খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশে নামাতে কঠোর অবস্থানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক
উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, আপডেট ১৬:৪০
দেশের ব্যাংক খাতে বেড়ে চলা খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে এবার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ধাপে ধাপে খেলাপি ঋণের হার কমিয়ে চলতি বছরের শেষে ২০ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের শেষে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই লক্ষ্য অর্জনে শুরুতে ঋণ আদায়ে কিছুটা নমনীয়তা দেখানো হলেও পরবর্তীতে অনিয়মকারী ব্যাংক ও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি অভ্যন্তরীণ কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ কমাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মিলিয়ে ২১টি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ হারগুলোর একটি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ঋণ আদায় বাড়াতে সুদ মওকুফসহ কিছু বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে। গত ২৯ জুন জারি করা ‘এক্সিট পলিসি’র আওতায় অন্তত মূল ঋণ আদায় নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সুদ এবং তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় মওকুফের সুযোগও রাখা হয়েছে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, নতুন করে কোনো বিশেষ ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালা আনা হবে না। চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত নমনীয় নীতির আওতায় ঋণ পরিশোধের সুযোগ থাকবে। এরপর ঋণ আদায়ে আইনি ব্যবস্থা আরও কঠোর করা হবে।
এ লক্ষ্যে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন, অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন এবং খেলাপি ঋণসংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কর্মপরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে, নমনীয় নীতির সুযোগ নিয়েও যারা ঋণ পরিশোধ করবেন না, তাদের নাম-পরিচয়সহ প্রকাশ করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকৃত খেলাপি ঋণের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি নির্ধারণ করে তা পূরণের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও কোনো ব্যাংক মূলধন ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে তারা ব্যাংকের মালিকানা হারাতে পারেন এবং পরবর্তী পাঁচ বছর কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকার অযোগ্য বিবেচিত হবেন।
এ ছাড়া কোনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য অবনতি হলে সেটিকে রেজল্যুশন কাঠামোর আওতায় এনে বিক্রি, একীভূতকরণ অথবা অবসায়নের মতো পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, খেলাপি ঋণ কমানো এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। শুরুতে ঋণ আদায়ে সহায়ক নীতি অনুসরণ করা হলেও পরে অনাদায়ী ঋণগ্রহীতা ও দায়ী পক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি (এএমসি) গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান নগদ অর্থের বিনিময়ে সমস্যাগ্রস্ত ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পদ অধিগ্রহণ করতে পারবে। তবে সম্পদ বিক্রি হলেও ঋণগ্রহীতার দায় পুরোপুরি শেষ হবে না; বিক্রয়মূল্যের বাইরে অবশিষ্ট ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব তার ওপরই বহাল থাকবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, নমনীয় ঋণ আদায় নীতির পাশাপাশি কঠোর নজরদারি, আইনি সংস্কার এবং ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে আগামী দুই বছরের মধ্যে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
ইউডি/কেএস

