আগামী ৫০ বছরে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে ১৫ দেশ

আগামী ৫০ বছরে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে ১৫ দেশ

উত্তরদক্ষিণ। শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬, আপডেট ১২:০০

পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্রকে আমরা প্রায়ই স্থায়ী বলে মনে করি। কিন্তু ইতিহাস বলছে, কোনো রাষ্ট্রই চিরস্থায়ী নয়। একসময় বিশ্বের বৃহত্তম শক্তি ছিল রোমান সাম্রাজ্য, পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুগোস্লাভিয়ার মতো রাষ্ট্রও ভেঙে গেছে সময়ের স্রোতে।

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন, জাতিগত বিভাজন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নতুন করে প্রশ্ন তুলছে বহু দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ ও গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্বের কিছু দেশ হয়তো পুরোপুরি বিলীন হয়ে যেতে পারে, আবার কিছু রাষ্ট্র বর্তমান সীমানা হারিয়ে নতুন রূপ নিতে পারে।

মালদ্বীপ
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকারদের মধ্যে অন্যতম মালদ্বীপ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে খুব কম উচ্চতায় অবস্থিত দেশটির বহু দ্বীপ ইতোমধ্যেই সাগরের ক্রমবর্ধমান জলস্তরের হুমকির মুখে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিদেশে জমি কেনার উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে প্রয়োজন হলে নাগরিকদের পুনর্বাসন করা যায়। যদি কোনো রাষ্ট্র পুরোপুরি সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যায়, তবে আন্তর্জাতিক আইনে তার সার্বভৌম অস্তিত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে—মালদ্বীপ হয়তো সেই প্রশ্নের প্রথম বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

বেলজিয়াম
ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র বেলজিয়ামের অভ্যন্তরেই রয়েছে গভীর ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বিভাজন। ডাচভাষী ফ্ল্যান্ডার্স এবং ফরাসিভাষী ওয়ালোনিয়া অঞ্চল রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অনেকটাই পৃথক। রাজধানী ব্রাসেলস দুই অঞ্চলের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করলেও বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে দেশটির বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

কিরিবাতি
প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দ্বীপরাষ্ট্র কিরিবাতি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। সমুদ্রের পানি বাড়ায় নিচু প্রবাল দ্বীপগুলো ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে এবং লবণাক্ত পানি সুপেয় জলের উৎস নষ্ট করছে। সম্ভাব্য বিপর্যয়ের কথা বিবেচনা করে সরকার ফিজিতে প্রায় ৬ হাজার একর জমি কিনে রেখেছে, যাতে প্রয়োজনে নাগরিকদের সেখানে স্থানান্তর করা যায়।

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা
১৯৯৫ সালের ডেটন চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত বসনিয়ায় একটি জটিল ক্ষমতা কাঠামো গড়ে ওঠে। দেশটিতে তিনটি প্রধান জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী তিনজন প্রেসিডেন্ট রয়েছেন। তবে সার্ব অধ্যুষিত ‘রেপুব্লিকা সর্পস্কা’র বিচ্ছিন্নতাবাদী অবস্থান এবং ক্রোয়াটদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

উত্তর কোরিয়া
দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটের মধ্যেও টিকে আছে উত্তর কোরিয়া। তবে খাদ্য সংকট, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং বাইরের তথ্যপ্রবাহের বিস্তার দেশটির কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। কিম রাজবংশের শাসনের অবসান ঘটলে ক্ষমতার শূন্যতা কিংবা দুই কোরিয়ার পুনরেকত্রীকরণের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো বিলীন হতে পারে।

ইয়েমেন
বহু বছরের গৃহযুদ্ধ ইয়েমেনকে কার্যত কয়েকটি অংশে বিভক্ত করেছে। উত্তর-পশ্চিমে হুথি বিদ্রোহী, দক্ষিণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এবং বিভিন্ন অঞ্চলে পৃথক সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বিদ্যমান। একসময় পৃথক উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন হিসেবে পরিচিত দেশটি আবারও সেই পথে ফিরে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

টুভালু
প্রশান্ত মহাসাগরের আরেক দ্বীপরাষ্ট্র টুভালু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। জোয়ারের পানিতে গ্রামের ভেতর জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে এবং সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে। ফলে অনেক নাগরিক ইতোমধ্যেই বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। ভবিষ্যতে দেশের চেয়ে বিদেশে টুভালুর নাগরিক বেশি হয়ে গেলে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রশ্নও সামনে আসতে পারে।

লিবিয়া
২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকে লিবিয়া রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। বর্তমানে দেশটিতে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রশাসন কার্যকর রয়েছে। বিপুল তেলসম্পদ থাকা সত্ত্বেও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বিভাজন দেশটির স্থায়ী ভাঙনের আশঙ্কা বাড়িয়েছে।

যুক্তরাজ্য
ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্যের ভেতরে নতুন করে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার দাবি জোরদার হয়েছে, কারণ অধিকাংশ স্কটিশ নাগরিক ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। অন্যদিকে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে জনমিতিক পরিবর্তন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আয়ারল্যান্ডের পুনরেকত্রীকরণের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের বর্তমান কাঠামো পরিবর্তিত হতে পারে।

সোমালিয়া
তিন দশকের বেশি সময় ধরে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। রাজধানী মোগাদিশুর বাইরে সরকারের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল। ১৯৯১ সাল থেকে সোমালিল্যান্ড নিজস্ব প্রশাসন, মুদ্রা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কার্যত স্বাধীন রাষ্ট্রের মতো পরিচালিত হলেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। এ অবস্থার স্থায়ী সমাধান না হলে বিভক্তি আরও স্পষ্ট হতে পারে।

স্পেন
স্পেনে কাতালোনিয়া ও বাস্ক অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদ দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। ২০১৭ সালের কাতালোনিয়া সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মধ্যেও বিচ্ছিন্নতার আকাঙ্ক্ষা কতটা প্রবল হতে পারে। কাতালোনিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় স্বাধীনতার দাবিকে এখনো জীবিত রেখেছে।

ইরাক
ঔপনিবেশিক আমলে নির্ধারিত সীমানার কারণে ইরাকে জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন দীর্ঘদিনের। কুর্দিস্তান অঞ্চল বর্তমানে ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাও সেখানে প্রবল। পাশাপাশি শিয়া ও সুন্নি রাজনৈতিক বিভাজন দেশটির ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

হাইতি
রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সশস্ত্র গ্যাংদের সহিংসতায় হাইতির রাষ্ট্রীয় কাঠামো মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। রাজধানীর বড় অংশই এখন অপরাধী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। আন্তর্জাতিক সহায়তা সত্ত্বেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়ায় দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

সাইপ্রাস
১৯৭৪ সাল থেকে সাইপ্রাস কার্যত দুটি অংশে বিভক্ত। একদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রিপাবলিক অব সাইপ্রাস, অন্যদিকে কেবল তুরস্কের স্বীকৃত নর্দার্ন সাইপ্রাস। কয়েক দশকের আলোচনার পরও পুনরেকত্রীকরণ সম্ভব হয়নি। ফলে আনুষ্ঠানিক বিভাজনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

মলদোভা
পূর্ব ইউরোপের ছোট রাষ্ট্র মলদোভা দীর্ঘদিন ধরে ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। ১৯৯২ সাল থেকে ত্রান্সনিস্ত্রিয়া অঞ্চল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর সঙ্গে গাগাউজিয়া অঞ্চলের রুশপন্থী অবস্থান এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব দেশটির ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে মলদোভা হয় রোমানিয়ার সঙ্গে একীভূত হতে পারে, নয়তো আরও গভীর বিভাজনের মুখোমুখি হতে পারে।

বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র কখনোই স্থির নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংকট, জাতিগত দ্বন্দ্ব এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আগামী কয়েক দশকে বহু দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এসব দেশের কেউ হয়তো বর্তমান রূপে টিকে থাকবে, কেউ বদলে যাবে, আবার কেউ হয়তো ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে-যেমনটি একসময় হয়েছিল বিশ্বের বহু শক্তিশালী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading