রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে ৮ মৃত্যু: এখনও ঝুঁকিতে লাখো মানুষ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে ৮ মৃত্যু: এখনও ঝুঁকিতে লাখো মানুষ

উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ০৬ জুলাই, ২০২৬, আপডেট ১৫:৪৬

একদিকে টানা বর্ষণ, অন্যদিকে নরম হয়ে আসা পাহাড়ের ঢাল। গভীর রাতে মুহূর্তেই মাটির নিচে চাপা পড়ে নিভে গেল আটটি প্রাণ। কিন্তু তারপরও কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন লাখো মানুষ। প্রতি বর্ষায় পাহাড়ধসের আশঙ্কা থাকলেও নিরাপদ আশ্রয়ের সীমাবদ্ধতায় তাদের বড় একটি অংশ একই ঝুঁকির মধ্যেই দিন কাটাচ্ছেন। ফলে যেকোনও সময় আবারও ঘটতে পারে প্রাণহানির শঙ্কা।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। তাদের বসবাসের জন্য বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা। এতে বর্ষা মৌসুম এলেই পাহাড়ধসের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। প্রতি বছরই কোথাও না কোথাও ঘটে প্রাণহানির ঘটনা। এমন পরিস্থিতিতে সোমবার গভীর রাতে উখিয়ার ৭ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় নারী-শিশুসহ আট জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ক্যাম্পজুড়ে শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ঘেঁষা ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে থাকা হাজারো পরিবার অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

স্থানীয় প্রশাসন এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয় জানিয়েছে, ভারী বর্ষণের সময় অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। ক্যাম্পের লার্নিং সেন্টারগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে বাসিন্দাদের আহ্বান জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু পরিবার সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। তবে এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশের ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে অবস্থান করায় নতুন করে প্রাণহানির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

উখিয়ার কুতুপালং টিভি টাওয়ারসংলগ্ন পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে ৭ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির। এ ক্যাম্পে ১০ হাজারের বেশি পরিবারের প্রায় অর্ধলাখ রোহিঙ্গার বসবাস। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া এসব রোহিঙ্গার বড় একটি অংশের বসতি পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে। তাই বর্ষা এলেই তাদের মধ্যে পাহাড়ধসের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে সোমবার রাতে ওই ক্যাম্পে পাহাড়ধসে মো. একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় পুরো ক্যাম্পজুড়ে শোক ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

৭ নম্বর ক্যাম্পের চেয়ারম্যান রোহিঙ্গা নেতা আবদুল মাবুদ বলেন, ‘আমাদের পুরো ক্যাম্পই পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে। তাই টানা বৃষ্টির সময় প্রায় অর্ধলাখ মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটান। আজ এক শিশুর মৃত্যুর পর মানুষের ভয় আরও বেড়ে গেছে।

‘ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার কিছু পরিবারকে লার্নিং সেন্টারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অনেকে স্বজনদের নিয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ আশ্রয়েও চলে গেছেন। আমরা নিয়মিত মাইকিং করে সবাইকে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’

এদিকে, জানা গেছে, শুধু ৭ নম্বর ক্যাম্প নয়, উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মধ্যে অন্তত ৯টি ক্যাম্প পাহাড় ধসের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশ ও খাড়া ঢালজুড়ে গড়ে ওঠা অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে বাস করছেন এক লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। বর্ষায় টানা ভারী বর্ষণ শুরু হওয়ায় তাদের উদ্বেগ এখন চরমে।

ক্যাম্প-১৫-এর বাসিন্দা মো. আক্তার বলেন, ‘বর্ষা এলেই আমাদের ভয় বেড়ে যায়। কারণ, ক্যাম্পের অধিকাংশ ঘরই পাহাড়ের পাদদেশে। সোমবার রাতের ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধসে একই পরিবারের তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। এমন দৃশ্য আমাদের সবার হৃদয় ভেঙে দিয়েছে। এখনও টানা বৃষ্টি হচ্ছে। আমরা জানি না, কখন আবার কোথায় পাহাড়ধস নামবে। অনেকের ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। জীবন বাঁচানোর জন্য সবাই আতঙ্কের মধ্যে দিন-রাত পার করছি।’

এ বিষয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান বলেন, ‘রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বড় অংশই পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে। তাই টানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। সোমবারের পাহাড়ধসে নারী-শিশুসহ আট জন রোহিঙ্গার মৃত্যু অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুঃখজনক।’

তিনি আরও বলেন, ‘পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্যাম্পের লার্নিং সেন্টারগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু পরিবার সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’

এদিকে, আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, কক্সবাজারে গত ২৪ ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আগামী দুই দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে।

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading