শুধু নায়ক না, গায়ক ও সংগীত পরিচালক ছিলেন উত্তম কুমার
উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, আপডেট ১৪:০০
বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমারের আজ জন্মশতবর্ষ। অভিনয়ের জাদুতে প্রজন্মান্তরের দর্শকদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গেড়ে নিয়েছেন। তিনি কেবল রূপালী পর্দার আইকনই ছিলেন না। গান ও সুরের ভুবনেও ছিল অবাদ বিচরণ।
চলচ্চিত্রে উত্তম কুমারের যাত্রা শুরু হয়েছিল অরুণ কুমার নামে। ১৯৪৭ সালে ‘মায়াডোর’ নামের একটি হিন্দি সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু করেন তিনি। এরপর পঞ্চাশের দশকে ‘দৃষ্টিদান’ দিয়ে নাম লেখান বাংলা সিনেমায়। শুরুটা মসৃণ ছিল না অভিনেতার। অরুণ কুমার নাম নিয়ে সিনেমায় এসে একের পর এক ফ্লপ সিনেমার অধিকারী হন তিনি। উপাধি পান ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’।
ভাগ্য ফেরাতে এ সময় তিনি নতুন করে শুরু করেন অরুপ কুমার নামে। কিন্তু এই নামও ব্যর্থতা ছাড়া কিছু দেয়নি তাকে। সবশেষে তিনি ‘সহযাত্রী’ সিনেমায় রুপালি পর্দায় হাজির হন উত্তম কুমার নামে। শুরুর দিকে ব্যর্থতা দিলেও পরে এই নাম হয়ে দাঁড়ায় ঘুরে দাঁড়ানোর অবলম্বন। ১৯৫২ সালে ‘বসু পরিবার’ নামে একটি সিনেমা মুক্তি পায় তার। মুক্তির পরপরই দারুণভাবে ব্যবসাসফল হয় চলচ্চিত্রটি। সেইসঙ্গে উত্তম কুমারও পেয়ে যান তারকাখ্যাতি। এরপর যে সিনেমাই মুক্তি পেয়েছে তা দেখতে প্রেক্ষাগৃহে উপচে পড়ছে দর্শকের ভিড়।
জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় ১৯৫৬ সালে মুক্তি পায় দেবকী বসু পরিচালিত ‘নবজন্ম’। এই ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় গায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন মহানায়ক। ছবিতে নচিকেতা ঘোষের সুরে মোট সাতটি বৈষ্ণব পদাবলি নিজের কণ্ঠে রেকর্ড করেছিলেন তিনি। গানগুলো সে সময় দারুণ সাড়া ফেলেছিল। তবে ‘নবজন্ম’-তে নিজের কণ্ঠে গান গাইলেও, সিনেমার নেপথ্যে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে তিনি আর নিয়মিত হননি। বরং গানের প্রতি ভালোবাসা থেকে পরবর্তীতে দুটি ছবির সংগীত পরিচালনা করেছিলেন।
মাহানায়কের বাড়িতে নিয়মিত গানের আসর বসত। সেখান থেকে সংগীতের প্রতি ভালোবাসা জন্মে। পরবর্তী ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর প্রখ্যাত সংগীতশিক্ষক নিদানবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নেওয়া শুরু করেন তিনি। নিজের আত্মজীবনী ‘আমার আমি’-তে স্মৃতিচারণ করে উত্তমকুমার লিখেছিলেন, ‘সিনেমায় আত্মপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষা তখন প্রবল আমার। শুনেছিলাম গান জানলেই নাকি সহজে সিনেমায় সুযোগ পাওয়া যায়। আমি তাই গান শেখবার জন্য মরিয়া হয়ে গেলাম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম গান শিখবই। কিন্তু কে শেখাবে আমাকে? এই ভাবনায় আমি নিদারুণ ব্যাকুল হয়ে পড়েছি। হঠাৎ মনে পড়ল নিদানবাবুর কথা। কণ্ঠশিল্পী ও সংগীতশিক্ষক হিসেবে নিদানবাবুর তখন নামডাক অনেক। বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে একদিন একেবারে সরাসরি হাজির হলাম তাঁর কাছে।’
সংগীতের তালিম অভিনয়কে আরও নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে ভুমিকা রেখেছিল। পর্দায় যখনই কোনো গানে ঠোঁট মেলাতেন, তখন বিন্দুমাত্র বোঝার উপায় থাকত না যে নেপথ্যে অন্য কোনো শিল্পী গাইছেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি সংগীত পরিচালক হিসেবে নিজের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তিনি। প্রখ্যাত সাহিত্যিক আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘কাল তুমি আলেয়া’ সিনেমার মাধ্যমে প্রথমবার সংগীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন উত্তমকুমার। ছবির তিনটি গানের মধ্যে একটি হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং বাকি দুটি আশা ভোঁসলের কণ্ঠে রেকর্ড হয়েছিল। গানগুলো তুমুল জনপ্রিয়তা পেলেও, এর ঠিক ১১ বছর পর ১৯৭৭ সালে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘সব্যসাচী’ সিনেমায় দ্বিতীয় ও শেষবারের মতো সংগীত পরিচালনা করেন তিনি।
চলচ্চিত্রের গণ্ডি পেরিয়ে উত্তম কুমার বিভিন্ন ঘরোয়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করতেন। বিশিষ্ট সুরকার নচিকেতা ঘোষ, আরতি মুখোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় গান ‘এই মোম জোছনায়’ মহানায়কের জন্য তৈরি করেছিলেন। রবীন্দ্রসদনের এক মঞ্চে গানটি প্রথম গেয়েছিলেন উত্তমকুমার। তাঁর গায়কী ও পরিবেশনা এতটাই মনোগ্রাহী ছিল যে পরে গানটি এইচএমভি থেকে রেকর্ড আকারে প্রকাশিত হয়।
মহানায়ক ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার ভবানীপুরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই।
ইউডি/কেএস

