ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের বিষাক্ত ধোঁয়ায় ছেয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া
উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, আপডেট ১৩:৪৪
ইন্দোনেশিয়ায় সৃষ্টি ভয়াবহ দাবানল থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। দেশটির সুমাত্রা ও কালিমেন্টান দ্বীপের বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া আগুন থেকে বিষাক্ত ধোঁয়া এখন সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনে সংকট তৈরি করেছে।
ইউরোপীয় ভূ-পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘কোপারনিকাস অ্যাটমোস্ফিয়ার মনিটরিং সার্ভিসেস’ (সিএএমএস)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই বিষাক্ত ধোঁয়া দক্ষিণ চীন সাগর পেরিয়ে খুব শিগগির থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের দক্ষিণাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সুপার এল নিনো ও দাবানলের প্রভাবে পরিস্থিতি ভয়াবহ
প্রতি বছর জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ইন্দোনেশিয়ায় পাম অয়েল ও কাগজ উৎপাদনের জন্য জমি পরিষ্কার করতে কৃষকরা ইচ্ছাকৃতভাবে গাছে আগুন লাগায়। দেশটির আইনে এটি নিষিদ্ধ হলেও অসাধু ব্যক্তি ও কর্পোরেশনের মাধ্যমে এই চর্চা অব্যাহত রয়েছে। ইন্দোনেশিয়া সরকার এ ঘটনার দায় স্বীকার করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রবোবো সুবিয়ান্তো অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
চলতি বছরে একটি ভয়াবহ ‘সুপার এল নিনো পরিস্থিতির কারণে আবহাওয়া অতিরিক্তর কারণে আবহাওয়া অতিরক্তি শুষ্ক হয়ে পড়ে, যা আগুনকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করেছে। জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যেই দেশটির ২ লাখ হেক্টরেরও বেশি জমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যার মধ্যে ১ লাখ হেক্টরই পুড়েছে জুলাই মাসে।
সিএএমএস-এর তথ্যমতে, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ইন্দোনেশিয়া থেকে প্রায় ৪৬ মেগাটন কার্বন নির্গত হয়েছে, যা ২০০৩ সালের পর সর্বোচ্চ এবং প্রায় ৪৫টি কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বার্ষিক নির্গমনের সমান।
প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভয়াবহ প্রভাব
ইন্দোনেশিয়ায় এই ভয়াবহ দাবানলের ঘন কুয়াশা ও ধোঁয়ার কারণে দেশটিতে বিমান থেকে পানি ফেলে আগুন নেভানোর কাজ ব্যাহত হচ্ছে। শ্বাসতন্ত্রের নানা সংক্রমণ নিয়ে ইতিমধ্যে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
প্রতিবেশী দেশ মালয়েশিয়ার সারাওয়াক রাজ্যের কুচিং শহর ভয়াবহ দূষিত শহরে পরিণত হয়েছে এবং এর বাতাস বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছেছে। একাধিক এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বরের ‘মালয়েশিয়া দিবস’-এর অনুষ্ঠান উন্মুক্ত স্থান থেকে সরিয়ে এনে রুমের ভেতরে আয়োজন করা হচ্ছে। ৩ থেকে ৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ক্লাউড সিডিং করে কৃত্রিম বৃষ্টির পরিকল্পনা করছে দেশটি।
আরেক প্রতিবেশী দেশ ফিলিপাইনের ম্যানিলার বায়ুমণ্ডলে অতিসুক্ষ্ম ক্ষতিকর কণা পিএম২.৫-এর পরিমাণ ‘অস্বাস্থ্যকর’ মাত্রায় পৌঁছেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ম্যানিলার কুইজোন সিটিতে সরকারি-বেসরকারি স্কুলের স্থগিত করে অনলাইন শিক্ষা চালু করা হয়েছে। সুদূর পালাওয়ান দ্বীপের বাসিন্দারাও চোখে-গলায় চুলকানি ও মাথাব্যথার মতো এলার্জিজনিত সমস্যায় ভুগছেন।
এদিকে ব্রুনাইয়ের বায়ুতে ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ১৩ গুণ বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। অপরদিকে সিঙ্গাপুর সরকার ও ব্যবসায়ীরা এন-৯৫ মাস্কের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করছে। অক্টোবরের শুরুতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বহু প্রতীক্ষিত ‘ফর্মুলা ওয়ান গ্র্যান্ড প্রিক্স’-এর জন্য জরুর স্বাস্থ্য পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে নতুন করে আগুন লাগার আশঙ্কা আরও বেশি। ফলে বায়ুদূষণের এই মারাত্মক প্রভাব পুরো অঞ্চলজুড়ে আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি ও জাকার্তা পোস্ট
ইউডি/রেজা

