আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে

আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আত্মহত্যার পেছনে একটি নয় বরং একাধিক কারণ শনাক্ত হয়। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধে সর্বস্তরের উদ্দ্যোগ, সমন্বয় ও সহযোগিতা প্রয়োজন।

১০ অক্টোবর, বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধ’।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জন্য এই বিষয়ে লিখেছেন শিক্ষা মনোবিজ্ঞানী, সাইকোথেরাপিস্ট, কাউন্সেলর, ইয়ুথ মেন্টাল হেল্থ ফার্স্ট এইড’য়ের ন্যাশনাল ইন্সট্রাক্টর ইরফানা সামিয়া।

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালনের প্রধান উদ্যোক্তা ‘ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথ (ডব্লিউএফএমএইচ) এর সিদ্ধান্তে ‘আত্মহত্যা প্রতিরোধ’ কে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে ধরা হচ্ছে। কারণ বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যার হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র (ডব্লিউএইচও) এর মতে বিশ্বজুড়ে বছরে প্রায় ৮ লক্ষ’র মতো মানুষ আত্মহত্যার মাধ্যমে মৃত্যুবরণ করে থাকে; প্রতি চল্লিশ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহত্যা করছে।

আর সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১১ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে।

আত্মহত্যা যে কোনো বয়সসীমার মধ্যেই বিদ্যমান হলেও, দেখা গেছে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর পেছনে দ্বিতীয়তম কারণ হচ্ছে আত্মহত্যা। 

এবারের প্রতিপাদ্যের দুইটি অংশেরই গুরুত্ব অপরিসীম। প্রথম অংশ ‘মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন’ এর সঙ্গে দ্বিতীয় অংশ ‘আত্মহত্যা প্রতিরোধ’ ব্যাপারটি সম্পর্কিত।

মানসিক স্বাস্থ্যের ধারণাটা এখন পর্যন্ত পৃথিবীর অনেক জায়গায় অবহেলিত এবং অস্পষ্ট। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই একজন মনোবিজ্ঞানী হিসেবে মানসিক স্বাস্থ্যের সংজ্ঞাটা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরাটা খুব জরুরি মনে করছি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, স্বাস্থ্য হল শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে সামগ্রিক ও পূর্ণাঙ্গ সুস্থতা। কেবল কোনো রোগের অনুপস্থিতি নয় এবং মানসিক স্বাস্থ্য হচ্ছে একটি সুস্থতার অবস্থা যেখানে একজন ব্যক্তি তার সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন থাকেন, দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক চাপকে মোকাবেলা করতে পারেন, দৈনন্দিন কাজ সফলভাবে করতে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনে সক্ষম হন।

ভিন্নভাবে বলতে গেলে, মানসিক স্বাস্থ্য হচ্ছে আবেগীয় এবং মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতা যা কিনা একজন মানুষকে স্বাভাবিকভাবে চিন্তা, অনুভব এবং আচরণ করতে সক্ষম করে।

মানসিক স্বাস্থ্যের উপস্থিতি একজন মানুষকে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে, সঠিক এবং ভুলের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করতে, সমস্যা সমাধানের পথ বেছে নিতে সাহায্য করে। নিজের ও অন্যের প্রতি সম্মান, সক্ষমতা সম্পর্কিত বিশ্বাসও মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি অজ্ঞতার দরুণ এটি নিয়ে আমাদের সমাজে বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণা এবং কুসংস্কারও বিদ্যমান। আবার মানসিক সমস্যা এবং মানসিক রোগ সম্পর্কেও আমাদের ধারণা না থাকায় আমরা নানা ধরনের বিভ্রান্তিতে পড়ি। আর মনোবিজ্ঞানীর দ্বারস্থ হওয়া তো আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে অনেক দূরের বিষয়।

আমরা শারীরিক ভাবে অসুস্থ বা কোনো রোগ হলে একজন ডাক্তারের কাছে যেতে দ্বিধাবোধ করি না। তবে কোনো মানসিক সমস্যা দেখা দিলে বা মানসিক রোগের ক্ষেত্রে কোনো পেশাদার মনোবিজ্ঞানী বা মনোঃচিকিৎসকের কাছে যেতে চাই না। কারন পাছে লোকে কিছু বলে!

এক্ষেত্রে ব্যক্তি মনে করেন যে, অন্য মানুষ তাকে মানসিক সমস্যাগ্রস্ত, পাগল বা উন্মাদ ভাববে। শুধু তাই না, ধরা যাক কোনো আঘাতের কারণে আপনার শরীরে ক্ষত হল বা গায়ে জ্বর আসল তখন আমরা ডাক্তারের কাছে যাই। তবে কোনো কারণে মনে আঘাত পেলাম, অনেক দুঃখ-কষ্ট-ব্যথা অনুভূত হল, সেটা সারানোর জন্য একজন মনোবিজ্ঞানীর শরণাপন্ন হওয়ার কথা কি ভাবি?

মানসিক চাপ বা আঘাত মনে পুষে রাখতে রাখতে, তা মনের ভেতর এক বিশাল  ক্ষতের সৃষ্টি করে, ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা, আবেগ ও আচরণকে এলোমেলো করে দেয়। তখন কিন্তু সেটা শুধু একটা আঘাত নয়, মানসিক রোগেও পরিণত হতে পারে।

অনেক সময় শারীরিক ছোট সমস্যা চিকিৎসার অভাব থেকে যেমন বড় আকার ধারন করে, মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রেও তাই। এছাড়া অনেক শারীরিক সমস্যা রয়েছে যার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে কোনো মানসিক চাপ, আঘাত যা হয়ত কখনও নিরুপণ করা হয়নি এবং কাউন্সেলিং বা মনোচিকিৎসার মাধ্যমে সারিয়ে তোলা হয়নি।

আর আত্মহত্যাকে মনে করা হয় মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির এক চূড়ান্ত ফলাফল হিসাবে।

প্রত্যেকটি আত্মহত্যা একটি বা ততোধিক পরিবার, সমাজ, দেশ এবং পুরো বিশ্বকে প্রভাবিত করে এবং যারা বেঁচে থাকে তাদের ওপরে এর একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রেখে যায়। আত্মহত্যা প্রবণ ব্যক্তি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভীষণ হতাশাগ্রস্ত বা বিষাদগ্রস্ত থাকে এবং চিন্তা করে যে আত্মহত্যার মাধ্যমে তার সব কষ্ট শেষ হয়ে যাবে।

এমন কেউ নেই, যে তাকে সাহায্য করতে পারে, বেঁচে থাকাটা অর্থবহ হচ্ছে না, সবকিছু তার সহ্যের বাইরে, সে না থাকলে সবাই ভালো থাকবে এবং সব ঠিক হয়ে যাবে।

এই ধরনের নেতিবাচক আবেগ এবং চিন্তা যাদের মধ্যে বিদ্যমান, তাদের বেশিরভাগই কোনো মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর (পেশাদার মনোবিজ্ঞানী/মনোচিকিৎসকের) শরনাপন্ন হন না, সমাজে বিদ্যমান বদ্ধমূল ধারণার জন্য।

কিছু দীর্ঘমেয়াদী মানসিক অসুস্থতার সঙ্গে আত্মহত্যা সম্পর্কিত, এর মধ্যে অন্যতম বিষণ্ণতা। এছাড়াও ব্যক্তির জীবনে কিছু ঘটনা বা টানাপোড়েন যেমন- জীবনের চাপ মোকাবেলা করতে না পারা, আর্থিক সংকট, একাকিত্ববোধ, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক কলহ, নেশাগ্রস্ততা, রোমান্টিক সম্পর্কের বিছিন্নতা, পড়াশোনায় ভালো ফলাফল না করা, দীর্ঘ মেয়াদী মানসিক আঘাত ইত্যাদিও ব্যক্তিকে আত্মহত্যার ঝুঁকিতে ফেলে।

মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, নিকট বন্ধুর বা আত্নীয়ের আত্মহত্যা বা অকাল মৃত্যু ইত্যাদি আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া যে ব্যক্তি পূর্বে একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন, সে পরে আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকেন।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আত্মহত্যার পেছনে শুধু একটি কারণ নয় বরং একাধিক কারণ শনাক্ত হয়। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধে সর্বস্তরের উদ্দ্যোগ, সমন্বয় ও সহযোগিতা প্রয়োজন (স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শ্রম, কৃষি, বাণিজ্য, আইন ও বিচার, প্রতিরক্ষা, রাজনীতি ও গণমাধ্যম)।

এক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, ইলেক্ট্রনিক এবং সোশ্যাল মিডিয়াকে এগিয়ে আসতে হবে। এখন পর্যন্ত আত্মহত্যা নিয়ে কথা বলা বা আলোচনা করাটা সর্বস্তরে একটা স্পর্শকাতর বিষয় বলে মনে করা হয়। তবে এ বিষয়টাকে এখন আর পেছনে ফেলে রাখলে হবে না, সামনে নিয়ে আসতে হবে, আলোচনা করতে হবে, প্রতিরোধের দিকে মূল মনোযোগটি দিতে হবে, আত্মহত্যার কারণগুলোকে মাথায় রেখে প্রতিরোধের কৌশলগুলোকে সামনে আনতে হবে। তবে প্রত্যেক স্তরে আলোচনার প্রকাশটি হতে হবে সচেতনভাবে, অতিরঞ্জন বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য যাতে না থাকে।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে যে, এবারের প্রতিপাদ্যে আত্মহত্যা প্রতিরোধ কথাটি নির্ধারিত করার অর্থ হচ্ছে সরকার এবং রাষ্ট্রের নজরে আনা, যাতে এটা প্রতিরোধে রাষ্ট্র সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণে আরও সচেষ্ট ও মনযোগী হয়। প্রতিপাদ্যের উদ্দেশ্য এটা নয় যে, মানুষকে আত্মহত্যা সম্পর্কে ইন্ধন দেওয়া। বরং সামাজিকভাবে যে বিষয়টা আলোচনা করায় বাধা আছে এবং যার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ভ্রান্ত ধারণা এবং কুসংস্কার জড়িত থাকে সে বিষয় নিয়ে সমাজের মানুষ যদি খোলামেলা কথা বলে তাহলে এর সঙ্গে জড়িত নেতিবাচক ফলাফলের পেছনের ঝুঁকিপূর্ণ কারণগুলোকে খুঁজে পাওয়া যায় এবং প্রতিরোধ করা যায়। আর এবারের মানসিক স্বাস্থ্যদিবসের আয়োজকদের মূল উদ্দেশ্য এটাই।

তাছাড়া আত্মহত্যা প্রতিরোধে আরও কিছু বিষয়ের দিকে দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন। যেমন- পারিবারিক বা সামাজিক পর্যায়ে আত্মহত্যা প্রবণ ব্যক্তিকে দোষারোপ, কটুক্তি বা অবহেলা না করে বরং তার কথাগুলো গুরুত্ব সহকারে শুনতে হবে এবং তার সমস্যা থেকে বের হওয়ার জন্য যথাযথ তথ্য প্রদান করতে হবে যে, তিনি একা নন এবং যথাযথ চিকিৎসা বা ব্যবস্থার মাধ্যমে তার সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব।

এছাড়া পারিবারিক বন্ধন সমুন্নত রাখা, বিশেষ করে সন্তানের সঙ্গে পিতামাতার খোলামেলা সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে ভুমিকা পালন করে। 

আত্মহত্যা প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ প্রয়োজন। যেমন- আত্মহত্যার সরঞ্জামের প্রাপ্ততা সংকীর্ণ করা। এছাড়া একজন শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানী হিসেবে আমার মতামত হচ্ছে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। ছেলেমেয়েদের স্কুলের পাঠ্যপুস্তকেও এই মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অধিভুক্ত করা হোক যাতে  শিক্ষার্থীরা নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকে, নিজের যত্ন নিতে শেখে, নিজেকে এবং জীবনকে ভালোবাসতে শেখে।

এ উদ্দেশ্যে অল্প বয়স্ক ছেলেমেয়েদের দৈনন্দিন চাপ মোকাবেলার জন্য দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনা করা যেতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, প্রাথমিক অবস্থায় আত্মহত্যা প্রবণতা নিরুপন করা এবং যারা আত্মহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছে তাদের পরে ফলোআপে রাখার জন্য প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী (এডুকেশনাল সাইকোলজিস্ট/শিক্ষা মনবিজ্ঞানী, কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, মনোচিকিৎসক) নিয়োগের প্রয়োজন।

আমাদের দেশে কিন্তু এখন বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীরা কাজ করছেন। তাছাড়া বেশ কিছু হেল্পলাইন নাম্বারও রয়েছে।

তাই বদ্ধমূল ধারণা আর কুসংস্কারকে পেছনে ফেলে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নের লক্ষে সাহায্যের জন্য অগ্রসর হতে হবে। আর জীবনকে উপভোগ করতে হবে। জীবন তো একটাই। 

মানসিক স্বাস্থ্যের তাৎপর্য অনুধাবন, উন্নয়ন এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ের সমন্বিত এবং সামগ্রিক উদ্যোগই পারবে এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading