গ্যাস সরবরাহ পূর্বের পর্যায়ে নেওয়ার সুযোগ সীমিত
উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, আপডেট ১৯:৩৫
আগামী সপ্তাহ থেকে গ্যাস সরবরাহ পূর্বের অবস্থায় ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছে পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সহসা ২১ জুলাইয়ের পূর্ব পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করার কোন পথই খোলা নেই।
তবে পুরোপুরি পূর্বের অবস্থায় ফেরার পথ এই মুহূর্তে খোলা নেই। আমদানি পূর্বের অবস্থানে ফিরলেও দেশীয় উৎপাদন পূর্বের অবস্থায় ফেরার কোন সুযোগ থাকছে না। তাই দিন যত গড়াচ্ছে ততই সংকট বাড়তে পারে।
২১ জুলাই সংকটের আগে দৈনিক ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হলেও মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ২ হাজার ৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। এদিন দেশীয় গ্যাসফিল্ড থেকে ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানি থেকে ৭০৯ মিলিয়ন ঘনফুট। আমদানির সক্ষমতা রয়েছে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাইলে আরও ৪০০ মিলিয়নের মতো আমদানি বাড়ানো সম্ভব। তবে পেট্রোবাংলার পরিকল্পনায় মাত্র ৩০০ মিলিয়ন বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে।
একদিকে যখন আমদানি সাইডে সংকটে সরবরাহ কমেছে। অন্যদিকে দেশীয় উৎস থেকে ৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে। ২১ জুলাই দেশীয় উৎসের গ্যাস সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৬৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট, যা এখন ১ হাজার ৬২০ মিলিয়নে নেমে এসেছে। মজুদ কমে যাওয়ায় প্রতিদিনেই কমছে উৎপাদন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গ্যাস সংকট প্রকট হয়নি, তাহলে এখন কেনো এমন হচ্ছে। এ বিষয়ে পেট্রোবাংলা একজন পরিচালক বলেছেন, ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ ছিল ২ হাজার ১০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা এখন ১ হাজার ৬২০ মিলিয়নে নেমে গেছে। দুই বছরে দেশীয় উৎসের গ্যাস কমেছে ৩৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। যে কারণে সংকট প্রকট মনে হচ্ছে।
এক সময়ে দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে দৈনিক ২ হাজার ৮০০ মিলিয়নের মতো গ্যাস উৎপাদিত হলেও এখন ১৬২০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। মজুদ কমে যাওয়ায় প্রতিনিয়ত কমে আসছে উৎপাদন। উদ্বেগের বিষয় বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদন কমে যাওয়া। ফিল্ডটি থেকে এখনও সাড়ে ৪৫ শতাংশের মতো গ্যাস যোগান আসছে। আর কনডেনসেট পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৬৮ শতাংশ। এক সময়ে ১৩৫০ মিলিয়নের মতো উৎপাদন দিতো, ৭ সেপ্টেম্বর ৭৩০ মিলিয়নে নেমে গেছে। মজুদ কমে আসায় দ্রুতই কমে যাচ্ছে উৎপাদন।
চাহিদা যখন বাড়ন্ত তখন প্রতিদিনেই কমছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন। চাইলেও সহসা আমদানি বাড়ানোর সুযোগ নেই। আমদানি বাড়াতে হলে নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইন স্থাপন করতে হবে, যা খুবই সময় সাপেক্ষ। যে কারনে আসছে ২০২৭ ও ২০২৮ সালে গ্যাস সংকট আরও প্রকট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদনে ব্যাপক ধসের শঙ্কার কারণে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী দেশে ৮টি গ্রাহক শ্রেণিতে অনুমোদিত লোডের পরিমাণ রয়েছে ৫ হাজার ৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট (দৈনিক)। মতান্তরে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিবেচনা করা হয়। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। ৭ সেপ্টেম্বর মাত্র ৮৬১ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে। ঘোষিত চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বাইরে এক তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে ৩৭৯টি শিল্পের বিপরীতে প্রতিশ্রুত লোডের পরিমাণ রয়েছে ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। যারা কোটি কোটি টাকা জামানত দিয়ে জুতার তলা ক্ষয় করছেন।
অন্যদিকে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সার উৎপাদনেও। ৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুটের বিপরীতে সরবরাহ দেওয়া হয়েছে ১৯৫ মিলিয়ন ঘনফুট।
পেট্রোবাংলা সুত্র জানিয়েছে, ২১ জুলাই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল)-এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সংকটের সুত্রপাত। কয়েক সপ্তাহ পরে এফএসআরইউ মেরামত হলে শুরু হয় কার্গো সংকট। হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। যে কারণে স্পর্ট মার্কেট থেকে দ্বিগুন দামে কিনতে হচ্ছে। আগস্টে ডিপিএম পদ্ধতিকে ৪ কার্গো এলএনজি আমদানির আদেশ দেওয়া হয়। যেগুলো কোনটাই দেশে আসেনি, যে কারণে মারাত্মক গ্যাস সংকট চলছে।
আগামী কয়েকদিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেছেন, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস আমদানির ব্যবস্থার ফলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। জ্বালানি সংকটের কারণে জনগণ যে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, তার জন্য সরকার সমব্যথী।
পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ৮ সেপ্টেম্বরের একটি কার্গো না আসায় বর্তমান সংকট। আশা করছি আগামী সপ্তাহ থেকে সরবরাহ পূর্বের অবস্থায় চলে আসবে।
ইউডি/রেজা/রহমান

