সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে জাতীয় অগ্রাধিকার খাত ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে জাতীয় অগ্রাধিকার খাত ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

উত্তরদক্ষিণ। শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, আপডেট ১২:৪২

সেমিকন্ডাক্টর খাতকে সরকার জাতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি বলেন, এ খাতের উন্নয়ন কোনো একক মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়, এটি একটি সম্মিলিত জাতীয় মিশন। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকার চলতি বাজেটে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করেছে বলেও জানান তিনি।

শনিবার (২৫ জুলাই) রাজধানীর তেজগাঁওয়ের নভো থিয়েটারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি, ইলেকট্রনিক্স, এআই অ্যান্ড রোবোটিক্স সামিট-২০২৬’-এর উদ্বোধনী উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের আয়োজন কোনো সাধারণ সম্মেলন নয়; বরং প্রযুক্তিনির্ভর আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণের অন্যতম কারিগরদের মিলনমেলা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখে চলা প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকে নিজ উদ্যোগে এ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সামিটে অংশ নিয়েছেন। তাদের বিশেষভাবে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি সেমিকন্ডাক্টর শিল্প-সংশ্লিষ্টদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। এ সামিটে উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে এরই মধ্যে তথ্যবহুল আলোচনা হয়েছে। সরকার এমন একটি স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ ও প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়। এ সম্মেলনের মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে একটি মেধাভিত্তিক বাংলাদেশের সম্ভাবনার বার্তা পৌঁছে দিতে চায় সরকার।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিশ্ব এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি মিলেমিশে চতুর্থ ও পঞ্চম শিল্প বিপ্লবের ভিত্তি রচনা করেছে। বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টর শুধু একটি শিল্প নয়, এটি আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃষি প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, ডাটা সেন্টার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক কলকারখানা কিংবা মহাকাশের স্যাটেলাইট— প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেমিকন্ডাক্টর অপরিহার্য। সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে একটি সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপ।

তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং, ইলেকট্রিক ভেহিকল, স্মার্ট ডিভাইস, ৫-জি ও ৬-জি যোগাযোগব্যবস্থা, ডাটা সেন্টার এবং অটোমেশন প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে বিশ্বে চিপের চাহিদা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। নিজেদের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে বাংলাদেশেরও সম্মানজনক অবস্থান তৈরির এখনই সময়।

তারেক রহমান বলেন, সংশ্লিষ্টদের ধারণা ছিল ২০৩০ সালের দিকে বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর বাজার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাবে। তবে ২০২৬ সালের মধ্যেই সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে রয়েছে। ফলে এ বাজারে প্রবেশের জন্য বাংলাদেশের সামনে অপার সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ২০৩০ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প থেকে রপ্তানি আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, বাংলাদেশ তা পূরণ করতে সক্ষম হবে।

তিনি জানান, বাংলাদেশের তিন হাজারের বেশি সেমিকন্ডাক্টর পেশাজীবী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বড় প্রযুক্তি কোম্পানি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট, গবেষক, ম্যানেজার ও উদ্যোক্তা হিসেবে অবদান রাখছেন। তাদের আরও গভীরভাবে বাংলাদেশের সমৃদ্ধির পথে যুক্ত করতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে এরই মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, টেস্টিং, এমবেডেড সিস্টেম, পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স এবং অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং খাতে কাজ শুরু হয়েছে। দেশের কিছু প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করেছে।

তিনি বলেন, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে এগিয়ে নিতে চলতি বাজেটে এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের চাহিদা অনুযায়ী সব সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্প তৈরির সব কাঁচামালের ওপর সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সার্ভিসের রপ্তানি আয়ের ওপর নগদ প্রণোদনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবন বাস্তবায়নের জন্য সরকার প্রথমবারের মতো বছরে ৫০০ কোটি টাকা স্টার্টআপ অনুদান বরাদ্দ রেখেছে। এরই মধ্যে কয়েকটি স্টার্টআপ অনুদানও বিতরণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সর্বাত্মক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। বিনিয়োগবান্ধব নীতি, করসুবিধা, বন্ডেড সুবিধা, বিশেষায়িত অবকাঠামো এবং ওয়ান-স্টপ সার্ভিস আরও কার্যকর করতে কাজ চলছে। বিদ্যমান হাইটেক পার্কগুলোর আধুনিকায়নের পাশাপাশি একটি বায়োটেক পার্ক নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প-সংশ্লিষ্টরা সম্প্রতি মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে রোডশোর মাধ্যমে দেশের সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরেছেন, যা প্রশংসাযোগ্য। তবে শুধু রোডশো নয়, ফলো-আপ, অংশীদারত্ব, বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ সহযোগিতা এবং রপ্তানির সুযোগ বাস্তবে রূপ দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সামনে দক্ষতার ঘাটতি, ল্যাবের সীমাবদ্ধতা, বিনিয়োগের সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কঠিন প্রতিযোগিতাসহ নানান চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে এসব সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছাশক্তিও রয়েছে। সরকার সাধ্য ও সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে এ খাতের উদ্যোক্তাদের পাশে থাকবে।

তিনি আরও বলেন, সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাংলাদেশ কৃষি, পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয় এবং ডিজিটাল সেবায় সফলতা দেখিয়েছে। দেশের মেধাবী তরুণ, দক্ষ ও উদ্যমী জনশক্তির উদ্ভাবনী শক্তির ওপর ভর করে পোশাকশিল্পের পর সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বাংলাদেশের আরেকটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক গন্তব্য হতে পারে।

এসময় প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, প্রবাসী পেশাজীবী এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুই দিনের এ সামিট থেকে নতুন অংশীদারত্ব, গবেষণা উদ্যোগ, বিনিয়োগের সুযোগ এবং উদ্ভাবনী চিন্তার জন্ম হবে, যা বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading