বাউফলের শহিদ হৃদয়: রাষ্ট্রে মিলেছে স্বীকৃতি, মেটেনি স্বজনদের অনিশ্চয়তা
উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট, ২০২৬, আপডেট ১৮:২১
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে সরকারি গেজেটে শহিদদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে আশিকুর রহমান হৃদয়ের। কিন্তু সেই স্বীকৃতির বাস্তব কোনো সুফল এখনো পৌঁছায়নি তার দরিদ্র পরিবারের কাছে। সরকারি গেজেটে শহিদ হিসেবে নাম প্রকাশিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আর্থিক সহায়তা, পুনর্বাসন কিংবা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার সদর ইউনিয়নের জৌতা গ্রামের অটোরিকশাচালক আনসার হাওলাদার ও মোর্সেদা বেগম দম্পতির পরিবার যেন একের পর এক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চার ছেলের মধ্যে একজন জুলাই আন্দোলনে শহিদ হয়েছেন, আরেকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে এখনো স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারেন না এবং তৃতীয়জন দীর্ঘদিন ধরে জটিল রোগে ভুগছেন। ফলে কর্মক্ষম মানুষের অভাবে পরিবারটি এখন চরম অর্থকষ্টে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ছোট ছেলে আশিকুর রহমান হৃদয় (১৭) ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নেন। আন্দোলন চলাকালে পুলিশের ছোড়া গুলিতে তার মাথায় তিনটি গুলি লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
প্রায় তিন মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন হৃদয়। ছেলেকে বাঁচাতে দরিদ্র বাবা আনসার হাওলাদার নিজের একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম অটোরিকশা বিক্রি করে দেন। বিক্রি করেন পরিবারের একটি দুধের গাভীও। আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে চিকিৎসা চালিয়ে গেলেও একপর্যায়ে অর্থের অভাবে আর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে ছেলেকে গ্রামের বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন।
পরিবারের দাবি, হৃদয়ের মাথার ভেতরে থাকা একটি গুলি অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও অর্থের অভাবে তা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ প্রায় নয় মাস মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল বিকেল ৩টার দিকে বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
পরবর্তীতে আশিকুর রহমান হৃদয়ের নাম সরকারি গেজেটে জুলাই শহিদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, গেজেটে নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত তারা কোনো সরকারি আর্থিক অনুদান বা পুনর্বাসন সহায়তা পাননি।
শহিদ হৃদয়ের বাবা আনসার হাওলাদার বলেন,
“ছেলের চিকিৎসার জন্য আমার অটোরিকশা বিক্রি করেছি, গরু বিক্রি করেছি, অনেক মানুষের কাছে ঋণ করেছি। তারপরও আমার ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না। ডাক্তার বলেছিলেন বিদেশে নিয়ে গেলে হয়তো ভালো চিকিৎসা সম্ভব ছিল। কিন্তু আমার সেই সামর্থ্য ছিল না। সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো সহযোগিতা পাইনি।”
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন,
“আমি একজন জুলাই শহিদের বাবা। কিন্তু আজও অভাবের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। থাকার মতো ভালো একটা ঘরও নেই। সরকার অন্য শহিদ ও আহতদের যেভাবে সহায়তা করছে, আমাকেও যেন সেভাবে সহায়তা করে। আমি আর কিছু চাই না, শুধু আমার পরিবারের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা হোক।”
এই পরিবারের দুর্ভোগ এখানেই শেষ হয়নি। মেজো ছেলে মো. রেজাউল করিমও জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়ে ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই গুলিবিদ্ধ হন। তার মাথার পেছনে গুলি লাগে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর প্রাণে বাঁচলেও এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। ভারী কোনো কাজ করতে পারেন না। বর্তমানে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে দারোয়ানের চাকরি করে কোনোমতে সংসারে সামান্য সহায়তা করছেন।
অন্যদিকে বড় ছেলে মো. আনিসুর রহমান ঢাকায় রিকশা চালিয়ে নিজের পরিবার চালাতেই হিমশিম খান। আর সেজো ছেলে মো. জসিম হাওলাদার (২৬) দীর্ঘদিন ধরে রক্তজনিত জটিল রোগে ভুগছেন। নিয়মিত রক্ত গ্রহণ ও চিকিৎসা নিতে হয় তাকে। শারীরিক অবস্থার কারণে তিনিও কোনো ধরনের উপার্জন করতে পারেন না।
চার ছেলের মধ্যে একজন শহিদ, একজন আহত এবং একজন দীর্ঘদিনের রোগী হওয়ায় পরিবারটির আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালাতেই প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাদের।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের বসবাসের টিনের ঘরটি অত্যন্ত জরাজীর্ণ। বিভিন্ন স্থানে টিন খুলে গেছে। কোথাও কোথাও ছাদের বড় অংশ ভেঙে পড়েছে। ঘরের ভেতর থেকেই দেখা যায় আকাশ। সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে ভিজে যায় বিছানা, কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। যেকোনো সময় ঘরটি ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঘরের ভেতরে নেই তেমন কোনো আসবাবপত্র। একটি পুরোনো ছোট টেলিভিশন এবং একটি আলমারি ছাড়া চোখে পড়ার মতো কিছুই নেই। পরিবারের সদস্যরা জানান, ছোট ওই টেলিভিশনটি শহিদ হৃদয় নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে কিনেছিলেন। সেটিই এখন পরিবারের কাছে তার স্মৃতিচিহ্ন হয়ে আছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মত্যাগকারী ও আহতদের যথাযথ সম্মান এবং সহায়তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তারা মনে করেন, হৃদয়ের পরিবারের বিষয়টি দ্রুত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা, পুনর্বাসন এবং চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা উচিত।
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহ আহমেদ বলেন, “জুলাই যোদ্ধা আশিকুর রহমান হৃদয়ের বিষয়টি আমি জেনেছি। ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। তার নাম সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গেজেট অনুযায়ী তিনি যে সুবিধাগুলো পাওয়ার কথা, সেগুলো এখনো না পেয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিষয়টির সমাধান হওয়ার আশা করছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার চেষ্টা থাকবে।”
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বীকৃতিগুলোর একটি পেয়েও যখন একটি শহিদ পরিবারের জীবনে দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও অবহেলার অবসান ঘটে না, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—গেজেটের স্বীকৃতি কি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তবেও পৌঁছাবে শহিদ পরিবারের দোরগোড়ায়? এখন সেই উত্তরই খুঁজছেন আশিকুর রহমান হৃদয়ের অসহায় বাবা-মা।
ইউডি/রেজা/রুবেল

