জেন-জি বিক্ষোভের পর তরুণ প্রজন্মের মন জয় করতে ইনস্টাগ্রামে মোদি

জেন-জি বিক্ষোভের পর তরুণ প্রজন্মের মন জয় করতে ইনস্টাগ্রামে মোদি

উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট, ২০২৬, আপডেট ১৯:১৬

ইন্ডিয়ায় সাম্প্রতিক জিন-জি বিক্ষোভের পর তরুণ ভোটারদের মন জয় করতে নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। চাকরি ও শিক্ষার সুযোগের অভাব নিয়ে তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক ক্ষোভের পর এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামের দিকে ঝুঁকেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

সাম্প্রতিক সময়ে মোদিকে ইনস্টাগ্রামে নিয়মিত পোস্ট করতে করতে দেখা যাচ্ছে। সেলফি ভিডিও পোস্ট করে তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বার্তা দিচ্ছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

প্রতিবেদনে বলা হয়, র‍্যাপ মিউজিকের সঙ্গে মোটরসাইকেল জ্যাকেট ও সানগ্লাস পরা লুকে দেখা দেওয়া থেকে শুরু করে জনপ্রিয় সিটকম ‘ফ্রেন্ডস’-এর থিম সং ব্যবহার করে নিজের নির্ভরযোগ্যতা তুলে ধরা- মোদির দল ইন্ডিয়ান জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজনৈতিক প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন শুধুই তরুণ প্রজন্ম।

গত ৩১ জুলাই প্রকাশিত একটি ভিডিওতে মোদিকে সাধারণ ভঙ্গিতে ‘হাই, ফ্রেন্ডস’ বলতে দেখা যায়। ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে প্রায় ৪০ কোটি জেন-জি ভোটারকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যেই মোদির এই ডিজিটাল জাদু ছড়ানোর কৌশল।

দিল্লিভিত্তিক রাজনৈতিক কলামিস্ট অসীম আলী বলেন, “এসব প্ল্যাটফর্ম এমন জায়গা, যেখানে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া ঢঙে লাখ লাখ অনুসারীর কাছে বেশ গোছানো ও সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বার্তা পোঁছানো যায়।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের কেন্দ্র করে প্রচারণার এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জোরদার আন্দোলন। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশী রাজপথে নেমে এলে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগে বাধ্য হন। ভারতে সরকারি ও পেশাগত পরীক্ষাগুলোকে একটি উন্নত ক্যারিয়ার ও আর্থিক নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হয়।

মন্ত্রী ও সরকারি দপ্তরের ভিডিও বন্যা

মোদির দেখাদেখি বিগত দিনগুলোতে তার মন্ত্রিসভার সদস্য ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংক্ষিপ্ত ও সাধারণ সম্পাদনার ভিডিও প্রকাশ করতে শুরু করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে যে, তারা তরুণদের কাছে পৌঁছাতে ‘স্ন্যাপচ্যাট’ ব্যবহার করা শুরু করবে।

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইন্ডিয়ায় রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরন বদলে দেওয়ার জন্য মোদিকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তিনি ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ গড়ে তুলেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মোদির দল বিজেপি সংবাদ চ্যানেল এবং হোয়াটসঅ্যাপ ও এক্স-এর মতো সামাজিক মাধ্যমে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।

তবে অসীম আলীর মতে, ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো কঠিন স্ক্রিপ্ট করা বার্তার চেয়ে স্বতঃস্ফূর্ততা, রসিকতা এবং স্বাভাবিক রূপকে বেশি প্রাধান্য দেয়। আর সেখানেই আন্দোলনকারীরা সফল হয়েছিলেন। শর্টস এবং ইনস্টাগ্রাম রিলসের মাধ্যমে তারা তাদের বক্তব্য ছড়িয়ে দিয়েছেন, যা মোদির বহু কষ্টার্জিত ‘রাজনৈতিক অপরাজেয়তা’ এবং সরকারের প্রচার মাধ্যমের নিয়ন্ত্রণকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

অন্য বিশ্লেষকরা বলছেন, বিজেপির আগের ডিজিটাল প্রচারণা তরুণদের কাছে অতিরিক্ত কৃত্রিম বলে মনে হতো, অথচ তরুণরা প্রকৃত ও অসম্পাদিত কনটেন্ট বেশি পছন্দ করে।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জয়জিৎ পাল বলেন, “যেসব কনটেন্ট অতিরিক্ত সতর্কতার সাথে তৈরি, মেপে মেপে কথা বলা এবং চালচলন সাজানো বলে মনে হয়, তরুণদের কাছে সেগুলো আকর্ষণীয় হওয়ার সম্ভাবনা কম।”

নজরে ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচন

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিজেপির এই নতুন উদ্যোগ তরুণ ভোটারদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক গুরুত্বেরই প্রতিফলন।

ভারতের ১৪০ কোটি জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় জেন-জি হতে যাচ্ছে সবচেয়ে বড় ভোটিং ব্লকগুলোর একটি, যা জয়ী হতে পারলে মোদিকে টানা চতুর্থ মেয়াদের জন্য ক্ষমতায় বসাতে পারে।

তবে বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া প্রধান অমিত মালব্য এ বিষয়ে রয়টার্সে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সামাজিক মাধ্যমের বাইরেও তরুণদের সঙ্গে সংযোগ বাড়াচ্ছে বিজেপি। মুম্বাইয়ে জেন-জিদের উদ্দেশ্যে এক অনুষ্ঠানে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর সামনে বক্তব্য দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিজেপির আদর্শিক মূল সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবতের। তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে আরএসএস-এর যোগাযোগের ক্ষেত্রে এটি অন্যতম বড় উদ্যোগ।

বিক্ষোভের পর এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে মোদি মন্ত্রীদের তরুণদের প্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলোতে আরও সক্রিয় হতে নির্দেশ দেন এবং তাদের ভিডিও যাতে কৃত্রিম মনে না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেন।

বিজেপির এক মন্ত্রীর যোগাযোগ দলের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আগে এক্স বা ফেসবুকের জন্য সাধারণ পোস্ট বেশি করা হতো। কিন্তু এখন নির্দেশ এসেছে রিলস বানানোর জন্য- তাও খুব কম এডিটিং ও কিছুটা স্বাভাবিক ভাব বজায় রেখে।”

জেন-জি প্রতিশ্রুতির পোস্টার

ইতোমধ্যে মুম্বাইজুড়ে ‘আই অ্যাম জেন-জি’ (আমি জেন-জি) লেখা পোস্টার দেখা গেছে। সেখানে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও মোদিকে শ্রদ্ধা করা এবং শিক্ষার্থীদের সমর্থনের মতো বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি জেন-জিদের নামে প্রচার করা হচ্ছে।

তবে এই কৌশল কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

লেখক ও পডকাস্টার অনুরাগ মাইনাস বর্মা বলেন, “ইন্টারনেটের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি আছে। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাকে রিলস হিসেবে পরিবেশন করলেও তা সহজে ট্রোলের শিকার হতে পারে। ইনস্টাগ্রামে এখন মনোযোগ বাড়লেও জেন-জি প্রজন্ম এটি শেষ পর্যন্ত কতটা গ্রহণ করবে, সেটাই দেখার বিষয়।”

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading