি সহিংসতা একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতা
মো. আসাদুজ্জামান: দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারপ্রাপ্তির চিত্র উদ্বেগজনক। নারী ও শিশু নির্যাতনের ৭০ শতাংশ মামলাতেই খালাস পাচ্ছেন আসামিরা। এ ধরনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। স¤প্রতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। শনিবার (০২ মে) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত সভায় এই গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা (সেলফ) কর্মসূচি এই সভার আয়োজন করে। গবেষণাপত্রের শিরোনাম ছিল-‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং উক্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ। গবেষণাটি দেশের ৩২ জেলায় ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তিকৃত ৪ হাজার ৪০টি মামলার নথি ও রেজিস্টার পর্যালোচনার ভিত্তিতে করা হয়।
গবেষণায় নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোর ক্ষেত্রে মামলার সময়সীমা, মুলতবির সংখ্যা, সময় আবেদনের পুনরাবৃত্তি, মামলার ধরন ও নিষ্পত্তি, সাক্ষী ও অভিযুক্ত ব্যক্তির তথ্য, ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের গড় বয়স ও বৈবাহিক অবস্থা, ফরেনসিক ও ডাক্তারি পরীক্ষা, দণ্ড প্রাপ্তি ও খালাসের ধরন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ। স্বাগত বক্তব্য দেন ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা এবং জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব। সভা সঞ্চালনা করেন ব্র্যাক শেলফ কর্মসূচির আইনি সহায়তা ও পলিসি অ্যাডভোকেসির লিড এ টি এম মোরশেদ আলম। পরামর্শক হিসেবে সভায় গবেষণা পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ উম্মে কুলসুম।

গবেষণায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে যুক্ত ছিল ব্র্যাক
স্বাগত বক্তব্যে ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা এবং জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভার্সিটি কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব বলেন, বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতা। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই অসংখ্য নির্যাতনের ঘটনা দেখা যায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হন। সা¤প্রতিক ইউএনএফপিএ ও বিবিএসের যৌথ জরিপেও একই চিত্র উঠে এসেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, ২০০০ দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রণীত হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। বিচারপ্রার্থীদের জন্য কার্যকর ও সময়োপযোগী ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি।
গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা। এর মধ্যে আইনগত সময়সীমা কঠোরভাবে তদারকি, অপ্রয়োজনীয় মুলতবি সীমিত করা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সময়মতো ফরেনসিক ও মেডিকেল রিপোর্ট প্রাপ্তি নিশ্চিত করা, তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, প্রসিকিউটরদের কার্যক্রম মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু, গোপনীয় বিচার এবং ভুক্তভোগী-সংবেদনশীল বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, অন্যান্য সহায়ক সেবা (আইনি সহায়তা, কাউন্সেলিং, আশ্রয়কেন্দ্র) সম্প্রসারণ ও মামলার অধিক চাপযুক্ত জেলাগুলোতে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বৃদ্ধি করা অন্যতম।
আইন বলছে ১৮০ দিন, বাস্তবে সাড়ে তিন বছর
মো. পারভেজ আহমেদ : নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরা হয়েছে গবেষণার তথ্যে। এর মধ্যে অভিযোগকারী ও সাক্ষীর অনুপস্থিতি, ঘন ঘন সময় প্রার্থনা, তদন্তে বিলম্ব, দুর্বল প্রমাণ ব্যবস্থা এবং সাক্ষী সুরক্ষার অভাব বিচার বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে গবেষণায় চিহ্নিত হয়েছে। আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য এই প্রতিবন্ধকতাগুলোর যথাযথ সমাধান না করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ সময়সীমা কমিয়ে ৯০ দিন করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, ২০০০ অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে ৩ বছর ৭ মাস সময় লাগছে। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৩ শতাংশ মামলায় আপস করা হয়েছে। আইনটিতে দ্রæত তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম শেষে দ্রæত বিচার নিষ্পত্তির জন্য ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও মামলার গড় সময়কাল ১ হাজার ৩৭০ দিন (৩.৭ বছর)। প্রতিটি মামলার জন্য ট্রাইব্যুনালে তারিখ পড়েছে গড়ে ২২ বার।

৭০% ঘটনাই আদালত পর্যন্ত আসে না
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন। তিনি বলেন, কম সাজার হার দেখে অনেকেই এসব মামলাকে ‘মিথ্যা’ মনে করেন, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। মঞ্জুরুল হোসেনের ভাষ্য, নারীর ওপর সহিংসতার প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটনাই সামাজিক কাঠামো, কলঙ্ক, ভয় ও মানসিকতার কারণে আদালত পর্যন্ত আসে না। সামাজিক কাঠামো, মানসিকতা ও স্টিগমা অনেক ভুক্তভোগীকে আদালতে আসতে বাধা দেয়। তিনি আরও বলেন, যেহেতু এসব মামলায় অনেক ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান থাকে, তাই অভিযুক্ত পক্ষ অনেক ক্ষেত্রে সমঝোতার চেষ্টা বা চাপ সৃষ্টি করে। এতে ভুক্তভোগী পরিবার মানসিক ও সামাজিক চাপে পড়ে এবং অনেক সময় মামলা চালানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে জটিলতার কারণে অনেক মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে, একই সঙ্গে উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ নিয়ে মামলার নিষ্পত্তি বিলম্বিত হয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, এসব কারণে অনেক সময় ভুক্তভোগী পরিবার শেষ পর্যন্ত মামলা চালিয়ে যেতে আগ্রহ হারায়। তবে এর মানে এই নয় যে মামলা মিথ্যা। মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, যৌতুক নিরোধ বা ঘরোয়া নির্যাতনের মতো বেশির ভাগ ঘটনা ঘরের ভেতরে ঘটে, যেখানে বাইরের সাক্ষী পাওয়া কঠিন। এতে প্রমাণ উপস্থাপন জটিল হয়ে পড়ে। নারীদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের একটি বড় অংশ পারিবারিক পরিসরে ঘটে, যেখানে ভুক্তভোগীরা দীর্ঘ সময় সহ্য করে চলেন এবং পরিস্থিতি অসহনীয় হলে তবেই আদালতের শরণাপন্ন হন। সাক্ষ্য উপস্থাপনে দীর্ঘসূত্রতা কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগের মধ্যে সমন্বিত কমিটি থাকলে সাক্ষ্য গ্রহণ ও বিচারপ্রক্রিয়া আরও দ্রæত করা সম্ভব।
রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগ সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত: আইনমন্ত্রী
রেজাউল করিম সবুজ : অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, আলোচনায় বিভিন্ন সমস্যা উঠে এসেছে-পরিসংখ্যান এসেছে, বাস্তব চিত্র এসেছে। এসবের মূল কথা হলো, রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও আইন প্রশাসনের সক্ষমতা। পদোন্নতি ও কাঠামোগত ভারসাম্য নিয়েও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত জনবলকাঠামোতে কিছু অসামঞ্জস্য আছে। দ্রæত নিয়োগপ্রক্রিয়া চালু করা এবং জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
আইনমন্ত্রী বলেন, আমি দীর্ঘদিন আইনজীবী ছিলাম, অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলাম, বর্তমানে আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমার অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে, রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগ সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। মন্ত্রী আরও বলেন, জাতীয় বাজেটে বিচার বিভাগের বরাদ্দ তুলনামূলক কম, প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। সেখানে শুধু বিটিভির জন্য বরাদ্দ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা; যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দও এর চেয়ে বেশি। এই বরাদ্দ দিয়ে বিচারকদের বেতন, প্রশাসনিক ব্যয় ও অবকাঠামো পরিচালনা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান
বিচার বিভাগের বাজেট বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাজেট আলোচনায় নানা স্তরের প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা আছে। অনেক সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দেয়। এই কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। মন্ত্রী আরও বলেন, পদোন্নতি ও কাঠামোগত ভারসাম্য নিয়েও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত জনবল কাঠামোতে কিছু অসামঞ্জস্য আছে। দ্রুত নিয়োগপ্রক্রিয়া চালু করা এবং জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগপ্রক্রিয়া অনেক স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে, যা প্রশংসনীয়। একইভাবে বার কাউন্সিলের পরীক্ষাও যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যদিও সেখানে কিছু বিতর্ক ছিল, তবে আমরা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে গুরুত্ব দিয়েছি। বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়াতে হলে আমাদের মানসিকতা, কাঠামো ও সক্ষমতা-এই তিনটি ক্ষেত্রেই উন্নয়ন প্রয়োজন। সরকার ৪০ লাখ মামলাকে কমিয়ে ৪ লাখে নামিয়ে আনতে চায় জানিয়ে আসাদুজ্জামান বলেন, একটা মামলা থেকে শাখা-প্রশাখা গজানোয় মামলার সংখ্যা কমছে না। আইনজীবীরাও অনেক ক্ষেত্রে মামলাকে দীর্ঘ করেন। বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়াতে হলে মানসিকতা, কাঠামো এবং সক্ষমতা তিনটি ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রয়োজন।
পরামর্শ সভায় সভাপতিত্ব করেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ। তিনি বলেন, বাজেট বাড়ানো জরুরি; কিন্তু এটা সমাধান নয়। জবাবদিহি, সুশাসন এবং ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধ না থাকলে পরিবর্তন আসবে না। নারী ও শিশুবান্ধব বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে ফলাফলনির্ভর কাজ করতে হবে। কাঙ্ক্ষিত বিচারব্যবস্থা নিশ্চিতে প্রয়োজন ‘কালেকটিভ রেসপনসিবিলিটি’। এ জন্য সব পক্ষকে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে এবং ‘এক সরকার’-এর ধারণাকে জোরদার করা দরকার, যেখানে পুলিশ, চিকিৎসক ও আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করবেন।
এক বছরে মামলার সংখ্যা বেড়েছে ২৫ শতাংশ
কিফায়েত সুস্মিত: পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে সারা দেশে মামলা হয়েছে ২১ হাজার ৯৩৯টি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় ৯টি অভিযোগে মামলা করা যায়। সেগুলো হলো ধর্ষণ ও ধর্ষণের কারণে মৃত্যু, বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, যৌন পীড়ন, যৌতুক, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ভিক্ষাবৃত্তির উদ্দেশ্যে শিশুর অঙ্গহানি, দহনকারী পদার্থ দিয়ে সংঘটিত অপরাধ। ২০২৫ সালে হওয়া মামলার মধ্যে ৭ হাজার ৬৮টি মামলা ধর্ষণের অভিযোগের।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ৫ হাজার ১৭১ জন ও শিশু ১ হাজার ৮৯৭টি। ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর নারী নির্যাতনের মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালে ১৭ হাজার ৫৭১টি মামলা হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের মামলা ছিল ৫ হাজার ৫৬৬টি। তার আগে ২০২৩ সালে ১৮ হাজার ৯৪১টি, ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭৬৬টি ও ২০২১ সালে ২২ হাজার ১৩৬টি মামলা হয়েছিল নারী নির্যাতনের অভিযোগে। উচ্চ আদালতের তথ্য অনুসারে, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩০ হাজার ৩৬৫টি।

ঢাকার ৯টি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ১১ হাজার ৫৬৭টি। ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ৩ হাজার ৯১টি মামলা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক গণমাধ্যমকে বলেন, নারীর ওপর সহিংসতা, সহিংসতার হুমকি, নিপীড়ন, হেনস্তা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীর ওপর খবরদারি করতে পারার প্রবণতার একটা পর্যায় হচ্ছে নারীর ওপর সহিংসতা। পুরুষের আত্মবিশ্বাস রয়েছে যে নারীর ওপর সহিংসতা করার তার অধিকার আছে এবং সে পার পেয়ে যাবে। নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে বড় রকমের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে শিরীন পারভীন বলেন, এ আন্দোলনের মূল বার্তা হবে—নারীকে মানুষ হিসেবে চিনুন, জানুন, সম্মান করুন। নারীর ওপর সহিংসতা জাতীয় সমস্যা হিসেবে মনে করতে হবে সরকারকে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার সময় যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।
গত এপ্রিল মাসে ৩১২ নির্যাতনের ঘটনা
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত এপ্রিলে ৩১২টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। গত মাসের তুলনায় এ মাসে ২৩টি ঘটনা বেশি ঘটেছে। এ মাসে ধর্ষণের ঘটনা ৫৪টি, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ১৪টি, ধর্ষণ ও হত্যা ১টি। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬ জন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী।
গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) এপ্রিলের মানবাধিকার পরিস্থিতি মনিটরিং প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্ষণের শিকার ৫৪ জনের মধ্যে ১৮ জন শিশু ও ১৪ জন কিশোরী রয়েছে। অপরদিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ জন শিশু, ৪ জন কিশোরী ও ৯ জন নারী এবং ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছেন ১ জন কিশোর ও ১ জন নারী। ধর্ষণের চেষ্টা ২৩টি, যৌন হয়রানি ১৭টি, শারীরিক নির্যাতনের ৬৮টি ঘটনা ঘটেছে। এসিড নিক্ষেপে আক্রান্ত হয়েছেন ১ জন নারী।
পাঁচ বছরে দুইবার আইন সংশোধন: তদন্ত হবে ১৫ দিনে, বিচার ৯০ দিনে
মহোসু : গত বছরের মার্চে মাগুরার আট বছরের শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ষণের মামলার বিচারে উল্লেখযোগ্য কিছু সংশোধন এনে ওই বছরের ২৫ মার্চ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। আইনে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণকে ধর্ষণের ধারায় (৯)-এ রাখা হলেও ভিন্ন উপধারায় (৯খ) ভিন্ন শিরোনামে (বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম করিবার দণ্ড) নেওয়া হয়েছে। এ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড নির্ধারণ হয়েছে। এ ছাড়া ভুক্তভোগী ও আসামির ডিএনএ পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে বলা হয়, আদালত যদি মনে করে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া মেডিক্যাল সনদ দিয়ে বিচারকাজ পরিচালনা করা যাবে, তাহলে ডিএনএ পরীক্ষা লাগবে না। ধর্ষণের (৯খ বাদে) ঘটনার তদন্ত ও বিচারের সময় অর্ধেক করা হয়েছে। তদন্ত হবে ১৫ দিনে এবং বিচার হবে ৯০ দিনে। তবে বিচারক মনে করলে সময় বাড়াতে পারবেন। আইন অনুসারে, ধর্ষণের ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ। ০৩ মে, ২০২৬ । প্রথম পৃষ্ঠা
ভুক্তভোগী ও আসামির ডিএনএ পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে বলা হয়, আদালত যদি মনে করে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া মেডিক্যাল সনদ দিয়ে বিচারকাজ পরিচালনা করা যাবে, তাহলে ডিএনএ পরীক্ষা লাগবে না। এর মধ্য দিয়ে ২০০০ সালে প্রণীত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে গত পাঁচ বছরে দ্বিতীয়বার সংশোধন আনা হয়। এর আগে ২০২০ সালে সিলেট ও নোয়াখালীতে দলবদ্ধ ধর্ষণের দুটি ঘটনায় দেশজুড়ে বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এই আইনের অধীন ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড করেছিল। পাশাপাশি ধর্ষণের মামলার আসামি শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে।
ইউডি/এজেএস

