উত্তপ্ত সমাজ: উপাচার্যের চাপে শিক্ষার নাভিশ্বাস
নানা ইস্যুতে দেশ এখন উত্তপ্ত। একটার পর একটা ইস্যু আসছে সামনে। একটার আগুন নিভতে না নিভতেই আর একটা জ্বলে উঠছে। উপাচার্য বিতর্কের রেশ না কাটতেই যুবলীগ প্রধানের অব্যাহতি, তার খবর পাতে পড়তে না পড়তেই শুরু হয়েছে দাঙ্গা বাধানোর অপপ্রক্রিয়া। সামাজিক মাধ্যম এমনিতেই একটি অনিয়ন্ত্রিত অসম্পাদিত মিডিয়া। মানুষ যদি তার ব্যবহার না জানে বা ভুল ব্যবহার করে তবে যে কি হতে পারে তা আমাদের চাইতে ভালো আর কে জানে? শনিবার রাতে তৃতীয় মাত্রায় অতিথি থাকার সুবাদে কি কারণে যেন এমন প্রসঙ্গ উঠেছিল। সে কথাই বলেছি আমি। জাতি হিসেবে অপ্রস্তুত আর অপরিমিত হবার পরও এই অবাধ সামাজিক মাধ্যম কি আসলেই মঙ্গলের? নাসিরনগর, রামু, বোরহানউদ্দিন কী প্রমাণ করে? এর পেছনে যে ইন্ধন বা যে ধরণের উস্কানি থাক না কেন এটা যে একটা অস্ত্র এবং তার ব্যবহার করে মানুষের সর্বনাশ করা যায় তা এখন স্পষ্ট। সরকার ও প্রশাসন কঠোর হলে এ ঘটনা বেশি দূর যেতে পারবে না। যেতে যে পারবে না তার প্রমাণও আছে সামাজিক মাধ্যমে। চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে হাতে হাত রেখে মন্দির পাহারায় নেমেছেন মাদ্রাসার ছাত্ররা। এ দৃশ্যই বাংলাদেশ। এর ভেতরই আছে সামাজিক বন্ধন আর মুক্তির পথ।
বলছিলাম উপাচার্য বিষয়ে। আমার সৌভাগ্য হয়েছে ভিসি মীজানুর রহমানের সাথে অপর একটি টকশোতে অংশ নেয়ার। অদ্ভুত অভিজ্ঞতা বটে। প্রথমেই তাকে ধন্যবাদ দেই বিশাল কলিজা বা সহ্যশক্তির জন্য। কথায় আছে একমাত্র দেবদূত আর শয়তানই নাকি পারে সব কিছু সহ্য করতে। তিনি কোন দলে জানি না তবে পারেন। মাঝপথে চলে গেলেও কটু কথা বলেননি। কিংবা মাইক্রোফোন খুলে তার ছিঁড়ে বেরিয়ে যাবার মত অভদ্রতাও করেননি। আফটারঅল ভিসি মানুষ। তবে সে অপমান আর তিরস্কার আমার মতো দুর্বল মানুষের পক্ষে তা হজম করা দুঃসাধ্য। লাখ লাখ লোকের পত্রিকা নামে পরিচিত প্রথম আলো সভ্যতা ভব্যতার ধার না ধেরে শিরোনাম দিয়েছিল মীজানুর যুবলীগের নেতা হতে চায় । তিনি সবই হজম করেছেন। সে সন্ধ্যার টকশোতে মুন্নী সাহার তির্যক কথাতো ছিলোই, ছিলো আমাদের যৌক্তিক বা রাগের মাথায় বেরিয়ে আসা প্রশ্নবাণ। মীজানুর রহমান না রেগেই কিন্তু উত্তর দিতে চেষ্টা করেছিলেন। তবে তিনি কি বলেছেন আর তাতে কি মনে হয়েছে সে কথা বলার আগে আর একটা কথা বলবো। সে আলোচনায় ছাত্রলীগের প্রাক্তন নেতা সোহাগ যতটা সাহস আর তেজ নিয়ে সত্য বললো ততটাই দুর্বল আর দোটানায় থেকে মদদ যোগালেন অধ্যাপক জিয়াউর সাহেব।
মীজানুর রহমান যা বলেছেন তাতে আমি নিশ্চিত আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসি পদ এখন আর সম্মানের কিছু না। আমি দেখলাম যে এমন একটি সম্মানজনক বিশাল পদের মানুষও কতটা নির্লজ্জ আর বেহায়া হতে পারেন। মুশকিল কি জানেন? এখন দেশে তার এই কথা বা ভূমিকা সমর্থনের মানুষেরও কমতি নাই। এসব মানুষের এক কথা। এদেশে সবসময় রাজনৈতিক মানুষেরা ভিসি হয়েছিলেন কাজেই সমস্যা কোথায়? এদেশের অতীত গ্লানি আর পাপকে মোছার জন্যইতো শেখ হাসিনার বারবার শাসনভার গ্রহণ। তার আগে কেউতো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেনি। তার আমলে যে উন্নয়ন তা কি আগে হয়েছিল? তিনি যেভাবে দলের লোকদের ব্যাপারে কঠোর হচ্ছেন এর আগে কি কেউ তেমন করতে পেরেছিল? তাহলে ভিসির বেলায় আমরা পুরনো অতীতে থাকতে চাই কেন? কেন আমরা এমাজউদ্দীন বা মুনীরুজ্জামানদের কথা টেনে আনি? সে যুগের কালো অধ্যায়গুলো আজ বিএনপি নামের বড় দলকে মাইক্রস্কোপিক দলে পরিণত করে ফেলেছে আমরা কি আওয়ামী লীগের বেলায়ও তাই চাই? না চাইলে কি কারণে রাজনীতিকরণের সমর্থনে গলা ফাটাই? কেউ কি বুঝিয়ে দিতে পারবেন?
মীজানুর রহমান বললেন বুয়েটের ভিসি দলীয় রাজনীতির সাথে থাকলে নাকি ঘটনা এভাবে ঘটতে পারতো না। কথাটা কি সাধারণ বা যৌক্তিক কোনো কথা? এর মানে কি দলীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত ভিসিরা আগেই জেনে যান কাকে মারা হবে? এবং কিভাবে সে ঘটনা ধামাচাপা দেয়া যাবে? আরো একটা সন্দেহ মাথাচাড়া দেয়। ভিসি কি দলীয় হলে ক্যাম্পাসে সংঘটিত অপরাধগুলো চাপা দেয়ার ট্রেনিং লাভ করেন? না তার নির্দেশ মতো মারামারির ধরণ ঠিক হয়? এই কথাগুলো সময়াভাবে আলাপ করা হয়নি। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত আমাদের দেশের মিডিয়ায় যারা কথা বলেন তাদের আরো সংযত আর জানা বা পাঠ থাকা উচিৎ। অধ্যাপক জিয়াউর বিদেশে কোন কোন ভিসি রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন তার একটা তালিকা দিলেন। বলছি না সেগুলো ভুল। কিন্তু এমন খণ্ডিত তালিকা কি আসল কোনো সত্য প্রকাশ করে? আমরা যারা দেশের বাইরে থাকি সেখানে অল্পবিস্তর পড়াশুনা করা বা কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি আমরা কিন্তু এমন কিছু নিয়ম সেখানে দেখি না। বিচ্ছিন্ন কেউ কেউ রাজনীতি করে এসব পদে গেলেও তা কি আমাদের মত দলীয় আধিপত্য আর হানাহানির রাজনীতির সমতূল্য? একজন অভিজ্ঞ অধ্যাপক যখন এভাবে ভুল বা আংশকিক সত্য তুলে ধরেন তখন ভয় লাগে। বিদেশে বা উন্নত অনুন্নত সব দেশেই ছাত্র রাজনীতি মূলত সে দেশের মূলধারার রাজনীতি বা দল থেকে পৃথক। যেসব দেশে মিছিল মিটিং নাই, নাই কোনো গডফাদারের অত্যাচার তাদের উদাহরণ টেনে আমরা কি প্রমাণ করতে চাইছি?
আমাদের বাস্তবতা মনে রেখে আপনি উপাচার্য পদের দিকে তাকান। একমাত্র গদীর লোভ আর রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছাড়া কে চাইবে বিপদকে আলিঙ্গন করতে? বিপদই যদি না হবে এদেশে ভিসিদের মত অপমান আর কাকে করা হয়? নাম উল্লেখ না করেই বলা যায় প্রায় সব ভিসিই এখন তোপের মুখে। ছাত্র-ছাত্রীর আত্মীয়স্বজনরাও তাদের আঙুল উঁচিয়ে কথা বলে। সে অপমানের খবর জেনে যায় বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জের মানুষ। জানে বিদেশের বাঙালি। ভিসিকে দিনের পর দিন ঘেরাও করে রাখা হয়। ভিসি পালিয়ে যান, ভিসি ভয়ে ঘর থেকে বের হতে পারেন না। তাই হয়তো মীজানুর রহমান ভিসি পদের চাইতে যুবলীগের পদটিকে বেশী ভালোবাসেন। লজ্জায় বলতে পারেন না। কারণ তখন তার টিকি স্পর্শ করার সাহস থাকবে না কারো। যতদিন পর্যন্ত তিনি বা তার মতো কেউ ওমর ফারুকের পরিণতি বরণ না করবে।
আমাদের দেশে উন্নয়ন হচ্ছে এ কথা স্বীকার করতেই হবে। মানুষের টাকা বেড়েছে। রাস্তা বড় হয়েছে। উড়াল পুল বাড়ছে। কমছে নৈতিকতা। কমছে মানুষের বোধ। যেতে যেতে ব্যাংকগুলো গেছে, রাজনৈতিক দলগুলো গেছে, বীমা গেছে, মিডিয়া গেছে। মগজ তৈরীর কারখানা নামে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এখন যাবার পথে। না, পড়ালেখার মান বা উন্নতি অবনতি নিয়ে কোনো কথা নাই। কোন ভিসি থাকবে কে থাকবে না সেটাই বড় বিষয়। এই ঘোলা পানিতে স্বাধীনতাবিরোধী আর বিএনপির মুখ থুবড়ে পড়া রাজনীতি মৎস্য শিকারে ব্যস্ত। তাদের যখন আর কোনো রাস্তা নাই তারা নিরাপদ সড়ক হোক আর বুয়েট হোক বন্দুক ছাত্র-ছাত্রীদের কাঁধে রাখতেই পাগল। কারো কল্যাণ-অকল্যাণ, মরা-বাঁচা তাদের কাছে বিষয় না। বিষয় দলের মনোবল চাঙ্গা করা। শেখ হাসিনার বিপদ টেনে আনা।
মীজানুর রহমান অবশ্য কামিয়াব হবেন না। কারণ ১৮ থেকে ৫৫ই হবে যুবলীগের বয়স সীমা। তাকে আমি বলেছিলাম ষাট বছরের মানুষের সংখ্যা দেখে মনে হচ্ছে এর নাম কি বালাইষাট লীগ? এখন সে সুযোগ আর নাই। রাজনীতি নিষিদ্ধ হোক এটা আমরা চাই বা না চাই ছাত্রলীগ, যুবলীগের নামে অত্যাচার বন্ধ হোক। যে ছাত্রলীগের সেরা প্রডাক্ট আ স ম রব বা শাহজাহান সিরাজ তাদের গৌরব আসলে কতটা? শেষ কথা এই যুবশক্তির নামে অনাচার সব শাসকের আমলে দেখেছি। ভালো-মন্দ বিবেচনা পরের কথা। দরকার এগুলো বন্ধ করে ছাত্র-ছাত্রীদের নৈতিকতা ফিরিয়ে আনা। একজন ঠেলা গাড়ীওয়ালার ছেলে আর ধনী পরিবারের আদরের দুলাল যখন দেশের ভালো সেরা একটি প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনার পরও একজন ছাত্রকে এভাবে হত্যা করতে পারে, ধরে নিতে হবে আমাদের আশা ভরসা শেষ হবার পথে।
বিশ্বের সেরা কয়েক শ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আমাদের নাম নাই বলে দুঃখ হতো। মীজানুর রহমানরা ভবিষ্যতে আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় আছে কি নাই সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলে অবাক হবো না।

