আকাশ ছোঁয়ার নতুন স্বপ্ন আদানির, এয়ারলাইন ব্যবসায় নামার পরিকল্পনা

আকাশ ছোঁয়ার নতুন স্বপ্ন আদানির, এয়ারলাইন ব্যবসায় নামার পরিকল্পনা

উত্তরদক্ষিণ। শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬, আপডেট ০৯:২০

ইন্ডিগো আর এয়ার ইন্ডিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা ভারতের বিমান পরিবহন বাজারে নতুন এয়ারলাইন চালুর চিন্তা-ভাবনা করছে ভারতীয় ধনকুবের গৌতম আদানির মালিকানাধীন আদানি গ্রুপ। বিষয়টির সঙ্গে সরাসরি অবগত দুটি সূত্র বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে আদানি গ্রুপের নতুন এই পরিকল্পনার তথ্য জানিয়েছেন। আদানি গ্রুপের এই পদক্ষেপ দেশটির বিমান পরিবহন খাতে প্রতিযোগিতার সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদানি গ্রুপ বর্তমানে মুম্বাইয়ের দুটিসহ ইন্ডিয়ার মোট ৮টি বিমানবন্দর পরিচালনা করছে এবং এভিয়েশন খাতে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারের বিশাল সম্প্রসারণ পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও এর আগে দেশটির এই শিল্প গোষ্ঠী বলেছিল, বিমান পরিবহন ব্যবসা বা এয়ারলাইন চালু করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। তাই নতুন এই চিন্তাভাবনা তাদের পূর্ববর্তী কৌশলে পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই দুই সূত্রের একজন বলেছেন, এ বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি এবং এখনও বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখছে গ্রুপটি। কারণ এয়ারলাইন ব্যবসাকে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং এতে মুনাফা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করা হয়।

ওই সূত্র বলেছেন, গত বছর আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার প্রাণঘাতী বিমান দুর্ঘটনা এবং এরপর থেকে কঠোর নজরদারি আর ডিসেম্বরে বাজারসেরা ইন্ডিগোর অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে দেশজুড়ে বড় ধরনের ফ্লাইট বিপর্যয় ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের সরকার আদানিসহ কয়েকটি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে নিজস্ব এয়ারলাইন চালু করার বিষয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে উৎসাহিত করেছে।

‘‘এটি একটি কঠিন ব্যবসা, তবে জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে আদানি গ্রুপ বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে চায়। কারণ, সরকার বুঝতে পেরেছে এয়ার ইন্ডিয়ার দুর্দশা এবং ইন্ডিগোর সংকট মোকাবিলার পর বাজারে এখন আরও একটি বড় এয়ারলাইনের প্রয়োজন রয়েছে।’’

আদানি গ্রুপের এয়ারলাইন ব্যবসায় নামার এই চিন্তা-ভাবনার খবরের প্রভাব পড়েছে দেশটির শেয়ারবাজারেও। বৃহস্পতিবার আদানির মূল প্রতিষ্ঠান আদানি এন্টারপ্রাইজের শেয়ারের দর ৩ শতাংশের বেশি কমেছে। দেশটিতে নতুন বিমান সংস্থা চালুর বিষয়ে আদানি গ্রুপের অভ্যন্তরীণ সব আলোচনা এখনও একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।

বর্তমানে প্রায় ৮ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের সম্পদের মালিক গৌতম আদানি। তিনি এশিয়ার দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী ব্যক্তি। বিমান পরিবহন খাতে এমন পা বাড়ানো তার বর্ণাঢ্য ব্যবসায়িক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপগুলোর একটি হতে যাচ্ছে।

রয়টার্স বলছে, অতিরিক্ত করের বোঝা, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের কারণে গত ১৫ বছরে কিংফিশার, জেট এয়ারওয়েজ এবং গো ফার্স্টের মতো বড় বড় ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলো দেউলিয়া হয়ে গেছে।

অন্যদিকে, সমুদ্র বন্দর এবং বিমানবন্দরের মতো খাতগুলোতে গৌতম আদানি দ্রুত ব্যবসা বাড়ালেও ২০২৪ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প পাওয়ার জন্য ঘুষের দায়ে অভিযুক্ত ছিলেন তিনি। যদিও সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে আনা ঘুষের সেই অভিযোগ মার্কিন কর্তৃপক্ষ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বড় স্বস্তি পেয়েছেন ভারতীয় এই ধনকুবের।

ইন্ডিয়া বিশ্বের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল বিমান পরিবহন বাজার হলেও দেশটিতে দুটি সংস্থার একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। দেশটির সবচেয়ে বড় বিমান সংস্থা ইন্ডিগোর দখলে রয়েছে এককভাবে ৬৫.৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ বাজার। আর এয়ার ইন্ডিয়ার দখলে রয়েছে ২৫ শতাংশ বাজার।

আকাশপথে যাত্রীসংখ্যার ব্যাপক বৃদ্ধি এবং বোয়িং ও এয়ারবাসের কাছে বিমান সংস্থাগুলোর রেকর্ড পরিমাণ নতুন বিমানের অর্ডার দেওয়ার বিষয়টিকে মাথায় রেখে গত বছর ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০৪৭ সালের মাঝে দেশটিতে বিমানবন্দরের সংখ্যা ২০১৪ সালের ৭৪টি থেকে বাড়িয়ে ৩৫০-৪০০টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের।

ইন্ডিয়ার কাতার এয়ারওয়েজের সাবেক প্রধান রাজন মেহরা বলেন, আদানির এই পদক্ষেপে ভারতের বিমান পরিবহন খাতের চিত্রই বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দেশটিতে সব এয়ারলাইনের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত এবং শক্তিশালী নীতিগত সুরক্ষা বলয় তৈরিতে নজর দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা দ্বিতীয় সূত্র বলেছেন, আদানি যেসব বিকল্প বিবেচনা করছেন, তার মধ্যে একটি হলো ইতোমধ্যে চালু থাকা কোনো এয়ারলাইনের শেয়ার কিনে নেওয়া। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে সব সুযোগই গোষ্ঠীটির বিবেচনায় রয়েছে।

গত বছরের ডিসেম্বরে পাইলট সংকটের কারণে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল করায় ইন্ডিগোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। ওই সময় পাইলট সংকটে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন এবং টিকেটের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। পরে দেশটির সরকার বাধ্য হয়ে ইন্ডিগোকে বিমান টিকেটের নির্ধারিত মূল্যসীমা বেঁধে দেয়।

এদিকে, গত বছর ড্রিমলাইনার দুর্ঘটনায় ২৬০ জনের মৃত্যুর পর থেকে লোকসানে থাকা এয়ার ইন্ডিয়া ব্যাপক তদন্তের মুখে পড়েছে এবং সংস্থাটি একাধিক নিরীক্ষা ত্রুটির সম্মুখীন হয়েছে। দেশটির অপেক্ষাকৃত ছোট বিমান সংস্থা স্পাইসজেট তীব্র আর্থিক সংকট ও কর্মচারীদের বেতন বকেয়া থাকার সমস্যায় ভুগছে।

এয়ার ইন্ডিয়া ইন্ডিয়ার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। তবে আদানির সম্ভাব্য আগমনের খবরে বৃহস্পতিবার মুম্বাইয়ের শেয়ারবাজারে ইন্ডিগোর শেয়ারের দাম ১ শতাংশেরও বেশি কমেছে। অন্যদিকে স্পাইসজেটের শেয়ারের দাম লাফিয়ে ১০ শতাংশ বেড়েছে।

আদানি এয়ারপোর্টের পরিচালক এবং গৌতম আদানির ছোট ছেলে জিৎ আদানি গত ডিসেম্বরে রয়টার্সকে বলেছিলেন, বিমান পরিবহন ব্যবসা নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। কারণ এতে লাভের পরিমাণ অত্যন্ত কম এবং বিমান সংস্থা চালানোর জন্য যে মানসিকতা দরকার, তা তাদের নেই।

সেই সময় তিনি বলেছিলেন, আমাদের স্বাচ্ছন্দ্য এবং মূল দক্ষতা হলো ভূমিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি এবং সেগুলো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা। এরপরও এভিয়েশন অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছেন গৌতম আদানি। আদানি এয়ারপোর্টস গত মাসে বলেছে, ভারতের ছয়টি স্থানে হোটেল, খুচরা বিক্রয় কেন্দ্র এবং অফিসের জায়গাসহ বিমানবন্দর-সংলগ্ন বাণিজ্যিক এলাকা গড়ে তুলতে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করেছে তারা।

বৃহস্পতিবার দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানবন্দর পরিচালনাকারী কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত বিমান সংস্থায় বা এয়ারলাইনের শেয়ারহোল্ডার হতে পারবে না; আইনের এই শর্ত শিথিল চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেছেন আদানি।

স্বতন্ত্র বিমান পরিবহন বিশ্লেষক ব্রেন্ডন সোবি বলেন, কিরগিজস্তান, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামের মতো বাজারে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব এয়ারলাইন থাকার কিছু বিশেষ উদাহরণ রয়েছে। তবে ভারতের অন্যান্য বিমান সংস্থাগুলো এতে স্বার্থের সংঘাত হতে পারে বলে ন্যায্য কারণেই চিন্তিত হবে।

সূত্র: রয়টার্স।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading