র‍্যাব-পুলিশ দিয়ে মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো যাবে না: অর্থমন্ত্রী

র‍্যাব-পুলিশ দিয়ে মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো যাবে না: অর্থমন্ত্রী

উত্তরদক্ষিণ। শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, আপডেট ১৬:৪৫

দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে র‍্যাব-পুলিশ কিংবা প্রশাসনিক অভিযানের ওপর নির্ভর না করে কার্যকর নীতি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোর গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ব্যবসায়িক অদক্ষতা ও অতিরিক্ত ব্যয় কমানো এবং গৃহীত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।

শুক্রবার (১২ জুন) দুপুরে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতির ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ রয়েছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবও যুক্ত হয়েছে। ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতি এবং অর্থ পাচারের কারণে তহবিলের ব্যয় (কস্ট অব ফান্ড) অনেক বেশি রয়েছে, যার প্রতিফলন মূল্যস্ফীতিতে পড়ছে। আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়ছে, বিশ্ববাজারেও মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে। ফলে দেশের বাজারেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় (কস্ট অব ডুইং বিজনেস) কমাতে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা কিংবা প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে দেশে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এ সময় বিভিন্ন দপ্তরে যেতে হয় এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদের হার, পণ্য খালাস থেকে শুরু করে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত নানা ধাপের খরচ এবং বিভিন্ন খাতে অদক্ষতার কারণে ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক কারণে যে মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়, সেখানে সরকারের করার খুব বেশি কিছু থাকে না। তবে দেশের অভ্যন্তরে যেসব কারণে ব্যবসার ব্যয় বাড়ে, সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মূল্যস্ফীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশে ব্যবসা সহজীকরণের সূচক (ইজ অব ডুইং বিজনেস) অত্যন্ত নিচের দিকে অবস্থান করছে। এর অর্থ ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বেশি। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে সরকার বিভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রক সংস্কার ও ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরবরাহব্যবস্থা কার্যকর রাখতে হবে। পণ্যের উৎস থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একইসঙ্গে জ্বালানি, খাদ্য ও সারসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অন্তত তিন মাসের মজুত এবং খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

তিনি বলেন, অতীতে অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক বা স্পট ক্রয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, যেখানে মূল্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত গুদাম ও সংরক্ষণব্যবস্থা এবং কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা গেলে ব্যয় অনেক কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি কমানো গেলে ব্যবসার খরচও কমবে।

সরকারি কর্মচারীদের সম্ভাব্য বেতন বৃদ্ধি দুর্নীতি কমাতে ভূমিকা রাখবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, মানুষের অভাব থাকলে দুর্নীতির দিকে ঝোঁকার একটি প্রবণতা তৈরি হয়, এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামো প্রায় ১১ বছর ধরে সমন্বয় করা হয়নি। এ সময়ে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। ফলে সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিষয়টি সমন্বয় করা প্রয়োজন। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে অনেক ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বেতন বৃদ্ধি পায়, ফলে দুই খাতের মধ্যে একটি বৈষম্য তৈরি হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন— বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, কৃষি, মৎস্য ও পানি সম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এবং প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি।

এর আগে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম বাজেট।

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading