প্রতীক্ষিত ‘পদ্মা ব্যারাজ’ আলোর মুখ দেখবে তো !
উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, আপডেট ১৮:২০
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানিসংকট নিরসনে সরকারের উদ্যোগ
ইন্ডিয়ার ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে প্রতি বছরই কমে যাচ্ছে দেশের অন্যতম নদী পদ্মার পানি সমতলের উচ্চতা। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে দেশের অন্য নদীগুলোর ওপর। ফলে বর্ষা মৌসুমে যেমন বাড়ছে ভাঙনের প্রবণতা, তেমনি শুষ্ক মৌসুমে ক্রমেই পানির অভাবে মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে পদ্মার অববাহিকায় থাকা বিস্তীর্ণ অঞ্চল। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানিসংকট নিরসনে বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। ‘পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প’ নামে একটি মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে পাঁচটি নদী ব্যবস্থা পুনর্জীবিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। জানা গেছে, আগামীকাল বুধবার (১৩ মে) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এই পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদনের জন্য ওঠানো হতে পারে। এই প্রকল্পে খরচ ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। বহুল প্রতীক্ষিত এই পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন…
২৬ জেলার মানুষের অপেক্ষা আর কত!
মো. আসাদুজ্জামান : ইন্ডিয়া থেকে বয়ে আসা গঙ্গা নদী বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ঢুকে পদ্মা নাম ধারণ করেছে। এই নদীকে কেন্দ্রে করেই একসময় আবর্তিত হতো এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা। তবে সময়ের ব্যবধানে এই নদী এখন এই এলাকার মানুষের দুর্ভোগের কারণ। ১৯৭৫ সালে ইন্ডিয়া এই নদীর উজানে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর বদলে যেতে থাকে এই নদীর গতিপথ। ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে পদ্মা নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করার ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ অংশে পদ্মার স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমেছে। ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী-খালগুলোতে লবণাক্ততার মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, যা কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন, বনায়ন, নৌ-চলাচল, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যসহ সামগ্রিক ইকোসিস্টেমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফারাক্কা ব্যারাজের উজানে পানি প্রত্যাহারের ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতি ও বড়াল নদী শুকিয়ে গেছে।

ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে পদ্মা নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করার ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ অংশে পদ্মার স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমেছে।
বাংলাদেশের মোট ভূখন্ডের প্রায় ৩৭ শতাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত চার বিভাগের ২৬ জেলা ও ১৬৩ উপজেলার মানুষ পদ্মা অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে বহু বছর ধরে শুষ্ক মৌসুমে এই অঞ্চলে তীব্র পানিসংকট দেখা দিচ্ছে। এমন অবস্থায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানিসংকট নিরসনে বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। ‘পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প’ নামে একটি মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে পাঁচটি নদী ব্যবস্থা পুনর্জীবিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রায় ২৫ বছর আগে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ শুরু করেছিল। আগামীকাল বুধবার (১৩ মে) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদনের জন্য ওঠানো হতে পারে। এই প্রকল্পে খরচ ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। এই প্রকল্প প্রস্তাবের নথি অনুসারে, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার পদ্মা নদীতে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার মূল বাঁধ নির্মাণ করা হবে। পদ্মা নদীর ওপর নির্ভরশীল দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ জমিতে পানির সমস্যা সমাধানে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি নদীকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে। যার মাধ্যমে সুন্দরবন অঞ্চল থেকে আসা লবণাক্ততার নিরসন হবে। এতে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে। বাড়বে কৃষি ও মাছের উৎপাদনও।
বুধবারের একনেক সভায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণসহ ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপনের কথা আছে। বিএনপি’র নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণের অংশ হিসেবে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। মূলত ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে পানির যে সংকট দেখা দেয়, তা থেকে কিছুটা রেহাই পেতে প্রকল্পটি প্রস্তুত করা হয়েছে বলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। সে জন্য কয়েক দশকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে পদ্মা ব্যারাজ নামের প্রকল্পটি পাসের অপেক্ষায় আছে।
প্রসঙ্গত, পদ্মার ওপর ব্যারেজ নির্মাণের ধারণা নতুন নয়। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়। পরে ২০০৫ সালে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয় এবং স্থানীয় ও বিদেশি পরামর্শকদের একটি কনসোর্টিয়াম ২০১৩ সালে সেই সমীক্ষা শেষ করে। সেই সমীক্ষায় বলা হয়, ইন্ডিয়ার ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে উজানে পানি প্রত্যাহার বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়া, কৃষি ও মৎস্য খাতে ক্ষতি, নৌ-চলাচলে বিঘœ এবং জীববৈচিত্র্যেও চরম অবনতি ঘটেছে।
বর্তমান বাস্তবতা ও মেগা এই প্রকল্পের প্রয়োজনীতা
রিন্টু হাসান : সত্তরের দশকে ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের পর থেকে উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের অংশে পদ্মা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী-খালগুলোতে লবণাক্ততা বেড়ে কৃষি, মৎস্য, বনজ সম্পদ, নৌ-চলাচল ও সুপেয় পানির প্রাপ্যতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যসহ সামগ্রিক প্রতিবেশ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা ও বরিশাল অঞ্চলের জন্য পদ্মা নদী ভ‚-উপরিস্থ সুপেয় পানির প্রধান উৎস হওয়ায় এসব এলাকার উন্নয়ন নদীর পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে বর্ষা-পরবর্তী সময়ে পানি সংরক্ষণ এবং শুষ্ক মৌসুমে নিয়ন্ত্রিত পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের আওতা বাংলাদেশের মোট ভৌগোলিক এলাকার প্রায় ৩৭ শতাংশজুড়ে বিস্তৃত। এর আওতায় দেশের ৪টি বিভাগ, ২৬টি জেলা ও ১৬৩টি উপজেলা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে প্রথম পর্যায়ে বাস্তবায়নের মাধ্যমে ৪টি বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলা সরাসরি উপকৃত হবে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি
অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে কেন এত বড় প্রকল্প এই প্রসঙ্গে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি গণমাধ্যমকে বলেছেন, এই প্রকল্পটির বিষয়ে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার রয়েছে। তাই এটি নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। একনেক সভায় বিস্তারিত আলোচনা হবে। তারপর এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে। পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের আওতায় প্রকল্পটির চূড়ান্ত প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। এ বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান গণমাধ্যমকে বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে পানির অভাবে আমাদের বিস্তীর্ণ এলাকা শুকিয়ে গেছে। তাপমাত্রাও বেড়ে গেছে। নিশ্চিতভাবেই এ বাঁধের মাধ্যমে সেটার প্রভাব কিছুটা কাটিয়ে ওঠা যাবে। এখানে পানি জমিয়ে আমরা সারা বছর সরবরাহ করতে পারব। প্রকল্পটি অবস্থা জানতে চাইলে মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, আমরা আমাদের কাজ শেষ করে প্রকল্পটি একনেকের জন্য পাঠিয়েছি। এখন সরকার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পটি মোট ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ ৫২ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে মার্চ ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে সম্পূর্ণ প্রকল্পটি এক ধাপে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের সংস্থান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি/সমন্বয়ে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাছাড়া, প্রকল্পে প্রস্তাবিত বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ পরবর্তী সংশ্লিষ্ট নদী সিস্টেম জলাধার থেকে প্রাপ্ত প্রবাহের সঙ্গে হাইড্রোলোজিক্যাল ও মরফোলজিক্যালভাবে ধীরে ধীরে অভিযোজিত হবে। ফলে খননসহ সংশ্লিষ্ট কাজগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করার সুযোগ রয়েছে বিধায় প্রকল্পের কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা বাস্তবসম্মত হবে। এই প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটি দুটি পর্যায়ে বিভক্ত করে বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে সুপারিশ করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
এই প্রকল্পের আওতায় কী থাকছে
মো. পারভেজ : এই প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার মূল বাঁধ নির্মাণ করা হবে। যাতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস ও ২টি ফিশ পাস। এ বাঁধের মাধ্যমে ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা যাবে। আর সংরক্ষিত পানি বণ্টনের জন্য তিনটি অফটেক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। সংরক্ষিত পানি দিয়ে পাঁচটি নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করা হবে। এগুলো হলো হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক মিটার পানি সরবরাহ করা হবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে প্রথম পর্যায়ে ব্যয় হবে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। ২০২৬ সাল থেকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত এ কাজ চলবে। প্রকল্পের নথি বলছে, বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের চাষযোগ্য প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষি জমিতে প্রয়োজনীয় সেচের পানি সরবরাহ করা যাবে। এতে প্রায় ২৪ লাখ টন ধানের ও ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হচ্ছে। প্রকল্পের নথি অনুসারে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় ব্যারেজ ও গড়াই অফটেকসংলগ্ন ইলেকট্রিক ওয়ার্কসসহ দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট, যার মধ্যে ৭৬ দশমিক ৪ ও ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট থাকবে। এ ছাড়া নদী ব্যবস্থার উন্নয়নে গড়াই-মধুমতি নদীতে প্রায় ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ড্রেজিং এবং হিসনা নদী ব্যবস্থায় প্রায় ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

পাশাপাশি নদী শাসন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণসহ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রমও প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রকল্পের আওতায় জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট হারে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে গোদাগাড়ি পাম্প হাউজ, জি-কে সেচ প্রকল্প এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ বজায় রাখা হবে। সেচ সুবিধা স¤প্রসারণের মাধ্যমে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর নিট চাষযোগ্য জমিতে পানির সংস্থান নিশ্চিত করা হবে। এতে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এ প্রকল্প থেকে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নতুন সংযোজন হবে। এছাড়া ব্যারেজের ডেক বা করিডরকে বহুমুখী অবকাঠামোগত সংযোগ হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং গ্যাস ট্রান্সমিশন পাইপলাইন স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে। প্রকল্প প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, কৃষি ও মৎস্য খাতে উৎপাদন বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবছর ধান উৎপাদন প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন এবং মৎস্য উৎপাদন প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার টন বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখবে। বাস্তবায়নকালে প্রায় ৪৭ হাজার ৯৫০ জনের জন্য ১২ কোটি ২৫ লাখ জন-দিন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৯ লাখ ২৭ হাজার স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। ভ‚মি উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে সাতটি স্যাটেলাইট শহর প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি এবং প্রায় ৩ হাজার ৪৫০ একর এলাকায় দেড় লাখ পরিবারের জন্য আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন গ্রামীণ টাউনশিপ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরকে ভিত্তিবছর ধরে জিডিপিতে প্রায় শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সুফল মিলিয়ে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার রিটার্ন আসতে পারে বলে প্রকল্পের সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফারাক্কার ৫০ বছর: পদ্মার সর্বনাশ
মহোসু : একসময় রাজশাহী অঞ্চলের সবচেয়ে খরস্রোতা ছিল নদী পদ্মা। তবে অনেক আগেই রূপ হারিয়েছে সেই নদী। কালের পরিক্রমায় এখন ঐতিহ্যটুকুও হারাতে বসেছে। বর্ষায় কিছুদিনের জন্য পদ্মায় পানি থাকলেও আষাঢ়-শ্রাবণ শেষেই কমতে থাকে পানি। এরপর থেকে কমতে কমতে চৈত্রে এসে পরিণত হয় ধু-ধু বালুচরে। শুধু পদ্মা নয়, পদ্মার প্রবাহ ঘিরে এককালের সজাগ থাকা শাখা নদীগুলোরও এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই। মূলত পার্শ্ববর্তী দেশের ফারাক্কার প্রভাবেই গত ৫০ বছরে পানির প্রবাহ কমেছে ৭১ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা এই পানি হ্রাসের মূল কারণ হিসেবে পদ্মা নদীর জলপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং পানির স্তর হ্রাসকে চিহ্নিত করেছেন, যা মূলত ইন্ডিয়ার ফরাক্কা ব্যারেজের কারণে হয়েছে। ১৯৭৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে সেচের জন্য গঙ্গা নদী থেকে পানি ব্যবহার করার জন্য এই ব্যারেজ নির্মিত হয়েছিল, যা বাংলাদেশের পরিবেশের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া এবং ব্রিটেনের সাতজন গবেষক রাজশাহীতে একটি গবেষণা পরিচালনা করেন, যা স্প্রিঙ্গার ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়।

১৯৭৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে সেচের জন্য গঙ্গা নদী থেকে পানি ব্যবহার করার জন্য এই ব্যারেজ নির্মিত হয়েছিল
সেখানে বলা হয়, ১৯৭৪ সালে পদ্মায় শুষ্ক মৌসুমে প্রতি সেকেন্ডে পানিপ্রবাহ ছিল ৩ হাজার ৬৮৫ ঘনমিটার। এরপর ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ উদ্বোধন করা হয়। বর্তমানে ২০২৪ সালের শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ নেমে এসেছে ১০৭৬ ঘনমিটারে। ফলে ৫০ বছরে প্রবাহ কমেছে ২৬০৯ ঘন মিটার। গড়ে ৭১ শতাংশ পানির প্রবাহ কমেছে। বর্তমানে প্রবাহ আছে মাত্র ২৯ শতাংশ। বাংলাদেশে পদ্মার প্রবেশদ্বারেই যতদূর চোখ যায় চোখে পড়ে কেবলই ধু-ধু বালুচর। শুষ্ক মৌসুমের আগেই পদ্মায় নৌকা চলাচলের পথরুদ্ধ হওয়ায় মাইলের পর মাইল হেঁটে বালিচর পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে চরবাসীকে। আর মালামাল পরিবহনে দরকার পড়ছে গরুর গাড়ি। পদ্মা নদীতে পানি নেই, মাছ নেই। তাই রাজশাহী অঞ্চলের হাজার হাজার জেলে বেকার হয়ে পড়েছেন। অনেকে বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার পুরোনো পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোস্তফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি কিছু ইন্ডিয়ান গবেষকের সঙ্গে ফরাক্কা ব্যারেজের প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণা করেছেন। গবেষণায় নদীর প্রবাহ এবং পানির স্তরের বিষয়ে ভবিষ্যৎ যা অনুধাবন করেছিলেন, ২০২৪ সালে তা আরও অনেক বেশি কমে গেছে।
তিনি আরও বলেন, নদী ছোট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানি প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে, যা ধীরে ধীরে নদীটির তলদেশ পূর্ণ করে ফেলছে। এর ফলে বর্ষার মৌসুমে বারবার বন্যা হচ্ছে, কারণ নদী অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে পারছে না। অপরদিকে নদী শুকিয়ে যাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদী খরা সৃষ্টি হচ্ছে, যা কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জীবিকা বিপর্যস্ত করছে। তিনি আরও বলেন, যদি দ্রæত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে একটি বিধ্বংসী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী জানান, ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৮ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তার নির্ধারিত পানি শেয়ার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
নদী নির্ভরশীল জনগণের জীবন রক্ষাকারী প্রকল্প
সাদিত কবির : সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, পদ্মা অববাহিকার বিশাল কৃষি অঞ্চলকে মরুময়তা থেকে বাঁচাতে ও শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে ‘পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়েছে। ২০৩৩ সালের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ্যানি বলেন, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে বিস্তৃত এবং যেখানে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি মানুষ বসবাস করে। প্রকল্পটি নদী নির্ভরশীল জনগণের জীবন রক্ষাকারী প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত।

পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি
এ্যানি বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্পের ডিপিপি ইতোমধ্যেই প্রণয়ন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের ধারণা দীর্ঘদিনের। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রকল্পটি প্রণয়নের উদ্দেশ্যে মোট চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়। পরবর্তীতে ২০০২ সালে প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করা হয়। ২০০৪ সালে ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিস্তারিত সমীক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, যা ২০১৩ সালে সম্পন্ন হওয়ার পর, প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ নকশা চূড়ান্ত করা হয়।
সংকট মোকাবিলায় একটি কৌশলগত উদ্যোগ
আরাফাত রহমান : বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক মাহফুজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের আগে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা-গঙ্গা নদী ব্যবস্থায় পানিপ্রবাহ ছিল প্রায় ৭০ হাজার কিউসেক। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পর থেকে উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে অনেক সময় এ প্রবাহ ২০ হাজার কিউসেক বা তারও নিচে নেমে এসেছে, যা বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পদ্মানির্ভর ২০ থেকে ২৫টি জেলার মানুষের জীবিকা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে এবং ব্যাপক হারে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। মাহফুজুর রহমান বলেন, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প এই সংকট মোকাবিলায় একটি কৌশলগত উদ্যোগ।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ। ১২ মে, ২০২৬ । প্রথম পৃষ্ঠা
এটি বর্ষাকালে পানি সংরক্ষণ করবে এবং শুষ্ক মৌসুমে নিয়ন্ত্রিত সরবরাহ নিশ্চিতের মাধ্যমে পানির প্রাপ্যতা বাড়াবে। তিনি আরও বলেন, বড় ধরনের অতিরিক্ত ভ‚মি অধিগ্রহণ ছাড়াই ব্যারেজের মাধ্যমে নদীর মধ্যে ১৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জলাধার তৈরি হবে। এতে পর্যটন, মৎস্য খাত এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাÐে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।তার মতে, প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে নদীর দুই তীরে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে আরও কয়েকশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
ইউডি/এজেএস

