বন্দরের এনসিটি-সিসিটি ইজারা দিলে অর্থনীতি-জাতীয় নিরাপত্তায় ঝুঁকির শঙ্কা

বন্দরের এনসিটি-সিসিটি ইজারা দিলে অর্থনীতি-জাতীয় নিরাপত্তায় ঝুঁকির শঙ্কা

উত্তরদক্ষিণ। শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, আপডেট ১৪:৫২

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়া হলে দেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

‘চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি-সিসিটি ইজারা: বাংলাদেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে ‘বন্দর রক্ষা ও করিডোর বিরোধী আন্দোলন’ এবং ‘বন্দর রক্ষা কমিটি, চট্টগ্রাম’।

সভায় বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার এবং অর্থনীতি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, জ্বালানি নিরাপত্তাসহ জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। তাই এনসিটি ও সিসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে কনসেশন ভিত্তিতে পরিচালনার উদ্যোগকে শুধু একটি বাণিজ্যিক চুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, কৌশলগত নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত অবস্থান জড়িত।

বক্তারা আরও বলেন, এনসিটি ইজারার উদ্যোগ নতুন নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। চট্টগ্রামের শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ, বন্দর শ্রমিক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের আন্দোলন ও আপত্তির মুখে সে সময় সরকারকে পিছিয়ে আসতে হয়। বর্তমান সরকারও বিষয়টি নতুন করে মূল্যায়নের পরিবর্তে আগের নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে। অথচ দেশের অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিল্প খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রাধিকারমূলক মনোযোগ প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইজারা প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির সঙ্গে এ উদ্যোগের সামঞ্জস্য নিয়েও জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সভায় বলা হয়, এনসিটি ও সিসিটি বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় জনবল সফলভাবে এসব টার্মিনাল পরিচালনা করে আসছে। বিদ্যমান অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও পরিচালন সক্ষমতায় যখন টার্মিনালগুলো পরিচালিত হচ্ছে, তখন বিদেশি অপারেটরের কাছে দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করা দরকার। চূড়ান্ত ইজারা চুক্তির আগেই কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ প্রায় ৩৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এতে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত শিল্প উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন্দরসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ভবিষ্যৎ অপারেটরদের জন্য উচ্চ আয়ের পরিবেশ তৈরি করতেই এ মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে।

বক্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে এনসিটি পরিচালনা থেকে অর্জিত উদ্বৃত্ত ও রাজস্বের নিয়ন্ত্রণ বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে থাকলেও নতুন ব্যবস্থায় রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার কাঠামো পরিবর্তিত হতে পারে। এতে বাংলাদেশ টার্মিনালের পুরো পরিচালনাগত আয় সরাসরি না পেয়ে চুক্তিতে নির্ধারিত ইজারা ফি বা রাজস্বের অংশ পেতে পারে। চুক্তির আর্থিক শর্ত অনুকূল না হলে সরকারের নিট আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি সংগৃহীত অর্থ বিদেশে অবস্থান করলে তার আর্থিক সুবিধা বাংলাদেশ নয়, অপারেটর প্রতিষ্ঠান ভোগ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দুর্নীতি ও দক্ষতার প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, বিদেশি অপারেটর এলে দুর্নীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে—এমন ধারণার বাস্তব ভিত্তি নেই। প্রশাসনিক দুর্বলতা, জবাবদিহির অভাব ও তদারকির ঘাটতি দূর করা গেলে দেশীয় ব্যবস্থাপনাতেই বন্দরের কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও দক্ষ করা সম্ভব। একইভাবে কনটেইনার জট বা বন্দরের ধীরগতির জন্য শুধু বন্দরকে দায়ী করা যায় না; কাস্টমসের ডকুমেন্টেশন ও শুল্কায়ন প্রক্রিয়া, পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন প্রক্রিয়াও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের কাছে পরিচালনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বক্তারা বলেন, বিদেশি অপারেটর নিয়োগ করা হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন বিনিয়োগ বা কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা বৃদ্ধি নিশ্চিত হয় না। প্রকৃত ফলাফল নির্ভর করে চুক্তির শর্ত, বিনিয়োগ বাস্তবায়ন এবং কার্যকর তদারকির ওপর।

জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরে বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল। এর আশপাশে নৌবাহিনীর ঘাঁটি, বিমানবাহিনীর স্থাপনা, ইস্টার্ন রিফাইনারি এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো রয়েছে। বন্দর পরিচালনার সঙ্গে বাণিজ্যিক তথ্য, জাহাজ চলাচল, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোর নিরাপত্তা জড়িত। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা চুক্তির ক্ষেত্রে জাতীয় ও তথ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কৌশলগত বন্দরসংক্রান্ত চুক্তির শর্ত জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে না হলে ভবিষ্যতে তা সংশোধন বা বাতিল করতে গিয়ে রাষ্ট্রকে বড় ধরনের আইনি, আর্থিক ও কূটনৈতিক জটিলতায় পড়তে হতে পারে।

আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন বন্দর রক্ষা কমিটি, চট্টগ্রামের আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার; বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি তপন দত্ত; জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম বন্দর সিবিএর সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লা বাহার; বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, চট্টগ্রাম জেলার যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান; ডক জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তমলিম হোসেন সেলিম; লেখক, বিশ্লেষক ও গবেষক আবু তাহের খান প্রমুখ।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading